আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ নবম সংখ্যা ● ১-১৫ মে, ২০২৬ ● ১৬-৩১ বৈশাখ, ১৪৩৩

প্রবন্ধ

ডার্ক ওয়ার্ল্ড থেকে এক অভিনব সংবাদ

স্বপন ভট্টাচার্য


বহুদিন পরে ডার্ক ওয়ার্ল্ড থেকে একটা গোড়ায় ধাক্কা দেওয়া খবর এল। ডার্ক ওয়ার্ল্ড হল জীবাণুদের অদৃশ্য জগত। খালি চোখে দেখা যায় না তাদের। আমাদের পণ্ডিতি সে জগতে আলো ফেলার চেষ্টা করে আসছে আজ থেকে নয়! যদি যুগান্তকারী আবিষ্কারের মডেল হিসাবে একক একটি প্রাণকে নোবেল দিতে হয়, তাহলে হেসেখেলে সেটা জিতে নেবে ইঁদুর বা গিনিপিগ নয়, একটা এককোষী ব্যাকটেরিয়া - E. coli (Escherichia coli) যার নাম। বিজ্ঞানের বিশ পঁচিশটা নোবেল তো শুধু তাকে ছানবিন করেই পেয়েছেন নামজাদা গবেষকরা, তবু আজও সে নতুন নতুন বিস্ময় উপহার দিয়ে চলেছে এবং আমরা অবাক হয়ে দেখছি একটা সামান্য মাইক্রোস্কোপিক সজীব কোষকে কতশত আসামান্য প্রকৌশল দিয়েছে প্রকৃতি! ডার্ক ওয়ার্ল্ড-এর কতটুকু যে আমরা আসলে জেনেছি, তাও জানা নেই আমাদের।

