আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ অষ্টম সংখ্যা ● ১৬-৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ● ১-১৫ বৈশাখ, ১৪৩৩
প্রবন্ধ
বাদল সরকার
আনন্দ দাশগুপ্ত
১৯২৫ সালের ১৫ জুলাই উত্তর কলকাতার বিডন স্ট্রিটে বাদল সরকারের জন্ম হয়। তাঁর বাবা মহেন্দ্রলাল সরকার স্কটিশ চার্চ কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপক ছিলেন, পরে ওই কলেজে অধ্যক্ষ হন। বাদল সরকারের প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয়েছিল ক্যালকাটা আ্যকাডেমিতে। প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ চুকিয়ে তিনি ভর্তি হন স্কটিশ চার্চ কলেজিয়েট স্কুলে এবং সেখান থেকেই তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাস করেন। এরপর তিনি শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ-এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৪৭ সালে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন তিনি। তবে ছাত্রাবস্থা থেকেই তাঁর আকর্ষণ ছিল নাটকের প্রতি। সাহিত্য, নাটকের প্রতি প্রবল আগ্রহের কারণে বয়সকালে তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য নিয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৯২ সালে সেখান থেকে এম.এ. পাশ করেন। বয়সের আগল খুলে রেখে যিনি বিনীত ও বাধ্য ছাত্রের মতো এম.এ. পাশ করেছিলেন। করতে পেরেছিলেন। সূদুর নাইজেরিয়াতে স্থপতির কাজ করতে করতে লিখে ফেলেন 'এবং ইন্দ্রজিৎ' নাটক যা এই উপমহাদেশে মেট্রোপলিটান মন নিয়ে প্রথম মঞ্চায়িত দলিল। আবার প্রসেনিয়াম মঞ্চ থেকে নেমে আসতে পারেন কার্জন পার্কে, গুদামে, বাড়ির ছাদে, খোলা চত্বরে। তিনি আমাদের চোখের সামনে দেখা এক জ্যান্ত রূপকথা। আমাদের অভিজ্ঞতায় বাংলা নাটকের শেষ সর্বভারতীয় উপস্থিতি। আজকের প্রাদেশিক কিন্তু ডিজিটাল বাঙালির শুনলে অলীক মনে হবে যে, চলতি শতকের সূচনাতেও সর্বজনস্বীকৃত ছিল যে, হাবিব তনভির, বিজয় তেন্ডুলকার, মোহন রাকেশ, গিরিশ কারনাড ও বাদল সরকার বললেই ভারতীয় নাটকের রূপরেখা তৈরি হয়ে যায়। ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের যুগ শেষ হয়ে যাওয়ার পর, শম্ভু মিত্র ও উৎপল দত্তের যে উত্তরসূরীর ছায়া পড়ত আসমুদ্রহিমাচলের নাটকের আঙিনায়, তিনি বাদল সরকার - উত্তর কলকাতার এক প্রোটেস্ট্যান্ট বাঙালি। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার ঝোড়ো হাওয়ায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন সত্তর দশকের অন্যতম আইকন।
