আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ অষ্টম সংখ্যা ● ১৬-৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ● ১-১৫ বৈশাখ, ১৪৩৩
প্রবন্ধ
সার (SIR) না সার্জিক্যাল স্ট্রাইক?
সোমেশ্বর ভৌমিক
এতদিন শুনতাম সীমান্ত পেরিয়ে মারণাস্ত্র দিয়ে 'শত্রুঘাঁটি' ধ্বংস করার নাম সার্জিক্যাল স্ট্রাইক। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, বাছাই করা ভারতীয় ভোটারদের জন্যেও আছে একই ওষুধ।
ভোট দেওয়ার অধিকার ভারতীয় নাগরিকদের মৌলিক অধিকার না হলেও সাংবিধানিক অধিকার। এতদিন জানতাম, সংবিধানের ৩২৬ ধারা অনুসারে ভোটদানের অধিকার আছে তাঁরই, যিনি ভারতীয় নাগরিক, যাঁর বয়স অন্তত ১৮ বছর, যিনি দেশের কোনো একটি ভোটকেন্দ্রের বাসিন্দা, এবং যাঁকে আইনমাফিক অযোগ্য ঘোষণা করা হয়নি। এই অযোগ্য তালিকায় আছেন মানসিক ভারসাম্যহীন, দুর্নীতি বা অবৈধ কাজে জড়িত থাকার ফলে ফৌজদারি মামলায় দণ্ডিত এবং কারারুদ্ধ, এবং অভিবাসী মানুষেরা।
কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে অযোগ্যতার এই মাপকাঠিটিকে আরো বাড়িয়ে নেওয়ার জন্য ভারতীয় রাষ্ট্রের কর্তারা যেন উঠেপড়ে লেগেছেন। এই লক্ষ্য নিয়েই চালু করা হয়েছে SIR, বাংলায় বললে ভোটদাতাদের তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন। অজুহাত হিসেবে ভারতের নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে লেখা হয়েছে, 'বিশুদ্ধ ভোটার তালিকা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে'। 'ত্রুটিমুক্ত' না বলে এই যে 'বিশুদ্ধ' কথাটি ব্যবহার করা হল, তাতে নির্বাচন কমিশনের ওপর হিন্দুত্ববাদীদের সুনিশ্চিত প্রভাব নিয়ে কোনো নাগরিক যদি সরব হন, তাহলে তাঁকে দোষ দেওয়া যাবে কি?
আইন মোতাবেক ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ চলে নিয়মিত - প্রতিটি বিধানসভা আর লোকসভা নির্বাচনের আগেই একবার করে তালিকা যাচাই করে নেওয়া হয়। এই কাজে একদিকে নাম কাটা যায় যাঁরা নথিভুক্ত ঠিকানায় অনুপস্থিত (Absent), ঠিকানা বদলেছেন (Shifted), মারা গেছেন (Dead), অথবা দুটি নির্বাচনকেন্দ্রে নাম লিখিয়েছেন (Duplicate) - সংক্ষেপে ASDD। এছাড়াও তালিকাভুক্ত করা হয় তাঁদের আইন যাঁদের অযোগ্য আর অবৈধ ভোটার হিসেবে ঘোষণা করেছে। আর অন্যদিকে দুটি নির্বাচনের মাঝখানে যেসব নাগরিক ভোট দেওয়ার ন্যূনতম বয়সে, অর্থাৎ ১৮ বছরে পৌঁছেছেন, বা যাঁরা সেই ভোটকেন্দ্রের নতুন বাসিন্দা হয়েছেন, তাঁদের নাম তালিকায় তোলা হয়। এই কাজগুলি হয় নির্বাচনের আওতায় থাকা সবকটি নির্বাচনকেন্দ্র জুড়েই। তার মধ্যেই খুঁটিয়ে দেখা হয় বিশেষভাবে বেছে নেওয়া কয়েকটি অঞ্চলের তালিকা।
১৯৫২ সালে ভারতে প্রথম সাধারণ নির্বাচন হয় - প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে। তার জন্য ভোটার তালিকার কাজ চলেছিল প্রায় পাঁচ বছর ধরে। এরপরে আরও ১২ বার ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন করা হয়েছে, শেষবার হয়েছে ২০০৪ সালে। এবং প্রতিবারই কাজটি করতে লেগেছে কয়েকমাস, এমনকি বছরও পেরিয়ে গিয়েছে। তাছাড়া কমিশন একথাটি উল্লেখ করতে ভুলে গেছেন যে ১৯৯৩ সাল থেকেই চালু হয়েছে ভোটারদের সচিত্র পরিচয়পত্র দেওয়ার কাজ। সেই পরিচয়পত্রটিও নিশ্চয় কোনোকিছু যাচাই না করেই দেওয়া হয়নি বা হয় না। এই কাজটিও করে থাকেন নির্বাচন কমিশনই। যুক্তি বলে, এ-দুটি কাজ পরস্পর পরিপূরক হওয়া উচিত। কিন্তু পুরোনো আমলের কাজ নিয়েই এখনকার কমিশনের অস্বস্তি - অবশ্যই রাজনৈতিক প্রভুদের অঙ্গুলিহেলনে। তাই একেবারে ঢাল-তরোয়াল নিয়ে শুদ্ধিকরণ অভিযানে নেমে পড়া। এবং সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের ধাঁচে।
