আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ নবম সংখ্যা ● ১-১৫ মে, ২০২৬ ● ১৬-৩১ বৈশাখ, ১৪৩৩

সম্পাদকীয়

নির্বাচনের পরে


পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনপর্ব শেষ। মানুষের রায় আপাতত বাক্সবন্দী হয়ে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের স্ট্রং রুমে। গোটা ভারতের ইতিহাসে, শতাংশের হিসেবে সর্বাধিক মতদানের নজির স্থাপন করেছেন পশ্চিমবঙ্গের জনগণ। নির্বাচন কমিশনের হিসেব অনুযায়ী ৯২.৪৭ শতাংশ ভোট পড়েছে। সর্বশেষ হিসেব এলে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। অনেকে আপ্লুত হয়ে নির্বাচন কমিশনকে এই বিপুল ভোটদানের হারের জন্য বাহবা জানাচ্ছেন। আমরা সবিনয়ে জানাই যে আমরা এই বাহবা দিতে পারছি না। কারণ আমাদের লক্ষ লক্ষ সহনাগরিক এই নির্বাচনে ভোট প্রদান করতে পারেননি, নির্বাচন কমিশন এবং সুপ্রিম কোর্টের অবিমৃশ্যকারিতার কারণে। সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় বিচারপতি বলেছেন, এই নির্বাচনে ভোট দিতে না পারলেও, পরে তাঁরা ভোট দিতে পারবেন! নির্বাচকের প্রত্যেকটি ভোটে ভোটদান করার অধিকার রয়েছে। আজ নয়, কাল ভোট দিতে পারবে, এটি একটি ভ্রান্ত যুক্তি। নির্বাচন কমিশন বলেছিলেন যে একজনও বৈধ ভোটারকে তালিকার বাইরে রাখা হবে না। নির্বাচন কমিশন সেই কথা রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন, যা অত্যন্ত লজ্জার। তবু, এই কথা অনঃস্বীকার্য যে এই নির্বাচনে যারা ভোট দিতে পেরেছেন, তারা অবাধে ভোট দিয়েছেন।

কিন্তু এই নির্বাচনী প্রচার পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে বিশেষ স্থান পাবে। মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয়গুলি, চাকরি-কর্মসংস্থান-শিক্ষা-স্বাস্থ্যের উপরে আমরা খুব বেশি বিতর্ক দেখলাম না। আমরা দেখলাম একদল বলছে যে রাজ্যে প্রচুর 'ঘুসপেটিয়া' ঢুকে গেছে। তাদের সনাক্ত করে, তাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে মুছে দিয়ে, তাদের দেশান্তরিত করা হবে। যদিও নির্বাচন কমিশন এখনও অবধি এই কথা বলেনি যে কতজন বেআইনি অনুপ্রবেশকারীর এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাম বাদ গেছে। কাদের সম্পর্কে এই কথা বলা হচ্ছে তা বুঝতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক হওয়ার প্রয়োজনীয়তা নেই। সোজাসুজি মুসলমান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করা হয়েছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতন মেধাকেন্দ্রকে কলুষিত করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে জঘন্য নারী বিদ্বেষী মিম সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল করা হয়েছে। এবং যারা শ্রাবণ মাসে কেন নিরামিষ খাওয়া হচ্ছে বলে বিহারের নির্বাচনের সময় সরব ছিলেন, তাঁরা হঠাৎ পশ্চিমবঙ্গে মৎস্যপ্রেমী হয়ে গেছেন। দুই হাত লাগিয়ে মাছ খেয়েছেন, হাতে মাছ নিয়ে প্রচার করেছেন, বাঙালিদের বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে মাছ তাঁরাও খান। কিন্তু চাকরির কী হবে? স্বাস্থ্য কীভাবে উন্নত হবে? শিল্পায়ন কোন পথে হবে, তা নিয়ে কোনও পক্ষকেই খুব বেশি কথা বলতে শোনা যায়নি। বরং জানা গেছে যে তাঁরা ক্ষমতায় এলে বিরোধীদের উলটো ঝুলিয়ে সোজা করে দেবেন। যে পরিমাণ সাম্প্রদায়িক প্রচার এই নির্বাচনে করা হয়েছে, তা পশ্চিমবঙ্গের জনগণের মৈত্রী এবং ভ্রাতৃত্বকে বিঘ্ন করতে পারে বলে আশঙ্কার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