'থার্ড সিনেমা' যেমন একান্তভাবেই নিজেদের অর্থাৎ 'লাতিনীয়' হয়ে উঠছিল ওই সময়কার সেখানকার মানুষের কাছে ঠিক তেমনই আবার বাংলায় বাদল সরকারের থার্ড থিয়েটারও হয়ে উঠেছিল পুরোমাত্রায় দেশীয়। এই দেশীয় নাটক তাই সমাজের সকল শ্রেণির কাছে বোধগম্য হয়ে উঠত। একেবারে নকশাল আমলে বাদল সরকারের নাটকে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা আরও বেশি করে মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। তখন সেই নাটকগুলি মঞ্চের ঘেরা গণ্ডি ভেঙে একেবারে প্রকাশ্য জনপথে বেরিয়ে এসেছিল। তৈরি করেছিলেন নিজস্ব নাটকের দল 'শতাব্দী'। সেই সময়ের তাঁর নাটকের বার্তা দেশে আধুনিক নাট্যকার হিসেবে মারাঠি ভাষায় বিজয় তেন্ডুলকর, হিন্দিতে মোহন রাকেশ এবং কন্নড় ভাষায় গিরিশ কারনাডের পাশাপাশি বাংলায় বাদল সরকারের নাম উঠে এসেছিল।
বাদল সরকারের কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৪৭ সালে নাগপুরের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। টাউন প্ল্যানার হিসেবে তিনি কলকাতা, লন্ডন ও নাইজেরিয়ায় এবং ফরাসি সরকারের স্কলারশিপ নিয়ে টাউন প্ল্যান ট্রেনিংয়ের জন্য ফ্রান্সেও থেকেছেন কিছুকাল। এরপর ১৯৫৩ সালে তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৯৫৩ সালে যখন তিনি মাইথনে কর্মরত তখন অবসর সময় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন নাটকের কাজে। মাইথন থেকে কলকাতায় ফিরে এসে বাদল সরকার নাটক প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেন। এই সময় তিনি একটি বিদেশী সিনেমা 'মাঙ্কি বিজনেস' অবলম্বনে 'সলিউশন এক্স' নামে একটি নাটক লিখেছিলেন। ১৯৫৭ সালে তিনি ইংল্যান্ডে যান এবং চাকরি সূত্রে লন্ডনের ফিল্ম সোসাইটির সংস্পর্শে আসেন। ১৯৫৯ সালে তিনি প্রবল নাট্য উৎসাহ নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন এবং তারপরই তিনি তৈরি করেন 'চক্র' নামে একটি নাট্যদল। এই দলের জন্য তিনি বেশ কিছু নাটক লিখেছিলেন। ১৯৫৮ সালে 'খাপছাড়া' পত্রিকায় 'সলিউশন এক্স' নাটকটি প্রকাশিত হয়। ১৯৬১ সালে তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য কৌতুক নাটক 'বড় পিসিমা' প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর আরেকটি নাটক 'রাম শ্যাম যদু'। এই তিনটি চরিত্র যথাক্রমে জুয়াচোর, খুনি ও চোর ছিল। কিন্তু সমাজবিরোধী হয়েও একটি পরিবারের দুঃসময়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে এরা কীভাবে মনুষ্যত্বে উদ্দীপ্ত হল সেই কাহিনি এই নাটকে বর্ণনা করা হয়েছে।
বাদলবাবু আরও কয়েকটি মৌলিক নাটক লিখলেও তাঁকে সর্বভারতীয় খ্যাতি এনে দেয় ষাটের দশকের মাঝামাঝি 'এবং ইন্দ্রজিৎ' নাটকটি। এই নাটকটি 'বহুরূপী' পত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়েছিল। তারপর তাঁর রচিত 'বাকী ইতিহাস', 'প্রলাপ', 'পাগলা ঘোড়া', 'শেষ নাই' সবকটিই শম্ভু মিত্রের নেতৃত্বাধীন 'বহুরূপী' গোষ্ঠীর প্রযোজনায় মঞ্চস্থ হয়।
বাদল সরকারের নাট্যজীবন শুরু হয়েছিল পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে। প্রথম জীবনে তিনি শৌখিন থিয়েটারে 'চিরকুমার সভা', 'বন্ধু', 'ডিটেকটিভ', 'লালপাঞ্জা' প্রভৃতি নাটকে অভিনয় করেছিলেন। ১৯৬৭ সালে তিনি 'শতাব্দী' নাট্যগোষ্ঠী স্থাপন করেন যার প্রথম প্রযোজনা ছিল 'এবং ইন্দ্রজিৎ' নাটকটি। তাঁর রচিত 'পরে কোনদিন', 'যদি আর একবার' এছাড়া 'প্রলাপ' ও 'ত্রিংশ শতাব্দী' উল্লেখযোগ্য নাটক বাংলা সাহিত্যে।