তা ছাড়া আর কী? কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তিন দফায় এই কাজ করার বরাত পেয়েছে নির্বাচন কমিশন। প্রথম দফায় কাজ হয়েছে বিহারে, জুন-সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ, বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে। ওয়েবসাইটে দেখছি, লেখা আছে এই কাজটি সারা হয়েছে 'উইথ জিরো অ্যাপিলস্' - মানে বোঝাতে চাওয়া হচ্ছে বিহারে বিশুদ্ধিকরণ ছিল বিতর্কহীন। তাই কী? আসলে সেখানে এত দ্রুত কাজটি শেষ করা হয়েছে যে কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই কাজ শেষ বলে ঘোষণা করা হয়েছে।
এরপরে চালু হয়েছে দ্বিতীয় দফার কাজ। পশ্চিমবঙ্গ-সহ মোট বারোটি রাজ্য আর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই প্রক্রিয়া চলেছে - ছত্তিশগড়, গুজরাট, কেরালম, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, গোয়া, তামিলনাড়ু, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আন্দামান-নিকোবর, পুদুচেরি আর লাক্ষাদ্বীপে। ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবরের ভোটার তালিকা ধরে কাজটি করা হল, যথেষ্ট দ্রুততার সঙ্গে। বাদ-প্রতিবাদ আর বিতর্ক পেরিয়ে শেষও হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া বাকি এগারোটি রাজ্য আর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে। এই কটি অঞ্চলের মোট জনসংখ্যা ৭৩.৩৮ কোটি। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী ভাগ্য নির্ধারিত হল ৫১ কোটি ভোটারের। অর্থাৎ সেই কটি রাজ্য আর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার মোটামুটি ৭০%। প্রাথমিক হিসেবে জানা যাচ্ছে, নাম কাটা গেছে ৫ কোটি, অর্থাৎ দশ শতাংশ। মানে মোট বৈধ ভোটারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৬ কোটি (৬২.৫%)।
এর মধ্যেও নজর কেড়েছে পশ্চিমবঙ্গ। এবারে যে কেন্দ্রের (ফলত নির্বাচন কমিশনেরও) বিশেষ নজরে আছে পশ্চিমবঙ্গ, সে-কথা কেন্দ্রে অধিষ্ঠিত শাসকরা লুকোন নি। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাট তাঁদের চাই-ই।
২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর প্রাথমিক কাজ শুরু করার সময় কমিশনের হাতে ছিল ৭ কোটি ৬৬ লাখ ভোটারের তালিকা। দেড় মাসের মাথায় ৫৮ লাখ নাম বাদ দিয়ে সেটিকে নামিয়ে আনা হল ৭ কোটি ৮ লাখে (১৬ ডিসেম্বর)। এরপর সেই খণ্ডিত তালিকা থেকে ১ কোটি ৬৭ লাখ ভোটারের তালিকা তৈরি হয়েছিল দ্বিতীয় দফার যাচাইয়ের জন্য - ১ কোটি ৩৬ লাখের নামে নাকি দেখা গেছে 'তথ্যগত অসংগতি', বাকি ৩১ লাখের ক্ষেত্রে পাওয়া গেছে পুরোনো ভোটার তালিকার সঙ্গে অমিল বা অসংগতি। এঁদের ঘাড়ে এসে পড়ল কমিশনের প্রতিনিধিদের সামনে শুনানিতে হাজির হয়ে নিজেদের বৈধতা প্রমাণের দায়।
কিন্তু পরীক্ষায় পাশ করেছেন মাত্র ৪৩ লাখ মানুষ। অকৃতকার্য হয়ে নাম কাটা গেছে ৬৩ লাখ ৬৬ হাজার মানুষের। বাকি ৬০ লাখ ৬ হাজার মানুষের নাম উঠেছিল 'আইনি বিবেচনাধীন' তালিকায়। তাঁদের মধ্যে কমবেশি ৩৩ লাখ মানুষ রেহাই পেয়েছেন বিবেচনার পরে, কিন্তু ২৭ লাখ ১৬ হাজার মানুষের নাম কাটা গেছে। তাঁরা সুপ্রিম কোর্ট গঠিত বিশেষ ট্রাইবুনালের দ্বারস্থ হতে পারেন। কিন্তু নানা কারণে তাঁদের হাতে সময় এবং সুযোগ খুব কম। ইতিমধ্যে কমিশনও তালিকা ফ্রিজ করে দিয়েছে। ফলে অন্তত এই বিধানসভা নির্বাচনে তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগ মানুষেরই ভোট দেওয়া কঠিন। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে নির্বাচকদের সংখ্যা ৬ কোটি থেকে ৬ কোটি ১০ লাখের আশেপাশে থাকার সম্ভাবনাই প্রবল।
