আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ অষ্টম সংখ্যা ● ১৬-৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ● ১-১৫ বৈশাখ, ১৪৩৩
প্রবন্ধ
আশায় মরে চাষা - বাঁচার পথের সন্ধানে
গৌতম সরকার
অর্থনীতি শাস্ত্রের নিয়ম মেনেই আজ পশ্চিমবঙ্গের আলুচাষীরা চরম সঙ্কটের সম্মুখীন হয়েছে। চাহিদার তুলনায় যোগান বেশি হলে দ্রব্যের দাম কমবে, এটা অর্থনীতির একদম গোড়ার কথা। তাই এই ব্যাপারে কোনও অস্পষ্টতা নেই, কিন্তু আজকের এই পরিস্থিতির উদ্ভব কেন হল, কেন আজ লক্ষ লক্ষ চাষি লোকসানের সামিল হল, গতবছর বাম্পার উৎপাদনের পরেও এ'বছর উৎপাদনের ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেওয়া হলনা কেন, কেনই বা গত বছরের অত আলু অবিক্রীত থেকে হিমঘরগুলো আটকে রাখল? প্রশ্ন একাধিক, উত্তর আছে কি? এই প্রতিবেদনটি সেইসব উত্তর খোঁজার এক প্রয়াস মাত্র।
আলু উৎপাদনের নিরিখে দেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের স্থান উত্তরপ্রদেশের ঠিক পরেই। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে প্রতি বছর গড়ে ৯০-১০০ লক্ষ টন আলু উৎপাদিত হয়। ২০২৫ সালে গোটা রাজ্যে আলু চাষ হয়েছিল ৪ লক্ষ ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে, মোট উৎপাদন ছিল ১১০-১৩০ লক্ষ টন। এবছর অর্থাৎ ২০২৬ সালে মোট জমি ও উৎপাদন দুটোই বেড়ে গেছে। মোট ৫ লক্ষ ৫ হাজার হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ১৫০ লক্ষ টনেরও বেশি। এরমধ্যে রাজ্যের অভ্যন্তরীণ চাহিদার পরিমাণ হল ৬০ লক্ষ টন। তাহলে এই অতিরিক্ত আলুর ভবিষ্যৎ কি? সম্ভাব্যগুলি হল, এক, বাইরের রাজ্যে বা দেশে রফতানি; দুই, হিমঘরে সংরক্ষণ, আর তিন, ন্যূনতম সহায়তা মূল্যে অতিরিক্ত আলু সরকারের কিনে নেওয়া।
প্রথমে আসা যাক সংরক্ষণের প্রশ্নে। প্রথমে বুঝে নিতে হবে এই যে ৬০ লক্ষ টন অভ্যন্তরীণ চাহিদা, চাষীরা এর থেকে ন্যূনতম অংশ খাবার জন্য রেখে বাকিটা হিমঘরে রাখে। পশ্চিমবঙ্গে সাকুল্যে ৪৯৬টি হিমঘর আছে, সেখানে সর্বমোট ৭৫ লক্ষ টন আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে। এখন যদি ধরা যায় ১২০ লক্ষ টন আলু উৎপাদন হল, আর মধ্যে কৃষকেরা ২০ লক্ষ টন বাড়িতে সাময়িক খাবারের জন্য রাখলো, তাহলে প্রায় ১০০ টন হিমঘরে সংরক্ষণের জন্য পড়ে রইল। কিন্তু হিমঘরে কমবেশি ৭৫ লক্ষ টন রাখার ব্যবস্থা আছে, সেখানে পুরোনো বছরের আলু কিছু থেকেই যায়, তাহলে অতিরিক্ত ২৫ লক্ষ টন বা তার বেশি পরিমাণ আলু রফতানির ব্যবস্থা করতে হয়, নচেৎ পচনশীল প্রকৃতি হওয়ার কারণে এই অতিরিক্ত আলু হয় ঘরে, নয়তো মাঠে পড়ে নষ্ট হবে। এখানেই লুকিয়ে আছে দ্বিতীয় সমস্যা।
একথা অনস্বীকার্য এই রাজ্যের আলু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে ছোট বড় ব্যবসায়ী আর দীর্ঘ সাপ্লাই লাইনে থাকা অগণিত মধ্যস্বত্ব ভোগী বা ফড়ে। সেই কারণেই চাষী যে আলু মাঠ থেকে দু'টাকায় বিক্রি করে সেই আলু কলকাতার খুচরো বাজারে ২০ টাকায় বিক্রি হয়, যদি মাঠে পাঁচ টাকায় বিক্রি হয় তাহলে আমরা কিনি ৩০ টাকায়। আলুর বাজারের উপর সরকারি কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই, তাই চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে চড়চড় করে আলুর দাম বাড়তে থাকে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে পড়শি রাজ্য ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, আসাম এবং সময়ে সময়ে বাংলাদেশেও রফতানি করা হয়। সমস্যা হল, এইসব জায়গায় রফতানির ফলে সময়ে সময়ে চাহিদার তুলনায় যোগান অপ্রতুল হয়ে ওঠে, তখন আলুর দাম ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যায়। এই দাম বৃদ্ধি প্রকৃত চাষিদের কোনও উপকারে আসেনা, শুধু ব্যবসায়ীদের মুনাফার পার্স মোটা হয়। এই প্র্যাকটিস বন্ধ করার জন্য রাজ্য সরকার অন্য রাজ্যে আলু রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। সময় সময় সেই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হলেও বিশেষজ্ঞদের ধারণা এই নিষেধাজ্ঞা পলিসির অপর পিঠটা হল আলুর মূল্য হ্রাস। এখানেও সেই চাহিদা যোগানের মিল অমিলের গল্প।
আলুর দাম লাগামছাড়া হয়ে যাওয়ায় ২০১২ সালের ১ আগষ্ট বর্তমান রাজ্য সরকার আলু রফতানির উপর প্রথমবার নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এরপরে উৎপাদনে জোয়ার আসায় ২০১৩ সালে নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করা হয় এবং আন্তঃরাজ্য আলু রফতানি স্বাভাবিক গতি পায়। বিগত বছরগুলিতে আলুর বাজার 'নিষেধাজ্ঞা-উদ্বৃত্ত-মূল্য হ্রাস এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল-ঘাটতি- মূল্যস্ফীতি'র দুষ্টচক্রে আবর্তিত হয়ে এসেছে৷ ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে আবার আলুর দাম বেড়ে যাওয়ায় পুনরায় আন্তঃরাজ্য আলু বাণিজ্যে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। সরকারি নির্দেশে হিমঘরের আলুও স্থানীয় বাজার ছাড়া অন্য কোথাও বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়। বারবার নিষেধাজ্ঞার জেরে প্রতিবেশী রাজ্যগুলি যারা আমাদের রাজ্য থেকে আলু আমদানি করত তারা বিকল্প আমদানির সন্ধানে ফিরেছে। যেমন ২০২৪ সালে ওড়িশা সরকার উত্তরপ্রদেশ থেকে আলু আমদানি শুরু করেছে। অন্যান্য রাজ্যগুলোও একই পথ অনুসরণ করছে। এছাড়া সাম্প্রতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনমনের ফলে ভারত থেকে বাংলাদেশে আলু রফতানি বন্ধ আছে। সব মিলিয়ে পরপর দু'বছরের বাম্পার উৎপাদন আলুর দাম একেবারে তলানিতে পৌঁছে দিয়েছে।
আলু চাষিরা এবং সংশ্লিষ্ট ছোট ব্যবসায়ীরা এখনও গত বছরের লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারেনি, তার উপর ২০২৬-এর আকাশছোঁয়া উৎপাদন তাদের আরও বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে। গতবছর সরকার চাষিদের সাহায্যার্থে আলুর ন্যূনতম সহায়ক মূল্য রেখেছিল ক্যুইন্টাল প্রতি ৯০০ টাকা, কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতির চাপে চাষীরা খোলাবাজারে ৬০০ টাকা ক্যুইন্টাল দরে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিল। যার ফলশ্রুতিতে গতবছর এই রাজ্যে আলু চাষিদের সামগ্রিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ২,২০০ কোটি টাকা। এ'বছর সরকার আশ্বাস দিয়েছে, ৯৫০ টাকা ক্যুইন্টাল প্রতি ১২ লক্ষ টন আলু কিনে নেবে। কিন্তু মোট উৎপাদনের তুলনায় এই সংখ্যাটি কিছুই নয়। রাজ্যের সব হিমঘরের মালিকদের প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তারা যেন তাদের সংরক্ষণ ক্ষমতার ৩০ শতাংশ সরকার ক্রীত আলুর জন্য খালি রাখে। কিন্তু এই কার্যক্রম ঘোষণা এবং যথাযথ প্রয়োগের মধ্যে বড় ফাঁক থেকে যাচ্ছে।
