আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ অষ্টম সংখ্যা ● ১৬-৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ● ১-১৫ বৈশাখ, ১৪৩৩
প্রবন্ধ
নববর্ষ ১৪৩৩
সুখবিলাস বর্মা
আজ ২৮শে চৈত্র, ১৪৩২ 'আনন্দবাজার রবিবাসরীয়'-তে 'বঙ্গজীবনের মায়াঘেরা নববর্ষ' শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠান্তে বাংলা নতুন বৎসর ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ নিয়ে একটু কাজিয়া কীর্তনে মন দিতে চাইলাম। প্রথমত বঙ্গাব্দ শব্দটি নিয়ে - শব্দটির উৎপত্তির ইতিহাস নিয়ে যে ধারণা সেখানে আমি স্বচ্ছন্দ অবস্থানে বিচরণ করি না।
এ সম্পর্কে সাধারণ ধারণাটি নিম্নরূপঃ সম্রাট আকবরের সময়ে হিজরাকেই ৩৬৫ দিন গণনা করিবার ব্যবস্থা করা হয়। ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দের হিজরা সংখ্যা ৯৬৩-র সহিত তৎপরবর্তী সৌর বৎসর সংখ্যা যোগ করিলে বর্তমান কালের বঙ্গাব্দ পাওয়া যায়।
১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ কি করে ৯৬৩ হিজরি সন? হিসাবটা নিম্নরূপঃ
পৃথিবীর উপগ্রহ চাঁদ পৃথিবীর চারপাশে একবার ঘুরে আসতে সময় নেয় ২৯.৫৩০৫৮৮ অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ঊনত্রিশ সৌরদিন। এই সময় পরিমাণকে বলা হয় এক চান্দ্রমাস। অতএব এক চান্দ্র বৎসর হয় সাড়ে ঊনত্রিশ গুণিতক ১২ অর্থাৎ ৩৫৪ দিন, যা সৌরবৎসর থেকে ১১ দিন কম। এই চান্দ্র বৎসর অনুসারে ৬২২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই জুলাই শুক্রবার ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মহম্মদের মক্কা থেকে মদিনায় প্রস্থানের 'হিজরত' দিনটিকে ধরে নিয়ে শুরু হয়েছিল হিজরি অব্দ। হিজরির শুরু ৬২২ থেকে ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দ হল ৯৩৪ খ্রিষ্ট বৎসর। আবার যেহেতু প্রতি সাড়ে বত্রিশ খ্রিস্ট সনে এক বৎসর হিজরি সন বৃদ্ধি পায়, তাই ৯৩৪ খ্রিষ্ট বৎসরে অতিরিক্ত হিজরি বৎসরের সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৩৪/৩২.৫= ২৮.৭৩ অর্থাৎ ২৯। এইভাবে ৯৩৪ খ্রিষ্ট বৎসর মানে ৯৩৪+২৯=৯৬৩ হিজরি বৎসর।
১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দের হিজরা সংখ্যা ৯৬৩-এর সহিত তৎপরবর্তী সৌর বৎসর সংখ্যা যোগ করিলে বর্তমান কালের বঙ্গাব্দ পাওয়া যায়, সেই হিসাবে ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ হোল ২০২৬ বিয়োগ ১৫৫৬=৪৭০+৯৬৩=১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। স্পষ্টতই, বঙ্গাব্দের প্রাক্ ১৫৫৬ অংশ চান্দ্রমতে এবং পরবর্তী অংশ সৌরমতে গণিত। বঙ্গাব্দে সূর্য ও চন্দ্র দুই ঘড়িবাবুরই ভূমিকা।
বঙ্গাব্দ নিয়ে 'ভারতকোষ' তত্ত্বটি কেমন গোলমেলে/গোঁজামিল মনে হয় না?