E. coli গবেষণায় সাম্প্রতিকতম যে খবরটি পাওয়া গেল তা একদম টেক্সটবই বদলে দেওয়া জিনিস। সে প্রসঙ্গে ঢোকার আগে জীব ও জীবনের 'সেন্ট্রাল ডগমা' সম্পর্কে দু চার কথা বলে নেওয়া দরকার। ১৯৪৪ সালে আভেরী, ম্যাকলয়েড ও ম্যাকার্টি[1] নামের গবেষকত্রয় দ্বিধাহীনভাবে প্রমাণ করে দেন যে কোষের মধ্যে থাকা হাজার জাতের রাসায়নিকের মধ্যে DNA হল সেই বস্তু যা বংশগতির খবর নিয়ে যায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। জীব ও জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে এই 'জায়ান্ট অফ এ মলিকিউল'। অস্ট্রিয়ার সেই ভোলেভালা পাদ্রী মেন্ডেল সাহেবের সময় থেকেই জীবনের বার্তাবহ 'ফ্যাক্টর' যে ঠিক কোনটা তা নিয়ে সারা বিশ্বজুড়েই প্রচুর কাঠখড় পুড়েছিল - কিন্তু আভেরী প্রমুখের আগে সেটা যে DNA তা নির্দিষ্টভাবে বলার সুযোগ ছিল না। প্রমাণ পাকা হবার পরেও প্রশ্ন যেটা ছিল তা হল জীবনের বার্তাবহ অণুকে প্রতিরূপ গঠনে সক্ষম হতে হবে - DNA-এর গঠনশৈলীতে এই প্রশ্নের উত্তরও থাকা দরকার। প্রতিরূপ মানে ধরুন মিরর ইমেজ - আয়নার সামনে দাঁড়ালে আর একটা আমি। আয়না দেখায় বটে কিন্তু সে আমিকে ছোঁয়া যায় না, মিরর ইমেজ ছদ্ম অবয়বধারী, সত্যি নয়। কিন্তু DNA যদি বংশগতির ধারক-বাহক হয় তাহলে প্রকৃতই অবয়বধারী হতে হবে, যাতে মাতৃকোষ থেকে সংবাদ অপত্যে গেলেও পূর্ণ পূর্ণই থাকে আর একটা পূর্ণকে সৃষ্টি করার পরেও। এও এক পরম বিস্ময় যার সমাধান পাওয়া সহজ ছিল না। ছিল না কারণ, ১৯৫৩ সালের আগে DNA জিনিসটার একটা ঠিকঠাক অবিতর্কিত স্ট্রাকচার কেউ অণুমান করতে পারেন নি, যা দিয়ে 'মিরর বাট রিয়েল ইমেজ' বা প্রতিরূপ তৈরির ঘটনাটা ব্যাখ্যা করা যায়। ওই বছর, কিছুটা আকস্মিকভাবেই কেম্ব্রিজের জেমস ওয়াটসন এবং ফ্রান্সিস ক্রিক-এর যৌথ এক গবেষণাপত্র ছাপা হল 'নেচার' পত্রিকায় (Nature, 25 April, 1953)[2] যাতে DNA অণুর একটা দ্বিতন্ত্রী গঠন (Double helix) উপস্থাপিত করে উপসংহারে তাঁরা বললেন - আমাদের অনুমান এই গঠনশৈলী জীবনের বার্তাবহ অণুর প্রতিরূপতা সমস্যাটির সমাধান দিতে সক্ষম। শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী গবেষণাপত্র হবার দাবিদার যেটা, তাতে ওই 'সম্ভবত'র সংশয়টি রীতিমতো আন্ডারস্টেটমেন্ট বলে মনে হয় আজকে দাঁড়িয়ে - কিন্তু তাঁদের পক্ষে তা অস্বাভাবিক ছিল না, কেন না বিষয়টা তখনও প্রমাণিত হয় নি। প্রমাণ এল মেসেলসন-স্টাহল[3] নামের অপর দুই গবেষকের কাজ থেকে ১৯৫৮ সালে। তাঁরা দেখালেন দ্বিতন্ত্রী গঠনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে DNA অণুর প্রতিরূপতা অর্জনের রহস্য। একটা দ্বিতন্ত্রী DNA যখন প্রতিরূপ গঠন করে তখন তার তন্ত্রীদুটো কাজ করে টেমপ্লেট বা ছাঁচ হিসেবে এবং এই ছাঁচের বিপরীতে গড়ে ওঠে দুটো নতুন 'ডটার স্ট্র্যান্ড' বা অপত্য তন্ত্রী। অর্থাৎ, প্রতিটি ডবল হেলিক্সের দু'খানা তন্ত্রী দুটো আলাদা জেনারেশনের প্রতিনিধিত্ব করছে - একটা মাতৃতন্ত্রী, অপরটি কন্যার। এভাবেই মাতা ও কন্যাকে বয়ে নিয়ে প্রবাহিত জীবনের স্রোতধারা - প্রতিটি সজীব কোষের এই হল গল্প।

এই সমস্যার সমাধান মেলার পর প্রশ্ন এল, দেহ থেকে শুরু করে মন মানসিকতা - সবই যদি DNA-এর নিয়ন্ত্রণে তাহলে কাজটা সে করে কী ভাবে? সে কি নিজেই সংবাদ তৈরি করে সংবাদ ছাপিয়ে ফেলা খবরওয়ালা? জেনেটিক কোডের রহস্য উন্মোচিত করে নীরেনবার্গ, ম্যাথাই ও হরগোবিন্দ খোরানা[4] জানিয়ে দিয়েছিলেন, যে সংবাদ DNA বহন করে তা আসলে এক রাসায়নিক সংবাদ, তার ভাষা হল তার গঠনে অংশ নেওয়া বেসগুলির ভাষা যারা নিজেদের মধ্যে এক সুনির্দিষ্ট জোড় বাঁধার সূত্র মেনে চলে। কিন্তু জীব জীব হয়ে ওঠে অনবরত ঘটে চলা কিছু বায়ো-কেমিক্যাল রিঅ্যাকশনের সমন্বয়ে এবং তাতে DNA বস্তুটার সরাসরি কোনো অংশগ্রহণকারী ভূমিকা নেই।

