আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ সপ্তম সংখ্যা ● ১-১৫ এপ্রিল, ২০২৬ ● ১৬-৩০ চৈত্র, ১৪৩২
প্রবন্ধ
অমিয় কুমার বাগচী ও অর্থনৈতিক ইতিহাস চর্চা
সত্যজিৎ দাশগুপ্ত
।। এক ।।
উন্মুক্ত বৌদ্ধিকতায় সুপুষ্ট বাম-মনোভাবাপন্ন সমাজ ও রাজনৈতিক সচেতনতার সাথে অর্থনীতি এবং সমাজবিজ্ঞান প্রসূত পেশাদারী বিদ্যাচর্চার নিবিড় মেলবন্ধনে গড়ে উঠেছিল অধ্যাপক অমিয় কুমার বাগচীর বৈচিত্রপূর্ণ শিক্ষকতা ও গবেষণার জগৎ। আলোচ্য নিবন্ধ সংকলনে তাঁর এই বহুমুখী-বহুস্তরীয় কর্মকান্ডের আলোচনা ও বিচার-বিশ্লেষণ করেছেন তাঁরই সহকর্মী, গুণমুগ্ধ ছাত্রছাত্রী এবং বন্ধুরা।
১৯৮০ ও ১৯৯০ দুটি দশকে কলকাতার 'সেন্টার ফর স্টাডিস ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস'-এ আমার সৌভাগ্য হয়েছিল ওঁর সাথে বিদ্যাচর্চা ও নানান রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে বেশ খানিকটা মতবিনিময় করার। ১৯৮৩ - ১৯৯৫ সালের মধ্যে সেন্টারে মাঝেমধ্যেই ঘটত এই আদান-প্রদান এবং পরবর্তীতে কিঞ্চিৎ অনিয়মিত বা বলা ভালো কিছুটা বিক্ষিপ্তভাবেই ওঁর বাড়িতে বা কখনো-সখনো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আলিপুর ক্যাম্পাস-স্থিত আইডিএসকে'তে চালু থেকেছে আমাদের কথোপকথন। তাই বুক-রিভিউ-এর বহুল-ব্যবহৃত কাঠামো থেকে একটু সরে গিয়ে বলে নেব দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত কথা, বৌদ্ধিক বা বিদ্যাচর্চার সন্দর্ভে যার তাৎপর্য অবশ্যই এই পর্যালোচনায় সাযুজ্যহীন হবে না।
আমি ওঁকে বরাবরই অমিয়দা বলে সম্বোধন করেছি (এই পর্যালোচনার মূল পরিসরে প্রতিষ্ঠিত রীতি মেনে নিশ্চয়ই অধ্যাপক বাগচী বলেই উল্লেখ করব)। কলকাতার সেন্টারে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের তদারকিতে এবং অশোক সেন মশাইয়ের প্রভূত শলাপরামর্শে লেখা ঔপনিবেশিক শাসনের শেষ পর্বে কমিউনিস্ট পার্টি'র নেতৃত্বে সংগঠিত কৃষক আন্দোলন সংক্রান্ত আমার পিএইচডি থিসিসটি অমিয়দা প্রায় হপ্তাখানেক নিজের কাছে রেখেছিলেন। ফেরত দেবার সময় বলেছিলেন, "ঔপনিবেশিক লুঠতরাজ ও শোষণের রাজনৈতিক অর্থনীতির বিষয়ে ('political economy of colonial loot-plunder and exploitation') এবং 'orchestrated decapacitation of agricultural and industrial growth' (আমাকে সেই সময় প্রশ্ন করে বুঝে নিতে হয়েছিল দ্বিতীয় ব্যাপারটার অর্থ ও তাৎপর্য) নিয়ে তোমার থিসিস'এ তেমন চোখ-ঠিকরানো ('eye-hitting' কথাটা ব্যবহার করেছিলেন) কোনো বিশ্লেষণ পেলাম না... এটা হয়তো সেই আমলের বাম আন্দোলনেরই একটা বিশেষ খামতির দিক"। আরও বলেছিলেন, "তোমাদের পেশাদার ইতিহাস গবেষণায় তথ্যের পাহাড় জমিয়ে তোমরা ঘটনাক্রমের পুঙ্খানুপুঙ্খ দিন আর মাস-পঞ্জী সাজাও, কিন্তু সমাজ, রাষ্ট্র আর সমষ্টি-স্বার্থের অর্থনৈতিক ইতিহাসটা থেকে অনেকটা তফাতেই দাঁড়িয়ে থাকো"।
