আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ অষ্টম সংখ্যা ● ১৬-৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ● ১-১৫ বৈশাখ, ১৪৩৩

সম্পাদকীয়

ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ ও ভারতের কূটনীতি


গোটা একটি সভ্যতাকে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়ার হুমকি শুনতে হল একবিংশ শতাব্দীতে এসে। শুনতে হল যে সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পরিকাঠামো, বড় সেতু, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সব বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া হবে। মার্কিন রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করলেন যে ইরানকে এমন শিক্ষা দেওয়া হবে যে সে আর কোনোদিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। এই প্রবল আঁধার এবং বিধ্বংসী হুমকির সামনে মানবিকতা এবং সাহসের বিরল উদাহরণ গড়ে তুললেন ইরানের মানুষ। তাঁরা তাঁদের দেশের পরিকাঠামো বাঁচানোর জন্য হাতে হাত ধরে, ব্রিজের উপরে গিয়ে দাঁড়ালেন, ঘিরে ফেললেন বিদ্যুৎ কেন্দ্র। আমেরিকাকে বললেন যে যদি বোমা মারতেই হয়, তাহলে মারো। কিন্তু শুধু পরিকাঠামো নয়, ধ্বংস করতে হবে সাধারণ মানুষকে। গোটা দুনিয়ার সামনে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দেশপ্রেমের বিরল উদাহরণ পেশ করলেন ইরানের জনসাধারণ। তাঁদের কুর্নিশ জানাতেই হয়।

এই প্রবল হুমকির মুখে বিশ্বের কোনও নেতাকে দেখা গেল না, ট্রাম্পকে দূর হটো বলতে। ভারতের বিশ্বগুরু প্রধানমন্ত্রী মৌনব্রত অবলম্বন করলেন। ট্রাম্পের ভয়াবহ হুমকি যখন গোটা দুনিয়াকে ধ্বংসের মুখে পৌঁছিয়ে দিয়েছে তখন ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন ইরানের মানুষ। আর মধ্যস্থতায় সামিল হল পাকিস্তান, মিশরের মতন দেশ। ট্রাম্পকে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে হল। শুধু তাই নয় পাকিস্তানের ইসলামাবাদে এসে ইরানের সঙ্গে মুখোমুখি বসে আলোচনায় সামিল হতে হল। এই আলোচনা ফলপ্রসু হল না। কিন্তু অনেক প্রশ্ন ও সম্ভাবনার জন্ম দিল।

প্রথমত, কোনও চুক্তি হল না ইরান ও আমেরিকার মধ্যে। যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালী খোলা ছিল। যুদ্ধের মধ্যে ইরান তা বন্ধ করে। অতএব হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার দায় মূলত মার্কিন ও ইজরায়েলি হামলার। ইসলামাবাদে আলোচনা আটকে যায় হরমুজ প্রণালী ও ইরানের পরিশোধিত ইউরেনিয়ামকে কেন্দ্র করে। ইরান জানায় যে তারা বিনা শর্তে হরমুজ প্রণালী খুলবে না, এবং তাদের ব্যাঙ্কে আটকে রাখা টাকা আমেরিকাকে ফেরত দিতে হবে। ইরান আলোচনার পরে সাংবাদিক সম্মেলনে জানায় যে আমেরিকা যুদ্ধ করে যা আদায় করতে পারেনি, তা আলোচনার টেবিলে এসে আদায় করতে চাইছে, যা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। অতএব, আলোচনা ভেস্তে যায়। কিন্তু তবুও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এখনও বিভিন্ন চ্যানেলে চলছে সেই খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কাজেই আবারও ট্রাম্প যুদ্ধের হুঙ্কার দেবেন কি না তা সময় বলবে।