প্রতিটি রাসায়নিক বিক্রিয়া যা প্রাণের প্রতীক, তা সংঘটিত হয় কোনও না কোনও উৎসেচকের উপস্থিতিতে। DNA আসলে বহন করে ওই উৎসেচক তৈরির সংবাদ। উৎসেচক কিন্তু প্রোটিন, তার গঠনে বেস নেই, রয়েছে অ্যামিনো অ্যাসিড। অর্থাৎ DNA-এর ভাষা অনূদিত হয় প্রোটিনের ভাষায়, কিন্তু কী ভাবে? এর কারণ, জীবনের সংবাদপ্রবাহ একটা একমুখী গতিপথে কাজ করে। DNA-এর সংবাদ প্রোটিনের ভাষায় অনূদিত হয় ঠিকই, কিন্তু সরাসরি নয়। DNA যদি সংবাদবাহক হয়, তাহলে তার একটা ছাঁচ তুলে নেয় আর একটা ইন্টারমিডিয়েট অণু যার নাম mRNA, এবং সেটা ঘটে 'ট্রান্সক্রিপশন' নামের একটা ধাপের মাধ্যমে। এই ট্রান্সস্ক্রিপ্ট আসলে সেই সমস্ত জেনেটিক কোডের সমন্বয় যা পড়ে নিয়ে সজীব কোষ তৈরি করবে সজীবতার কারেন্সি-প্রোটিন। DNA থেকে ছাঁচ তোলা mRNA এবং mRNA থেকে অনূদিত প্রোটিন - ফ্রান্সিস ক্রিক (১৯৫৭) একে বলেছিলেন জীবনের অমোঘ কেন্দ্রীয় প্রত্যয় - সেন্ট্রাল ডগমা। এই সংবাদপ্রবাহ নিতান্তই একমুখী বলে জানা ছিল একসময়, ক্রিক এর বিপরীতমুখী সংবাদপ্রবাহের কথা একেবারে উড়িয়ে দেন নি অবশ্য, কিন্তু তেমন কিছু অন্তত গোড়ায় জানা ছিল না। পরবর্তীকালে HIV এবং কয়েকটি সদৃশ ভাইরাসের ক্ষেত্রে দেখা যায় mRNA থেকে বিপরীত অভিমুখে DNA তৈরি হতে পারে এবং এজন্য বিশেষ একটা উৎসেচক তারা কাজে লাগায় যার নাম রিভার্স ট্রান্সস্ক্রিপ্টেজ (RT), কিন্তু প্রোটিন থেকে DNA তৈরির কোনও সংবাদ যে পাওয়া যেতে পারে কোনোদিন - তা বোধহয় কল্পনাও করা যায় নি এই সেদিনের আগে পর্যন্ত।

২০২৬-এর ১৬ এপ্রিল স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালেক্স গাও ও সহযোগীরা[5] জানিয়েছেন আমাদের অতি পুরোনো এবং বিশ্বস্ত বন্ধু E. coli নামের ব্যকটেরিয়া থেকে এক আশ্চর্য উপায়ে এটাও সম্ভব হবার খবর পাওয়া গেছে (Gao et al, Science, 16 April, 2026)। এখন কথা হচ্ছে DNA অথবা mRNA উভয়ের ভাষাই নিউক্লিওটাইড বেসের ভাষা, ফলে mRNA যদি টেমপ্লেট হিসাবে কাজ করে তাহলে সেটা থেকে DNA গড়ে নেওয়া অসম্ভব নয়, রিভার্স ট্রান্সক্রিপশনের ক্ষেত্রে সেটাই হয়, কিন্তু প্রোটিনের অ্যামিনো অ্যাসিডে DNA তৈরির ছাঁচ কোথায়? ফলে এমনটা যে হতে পারে তা ভাবাই দুরূহ ছিল। ১৯৬০-এর দশক থেকেই জেনেটিকসের টেক্সট বই এই একমুখী সেন্ট্রাল ডগমা-র কথা বলে এসেছে, সেটা বাইপাস করার মতো কিছু পেতে যে আরও ষাট বছর অপেক্ষা করতে হল তার কারণ ওই রহস্যময় ডার্ক ওয়ার্ল্ড! আমরা সত্যিই তার কতটুকু জানি?