আমরা জানি, বিশেষ বিশেষ অব্দ শুরু হয়েছে কোনো রাজা বাদশা সম্রাটের সিংহাসন আরোহন তারিখ বা কোনো মহাপুরুষের জন্ম তারিখ থেকে। যীশুখ্রিষ্টের জন্মকাল স্মরণ করে সারা পৃথিবীতে যে খ্রিষ্টাব্দ শুরু হয়েছিল গ্রেগরীয় ক্যালেণ্ডার রূপে ৩৬৫ বা ৩৬৬ দিনের সৌরবৎসর ধরে নিয়ে, তার সঙ্গেই সম্পর্কযুক্ত করা হয়েছে সব অব্দকে। শকাব্দ শুরু হয়েছিল ৭৮ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট কণিষ্কের সিংহাসন আরোহনের বর্ষ থেকে। দক্ষিণ ভারতে এই শকাব্দ শকাদিত্য শালিবাহনের শাসনকালে প্রবর্তিত হয়েছিল বলে তা শালিবাহনাব্দ নামে পরিচিত। হর্ষাব্দ প্রচলিত হয় ৬০৬ খ্রিষ্টাব্দে কান্যকুব্জরাজ হর্ষবর্ধনের সিংহাসন আরোহনের বর্ষ থেকে। সেই সময়ে পূর্বভারতে প্রতাপশালী রাজা ছিলেন কামরূপাধিপতি ভাস্কর বর্মা বা ভাস্কর বর্মণ। বহু প্রাচীন কামরূপ দেশটির উল্লেখ রয়েছে তন্ত্র ও পুরাণাদিতে। কামরূপ অধিপতি ভাস্কর বর্মার সাহায্যেই হর্ষবর্ধন তাঁর ভগ্নীপতি গ্রহ বর্মা ও দাদা রাজ্যবর্ধনের হত্যাকারী গৌররাজ শশাঙ্ককে শায়েস্তা করেছিলেন। হিউয়েন সাঙের বিবরণ মতে, শশাঙ্কের মৃত্যুর পরে সমস্ত পশ্চিমবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের অধিপতি হয়েছিলেন ভাস্কর বর্মা। তিনি কামরূপ সিংহাসন আরোহন করেন ৫৯৩ খ্রিষ্টাব্দে, এবং সেই উপলক্ষে কামরূপ রাজ্যে চালু হয় ভাস্করাব্দ বা কামরূপী সন। আমাদের ধারণা এই ভাস্করাব্দই হোল বঙ্গাব্দ-এর ভিত্তি। ২০২৬ থেকে ৫৯৩ বাদ দিলেই ১৪৩৩।
বঙ্গাব্দ নিয়ে এই আলোচনাটি তুলে ধরলাম বাংলার বৌদ্ধিক সমাজের চিন্তার খোরাক রূপে।
যা হোক, এবারে আসা যাক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের নববর্ষে। বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন উপলক্ষ করে উৎসাহের শেষ থাকার কথা নয়। তবে নানা কারণে গত কিছুদিন হল বাংলা নববর্ষ-এর 'পয়লা বৈশাখকে বাঙ্গালিয়ানার স্মৃতিচারণের এক প্রহরণ ছাড়া কিছু মনে হয় না'। কিন্তু বছরের প্রথম মাসের ৯ এবং ১৫ তারিখে নির্বাচন নির্ধারিত হওয়ার কারণে ১৪৩৩-এর নববর্ষ আলাদা মাত্রা পেয়েছে। প্রধান দুই যুযুধান দল প্রতিশ্রুতির বন্যা ছুটিয়েছে।
গত ১৫ বছরে দিদির অনেক প্রতিজ্ঞার ভঙ্গদশার পরে এবারে তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী ইস্তাহার 'দিদির ১০ প্রতিজ্ঞা'। এই দশ প্রতিজ্ঞা নিয়েই একটু আলোচনা করা যাক।
১) প্রথম প্রতিজ্ঞা - আজীবন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার। কী ভাবেন মমতা? তিনি কি চিরকাল মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন? অর্থাৎ মানুষের বোঝা উচিত যে এটা একটা ঠুনকো কথা মাত্র। এই জন্যই মাথাভাঙ্গার মনীন্দ্র বর্মণ গান গেয়েছেন, 'পিসি, যা ইচ্ছে তাই করছ চুরি রাজ্যটা তোর বাপের নাকি, দুর্নীতিবাজ ভ্রস্টাচারী ভণ্ডামি (ধাস্টামি)তে এক নম্বরী...'।
