আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ নবম সংখ্যা ● ১-১৫ মে, ২০২৬ ● ১৬-৩১ বৈশাখ, ১৪৩৩

প্রবন্ধ

ভূতের লেখা দিল বর

অম্লানকুসুম চক্রবর্তী


টেবিলের উপরে সাদা খাতা নিয়ে বসে রয়েছেন এক মহিলা। পাতার উপরে দামী ঝর্ণা কলম, ব্যাকগ্রাউন্ড ভরা বই, ধোঁয়া ওঠা কফির কাপ-সহ ফ্রেমের অন্যান্য আঙ্গিক দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না - মহিলা এক লেখিকা। তবে ওঁর মুখে হতাশা। কপালের রেখায় নানা জ্যামিতিক আঁকিবুকি। তিন চার সেকেন্ডের মধ্যেই বোঝা যায়, লেখা এগোচ্ছে না। পাতাটি সম্পূর্ণ সাদা। লেখা শুরুই করতে পারেননি নাকি কয়েক পাতা লেখার পরে সেটি আর এগোচ্ছে না তা জানার অবকাশ নেই। ঠিক এমন সময় ফ্রেমের খালি জায়গায় ধোঁয়ার কুণ্ডলী থেকে আবির্ভূত হলেন এক মানুষ। স্যুট-টাই পরিহিত এক মধ্যবয়সী লোক। লেখিকা অবাক। লোকটি মুহূর্তের মধ্যে টান মেরে ফেলে দিলেন লেখিকার খাতা। এর পরে তাঁদের মধ্যে যে কথোপকথন হল তা অনেকটা এরকম।

- ঝিঙ্গা লা লা হু। ঝিঙ্গা লা লা হু। লেখা নিয়ে টেনশন এবারে ভ্যানিশ।

- মানে? মতলব?

- এনজয় ইওর লাইফ। তোমার টেনশন আমায় দাও। তোমার হয়ে সব লেখা লিখে দেব আমি।

- বুঝলাম না একদম। শয়নে স্বপনে একটাই দৃশ্য দেখি আমি। একদিন খুব বড় সাহিত্যিক হব।

- আলবাৎ হবে। এই দেখো পাঁচ বছর পরে তোমার ছবি।

দেখা যায়, একটি ঘরের মধ্যে উদ্বাহু নৃত্য করছেন লেখিকা। শ্রাবণের ধারার মতো সেখানে পড়ছে পাঁচশ টাকার নোট। পরের দৃশ্য। বহুল প্রচারিত দৈনিক যেমন ভাবে ছাপা হয়, ঠিক তেমনভাবে একটি মেশিন থেকে বেরিয়ে আসছে হাজার হাজার বই। একজন যন্ত্রের মতো লেখিকার দিকে এগিয়ে দিচ্ছেন প্রতিটি বইয়ের প্রথম পাতা। উনি শুধু সই করে যাচ্ছেন। একটা করে সই হচ্ছে আর নেপথ্যসঙ্গীতে বাজছে ঘট ভেঙে যাওয়া খুচরো পয়সার ঝনঝন।

- ধ্যাৎ! এমন আবার হতে পারে নাকি?

- তোমায় গাইড করা শুরু করব একেবারে প্রথম শব্দ থেকে। অর্ধসমাপ্ত লেখা শেষ করে দেব। লেখা শুরুই করনি? নো ওয়ারিজ। তুমি আইডিয়াটুকু দিয়ে দিলেই আমরা লিখে দেব। প্লটও নেই? চিন্তাহীন থাকো। আমরা তোমার নামে তৈরি করে দেব বেস্টসেলার। আমাদের কাছে আছে আইডিয়ার খনি।

পরের দৃশ্যে দেখা গেল, লেখিকা বেজায় হাসছেন। আপনার দিকে তর্জনী তুলে বলছেন, 'লেখক হতে চাইলে সাবস্ক্রাইব ফর অমুক ডট কম।' পর্দার নিচে চলে আসছে ওয়েবসাইটের ঠিকানা। হাঁ করে আছে লিংক।