এই নতুন খবরটি এল E. coli ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরক্ষাতন্ত্র নিয়ে গবেষণার সূত্রে। এই ব্যাকটেরিয়ার ভাইরাসের আক্রমণ থেকে বাঁচবার জন্য একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা আছে - DRT3 নামে পরিচিত সেটা। জীবনবিজ্ঞানের ছাত্র মাত্রেই জানেন যে মাতৃ DNA থেকে অপত্য DNA তন্ত্রী তৈরি হয় DNA পলিমারেজ নামের একটা উৎসেচকের উপস্থিতিতে। অনুরূপভাবে DNA-কে ছাঁচ হিসেবে ব্যবহার করে mRNA তৈরি হয় RNA পলিমারেজ নামের আর একটা উৎসেচকের সমন্বয়ে। ছাঁচ যেন ফ্যাকসিমিলি - ফলে উভয় ক্ষেত্রেই এই পলিমার দুটির গঠন বিশ্বস্ততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়। আগেই বলেছি রিভার্স ট্রান্সক্রিপটেজ উলটো কাজটা করে, অর্থাৎ mRNA থেকে DNA গড়ে নিতে পারে একই রকম বিশ্বস্ততার সঙ্গে। সেন্ট্রাল ডগমার সঙ্গে তার ওটুকুই বিরোধ, কিন্তু তা অযৌক্তিক নয় যেহেতু ছাঁচ ও প্রোডাক্ট উভয়েই একে অন্যের পরিপূরক। গাও এবং সহযোগীরা দেখিয়েছেন যেটা তা হল, E. coli-এর DRT3 সিস্টেমেও দুটি রিভার্স ট্রান্সক্রিপটেজ আছে। একটি স্বাভাবিক, mRNA ছাঁচ থেকে প্রোটিন তৈরি করছে। অপরটি, Drt3b যার সাংকেতিক নাম, রীতিমতো নভেল। সেটি উৎসেচক বলেই প্রোটিন, অ্যামাইনো অ্যাসিড দিয়ে গঠিত। অবাক কান্ড যেটা তা হল, এটির গঠনে অংশ নেয় এমন দুটি অ্যামাইনো অ্যাসিডকে টেমপ্লেট হিসাবে ব্যবহার করে এই উৎসেচক নিজেই নিজের বার্তাবাহী DNA-এর একটা ছোট খণ্ড বানিয়ে নিতে পারে বলে দেখা গেছে। প্রোটিন নিজে DNA সিকোয়েন্সের ব্লুপ্রিন্ট হিসাবে কাজ করছে - এ এক অভাবনীয় ব্যাপার! জীবনের কেন্দ্রীয় প্রত্যয়কে বাইপাস করে তৈরি হওয়া এই DNA যে ঠিক কোন কাজে লাগছে তা এখনও জানা যায়নি নিশ্চিতভাবে। মনে হয় এই DNA খণ্ডকগুলো ভাইরাসকে বিভ্রান্ত করতে, ভুলপথে চালিত করতে কাজে লাগায় এই ব্যাকটেরিয়া। সে যাই হোক, জীবন বিজ্ঞানের কেন্দ্রীয় ধারণার মূলে কিছু বদল আনার ইঙ্গিত দিচ্ছে এই ঘটনা! দিচ্ছে তো আজ থেকে হঠাৎ করে নয় - মানুষের নজরে এল সদ্য এই যা! ডার্ক ওয়ার্ল্ড থেকে আরও যে কত বিস্ময় অপেক্ষা করে আছে কে জানে!

তথ্যসূত্র:

1. O. T. Avery et al. (1944) J Exp Med, 1944 Feb. 1; 79(2):137-58. doi: 10.1084/jem.79.2.137.
2. J. D. Watson and Crick, F. H. C. (1953). Nature, Volume 171, pages: 737-738.
3. Mathew Meselson and Stahl F. W. (1958); Proc Natl Acad Sci USA, July 15; 44(7):671-682. doi: 10.1073/pnas.44.7.671.
4. Matthaei, H. J., Jones, O. W., Martin, R. G., and Nirenberg, M. W., Vol. 48 No. 4 (1962). Proc. Natl Acad Sci USA 48 (4): 666-677.
5. Alex Gao et al. (2026) Science, 16 Apr 2026, First Release, DOI: 10.1126/science.aed1656.