তবে নিজের নাট্যদল 'শতাব্দী' গঠনের পর তিনি একেবারে কলকাতার কার্জন পার্কে খোলা আকাশের নিচে নাটক করা শুরু করেন। আসলে বাদল সরকারের পরীক্ষা নিরীক্ষায় 'থার্ড থিয়েটার'-এর উৎপত্তি সামন্ত সমাজের সেই গুটিকয়েক শিক্ষিতের দ্বারা, যারা ভূস্বামী বা কৃষক কোনও শ্রেণির মধ্যে পড়ে না। অনেক সময় তাঁর নাটকে কোনও প্লট থাকে না। চরিত্রের সুনির্দিষ্ট কোনো চরিত্রায়ন নেই ফলে, বাধ্যবাধকতা নেই সুনিদিষ্ট পোশাকের। অভিনেতা-অভিনেত্রীরা ইচ্ছে মতো চরিত্র বাছাই করে নেন, নাটকের মাঝখানে চরিত্র বদলেরও স্বাধীনতা থাকে। প্রয়োজন বুঝলে দর্শকেরাও অভিনয়ে অংশগ্রহণ করতে পারেন। ঠিকই অংশগ্রহণ সে ভাবে আক্ষরিক অর্থে নয়, খুব জোরালোভাবে কিন্তু দর্শক ঢুকে পড়েন কিছু একটা করতে যা অনেকটা সিনেমার 'এক্সট্রা'দের মতো। বাদল সরকারের 'থার্ড থিয়েটার আন্দোলন' ছিল প্রতিষ্ঠান বিরোধী তথা রাষ্ট্রবিরোধী। শহরাঞ্চলকে ভিত্তি করে তাঁর 'ভোমা' নাটকে পাওয়া যায় নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন সংগ্রামের প্রতিফলন। আবার 'মিছিল' নাটকে উঠে আসে ক্ষুব্ধ মানুষের প্রতিবাদ আর তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে রাষ্ট্রের ভূমিকা।
নাটক বিনোদনের মাধ্যম হলেও তা কখনো কখনো হয়ে ওঠে প্রতিবাদের হাতিয়ার। এই কাজটাই করেছিলেন বাদল সরকার। খানিকটা শখের থিয়েটার থেকে যাত্রা শুরু হলেও পরে তাঁর হাত ধরে জন্ম নেয় এক নাট্য দর্শনের।
নাটক বিনোদনের মাধ্যম হলেও তা কখনো কখনো হয়ে ওঠে প্রতিবাদের হাতিয়ার। এই কাজটাই করেছিলেন সুধীন্দ্রনাথ সরকার। যিনি থিয়েটার জগতে বাদল সরকার নামে পরিচিত। খানিকটা শখের থিয়েটার থেকে যাত্রা শুরু হলেও পরে তাঁর হাত ধরে জন্ম নেয় এক নাট্য দর্শন।
ক্রমে তিনি গণসস্কৃতি আন্দোলনের একজন পুরোধা কর্মী হয়ে ওঠেন এবং জীবনে শেষদিন পর্যন্ত থিয়েটারকে গণসস্কৃতির এক ধারালো অস্ত্র হিসেবে শান দিয়ে গেছেন। চাকরির সূত্রে বিভিন্ন দেশবিদেশ ঘুরেছিলেন। তার ফলে সেখানকার মানুষের জীবনযাত্রা ও থিয়েটার খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। ইউরোপে থাকাকালীন বিভিন্ন ধরনের নাটক দেখার সুযোগ পান। যা তাঁর উপর গভীর প্রভাব ফেলে। পরবর্তীকালে যা তাঁর নাট্যদর্শনে এক নতুন বোধের জন্ম দেয়। যার উন্মেষ ঘটতে দেখা যায় তাঁর রচিত বিভিন্ন নাটকে।