বিরোধীরা সরকার বিরোধী স্লোগান দেবে এটাই স্বাভাবিক, সরাসরি চাষিদের মুখে শুনে নেওয়া যাক সরকারের এই আশ্বাসবাণী তাদের কতটা আশ্বস্ত করছে। রাজ্য কৃষি বিপণন মন্ত্রী বেচারাম মান্না চাষিদের আতঙ্কিত হতে বারণ করেছেন। তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, "আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সরকার সহায়ক মূল্যে অতিরিক্ত আলু কিনে নেবে এবং সেখানে প্রান্তিক কৃষকেরা অগ্রাধিকার পাবে।" তবে এখানে একটা ট্যুইস্ট আছে, সরকার কিন্তু সরাসরি আলু কিনছে না। সরকার কোল্ডস্টোরগুলিকে দায়িত্ব দিয়েছে। এছাড়াও সরকার বিভিন্ন ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছে হিমঘরের মালিকদের ঋণ দিতে, যাতে করে সেই ঋণের টাকায় তারা চাষিদের কাছ থেকে আলু কিনে নিতে পারে। তবে এই উদ্যোগ মোটেই ফলপ্রসু হচ্ছে না। কারণ ব্যাংক ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে অকারণ দেরি করছে। এই দীর্ঘসূত্রতার কারণ হিসেবে সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, কোল্ডস্টোরগুলি দেরিতে ঋণের আবেদন করায়, অনুমোদনের ক্ষেত্রে দেরি হচ্ছে। কিন্তু চাষিদের গলায় অন্য সুর।
বর্ধমান জেলার এক ছোট চাষী অঞ্জন দে'র কথায়, "সরকার যদি প্রতিশ্রুতিমতো ১২ লক্ষ টন আলু সবটাই কিনে নেয়, তাহলেও সমস্যা যেখানে ছিল সেখানেই থাকবে, খুব বেশি হেরফের হবেনা"। সরকার ইতিমধ্যে কিছু চাষীকে 'কৃষক বন্ধু কার্ড' বিলি করেছে। যাঁরা কার্ড পেয়েছেন তাঁরা ৯৫০ টাকা কুইন্টাল দরে মাথা পিছু ৩৫ কুইন্টাল আলু বিক্রি করতে পারবে। চাষিদের কথায়, এই ব্যবস্থা চাষিদের তেমন কোনও সুরাহার পথের সন্ধান দিতে পারছে না। কারণ হিসেবে ঝাড়গ্রাম জেলার নেতাই অঞ্চলের এক চাষি জানাচ্ছেন, এ'বছর বিঘাপ্রতি ৬০ কুইন্টাল আলুর উৎপাদন হয়েছে এবং জেলায় আলু চাষির সংখ্যা ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার। তাঁদের মধ্যে মাত্র ১-২ শতাংশ চাষি আলু কেনার সরকারি টোকেন পেয়েছেন। তাই সরকারি মদতে হাতে গোনা কিছু কৃষক উপকৃত হবে, সবাই নয়।
আগের বছরে আলুর দাম নিম্নগামী থাকায় বেশিরভাগ আলু হিমঘরে সংরক্ষিত ছিল। এর ফলে এবছরে চাষীরা মাঠ থেকে আলু তুলতেই ভয় পেয়েছে। যাঁরা হিমঘরে সংরক্ষণের আশা নিয়ে দু'হাজার টাকায় ট্রাক্টর ভাড়া করে আলু নিয়ে যাচ্ছেন, লাইনে দাঁড়িয়ে দু'তিনদিন পর জানতে পারছেন হিমঘরে জায়গা হবে না। অগত্যা আবার ট্রাক্টর ভাড়া করে সেই আলু বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে হচ্ছে। এর ফলে এক ট্রাক্টর আলুর কোনও সুরাহা না হয়েই চাষীকে পকেট থেকে ৪-৫ হাজার টাকা অকারণ মাশুল গুণতে হচ্ছে।
যে সমস্ত ব্যবসায়ী চাষীদের থেকে আলু কিনে হিমঘরে সংরক্ষণ করে সারাবছর ধরে বাজারের দামের সাথে নিজেদের লাভের অঙ্কের হিসেব মিলিয়ে আলু বিক্রি করতেন, তাঁরা এ'বছর আলু কেনার দিকে ঝুঁকছেনই না। গতবছর ৬০০ টাকা বস্তা কিনে বছর শেষে বস্তাপিছু ৩০০ টাকায় বেচতে হয়েছে। তাই এই বছরে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করা নিয়ে তারা দ্বিধাগ্রস্ত। চাষীরা বাধ্য হয়ে সাড়ে তিন থেকে চার টাকা কিলো দরে আলু বিক্রি করে দিচ্ছে, সেখানেও যথেষ্ট ক্রেতা নেই। তারকেশ্বরের এক কৃষক বাপন হাজরা জানাচ্ছেন, "বিঘাপ্রতি আলু চাষ করতে ৩২-৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়। সেখানে এই মুহূর্তে বাজারে জ্যোতি আলুর বস্তাপিছু (৫০ কেজি) দাম ২০০ টাকা, আর চন্দ্রমুখী ৩০০ টাকার আশেপাশে"। তাঁর আক্ষেপ, এই দামে চাষীরা তাদের খরচটুকুও তুলতে পারবে না। তাঁর মতে, জ্যোতি আলুর দাম ন্যূনতম ৪০০-৫০০ টাকা আর চন্দ্রমুখী ৫৫০-৬০০ টাকা বস্তা দরে বিক্রি হলে চাষিদের কিছুটা সুরাহা হতো।