২) যুবসাথী - মমতার ধাপ্পাবাজীর চরমতম উদাহরণ। নির্বাচনী বিজ্ঞাপনের মাত্র কয়েকদিন আগে এই প্রোগ্রাম প্রচার করে লাখো দরখাস্ত নিলেন - তিনি জানেন এই অল্প সময়ে কোনও টাকা দেওয়ার প্রশ্নই আসবে না - বাংলার বেকার যুবক-যুবতীদেরকে ধাপ্পা দেওয়ার মোক্ষম সুযোগ। কাজের নতুন সুযোগ সৃষ্টি তো দূরের কথা, সমস্ত বিভাগের শূন্যপদগুলি পূরণ করেন নি - শিক্ষা বিভাগ থেকে অন্য সব বিভাগেই নিয়োগ যতটা হয়েছে সর্বত্র সীমাহীন দুর্নীতি। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয়েছে চুক্তিতে নিয়োগ - স্থায়ী চাকরি নয়। রাজ্যের এসসি, এসটি, ওবিসি মানুষেরা সংরক্ষণ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তিনি বহু বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছেন - কিন্তু সেখানে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো দূরের কথা, সব বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ করতে পারেন নি, শুধু এই কারণে যে তিনিই সর্বত্র আচার্য থাকতে চেয়েছিলেন। নতুন নিয়োগ নেই - অফিসগুলিতে কাজ করার লোক নেই। সেই অবস্থাতেও ডিএ না দেওয়ার জন্য এই সরকার সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত লড়াই করেছে এবং সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অমান্য করে ডিএ দিতে গড়িমসি চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ পুরোহিত ও মোজ্জামদের ভাতা বৃদ্ধিতে কার্পণ্য করেনি।
৩) কৃষকদের জন্য ৩০,০০০ কোটির বাজেট - এ ব্যাপারেও অতীত অভিজ্ঞতা এই যে বিভাগের কাজের জন্য ৪,০০০ কোটি মঞ্জুরী দিয়ে ৩,০০০ কোটি সিড কর্পোরেশনে ডিপোজিট অ্যাকাউন্টে জমা দেওয়া হয়। অর্থাৎ কৃষকদের জন্য খরচ বাজেটের সামান্য অংশ। কেন্দ্রীয় সরকারের টাকায় বিল্ডিং করেছেন ২০০টির কাছাকাছি কৃষক বাজার - প্রচুর টাকা কাটমানি আদায় করেছেন ঠিকাদারদের কাছ থেকে। কিন্তু সেসব জায়গায় বাজার বসে নি কারণ বিল্ডিং হয়েছে কৃষকদের প্রয়োজনের উপযুক্ত জায়গাতে নয় এবং প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরি না করে।
৪) একই ভাবে সবুজ সাথি প্রকল্পে কোটি খানিক অতি নিম্নমানের সাইকেল দেওয়া হয়েছে শুধু কাটমানি আদায়ের জন্য। বাজারে ২,২০০ - ২,৪০০ টাকা মূল্যের সাইকেল সরকার সাইকেল কোম্পানীগুলোর থেকে কিনেছে ৩,২০০ - ৩,৪০০ টাকায়। অর্থাৎ সাইকেল প্রতি ১,০০০ টাকার কাটমানি।
৫) সবার জন্য পাকা বাড়ি - মমতার ধাপ্পার আর এক মস্ত উদাহরণ। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় বার বার দাবি করা হয়েছে যে ২০১৭-১৮ থেকে পাঁচ বছরে 'বাংলার বাড়ি' প্রকল্পে গরীব মানুষের জন্য ৩৭ লক্ষ বাড়ি তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই কাজের জন্য কোনও বাজেট বরাদ্দ অর্থমন্ত্রী দেখাতে পারেন নি, অর্থাৎ কোনও বাড়ি হয় নি। মিথ্যা বলে বিধানসভাকে বিভ্রান্ত করার জন্য বিরোধী পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রীর বিরুদ্ধে স্বাধিকার ভঙ্গের কেস করা হয়েছিল। সেই কেসে প্রমাণিত যে অর্থমন্ত্রী মিথ্যা বলেছেন। এখন মমতা প্রচার করছেন যে তিনি ঐ প্রোগ্রামে এক কোটি বাড়ি তৈরি করেছেন। অন্যদিকে দুর্নীতির জন্য প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার টাকা এই সরকার পাচ্ছে না যেমন পাচ্ছে না একশ দিনের কাজের টাকা।