কিন্তু ট্রাম্প এবারে নিয়েছেন আরেক অদ্ভুত কৌশল। ইরানের হরমুজ অবরোধের বিরোধিতায় এবারে মার্কিন নৌসেনা হরমুজ অবরোধ শুরু করেছে। এহেন আশ্চর্যজনক নীতি যে কোনও রাষ্ট্রপতি নিতে পারে, তা কল্পনার বাইরে। যেই হরমুজকে খোলার জন্য এত মারামারি, যেই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আকাশ ছোঁওয়া হয়েছে, সেই হরমুজকেই অবরোধ করছে আমেরিকা! বিশ্বের মানুষ বুঝতে পারছেন না যে তাঁরা কাদের পাল্লায় পড়েছেন। এহেন দায়িত্বজ্ঞানহীন একজন ব্যক্তির হাতে অশেষ ক্ষমতা চলে এলে কী হতে পারে তা ট্রাম্প মানুষকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন।

অন্যদিকে, আমাদের তাকাতে হবে ভারতের দিকে। মাত্র একবছর আগে ভারত পাকিস্তানের মদতপুষ্ট পহেলগাঁও জঙ্গী হামলার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক অপেরেশন চালায়। ভারত সরকার গোটা পৃথিবীতে সাংসদদের পাঠিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক প্রচার চালায়, পাকিস্তানকে উগ্রপন্থার আঁতুড়ঘর হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু সেই অপারেশন সিঁদুরের সময় থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প, বারংবার পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, আসিফ মুনির ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হোয়াইট হাউসে আলোচনা করেছেন। তিনিই যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করছেন বলে ঘোষণা করেছেন। এই সমস্ত ঘটনা যখন ঘটছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ট্রাম্পের বিরুদ্ধ টুঁ শব্দটিও করেননি। আর এখন দেখা যাচ্ছে যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এত প্রচার চালানোর পরেও, ইসলামাবাদকেই বেছে নেওয়া হল ইরান ও আমেরিকার মধ্যে আলোচনার শহর হিসেবে। গোটা পৃথিবীর সামনে পাকিস্তান মধ্যস্থাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হল। যেখানে ভারত বলেছিল যে পাকিস্তান উগ্রপন্থার জনক, সেখানে সেই দেশেই এইরকম ভয়াবহ যুদ্ধের পরে শান্তি আলোচনা হওয়া নিশ্চিতভাবেই ভারতের কূটনৈতিক হার হিসেবেই দেখতে হবে।

কিন্তু ভারত সরকার এখনও নির্বিকার। বিদেশমন্ত্রক থেকে বলা হচ্ছে যে এমন কোনও ব্যাপার নয়। পাকিস্তানের মর্যাদা মোটেই বাড়েনি। 'অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?'। পাকিস্তান বরাবর আমেরিকার পক্ষেই থেকেছে। দেশটা একসময় সিআইএ চালাত বললে মিথ্যাচার হবে না। কিন্তু ভারতের স্থান গোটা পৃথিবীতে অনেক উঁচু ছিল। এর নেপথ্যে ছিল ভারতের 'জোটনিরপেক্ষ' অবস্থান, ন্যায় ও শান্তির পক্ষে অবস্থান। কিন্তু লাগাতার ট্রাম্পের গুণগান করা, ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে সমর্থন করা, ইরান আক্রমণের দুইদিন আগে ইজরায়েলে মোদীর যাত্রা, ভারতের 'জোটনিরপেক্ষ' এবং শান্তির দীর্ঘ দশকের অবস্থানকে ছোট করেছে। ভারত প্রকাশ্যে বহুদিনের মিত্র ইরান তথা পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলিকে ছেড়ে আমেরিকার পক্ষে ঝুঁকেছে। এই অবস্থান ভারতের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে খাটো করেছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের সামরিক তথা কূটনৈতিক আক্রমণ, আন্তর্জাতিক মঞ্চে পাকিস্তানের কদর কমাতে পারেনি, বরং এই যুদ্ধকে কেন্দ্র করে তা বেড়েছে। এই নিয়ে ভারতের মোদী ভৃত্য মিডিয়া কোনও কথা বলতে রাজি নয়। কিন্তু ভারতের এই কূটনৈতিক বিপর্যয়ের ভার বহন করতে হবে ভারতের জনগণকে। বিশেষ করে তাদেরকে যারা পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলিতে জীবিকানির্বাহ করেন।