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বস্তার কালোবাজারি। এখানে আবার অর্থনীতি শাস্ত্রের প্রাথমিক সূত্রগুলোর মধ্যে কাটাকুটি খেলা চলছে। আলুর যোগান বেশি চাহিদা কম, তাই আলু হয় সংরক্ষণের জন্য হিমঘরে পাঠাতে হবে কিংবা কম দরে বিক্রি করতে হবে, দুটি ক্ষেত্রেই আলু বস্তাবন্দি করা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে বস্তার বাজারে উল্টো চক্র কাজ করছে, এখানে চাহিদা বেশি তাই বস্তার দামের ঊর্ধ্বগতিতে কোনও লাগাম টানা যাচ্ছেনা। যে যা পারছে দাম হাঁকছে। যে বস্তা কদিন আগেই ১০-১৫ টাকায় বিক্রি হতো, সেটাই এখন খোলা বাজারে ৩৫-৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে করে চাষিদের লোকসানের বহর আরও বাড়ছে।
সাড়ে তিন-চার মাসের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের কথা ছেড়েই দিলাম, চাষ করতে গেলে মাটি তৈরি, সার, বীজ ও কীটনাশক ওষুধ কেনার জন্য পয়সা চাই। এরপর ফসল ওঠার পর মাঠ থেকে বস্তাবন্দি করে ঘরে আনা তার আগে ঝাড়াই বাছাই ও বস্তাবন্দি করতেও আলাদা মজুর আবশ্যক। আলুর বস্তা ট্রাক্টরে তুলতে ও নামাতেও মজুরের দরকার। এতগুলো পর্ব পেরিয়ে, এতগুলো খরচ সামলিয়ে চাষি যদি ফসলের দাম না পায়, তাহলে কোন আশায় তারা চাষের উপর নির্ভর করে পরিবার পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকবে? তবে বিপদ শুধু চাষিদের ভাবলে ভুল হবে। আলু চাষের সঙ্গে যুক্ত ছোট ব্যবসায়ীরাও এই পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে সার, বীজ ও কীটনাশক ওষুধের দোকানদাররা, যাঁরা ফসল ওঠার পর শোধ করার শর্তে চাষিদের ধারে মাল দিয়েছেন তাঁরাও এই বিপদে হাবুডুবু খাচ্ছেন। ফসলের দাম না পাওয়ায় চাষিরা এইসমস্ত ব্যবসায়ীদের ঋণশোধ করতে পারছে না। পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান এবং হুগলির ছোট ব্যবসায়ীরা গতবছর ধারে মাল দিয়ে সেই টাকা তুলতে পারেননি। পূর্ব বর্ধমানের এক দোকানদার জানাচ্ছেন, আগের বছর বেশ কয়েক লক্ষ টাকার সার আর বীজ চাষিদের ধারে দেওয়ার পর সেই টাকা ফেরত পাননি। এই বছর সেই টাকা ফিরে পাওয়ার আশায় আরও ব্যাংক লোন নিয়ে সেইসব চাষিদের আবার একপ্রস্থ ধারে সার বীজ যোগান দিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন গত বছর আলুর বাজার অত্যন্ত খারাপ যাওয়ায় এই বছরে আলুর দাম উঠবে। তাঁর সেই অনুমান মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে, আবার কয়েক লক্ষ টাকা লোকসানের আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