৬) সরকারী স্কুলের পরিকাঠামো - গত কয়েক বছরে সরকারী স্কুলগুলির পরিকাঠামো সব দিক থেকে তলানিতে ঠেকেছে। শিক্ষকের অভাবে কলকাতার হিন্দু স্কুল বন্ধ হওয়ার যোগাড় হয়েছে - অন্য স্কুল তো দূরের কথা, অন্য পরিকাঠামোও দূরের কথা।
৭) দুয়ারে চিকিৎসা - 'দুয়ারে সরকার' নাম দিয়ে সরকারের কোটি কোটি টাকা খরচ দেখিয়ে তৃণমূলের নেতানেত্রীদের পকেট ভরানো হয়েছে - প্রচুর দরখাস্ত পড়েছিল এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সমস্যাগুলির সমাধান নাকি হয়ে গেছে। যার নমুনা বাংলা দেখেছে আর. জি. কর কাণ্ডে - ধর্ষণ-মৃত্যু, লিফট-মৃত্যু, উত্তরবঙ্গ লবি, হাসপাতাল মেডিক্যাল কলেজগুলিতে ব্যাপক অরাজকতা, থ্রেট কালচার ইত্যাদি। বাংলায় আজ জেলায় জেলায় মেডিক্যাল কলেজ - সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল যেখানে সুপার তো দূরের কথা সার্জারি, মেডিসিন, গাইনি ইত্যাদির মতো সাধারণ স্পেশালিটির ডাক্তার নেই। মনমোহন সিং সরকারের দেওয়া স্পেশাল প্যাকেজের টাকা দিয়ে ৩১টা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের বিল্ডিং তৈরি হয়েছে - কন্ট্রাক্টরদের কাছ থেকে প্রচুর কাটমানি আদায় করেছেন মমতা কিন্তু চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়নি। জাতীয় স্বাস্থ্য মিশন ইত্যাদি বাবদ কেন্দ্রীয় সরকার থেকে প্রাপ্ত টাকা অর্থ দপ্তর কর্তৃক ঠিক সময়ে না ছাড়ার জন্য প্রকল্প রূপায়িত হচ্ছে না। ওষুধ সরবরাহকারীদের বহু কোটি টাকা বাকি। সেই সত্য স্বীকার করে নিয়ে এখন তিনি 'দুয়ারে চিকিৎসা' প্রকল্পের কথা বলছেন।হয়ত টাকা কামানোর আর এক ফাঁদ তৈরি হবে। একটু আভাস দিয়েছেন তিনি - প্রতি বছর ব্লকে স্বাস্থ্য শিবির - অর্থাৎ চিকিৎসার নামে মহোৎসব - আবার নেতানেত্রীদের পকেট ভরানোর ব্যবস্থা।
৮) নতুন ৭টি জেলা - ইতিমধ্যে অনেক জেলা হয়েছে যার অনেকগুলোতেই জেলার সব পরিকাঠামো তৈরি হয় নি - বহু পুলিশ কমিশনারেট হয়েছে, এসপি ও পুলিশ কমিশনারের মধ্যে জুরিসডিকশন (আইনগত আধিকার/সীমা) নিয়ে ঝামেলায় মানুষ প্রাপ্য সেবা পাচ্ছে না। নতুন নতুন জেলা তৈরিতে প্রশাসনিক সুবিধা বা আইনশৃঙ্খলার উন্নতি কতটা হয়েছে তা বাংলার সবারই জানা। জেলায় জেলায় প্রশাসনিক সভাগুলিতে তিনি নিজেইতো পুলিশকর্তাদেরকে তিরস্কার করছেন। জেলায় জেলায় সিন্ডিকেট, মাস্তানরাজ, কয়লা, বালির ব্যবসা কাদের মদতে চলছে? তবে নতুন জেলা মানেই তো অসংখ্য বিল্ডিং - অনেক কাটমানি।
৯) পঞ্চায়েত মিউনিসিপ্যালিটির পরিষেবার হাল এমন হয়েছে যে সরকার এদের উপর ভরসা রাখতে পারছে না - দুয়ারে সরকার, পাড়ায় সমাধান ইত্যাদি প্রকল্প করতে হচ্ছে। গ্রাম শহরের রাস্তাঘাটের করুণ অবস্থা। ঠিকাদারদের কয়েক'শ কোটি টাকা বাকি। তাই তারা কাজ করছে না। এই অবস্থার প্রধান কারণ পঞ্চায়েত মিউনিসিপ্যালিটির জন্য কেন্দ্রীয় ও রাজ্য অর্থ কমিশনের সুপারিশকৃত প্রাপ্য টাকা রাজ্য সরকার তাদেরকে দিছে না।