সাতের দশকে শহরাঞ্চলে, মফস্বলে প্রসেনিয়াম থিয়েটারের চর্চা চলছিল। যা এখনও চলে। নাটকের মাধ্যমে যে বক্তব্য রাখা হচ্ছিল তা শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছিল। গ্রামাঞ্চলে বা সাধারণ মানুষের মধ্যে সেভাবে পৌঁছচ্ছিল না। ফলে থিয়েটারে সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ঘটছিল না বা বলা যায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে একটা দূরত্বের সম্পর্ক থেকে যাচ্ছিল। এই বিষয়টি তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সেই সময় বাদল সরকার অন্য ধরনের থিয়েটারের কথা ভাবেন। সেই ভাবনাকে বাস্তবে রূপদানের জন্য সক্রিয় হয়ে উঠেন। সঙ্গী হিসেবে কিছু মানুষকে সঙ্গেও পেয়ে গেলেন। প্রয়োজন পড়ল নাটককে নির্মেদ ও বহনযোগ্য করে গড়ে তোলার। যা সহজে পৌঁছে যাবে গ্রাম, মফস্বলের সাধারণ মানুষের কাছে। ট্রেনে, বাসে, মাঠে-ময়দানে অভিনয় করে ঘুচিয়ে ফেলা হল দর্শক এবং অভিনেতার মধ্যের দূরত্ব।
জন্ম নিল নতুন ধারার থিয়েটারের। বাদল সরকার তার নাম দিলেন 'থার্ড থিয়েটার'। তৈরি হল 'মিছিল', 'ত্রিংশ শতাব্দী', 'বোমা', 'পিকদান'। দলের নাম দিলেন 'শতাব্দী'। তাঁর "শতাব্দী' ঘুরতে থাকল গ্রাম থেকে মফস্বলে। দর্শকের সঙ্গে তৈরি হল নিকট সম্পর্ক। 'শতাব্দী' দোসর হিসেবে পেল কাঁচরাপাড়ার 'পথসেনা' এবং বেহালার 'আয়না'-কে। যখন তিনি 'তৃতীয় থিয়েটার'-এ পা রাখলেন, তা শুধু আর্থিক কারণে নয়। চলচ্চিত্রে যেমন বানিজ্যিক হলিউড সিনেমা ও শিল্পরুচিসম্পন্ন তথাকথিত 'অতর' ছায়াছবির বাইরে, বিশেষত লাতিন আমেরিকায়, এমন এক চিত্রমালার খোঁজ চলছিল, যেখানে জাতির মর্মবেদনা তথ্য ও আখ্যানের স্তরে স্তরে ফুটে উঠবে। আলেয়া, সোলানাস, জেটিনো, এস্পিনোসা প্রমুখ পরিচালকেরা এমন এক রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অভিঘাতের জন্ম দিলেন যে কিউবায় 'অনুন্নয়নের স্মৃতি', আর্জেন্টিনায় 'চুল্লির প্রহর' জাতীয় ছবি অবদমিত এক জনগোষ্ঠীর জীবনভাষ্য হিসেবে দেখা দিল। লক্ষী-সরস্বতীর সাবেকী দ্বন্দ্বের বাইরে একটা জনগোষ্ঠী লুপ্ত বর্ণমালা পুনরাবিষ্কারের সুযোগ পেল।
'এবং ইন্দ্রজিৎ' বাদল সরকারের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ নাটক। এটি একটি অ্যাবসার্ড নাটক। 'অ্যাবসার্ড' কথাটির অর্থ - উদ্ভট হাস্যকর অসামঞ্জস্যপূর্ণ অযৌক্তিক। অ্যাবসার্ড নাটকের কাহিনির মধ্যে থাকে শূন্যতা ও অবক্ষয়। তাই এই নাটকের কাহিনি উদ্দেশ্যহীন হয়। তাছাড়া এই শ্রেণির নাটকগুলির পাত্র-পাত্রীদের মনে হয় মৃত্যুই একমাত্র মুক্তির পথ। মনে রাখতে হবে ১৯৬৭ সালে 'এবং ইন্দ্রজিৎ' যখন মঞ্চস্থ হচ্ছে, তা সময়ের আপাত 'অনিয়ম'। বামপন্থী গণজাগরণ ও রাজনৈতিক তাপপ্রবাহে এই নাটক যে অর্থশূন্যতার দিকে তর্জনী নির্দেশ করে, যে পৌনঃপুনিকতা, আবর্তন-পুনরাবর্তনের গল্প বলে, তা এক ফাঁপা নাগরিকতার দিকে জানলা খুলে দেয়, কিন্তু জীবনের বহিরঙ্গ বদলানোর জন্য তত ডাক দেয় না। এই রচনায় তেমন উত্তোলিত হাতের অরণ্য নেই। বরং শূন্যতার বাহুডোর আছে নাট্য-অভিজ্ঞতা হিসেবে। 