সামাজিক মাধ্যমে সদ্য দেখা একটি রিলের কথা সংক্ষেপে বলার চেষ্টা করলাম। রিলটি চোখ টেনেছিল। ফলে পালাবার পথ নেই। ওদের মধ্যে থাকা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অ্যালগোরিদম আমার ইন্টারেস্ট এরিয়া, মানে উৎসাহের ক্ষেত্র বুঝতে পেরে এমন পনেরো কুড়ি সেকেন্ডের ভিডিও দেখাতে শুরু করেছে ঘন ঘন। আমাকে প্রবল জনপ্রিয় সাহিত্যিক না বানানো অবধি ওদের বিরাম নেই। অধিকাংশ ওয়েবসাইটের লিংক খুললেই উপস্থিত হয় একটি প্রশ্নমালা। প্রশ্নগুলো তুলে দেওয়া যাক।

দেশের এক নম্বর প্রকাশনার সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ জানাই। আপনি কী লিখতে চান? অপশন - উপন্যাস, গল্প, কবিতা, অন্যান্য।

লেখাটি কি শুরু করে দিয়েছেন? অপশন - করিনি, মাঝপথে আছি, শুরু করেছি কিন্তু শেষ করতে পারছি না।

নিজেকে বেস্টসেলার সাহিত্যিক হিসেবে দেখার জন্য আপনার ইচ্ছেশক্তি কেমন? অপশন - সামান্য, মাঝারি, উদগ্র।

কত দিনের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয় সাহিত্যিক হতে চান? অপশন - ছ মাস, ন মাস, এক বছর।

মতামত জানানোর জন্য ধন্যবাদ। আমাদের এক্সপার্টরা আপনার সঙ্গে শীঘ্রই যোগাযোগ করে নেবেন।

প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, মোবাইল নম্বরটি একদম শুরুতেই চেয়ে নেওয়া হয়েছিল। ওটিপি সহকারে সেটির যাচাইপর্ব সমাপ্ত।

আক্ষরিক অর্থেই শব্দবাজির দাপট টের পেলাম প্রকাশনা সংস্থাগুলো থেকে কয়েকটি ফোন আসার পর। জানা গেল, একটি সামান্য শব্দের দাম দু টাকা থেকে পাঁচ টাকা। মাইক্রোসফট ওয়ার্ডের উপরে আমার সম্ভ্রম দুম করে গেল বেড়ে। একটি শব্দ লেখার পরে আপাত নিরীহ স্পেসবারটির উপরে মৃদু চাপ দিলেই তলায় দেখানো ওয়ার্ড কাউন্টারে শব্দ যোগ হতে থাকে। প্রতিটি স্পেসবার স্পর্শের মূল্য পাঁচ টাকা? বিস্মিত কান ফের শুনলো, 'ইয়েস স্যার।' উপন্যাস লেখার শখ হলে সাধারণ, মাঝারি এবং প্রিমিয়াম - বিভিন্ন 'প্যাকেজ'-এর বিষয়ে জানতে পারা গেল। লাখ তিনেক টাকার মধ্যে নেমে যাবে সাধারণ কোনো উপন্যাস। মাঝারি মানের জন্য গুণতে হতে পারে পাঁচ লক্ষ টাকা অবধি। গুণমানে সেরাটি চাইতে গেলে পার হয়ে যেতে পারে দশ লক্ষও। শব্দসংখ্যা ৫০ হাজার। দক্ষিণার পরিমাণ শব্দসংখ্যার সঙ্গে সমানুপাতিক। যত মোটা বই হবে, বিল তত বেশি। প্লটের অঙ্কুরোদগম থেকে শুরু করে বই প্রকাশ এবং অনলাইনে, সামাজিক মাধ্যমে মার্কেটিং - সব কিছুই ধরা আছে এর মধ্যে। 'নো হিডেন চার্জেস, মাই ডিয়ার অথর! আপনি আয়েস করুন। আপনাকে লেখক বানানোর যাবতীয় দায়িত্ব আমাদের।' শুধোলাম, 'লিখি তো বাংলায়। তাহলে?' উত্তর এল, 'স্থানীয় ভাষা নিয়ে কাজ এখনও শুরু করিনি আমরা। গ্লোবালি ভাবুন। ঈগলের মতো উড়ুন।'