আলুর দাম কমে যাওয়ার পিছনে অনেক কারণ আছে। আলুর বাজারকে বাঁচাতে হলে রফতানি বাণিজ্যকে ফিরিয়ে আনতে হবে। এর সাথে আলুর বহুমাত্রিক ব্যবহারের প্রসার ঘটানো খুব জরুরি। সরকারকে উদ্যোগী হয়ে সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করে আগের বছরের ইনভেন্টরির সাথে বর্তমান বছরের প্রত্যাশিত চাহিদার সঙ্গতি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করতে হবে। এই যুক্তিবাদী পরিকল্পনার অভাবই গত কয়েক বছর ধরে আলু উৎপাদকদের লোকসানের মূল কারণ। সরকারি নিষেধাজ্ঞার কারণে ব্যবসায়ীরা আগের মতো অন্য রাজ্যে আলু রফতানির করতে পারছে না, অন্যদিকে বাংলাদেশে আলু রফতানিও অনেকটাই কমেছে।
রাজ্য কৃষি বিপণন দপ্তরের অধিকর্তারা মনে করেন, হুগলি, পূর্ব বর্ধমান, হাওড়া, পশ্চিম মেদিনীপুরের মতো জেলায় একটা বড় অংশের কৃষক বংশ পরম্পরায় আলু চাষ করে আসছেন। এইসব এলাকার জমি আলু চাষের পক্ষে আদর্শ। আলু চাষ লাভজনক হওয়ায় এনারা কোনোদিন বিকল্প চাষ বা পেশার কথা ভাবেননি। তাই গত বছরের লোকসানের পরেও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তারা আলু চাষ করে গেছেন। আধিকারিকরা ভেবেছিলেন, গত বছরের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এবছর উৎপাদন কমবে, বাস্তবে সেটা ঘটেনি। এছাড়া কোভিডের সময় থেকেই বহু পরিযায়ী শ্রমিক গ্রামে ফিরে এসেছেন। বিকল্প কোনও কাজের সন্ধান করতে পেরে তাঁরাও বাধ্য হয়ে চাষবাস শুরু করেছেন।
বিভিন্ন অক্ষ থেকে প্রতিবাদ উঠছে, তাদের মধ্যে আলু চাষি এবং হিমঘরের মালিকদের বিভিন্ন সংগঠনও আছে। প্রতিবাদীদের মুখ্য দাবি হল, জেলার পাশাপাশি প্রতিটি ব্লকে সরকারি ক্রয়কেন্দ্র খুলতে হবে, সরকারি তরফে প্রতিশ্রুতি মতো ৯৫০ টাকা কুইন্টাল দরে আলু কেনার পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত করতে হবে, কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ ও আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা করতে হবে, ফড়েদের দৌরাত্ম কমাতে হবে, আলু চাষে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ঋণ মকুব করতে হবে এবং উদ্বৃত্ত উৎপাদনের সঠিক প্রক্রিয়াকরণ ও রফতানির ব্যবস্থা করতে হবে। এই সব দাবি সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলি সহানুভূতির সঙ্গে দেখবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে সমস্যার সমাধানের রাস্তা দেখাবে সেই আশায় আলুর পাহাড় বুকে নিয়ে উদগ্রীব অপেক্ষায় আছে রাজ্যের ১৫ লক্ষ আলু চাষি।
বাংলায় একটা প্রবাদ আছে 'আশায় মরে চাষা'। আমরা এমন একটা ক্রান্তিকালের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি যখন নবীন প্রজন্ম কৃষিকার্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, প্রযুক্তি মানুষকে শহুরে স্বাচ্ছন্দ্যের দিকে আকর্ষণ করছে, জমি থেকে কৃষকের পরবর্তী প্রজন্মরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, কায়িক পরিশ্রমে অনীহা প্রকাশ করছে। এইরকম সংকটকালে চাষবাস যদি দিনদিন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, অলাভজনক হয়ে ওঠে তাহলে সেটা শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, দেশের সামগ্রিক উৎপাদন কাঠামোকে বেসামাল করে তুলবে। ভুললে চলবে না কৃষিই হচ্ছে সভ্যতার হৃৎপিণ্ড। একে রক্ষা করতে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকার দুজনকেই উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ চাষিদের চোখের জল জমিতে পড়লে, সেই জমি দিন দিন রুক্ষ, অনুর্বর, বন্ধ্যা হয়ে উঠবে।