'এবং ইন্দ্রজিৎ' যে নতুন নাটক তা একারণেও যে, অভিনয় অতিরিক্ত ভাবেই তা সুপাঠ্য। যে সময় বাংলা সাহিত্যে নাট্যরচনা ও থিয়েটারে তার প্রয়োগ প্রায় অঙ্গাঙ্গী হয়ে উঠেছে, তখন বাদলবাবুর 'বাকী ইতিহাস' (১৯৬৫) বা 'পাগলা ঘোড়া' (১৯৬৭) একধরনের লিটারারিনেসকে আমন্ত্রণ জানায় যা শরীরী অভিব্যক্তি ও সংলাপের আওতা ছাড়িয়েও আমাদের চিন্তায় ডালপালা বিস্তার করে। বিদেশি নাটক আমরা কেউই প্রায় দেখার সুযোগ পাই না কিন্তু তা পাঠান্তে এক অনাস্বাদিতপূর্ব আহ্লাদ পাই। বাদলবাবুর নাটকে সে রকম পরিসর প্রচুর। তিনি মূল বয়ানকে শুধু প্রায়োগিক কুশলতায় উতরে দিতে চাননি। উত্তর-আইপিটিএ যুগে এ কৃতিত্ব ভুলবার নয়। আদ্যন্ত শহরের স্বর ভেসে আসে তাঁর নাটকে। কল্পিত গ্রামের উপকথায় আসর মাত করতে চায় না।
তাঁর আরো একটি অ্যাবসার্ডধর্মী নাটক 'যদি আর একবার' 'বহুরূপী'র প্রযোজনায় অ্যাকাডেমিতে ১৯৬৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অভিনীত হয়েছিল। এটি ছিল একটি হালকা রসের কমেডি। এর সংলাপও ছিল ছন্দে বাঁধা। নাটকটি দুই দম্পতি ও এক অবিবাহিত মেয়ের গল্প। বর্তমান জীবনের ক্লান্তি ও অবসাদ এই নাটকে চিত্রিত হয়েছে। তাঁর 'প্রলাপ' নাটকটি 'বহুরূপী' কর্তৃক নিউ এম্পায়ারে ১৯৬৭ সালের ৩ অক্টোবর অভিনীত হয়েছিল। বাদল সরকার নিজেই এই নাটকের নির্দেশক ছিলেন। এই নাটকটিতে অস্তিত্ববাদী দর্শন প্রাধান্য পেয়েছে। বাদল সরকারের আরও একটি উল্লেখযোগ্য নাটক 'বীজ'। তাঁর সৃষ্ট একাঙ্ক নাটক 'মনিকাঞ্চন' একটি উল্লেখযোগ্য নাটক। রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এই নাটকে প্রবল প্রতিবাদের সুর ধ্বনিত হয়েছে। তাঁর অন্যান্য একাঙ্ক নাটকগুলি হল 'সমাবিত্ত', 'সারারাত্তির', 'বল্লভপুরের রূপকথা', 'সাদাকালো', 'চূর্ণপৃথিবী', 'বায়োস্কোপ', 'ভুল রাস্তা', 'ক-চ-ট-ত-প', 'ওরে বিহঙ্গ' প্রভৃতি।
থিয়েটার মানেই যে শুধু মঞ্চ, বাংলা থিয়েটার জগতের এই প্রচলিত ধারণাকে তিনি ভেঙ্গে দিয়েছিলেন লাতিন আমেরিকার 'তৃতীয় চলচ্চিত্র'-র আদলে 'থার্ড থিয়েটার' বা 'তৃতীয় থিয়েটার'-এর ধারণা এনে। এই মাধ্যমে দর্শক এবং অভিনেতার মধ্যে দূরত্ব থাকে সামান্যই। পথ নাটিকার মাধ্যমে দর্শকদের মতই পোশাকে অভিনয় এই রীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। লাইট, মেকআপ ও অন্য সরঞ্জাম না লাগায় প্রযোজনার খরচও অনেক কম হয়। এই ধারার নাটকে দর্শকদের টাকা দিয়ে টিকিট কাটতে হয় না। 'থার্ড থিয়েটার' তৈরীর ব্যাপারে তিনি বিদেশি নাট্যবিদদের সাহায্য নিয়েছিলেন। বিশেষ করে পোল্যান্ডের গ্রোটোস্কির নাট্য ভাবনার দ্বারা তিনি বেশ প্রভাবিত হয়েছিলেন। এই মুক্তমঞ্চের অভিনয় খরচ কম।
থিয়েটারের নিজস্ব ভাষাকে নিজের মতো করে ভেঙে গড়ে মজবুত করে তুলেছিলেন তিনি। নাটকের যে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, রাজনীতিক এবং সামাজিক দায়দায়িত্ব রয়েছে তা বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। যার ফলে নিজের কাজের প্রতি কখনও আপোষ করেননি তিনি। তাঁর নাটকগুলি মঞ্চের ঘেরা গন্ডি ভেঙে একেবারে প্রকাশ্য জনপথে বেরিয়ে এসেছিল। নিজের নাট্যদল 'শতাব্দী' গঠনের পর তিনি একবার কলকাতার কার্জন পার্কে খোলা আকাশের নীচে নাটক করা শুরু করেছিলেন।