আন্তর্জালে বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান জানান দিচ্ছে, ভারতবর্ষে প্রকাশনা সংস্থাগুলোর সম্মিলিত বার্ষিক ব্যবসার পরিমাণ ৮০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সেল্ফ পাবলিশিং, অর্থাৎ পকেটের পয়সা খরচ করে নিজেই নিজের বই ছাপানোর মার্কেট সাইজ প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা, বার্ষিক। অর্থের পরিমাণ শুনলে চোখে ঝিলমিল লেগে যেতে বাধ্য। কিন্তু এটাই বাস্তব। সেল্ফ পাবলিশিংয়ের মধ্যে অবশ্য সৃজনশীলতার বিষয়টিতে অন্য কেউ নাক গলায় না সাধারণত। এটি অনেকটা নিজে ফাইল রেডি করে দেওয়ার পরে অন্য কারও সঙ্গে চুক্তি করে প্রিন্ট বোতামটি টিপে দেওয়া। তবে এরই মধ্যে একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে পুরো বিষয়টিই অন্যের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া। অর্থাৎ, লেখা থেকে শুরু করে প্রকাশ, পুরোটাই। পরিসংখ্যান বলছে, ৪ হাজার কোটির মধ্যে এর অংশ প্রায় ১২০০ কোটি। আরও অবাক করা তথ্য হল, এই ১২০০ কোটির সাগরে প্রতি বছরে যোগ হচ্ছে ৬ থেকে ৭ শতাংশ নতুন ঢেউ। অর্থাৎ, প্রতি বছর ব্যবসা বাড়ছে ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকার। ইউরোপ কিংবা মার্কিন মুলুকের তুলনায় মোট ব্যবসায় এখনও আমরা পিছিয়ে আছি অনেক। তবে বেশ কয়েক বছর হল বার্ষিক ব্যবসা বৃদ্ধির হারে ভারতবর্ষ ওদের টেক্কা দিয়েছে।

এক পরিচিত শিক্ষাবিদ এই প্রসঙ্গে দিন কয়েক আগে তির্যক হেসে বললেন, 'এই নিয়ে অনেক খবর নিয়েছি ভায়া। সেল্ফ পাবলিশিং নিয়ে কিছু বলার নেই আমার। দুনিয়ার বহু তাবড় তাবড় সাহিত্যিক প্রথমদিকে নিজের পকেটের কড়ি খরচ করে বই ছাপিয়েছেন। মুশকিলটা হল অন্য ক্ষেত্রে। প্লটও যদি তোমার হয়ে অন্য কেউ ভেবে দেয় তাহলে লেখাটি দিনের শেষে আর তোমার রইল কই? ইংরিজি সি অক্ষরের চারপাশে বৃত্ত টেনে যেভাবে লেখা হয় কপিরাইট হোল্ডারের নাম, সেখানে স্থান পাবেন তিন-পাঁচ-দশলাখি লেখক। পয়সা দেওয়া ছাড়া যাঁর এই রচনায় বিন্দুমাত্র কৃতিত্ব নেই। কিন্তু তা দেখে তাঁর আত্মিক সুখ হবে তো?'