অন্যদিকে, শাসকদলের প্রচারে বারবার ফিরে এসেছে 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার'-এর প্রসঙ্গ। বিজেপিও বলেছে যে তারা এই অনুদান আরও বাড়াবে। কিন্তু শাসকদল বিগত ১৫ বছরে কী কী কাজ করেছে সাধারণ মানুষের জন্য তার হিসেব তারা সৎভাবে মানুষকে বলেননি। মুখ্যমন্ত্রী আগেই বলে দিয়েছেন যে ১০০ শতাংশ কাজ হয়ে গিয়েছে। বিশেষ করে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার পালনের ক্ষেত্রে শাসকদলের দাদাগিরির বিষয়ে নেতানেত্রীদের মানুষের কাছে ভুল স্বীকার করার কোনও উদাহরণ আমাদের সামনে নেই। বাংলাকে কেউ সোনায় মুড়ে দিতে চেয়েছেন, কেউ আবার বাংলাকে হামলাকারীদের হাত থেকে বাঁচাবেন বলে দাবি করেছেন। কিন্তু মানুষের দুর্দশা তারা কীভাবে লাঘব করবেন তা নিয়ে বেশি কথা খরচ করেননি।

এই বাইনারির বাইরে বেরিয়ে মানুষের রুটি-রুজির কথা প্রচারে নিয়ে এসেছেন বামপন্থী প্রার্থীরা। গোটা প্রচারের সময় বামপন্থী প্রার্থীদের মধ্যে তরুণ প্রতিনিধিরা অনেকের নজর কেড়েছেন। তৃণমূল ও বিজেপি উভয়ের বিরুদ্ধেই গণতান্ত্রিক পরিসরকে বাড়ানোর জন্য বামপন্থীরা আবেদন রেখেছেন সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাইরে বেরিয়ে। এই প্রচারের গুরুত্ব আগামীদিনেও থাকবে। এই নির্বাচনী প্রচার ও সংগ্রামকে বামপন্থীদের সংহত করে আগামীর লড়াইয়ে সামিল হতে হবে।

এই নির্বাচনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল এই যে ২০২১ সালে যারা এনআরসি-সিএএ-র প্রেক্ষাপটে 'নো ভোট টু বিজেপি' বলে প্রচার চালিয়েছিলেন, তাদের এই নির্বাচনে দেখা গেল না। কেন দেখা গেল না, তা একটি গভীর পর্যালোচনার বিষয়। এবং এর সঙ্গেই সম্পৃক্ত এসআইআর বিরোধী আন্দোলন সেভাবে দানা না বাঁধা। এনআরসি-সিএএ-র বিরুদ্ধে যে প্রবল আন্দোলন পশ্চিমবঙ্গে দেখা গিয়েছিল, তা এসআইআর নিয়ে দানা বাঁধলা না। রাজনৈতিক দলগুলি রুটিন বিরোধিতা করেছেন, ধর্না দিয়েছেন, এমনকি মুখ্যমন্ত্রী সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে সওয়াল পর্যন্ত করেছেন। কিন্তু আন্দোলন দানা বাঁধেনি। এর একটি কারণ হয়ত এই যে সময় বেশি ছিল না, নির্বাচন দোরগোড়ায় এসে গিয়েছিল। প্রচারে এসআইআর নিয়ে কথা হয়েছে ঠিকই। কিন্তু মানুষের আন্দোলনে তা পর্যবসিত হয়নি, যেমনটি হয়েছিল এনআরসি-সিএএ-র সময়।

এই নির্বাচন তাই একদিকে যেমন সহনাগরিকদের একটি অংশকে বাদ দিয়ে হওয়া নির্বাচন, তেমনি এই নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সাম্প্রদায়িকতার যে ভয়াবহ প্রচার দেখলেন, তা ঐতিহাসিক। পশ্চিমবঙ্গবাসী ইতিমধ্যেই তাদের রায় বাক্সবন্দী করেছেন। যেই জিতুক, ইতিহাসে লেখা থাকবে যে লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারকে বাদ দিয়ে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আমরা শুধু আশা করতে পারি যে ৪ মে, ২০২৬ যখন ভোটবাক্স খোলা হবে, তখন সাম্প্রদায়িকতার দানবকে বোতলে বন্ধ থাকার নিদান পাওয়া যাবে। তা যদি না হয়, পশ্চিমবঙ্গ এক গভীর অন্ধকারের দিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাবে।