আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ অষ্টম সংখ্যা ● ১৬-৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ● ১-১৫ বৈশাখ, ১৪৩৩
সম্পাদকীয়
ভোটার বাদ দিয়ে ভোট?
বাঙালি বরাবরই নিজভূমে পরবাসী। বারবার তাকে লড়ে যেতে হয়েছে নিজের অস্তিত্বের জন্য। দিল্লীর অধীশ্বররা বরাবর ঠিক করে দিতে চেয়েছে বাঙালির ভাগ্য। কখনো তাকে বানিয়েছে সুবা, কখনো প্রভিন্স, কখনো রাজ্য। বাংলার মাটি থেকে উঠে আসা শাসককে বারবার পরাজিত করে তাকে দিল্লীর অধীন করে তোলার চেষ্টা কেন্দ্রের মসনদে বসে থাকা কুশীলবরা কখনো ছাড়েননি। কিন্তু বেয়াড়া বাঙালি তার মতো করে খুঁজে নিয়েছে প্রতিবাদের ভাষা, ধরন, আন্দোলন। এমনকি পরাধীন দেশেও ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম সংগঠিত প্রতিবাদের কেন্দ্র ছিল বাংলার মাটি, নাটোর। বইবিমুখ নব্য সমাজবিজ্ঞানীরা অবশ্য তার খবর জানেননা। তাদের ফোনে সে তথ্য আসেনা যা বাঙালির সাথে মাটির যোগের কথা মনে করিয়ে দেয়। সিপাহী বিদ্রোহ পরবর্তী সময়ে ইংরেজের বিরুদ্ধে বরাবর জীবনপণ লড়াই করে গিয়েছে এই বাংলার মানুষ। কতজন মনে রাখে তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের কথা। পরাধীন ভারতের বুকে তৈরী হওয়া প্রথম জাতীয় সরকার। তবু বাঙালিকে বরাবর পরীক্ষায় বসতে হয় তার দেশপ্রেমের প্রমাণ দিতে। তাকে নির্দ্বিধায় অনুপ্রবেশকারী, ঘুসপেটিয়া বলে ড্যাং ড্যাং করে রাজ্যের বুকে ঘুরে বেড়িয়ে সভা করা যায়, বাঙালিকে বেছে বেছে ঘাড় ধরে উইপোকার মতো মাড়িয়ে যাওয়ার কথা বলা যায়। তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধি আজ তার নির্বাচককেই বাতিলের খাতায় ফেলে পছন্দমতো করে নিতে চায়। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন আবারও বাঙালিকে তার নিজের হতভাগ্য দশা চিনিয়ে দিচ্ছে। সৌজন্যে স্বাধীন দেশের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন একটি প্রথামাফিক নিয়মিত কার্যক্রম। এই প্রক্রিয়া দূষণীয় নয়, বরং নির্বাচন যাতে ত্রুটিপূর্ণ না হয় তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু বর্তমান কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের, এবং তার সাথে কেন্দ্রের শাসকদল ও রাজ্যের তথাকথিত বিরোধী দলের ইচ্ছাকৃত ইন্ধনে একটি প্রথামাফিক প্রক্রিয়া বাংলার আপামর মানুষকে নির্যাতিত, অপমানিত এবং আত্মসম্মানহীন এক ক্লীব জনগোষ্ঠীতে পরিণত করেছে। এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়া থেকেই বোঝা গিয়েছিল, এটি কোনো নিয়মমাফিক সংশোধন নয়, বরং এটা বাঙালির পরিচয়কে প্রশ্ন করার, তার দেশে থাকার অধিকার, তার প্রতিনিধি নির্বাচন করার যোগ্যতা নিয়েই প্রথম তোলার এক ঘৃণ্য চক্রান্ত। আজকের রাজ্যের শাসকদল যতই নির্বাচন কমিশন ও বিজেপিকে নিশানা করে গরম গরম বক্তৃতা করুন, তারা যেন ভুলে না যায়, বাঙালিকে অনুপ্রবেশকারী দাগিয়ে ২০০২ সালে এই প্রক্রিয়া চালাতে দিল্লীকে তারাই ডেকে এনেছিল এ রাজ্যে। আজকের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মাইক হাতে মোদি-শাহকে অনেক কিছুই বলতে পারেন, কিন্তু ২০০১ সালে বাজপেয়ী সরকারের কাছে ইনিই গিয়েছিলেন রাজ্যে লাখে লাখে অনুপ্রবেশ ঘটছে এই দাবি নিয়ে। আজ বাঙালিকে দিল্লীর শাসকদল যে এভাবে অপমান করতে পারছে, তার মূল কূযুক্তিটি সেদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হাতে করে সংসদে তুলে দিয়ে এসেছিলেন। আজকে সেই রাস্তাতেই বর্গী এসেছে এ রাজ্যে।
২০০২ সালে যখন বিশেষ নিবিড় সংশোধন হয়, তখন তা ছিল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। রাজ্য সরকারের সহযোগিতায় সেই প্রক্রিয়া যখন সম্পন্ন হয় তখন আজকের মতো ২৫ লক্ষ সহনাগরিককে এভাবে ভোটাধিকারহীন, প্রায় বেনাগরিক হয়ে যেতে হয়নি। কিন্তু এবার এই ঘটনা কেন ঘটল? কারণ এখনকার কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন বিগত সময়ের মতো আর কোনও নিরপেক্ষ সংস্থা নয়। তারা ভোট ময়দানে ঝান্ডা, প্রতীক নিয়ে এখনো নেমে পড়েননি, তবে তারা যে একটি দলের পায়ে তাদের নিরপেক্ষতা বিসর্জন দিয়েছেন তা আজকে নিতান্ত নাবালকেও বুঝতে পারছে। যেভাবে গোটা রাজ্যকে তারা ত্রস্ত করে একটি অবাধ নির্বাচন করতে চাইছেন, তাতে বেশ বোঝা যাচ্ছে যে তারা কেবল আর খেলাটির রেফারি নন, নিজেরাই খেলতে নেমে পড়েছেন। বাংলার দুর্ভাগ্য যে আজকে রাজ্যের শাসন ক্ষমতায় এমন একটি নীতিহীন দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক শক্তি বসে, যাদের না আছে নৈতিকতার জোর, না আছে সততার আত্মশ্লাঘা যা দিয়ে তারা এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে একটি নৈতিক ভাষ্য গড়ে তুলতে পারে। ফলে অবাধে চলছে বাঙালি ছাঁটাইয়ের কাজ। বাঙালি জনতাকে ঝেড়ে বেছে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার তল্পিবাহক করে তোলার কাজ জারি রয়েছে।
কেন এ রাজ্যেই এই সাধারণ প্রশাসনিক একটি প্রক্রিয়া এরকম নির্যাতনে পরিণত হল? লক্ষ্য করলে বোঝা যায় এর মূল কারণ দুটি। প্রথমত, গোটা প্রক্রিয়ার মূল চালিকাশক্তি, যা আদতে বিজেপির রাজনৈতিক দর্শনের সাথেই সম্পৃক্ত, পশ্চিমবঙ্গকে সন্দেহের চোখে দেখা। যেহেতু বাঙালির সাংস্কৃতিক প্রাচীরে 'হিন্দি, হিন্দু, হিন্দুস্থান'-এর রাজনৈতিক দর্শন বারবার খাটো হয়ে পড়ে, সুতরাং আগেই গোটা রাজ্যকে বিদেশী ধরে নাও। তারপর তাদের অভিযুক্ত করো। প্রমাণের দায় তাদের ওপরেই ঠেলে দাও। দ্বিতীয়ত, রাজ্যে বিরোধী শক্তি থেকে শাসক হয়ে ওঠার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে, যেখানে নির্বাচন কমিশন কার্যত রাজ্য প্রশাসনকে সরিয়ে রেখে গোটা প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেছে। ফল দাঁড়িয়েছে হাস্যকর। রাজ্যের আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক ইতিহাস সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা না থাকায় আমদানি করা হয়েছে 'যুক্তিগত অসঙ্গতি'র মতো একটি উদ্ভট ছাঁকনি। কিছু কাগুজে যুক্তি খাড়া করে মানুষের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এই 'যুক্তিগত অসঙ্গতি' আসলে কোথায়? মানুষের জীবনে, না কি প্রশাসনের কাগজে? একজন বৃদ্ধা যার জন্মের সনদ নেই, একজন শ্রমিক যার ঠিকানার প্রমাণ বারবার বদলেছে, তাদের জীবনের বাস্তবতাকে কি কাগজের সোজা রেখায় মাপা যায়? যদি না যায়, তাহলে সেই অমিলের দায় কার? নাগরিকের, না রাষ্ট্রের? আরও স্পষ্ট হয় বিষয়টা যখন দেখা যায়, কমিশন প্রথমে জানিয়েছিল ২০০২ সালের তালিকার সাথে যোগ প্রমাণিত হলে সমস্যা নেই। পরে সেই নিয়মই বদলে যায়। কেন? কারণ বাস্তব বলছিল, রাজ্যের মুসলমান জনতার বিপুল অংশই নিজেদের নাম ২০০২ সালের তালিকার সাথে যুক্ত করতে পেরেছেন। ফলে নিয়ম পাল্টাতে হল। বলা হল, যোগ আছে ভালো, কিন্তু এক বাবার পাঁচ সন্তান কেন? অতএব আবার প্রমাণ করো তুমি ভুয়ো নও।
এই যে বলা হচ্ছে ট্রাইব্যুনালের সামনে যাও, নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ কর - এ নতুন কিছু নয়। এই পথ আমরা আগেও দেখেছি। আসামে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি প্রক্রিয়ার পর একইভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের সামনে দাঁড় করানো হয়েছিল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চূড়ান্ত তালিকা থেকে প্রায় ১৯ লক্ষ মানুষ বাদ পড়েছিলেন। তাদের বলা হয়েছিল, প্রমাণ করুন আপনি এই দেশের নাগরিক। কিন্তু তারপর কী হল? তারা কি সহজে প্রমাণ করতে পেরেছিলেন? বাস্তব বলছে, সেই প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ধরে চলেছে। হাজার হাজার মানুষ নিজেদের জন্মভূমিতে থেকেই 'ডাউটফুল' তকমা নিয়ে বেঁচে আছেন। অনেকে কাগজের অভাবে হেরে গেছেন, অনেকে আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে পারেননি। কারও নাম একবার ঢুকেছে, আবার বাদ গেছে। পরিবার ভাগ হয়ে গেছে, একজন নাগরিক, অন্যজন সন্দেহভাজন। তাহলে আবার কেন এই পথ? আবার কেন একজন মানুষকে নিজের মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করতে হবে সে এখানকারই? রাষ্ট্র কি তার নাগরিককে চেনে না? নাকি ইচ্ছে করেই তাকে অচেনা করে দেওয়া হয়? নাগরিকত্ব তখন আর অধিকার থাকে না। তা হয়ে দাঁড়ায় এক অন্তহীন পরীক্ষার খাতা। যেখানে পাস করার দায়িত্ব শুধু নাগরিকের। রাষ্ট্রের নয়।
এই প্রক্রিয়া যখন প্রশ্নের মুখে, তখন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের ভূমিকাও সামনে আসে। আদালত নিজেই বলছে, ট্রাইব্যুনালগুলির সামনে প্রায় ৩৪ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছে। অথচ বাদ পড়ার সংখ্যা প্রায় ২৫ লক্ষ। তাহলে এই বাড়তি ৯ লক্ষ আবেদনকারী কারা? তারা কোথা থেকে এল? তারা কি এমন মানুষ, যাদের নাম আদৌ বাদ যায়নি, তবুও তারা নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে ছুটছেন? নাকি এই প্রক্রিয়া এমন এক সর্বব্যাপী সন্দেহের পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে বাদ পড়ার আগেই মানুষ নিজেকে অভিযুক্ত ধরে নিচ্ছে? এই সংখ্যার অমিল কি কেবল একটি পরিসংখ্যানগত ত্রুটি? নাকি এই অমিলের মধ্যেই লুকিয়ে আছে গোটা প্রক্রিয়ার প্রকৃত চরিত্র? যদি ২৫ লক্ষ মানুষ বাদ যায়, অথচ ৩৪ লক্ষ মানুষ ট্রাইব্যুনালের সামনে দাঁড়াতে বাধ্য হয়, তাহলে কি ধরে নেওয়া যায় না যে সন্দেহের পরিধি ঘোষিত সংখ্যার বাইরেও অনেক দূর বিস্তৃত? তাহলে কি তালিকা কেবল একটি বাহানা, আর প্রকৃত প্রক্রিয়া হল সন্দেহ ছড়িয়ে দেওয়া? এই জায়গাতেই আদালতের পর্যবেক্ষণ আরও বিস্ময়কর হয়ে ওঠে। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী নিজেই বলেছেন, কোনও কেন্দ্রে যদি ১০ শতাংশ নাম বাদ যায়, এবং জয় পরাজয়ের ব্যবধান তার থেকেও কম হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে। অর্থাৎ আদালত নিজেই স্বীকার করছে যে এই প্রক্রিয়া নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে। তাহলে সেই সম্ভাবনা জেনেও প্রক্রিয়াটি বন্ধ করা হল না কেন? কেন বলা হল যেমন চলছে চলুক, ট্রাইব্যুনালের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করা হবে না? আরও আশ্চর্যের বিষয়, একইসাথে বলা হচ্ছে একবার ভোট দিতে না পারলেও তেমন অসুবিধা নেই। এই বক্তব্য কি কেবল একটি মন্তব্য, নাকি তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক ভয়ঙ্কর উদাসীনতা? সংবিধান যেখানে নাগরিকের ভোটাধিকারের মধ্যেই তার রাজনৈতিক অস্তিত্বের স্বীকৃতি দেয়, সেখানে একজন নাগরিককে বলা হচ্ছে - একবার ভোট না দিলেও কিছু যায় আসে না! তাহলে কি ধরে নেওয়া হবে, নাগরিকের অধিকার এখন আর অবিচ্ছেদ্য নয়, তা এখন পরিস্থিতি অনুযায়ী স্থগিত করা যেতে পারে? তাহলে আদালত আসলে কী বলছে? একদিকে সম্ভাব্য অনিয়মের কথা স্বীকার করা হচ্ছে, অন্যদিকে সেই প্রক্রিয়াকেই চলতে দেওয়া হচ্ছে। এই দ্বৈত অবস্থান কি নিছক বিচারিক সংযম, নাকি তা সরাসরি স্ববিরোধিতা? এই স্ববিরোধিতা নাগরিক মননে সন্দেহের জন্ম দেয়। আদালতের নিরপেক্ষতা, যা কিনা জনমনে সর্বোচ্চ আসনে থাকে, তারই এহেন অবস্থান নাগরিককে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি সন্দিগ্ধ করে তোলে না? এই কি তবে আজকের ভারতের গণতন্ত্র, যা নিপীড়িতকে অধিকার দেয় না, বরং তাকে ছেঁটে ফেলে বিনা দ্বিধায়?