আমার পিএইচডি'র গবেষণায় অমিয়দার ক্ষুরধার বৌদ্ধিক উপদেশ ও পরামর্শ এমন একটা সময় পেয়েছিলাম যখন কলকাতার সেন্টারে মুক্তচিন্তা-জারিত বিদ্যাচর্চার এক সুপুষ্ট ঐতিহ্যে আমরা বেড়ে উঠছিলাম। মনে পড়ছে, গবেষণার নানান পরিসরে অতীত বা সমকালীন ঘটনাবলীর ঘাত-প্রতিঘাতের তথ্য সংগ্রহের কাজে আলোচ্য প্রক্রিয়াগুলিতে জুড়ে থেকেছে এমন মানুষজনের সাথে কথা বলার ব্যাপারে অমিয়দার কেমন একটা "রোমান্টিক অনুসন্ধিৎসা" লক্ষ্য করতাম। প্রশ্ন করতেন, তুমি কোথায় শুরু করবে আর কখন থামবে, তার হিসাব কর কী ভাবে? সতর্ক করে বলতেন, কথা বলার রাজনীতিটা কিন্তু 'political economy'র থেকেও জটিল একটা ব্যাপার হয়ে উঠতে পারে।
তিনটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অমিয়দার এই আগ্রহ - অনুসন্ধিৎসার সম্যক পরিচয় আমি এবং সেই সময়ে সেন্টারে আমার সহযোগী তরুণ গবেষকেরা পেয়েছিলাম। ১৯৮৫-৮৬'তে যখন আমরা সেন্টারের তদানীন্তন ডিরেক্টর অধ্যাপক সুরজিৎ সিনহার তদারকিতে বিখ্যাত শাহবানো খোরপোষ মামলা পরবর্তী সময়ে কলকাতার "রক্ষণশীল" মুসলমান সম্প্রদায়ের একটি অংশের মধ্যে তাদের নিজস্ব বয়ানে 'ধার্মিক' ধ্যান-ধারণার সামাজিক ও ব্যক্তিগত বৈশিষ্টগুলি চিহ্নিত করতে চাইছিলাম (আমাদের বিতর্কিত সূচনা প্রতিপাদ্যটি ছিল, "social and personal discourses of the devout muslims"), তখন অমিয়দা একদিন যদুনাথ ভবনের দোতালায় ওঁনার ঘরে (ডিরেক্টর হবার পরে বসতেন তেতলায় তখনকার সেমিনার হলের লাগোয়া পেছনের ঘরটাতে) ডেকে পাঠালেন আমাকে। তার দিনকয়েক আগে কলকাতার অ্যানথ্রোপোলজিক্যাল সোসাইটি'র বড় কনফারেন্স রুমে আমরা তিনমাসের এই সমীক্ষার ফলাফল নিয়ে সভা করেছি। ওঁর স্বভাবসিদ্ধ গাম্ভীর্যে বললেন, "একটা কাজে আটকে পড়ে তোমাদের সেমিনারে যেতে পারিনি, কিন্তু যা শুনলাম তাতে তো মনে হলো কাজটা 'highly political'... তোমরা রাজনীতি থেকে মুখ ফিরিয়ে থেকে এরকম একটা 'communally sensitive' ব্যাপারে এগোবে কী করে সেটাতো আমার বোধগম্য হচ্ছে না।" বলেছিলেন, "এই যে 'radical' উর্দু ডেইলির এডিটর কিংবা 'moderate' মুসলমান প্রকাশক কিংবা সম্পন্ন রাজনীতিবিদদের সাথে কথা বলছো, এদের তো নিজের নিজের 'deep-seated economic interests' থাকবে এবং তার প্রভাবেই কথাগুলো নানাভাবে আছন্ন থেকে যাবে... তাই এদের মুখের কথায় তো আন্দোলনের বাস্তবটা অনেকটাই ধামাচাপা পড়বে"।
ওঁর সমাজ বীক্ষায় আর্থ-রাজনৈতিক বিষয়গুলির প্রাধান্য একইভাবে প্রকট হতে দেখেছিলাম যখন অধ্যাপক অশোক সেনের তদারকিতে ঢাকুরিয়া ব্রিজের নীচে রেলপাড়ের বসতিতে আমি অসংগঠিত শ্রমিকের জীবন ও জীবিকার টুকরো-টুকরো ইতিবৃত্ত তৈরির কাজ হাতে নিয়েছিলাম। বলেছিলেন, "অশোকদার 'onlology of the social existence forms of unorganized labour' কিন্তু অনেকটাই জড়িয়ে থাকবে 'economic histories of such labour relations'র সাথে'... 'এখানে যে রাজনৈতিক যোগাযোগের উপর তোমরা ভরসা করেছো, সমস্যাটা সেখান থেকেই আসবে কারণ এই মানুষগুলো খুব ভালো করেই জানে তোমাদের কোন কথাগুলো পছন্দের হবে না"। 'মুখের কথায় ইতিহাস' বইটি সম্পাদনা করার সময়েও মাঝে মধ্যে ওঁর সাথে 'economics of orality' নিয়ে কথা হত ('value of orality' অর্থে - ethics / confidentiality / transactional implications and compensation, ইত্যাকার বিষয়ের সাথে মৌখিকতার মূল্য সংক্রান্ত পরিমাপ যেভাবে নির্ভরশীল থাকে - এই জাতীয় আলোচনার মধ্যে অমিয়দা যেভাবে প্রবেশ করতেন তা থেকেই বুঝতে পেরেছি বিবিধ শ্রমের মূল্য সমন্ধে বৃহদার্থে উনি কীভাবে আর্থিক হিসাব-নিকাশের পরিচিত বেড়াজাল অতিক্রম করে কাজ কারবারের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মধ্যে নিজের অবস্থানকে প্রোথিত করতেন। যশোধরাদি যখন এখানে মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন ছিলেন তখন আমি 'হিউমান রাইটস ল নেটওয়ার্ক'-এ কাজ করছি এবং তখন এদেশীয় রাষ্ট্র এবং আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থার অর্থানুকুল্যে চালানো মানবাধিকার সংক্রান্ত কাজকর্মের সমালোচনায় সরব হয়ে বলতেন যে সাধারণভাবে গরীব ও পিছিয়ে পড়া মানুষজনের অধিকার রক্ষার লড়াইটা স্পষ্টভাবেই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার এবং সেটা রাজনীতির ময়দানেই লড়তে হয়।
।। দুই ।।
অধ্যাপক বাগচীর সাথে আমার ব্যক্তি-চিন্তা ও গবেষণার যোগাযোগের উপরুক্ত নিতান্তই সংক্ষিপ্ত প্রাক-কথনের সূত্রেই এখন এই গ্রন্থ-পর্যালোচনার মূল অংশে প্রবেশ করবো। সংকলনটির ভূমিকায় গোড়াতেই সম্পাদকদ্বয় লিখেছেন - "আমরা চেয়েছিলাম অধ্যাপক বাগচীর অর্থনৈতিক ইতিহাস চর্চার দর্শন ও ধারাটিকে যথাযত উপলব্ধি করতে... আমরা জানতাম তিনি প্রসিদ্ধ অর্থনীতিবিদ, কিন্তু তাঁর অর্থনৈতিক ইতিহাস অনুসন্ধান কীভাবে ইতিহাসের বিচিত্র তথ্য এবং অর্থনীতি চর্চার তত্ত্বের টানাপোড়েনে গড়ে উঠেছে তার সুলুক সন্ধানই আমাদের বিশেষ নজর কেড়েছিল"। ভূমিকাটির শেষে দেওয়া হয়েছে অধ্যাপক বাগচীর লেখা 'সংস্কৃতি সমাজ অর্থনীতি' শীর্ষক গ্রন্থের থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি যার মধ্যেই আমরা পাবো তাঁর অর্থনৈতিক ইতিহাস চর্চার নিহিত নিদর্শন ও মৌলিক বিচারধারার কাঠামোটি এবং তৎসম্পর্কিত সমাজ ভাবনার একটি তীক্ষ্ণ নির্যাস - "ভারত ও সমগ্র বিশ্বের ইতিহাস হিংস্রতা, বর্ণবিদ্বেষ, শ্রেণিদ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হয়েই চলেছে। তার সঙ্গে চলছে প্রকৃতির ওপর অনিয়ন্ত্রিত আক্রমণ এবং প্রকৃতির প্রতিশোধ। এর থেকে শেষ পর্যন্ত মুক্তি সমাজাশ্রয়ী গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রই একমাত্র দিতে পারে"।