১০) এই ধরণের অরাজক অবস্থার ফল ২০১০ সালে রাজ্যের মোট ঋণ যেখানে ছিল ১.৮৭ লক্ষ কোটি টাকা, আজ তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ লক্ষ কোটি টাকার উপরে। দেউলিয়া হতে আর বাকি নেই।
১১) এ সবের মধ্যেও মেলা খেলা চলছে, বিজনেস সামিট চলছে। কারণ শিল্প আসুক না আসুক কাটমানি আসবেই।
১২) অডিট করতে না দিয়ে দুর্নীতির চারণভূমি 'শিক্ষা'র অন্তর্গত সমগ্র শিক্ষা মিশন বাবদ ১৫,৮৬৪ কোটি, একশ দিনের কাজে কয়েক হাজার কোটি, খাদ্য ভর্তুকির ১,২৬৩ কোটি, এবং সীমাহীন চুরির ক্ষেত্র বুলবুল, আমপান ও ইয়াস-এর ক্ষতিপূরণ বাবদ ৪২,৮৬৬ কোটি টাকার বকেয়া দাবির কোনও সারবত্তা নেই। বুলবুল ও ইয়াস-এ তেমন কিছু হয়নি আমরা সবাই জানি। 'Economic Review ২০২০-২১'-এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২০ সালের আমপানের জন্য মোট খরচ হয়েছে ১,৯৬৯ কোটি টাকা। প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রাথমিক সফরেই নাকি ১,০০০ কোটি মঞ্জুর করেছিলেন! অথচ রাজ্য সরকার আমপান বাবদ দাবি করছে ৩২,৩১০ কোটি। কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনা নাম দিয়ে এভাবেই মানুষকে বিভ্রান্ত করার কাজ চলছে। আসলে, মমতাকে এসব করতে হচ্ছে বাংলার মানুষের নজর ঘুরিয়ে ধোঁকা দেওয়ার জন্য। বাঙালি অস্মিতার মূল দ্যোতক ও সম্পদ শিক্ষা সংস্কৃতির অন্তর্জলি-যাত্রার পথ সুগম করে দিয়ে বাংলা ও বাঙালি নিয়ে নাটক করে যাচ্ছেন। আর এখন তো সবচেয়ে বড় নাটক করছেন SIR নিয়ে। SIR আদেশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে BLO-দেরকে প্ররোচনা দেওয়ার জন্য মমতা কোনও চেষ্টার ত্রুটি করলেন না। বহু টাকা খরচ করে Supreme Court-এ কেস করলেন। অথচ বিএলও, ইআরও-দেরকে ঠিক মতো মোটিভেট করলে, ইসি-র সঙ্গে সহযোগিতা করলে, ঠিক সময়ে বি-গ্রুপ অফিসারের নাম পাঠালে এই কাজটি রাজ্য প্রশাসনের আধিকারিক দ্বারাই সুষ্ঠুভাবে সমাধা হতে পারত। প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ পড়ত না। 'মোদির গ্যারান্টি' নাম দিয়ে নরেন্দ্র মোদি যেভাবে মানুষকে ধাপ্পা দিয়ে চলেছেন, মমতাও তেমনি 'দিদির প্রতিজ্ঞা' নাম দিয়ে আর একবার ধাপ্পা চালিয়ে যেতে চাইছেন।
এবারে আসা যাক মোদির গ্যারান্টি - 'ভরসার শপথ' নিয়ে পর্যালোচনায়। দিদির প্রতিজ্ঞা, মোদির শপথ (প্রতিজ্ঞার হিন্দি) - দিদির ১০টি প্রতিজ্ঞার বিরূদ্ধে মোদির ২০টি শপথ। সেগুলি হল - অনুপ্রবেশ রুখতে কাঁটাতারের বেড়া সমস্যার সমাধান, সরকারী কর্মচারী/পেনশন ভোগীদের ডিএ পরিশোধ - সপ্তম পে কমিশন গঠন, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু, মমতা সরকারের দুর্নীতি অপশাসন নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ, মহিলাদের জন্য প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা, ৭০ লক্ষ মহিলাকে 'লাখপতি দিদি' বানানো এবং ৩৩% মহিলা সংরক্ষণ, রাজ্যের সরকারী বাসে মহিলাদের বিনাভাড়ায় যাতায়াত ব্যবস্থা, স্নাতকে ভর্তির সময়ে ছাত্রীদেরকে আর্থিক অনুদান, গর্ভবতী মহিলাদের এককালীন ২১,০০০ টাকা সাহায্য, 'দুর্গা স্কোয়াড' নামে মহিলা পুলিশ ব্যাটালিয়ান গঠন, সিঙ্গুরে শিল্প পার্ক, হলদিয়াকে ইকনমিক মেরুদণ্ড, দার্জিলিং ও সুন্দরবনের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি, মাইক্রোফিনান্স ঋণ শোধে সহায়তা, ২০২৬ বর্ষমধ্যে সমস্ত সরকারী শূন্যপদ পূরণ, যুবদের প্রতিমাসে ৩,০০০ টাকা সাহায্য, স্টার্টআপের জন্য ৬ লক্ষ যুবকে দশ লক্ষ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সাহায্য, কৃষকদের ৯,০০০ টাকা আর্থিক সাহায্য, ধান, আলু ও আম চাষের জন্য সাহায্য, ধানের সহায়ক মূল্য বৃদ্ধি, মৎস্যজীবিদেরকে সাহায্য, পর্যটনের উন্নতিতে শক্তিপীঠ ও শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু সার্কিট, বন্দেমাতরম সংগ্রহশালা, উত্তরবঙ্গে AIIMS, IIT, IIM স্থাপন এবং পুরোনো চা বাগানগুলিকে চাঙ্গাকরণ এবং সর্বশেষ ও সর্বকঠিন - কুড়মালি ও রাজবংশী ভাষাকে সংবিধানের অষ্টম তফসিলে আনয়ণ।
মমতা ১৫ বছর রাজত্ব করেছেন, তাই দাবি করছেন যে তাঁর প্রতিজ্ঞা তালিকার অধিকাংশ কাজই সমাপ্ত হয়েছে - রাজ্যবাসী অবশ্য সে কথা মানতে দ্বিধাগ্রস্ত। মোদি বলছেন - আমাকে একবার সুযোগ দিন - বাংলাকে নিরাশ করব না।
সবকিছু নিয়ে অনেক ভাবনাচিন্তা করেছি, অনেকের সঙ্গে আলোচনা তর্ক বিতর্ক হয়েছে। ভাল হতো যদি কংগ্রেস বামফ্রন্ট জোট এগিয়ে আসত। কিন্তু যে কোনও কারণেই হোক সেটা ঘটল না। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে - কি করেছেন মমতা গত দীর্ঘ ১৫ বছরে? শুধু বাংলা ও বাঙালি সেন্টিমেন্ট নিয়ে খেলা করা ছাড়া? উত্তরবঙ্গের মানুষকে তিনি রীতিমতো ঠকিয়েছেন, তাদের হক ছিনিয়ে নিয়েছেন। কংগ্রেস নেতা প্রিয়রঞ্জন দাসমুনশী বহু চেষ্টা করে রায়গঞ্জে AIIMS মঞ্জুর করিয়েছিলেন - উত্তর দিনাজপুরের কংগ্রেস নেতৃত্ব জমির ব্যবস্থা করেছিল। উত্তরবঙ্গের মানুষকে কাঁচকলা দেখিয়ে মমতা সেই হাসপাতাল নিয়ে এলেন কল্যাণীতে। মোদি উত্তরের মানুষের সেই ক্ষত সারিয়ে তুলতে চাইছেন - উত্তরবঙ্গে AIIMS, IIT, IIM করবেন বলেছেন। ভোটাররা ভাববেন না? সরকারি কর্মচারি, মহিলা, যুব, কৃষক, মৎস্যজীবী সংক্রান্ত শপথের বিষয়গুলি তো খুবই নগণ্য। মমতার মতো ডিএ না দেওয়ার জন্য মোদি তো কোর্টে যান নি। নিয়মিত ডিএ দিয়ে যাচ্ছেন। যোগাযোগ, শিল্পায়ন ও পর্যটন বিষয়েও মোদির track record খুব খারাপ নয়। সবচেয়ে বড় কথা সরকারকে টিকিয়ে রাখার জন্য মোদি যদি কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা বিহার ও অন্ধ্রের জন্য দিতে পারেন, তাহলে বহু চেষ্টা ও কষ্টে লাভ করা বাংলাকে কি তিনি ধাপ্পা দিতে চাইবেন?
মোদি ও তাঁর দলের নানা দোষ - প্রকট হিন্দুত্ব / ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং পুরোহিততন্ত্রে বিশ্বাসী ও সাম্প্রদায়িক। কিন্তু মমতাও তো কম যায় না। মমতা পুরোহিত ভাতা চালু করেছেন। তিনশ কোটির বেশি সরকারি অর্থ খরচ করে জগন্নাথ মন্দির স্থাপন করেছেন। মহাকাল মন্দিরের ভিত্তি স্থাপন করেছেন। সবচেয়ে বড় কথা বাংলায় তিনিই বিজেপিকে বরণ করে এনে সযত্নে লালন পালন করে চলেছেন।
পর্যালোচনা হল। সিদ্ধান্ত বাংলার আপামর সাধারণের।