এদিকে আবার সামনে আসছে সংসদে জনপ্রতিনিধির সংখ্যা বৃদ্ধির প্রস্তাব। বলা হচ্ছে, জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে হবে। আসনসংখ্যা বাড়বে, গণতন্ত্র আরও বিস্তৃত হবে। কিন্তু একই সময়ে যদি লক্ষ লক্ষ মানুষ ভোটার তালিকার বাইরেই থেকে যান, তাহলে এই প্রতিনিধিত্ব কাদের জন্য? যে মানুষ তালিকাতেই নেই, সে কি প্রতিনিধিত্বের অংশ? নাকি প্রতিনিধিত্ব কেবল সংখ্যার হিসেব, মানুষের নয়? ভয় হয়, চিরতরে কি কেন্দ্রের সমালোচক জনতাকে প্রান্তিক বানানোর নকশা তৈরী হচ্ছে!
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ এবং একইসঙ্গে সবচেয়ে অস্বস্তিকর চিত্রটি ধরা পড়ে রাজনৈতিক দলগুলির আচরণে। কেন্দ্রীয় শাসকদল তাদের পরিচিত বয়ানেই এগোচ্ছে অনুপ্রবেশ, নাগরিকত্ব, ছাঁকনি। রাজ্যের শাসকদল তার বিরোধিতা করছে, কিন্তু সেই বিরোধিতা কি নীতিগত, না রাজনৈতিক? যে অতীতে নিজেই অনুপ্রবেশের প্রশ্ন তুলে দিল্লীর দ্বারস্থ হয়েছিল, সে আজ সেই অস্ত্রের শিকার হলে তার প্রতিবাদ কতটা বিশ্বাসযোগ্য? আর যারা নিজেদের বিকল্প বলে তুলে ধরে, তারা কোথায়? তারা এই ২৫ লক্ষ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে কতটা তীব্রতায়? তাদের জন্য কি আইনি সহায়তার কাঠামো গড়ে তুলেছে গোটা রাজ্যজুড়ে? তাদের জন্য কি রাস্তায় নেমেছে? না কি তারাও বুঝে নিয়েছে যারা আর ভোটার নয়, তারা আর রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়? যে ২৫ লক্ষ মানুষ আজ তালিকার বাইরে, তারা কার্যত আর ভোটার নন। ফলে তারা আর রাজনৈতিক অঙ্কের অংশ নন। তাদের নিয়ে সহানুভূতির ভাষণ শোনা যায়, কিন্তু তাদের জন্য সুসংগঠিত লড়াই দেখা যায় না। কারণ তারা আর নির্বাচনের ফলাফল বদলাতে পারবেন না। এই জায়গাতেই রাজনীতির আসল চেহারা ধরা পড়ে। নাগরিক তখন আর মানুষ থাকে না, সে হয়ে ওঠে একটি সংখ্যা। যে সংখ্যা ভোট দেয়, সে গুরুত্বপূর্ণ। যে দেয় না, সে অপ্রাসঙ্গিক। এই বাছাই কি কেবল ভোটার তালিকায় হচ্ছে, নাকি রাজনীতির মননেও একইভাবে চলছে? তাহলে প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় থাকে কি? রাজনীতি কি মানুষের জন্য, নাকি কেবল ক্ষমতায় বসার জন্য? যদি একজন মানুষ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক সত্তা হিসেবেও মুছে যায়, তাহলে সেই রাজনীতির নৈতিক ভিত্তি কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আমরা এখনও নাগরিক, নাকি কেবল নির্বাচনের অঙ্কে ব্যবহৃত কিছু সংখ্যা এর ওপর।