হিজিবিজবিজ প্রশ্নগুলো মাথার মধ্যে চমকায়। এই কিছুক্ষণ আগে ফের ফোন বাজল আমার। অন্য একটি প্রকাশনা সংস্থা। কন্ঠস্বরে আহ্লাদ মিশিয়ে ফোনের ওপাশ থেকে ভদ্রমহিলা বললেন, 'আপনার নামে বই ছাপিয়ে দিয়েই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, প্রিয় ক্লায়েন্ট। অনলাইন খুচরো বিপনি, ভার্চুয়াল বুকশপে আপনার বইয়ের পাশে জ্বলজ্বল করবে রেটিং। পাঁচের মধ্যে ফোর পয়েন্ট নাইন একেবারে বাঁধা।' জিজ্ঞেস করলাম, 'কারা দেবে এমন রেটিং? তাঁরা কি আমার বই পড়বেন?' বুঝলাম, স্মিত হাসলেন উনি। বললেন, 'আপনি হয়তো এই জগতে একেবারে আনকোরা। এ নিউ ফিশ ইন দ্য পন্ড। বই পড়েই যে রেটিং দিতে হয় এটা কোথা থেকে জানলেন? অন্তত একশোটি রিভিউ পাবেন। সবাই উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করবেন আপনার বইটির। বইয়ের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নতুন রিলিজ টাইপ করলেই সবার প্রথমে চলে আসবে আপনার বইয়ের নাম। বিক্রি ঠেকায় কে?' চুপ করে ছিলাম। বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি। কয়েক সেকেন্ডের নিস্তব্ধতা। উৎসাহের মাপকাঠিতে আমি সামান্য, মাঝারি না উদগ্র তাই হয়তো জরিপ করছিলেন ফোনের অন্য প্রান্তে থাকা মানুষটি। বললেন, 'প্রতিটি অতিরিক্ত সার্ভিস কিন্তু চার্জেবেল। সার্ভিস প্রতি পঞ্চাশ হাজার টাকা প্লাস জিএসটি। ঘোস্টরাইটাররা আপনার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করবেন। এর মূল্য রয়েছে।' জানতাম, পরিচয় লুকিয়ে অন্যের জন্য যাঁরা লিখে দেন, তাঁরাই ঘোস্টরাইটার। ভূতুড়ে লেখক!

বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া অন্দরমহলের তথ্য জানান দিচ্ছে, এমন ক্ষেত্রে ভীষণভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কোনো অর্ধসমাপ্ত লেখা কপি পেস্ট করে 'শেষ কর' কম্যান্ড দিলে সেখানে মুহূর্তে চলে আসছে একগুচ্ছ সম্ভাব্য পরিণতি, ক্লাইম্যাক্স, উপসংহার। জহুরির মতো বেছে পেস্ট করে দিলেই কেল্লা ফতে। ওই শিক্ষাবিদের কথায়, 'লেখাটি যে শেষ করল সে মানুষ না যন্ত্র তা জানার কোনো উপায় আর থাকছে না আমাদের। পড়া শেষ করে ক্যায়াবাত বলে যার তারিফ করলাম, সে হয়তো এক মেশিন। যন্ত্রভূত লিখে দেবে, সে-ই প্রশংসা কুড়োবে। ভূতের গায়ে অর্থবলে বলীয়ান লেখকের জ্যাকেট।'

খুঁতখুঁতে মানুষরা এমন ট্রেন্ডের বিপক্ষে সোচ্চার হচ্ছেন বিশ্বজুড়ে। মানুষের সৃজনশীলতার পরিধিতে যান্ত্রিক প্রবেশের বিরুদ্ধে তাঁরা রব তুলছেন। বলছেন, 'ভাবনায় বাইনারি ঢেউ, তফাৎ যাও।' বিরোধী স্বর উঠছে কমার্শিয়াল কনটেন্ট রাইটিং ব্যতীত অন্য মৌলিক লেখায় ঘোস্টরাইটিংয়ের ব্যবহার নিয়েও। পুঁজিবাদী দুনিয়ায় এর সম্ভাব্য সমাধান আপাতত সময়ের গর্ভে।

অ্যাপ ক্যাবে করে সকালে অফিস যাওয়ার সময় রেডিয়োয় বাজছিল - নমো যন্ত্র, নমো যন্ত্র।

ধ্বংসবিকট দন্ত।