কিন্তু আসলে খেলা যেখানে হয়েছে, তা হল মহিলা ভোটার আর মুসলিম ভোটারের নাম বাদ পড়ার ক্ষেত্রে - যথাক্রমে ৫৭ লাখ আর ৩১ লাখ। এরাজ্যের সরকার মহিলাদের জন্য নানাভাবে সরাসরি অনুদান দেয়। সেখানে প্রায় ৬৩ শতাংশ মহিলার ভোটাধিকার চলে যাওয়া বেশ চোখে পড়ার মতো। কারণ পশ্চিমবঙ্গে মহিলা জনসংখ্যার অনুপাত ৪৯%, অর্ধেকেরও কম। ২৯৪টি নির্বাচন কেন্দ্রের প্রতিটিতে গড়ে ১৯,৪০০ জন করে। মুসলিমদের ভোটাধিকার হরণের খেলাটা আরো প্রকট। পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাত মোটামুটি 27%। অথচ ভোটাধিকার বঞ্চিতের অনুপাত ৬৬-৬৭%। ২৯৪টি নির্বাচন কেন্দ্রের প্রতিটিতে গড়ে ১০,৫০০ জন করে।
এছাড়া গত কয়েক বছর ধরেই এরাজ্যে ব্যাপক 'অনুপ্রবেশ' নিয়ে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকরা গলা ফাটাচ্ছেন। ইঙ্গিতে নয়, খোলাখুলি আঙুল উঠছে মুসলিমদের দিকেই। সংখ্যাটা শোনা যাচ্ছিল অন্তত এক কোটি। ছাঁকনিতে কিন্তু এর এক-তৃতীয়াংশও ধরা পড়েনি।
মজা হল, এত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও, এবং যাচাই প্রক্রিয়া চরম ত্রুটিপূর্ণ, এরকম কথা বলেও সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে ভর্ৎসনাটুকুও করেননি। শুধু জানিয়েছেন, এবারে যাঁদের নাম কাটা গেল, তাঁদের ভোটাধিকার চিরতরে চলে গেল, এটা যেন ধরে নেওয়া না হয়। ভবিষ্যতে তাঁদের নাগরিকত্ব প্রমাণের সুযোগ থাকবে। এখন যেন একটু অপেক্ষা করেন।
এই প্রশ্রয়ে বলীয়ান হয়ে শুধু বিরোধীপক্ষ নয়, নির্বাচনের কাজে জড়িত সরকারি কর্মচারী আর আধিকারিকরা বারবার কমিশনের, বিশেষ করে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের, স্বেচ্ছাচার এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ ব্যবহারের শিকার হয়েছেন, চরম অপমান আর হেনস্থা ভোগ করেছেন, করে চলেছেন।
আরও একটা তত্ত্ব এবারে প্রতিষ্ঠা পেল, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে। এখানকার ভোটার মানেই 'সন্দেহভাজন', 'অবৈধ'। এই তক্মা দিয়ে বারবার তাঁদের দাগিয়ে দেওয়া হবে। তাঁরা যে 'বৈধ' সেটা তাঁদেরই প্রমাণ করতে হবে। কেননা অভিযোগ থেকে রেহাই না পাওয়া পর্যন্ত সব অভিযুক্তই দোষী, এই নীতিতেই এখন চলছে রাজ্যপাট।
হঠাৎই আমেরিকা-ইজরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধের কথা মনে পড়ে গেল। বিনা প্ররোচনায় ইরানের ওপর হামলা চালানো হল। অজুহাত তৈরি হল তারপর - বস্তুত নিত্যনতুন অজুহাত এখনও তৈরি হচ্ছে। SIR কি এর থেকে খুব আলাদা?
ইরান আক্রমণের জবাব দিয়েছে হর্মুজ প্রণালী আটকে দিয়ে। পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদেরও ভোটবাক্সে অনেক কিছু জবাব দেওয়ার আছে।
তবে একটা কথা। এরাজ্যের শাসকদল বিরোধী অনেক বাম ভোট ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তো বটেই, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও হিন্দুত্ববাদীদের পক্ষে পড়েছিল বলেই এরাজ্যের প্রধান দুই প্রতিপক্ষের ভোটের ব্যবধান কমে গিয়েছিল। এরকম আত্মঘাতী রণকৌশলের অবসান হোক। বিপথে চলে যাওয়া এই ভোটগুলো ঘরে ফিরলেও এবারের ভোটে হিন্দুত্ববাদীদের দাপট অনেক ফিকে হতে বাধ্য।