এই গ্রন্থের প্রথম চারটি অধ্যায়ে পাওয়া যাবে অধ্যাপক বাগচীর কয়েকটি নবপথ-দিশারী গ্রন্থের কুটবিশ্লেষণ এবং পঞ্চম ও শেষ অধ্যায়ে স্থান পেয়েছে ছয়টি বিশেষভাবে নির্বাচিত পরিশিষ্ট। প্রথম অধ্যায়ের আলোচিত বিষয়টি সন্দর্ভের নিরিখে বিশেষ মনোযোগ দাবি করবে কারণ এই পরিসরে ইতিহাস ও অর্থনীতির তিন সুপ্রতিষ্ঠিত শিক্ষক-গবেষক আলোকপাত করেছেন অধ্যাপক বাগচী কিভাবে "অর্থনৈতিক ইতিহাসের তাত্ত্বিক প্রশ্নের উত্তরের খোঁজে" নিরলসভাবে করে গিয়েছেন "ইতিহাসের তথ্যের অনুসন্ধান"। বিষয়-ভাবনা, বিশ্লেষণী অন্তর্দৃষ্টি ও ব্যবহৃত উপাদান-ঘনত্বের নিরিখে বিশারদেরা সবিশেষ গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন এমন কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশের একটি সংক্ষিপ্ত কালানুক্রমিক আলোচনায় অরুণ বন্দোপাধ্যায় অমিয়বাবুর 'অর্থনৈতিক চর্চার বিবর্তন' প্রসঙ্গে 'মানবিক উন্নয়ন' ও ধনতন্ত্রের বিকাশের টানাপোড়েনের' পৌনঃপুনিকতার উল্লেখ করেছেন। সংকলনটির অন্যতম সম্পাদকের ভূমিকায় তাঁর সমাপ্তিসূচক মন্তব্যটিও উল্লেখযোগ্য: "তাঁর (অধ্যাপক বাগচীর) অর্থনৈতিক ইতিহাসের নিজস্ব চর্চা, জীবনের নানা পর্বের ভাবনা ও স্বপ্নের এক মিশেল হিসেবে অর্থনৈতিক ইতিহাস চর্চার ধারা, বিবর্তন ও সম্ভাবনা নিয়ে যে অমিয়বাবু তা এই গ্রন্থের নানা প্রবন্ধে খানিকটা বিস্তৃত হয়ে আলোচিত হয়েছে। কতদূর সার্থক হয়েছে সে বিচার পাঠকের"।
অচিন চক্রবর্তী অমিয়বাবুর রচনাবলীর কয়েকটি মাইলফলকের আলোচনায় দেখতে চেয়েছেন কীভাবে তিনি 'গ্রামীণ এবং শহরাঞ্চলে বিভিন্ন ধরণের শ্রেণি চিহ্নিত করে তাদের বিচিত্র মিথষ্ক্রিয়াকে কেন্দ্রে রেখে বিশ্লেষণ এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন মার্ক্সীয় দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি অনুসরণ করে', যার মূল প্রতিপাদ্যটি ছিল 'পুঁজিবাদী ঔপনিবেশিক ব্যবস্থায় বাজার-বহির্ভূত দমন-পীড়ন'। চক্রবর্তীর মতে, অমিয়বাবুর 'বরাবরের আগ্রহের' ক্ষেত্রটি ছিল - একটি উন্নয়নশীল দেশে মিশ্র অৰ্থনৈতিক ব্যবস্থায় শিল্পায়নে রাষ্ট্রের ভূমিকা - এবং উপসংহারে তিনি বলেছেন, "অধ্যাপক বাগচীর সারা জীবনের সারস্বত সাধনার ফসল তাঁর ব্যাপ্তি ও বৈচিত্র নিয়ে আমাদের যেভাবে সমৃদ্ধ করতে পারে তার অতি সামান্যই হয়তো আমরা আত্মীকরণ করতে পেরেছি"। ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাস ও পুঁজিবাদের বিকাশ সম্পর্কে অধ্যাপক বাগচীর ভাবনার বিশ্লেষণে রাজেশ ভট্টাচার্য লিখেছেন, "বর্তমানে, যে তীব্রতায় ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, বাণিজ্য যুদ্ধ, প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত বিকাশ এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত তীব্র বেকারত্ব ও লাগামছাড়া আর্থিক বৈষম্য বেড়ে চলেছে, সর্বোপরি, উদারনৈতিক গণতন্ত্রের যে চরম রাজনৈতিক সংকট দেখা যাচ্ছে, তাতে গোটা বিশ্বজুড়েই একদিকে যেমন যুদ্ধের আশংকা বাড়ছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক নিশ্চয়তার সন্ধানে সমাজে নতুন অর্থনৈতিক-সামাজিক বিকল্পের সন্ধান জরুরি হয়ে পড়েছে। এই বিকল্পের অবিচল সন্ধান অমিয় বাগচীর চিন্তা-ভাবনা, লেখা-পত্রের এক অন্যতম বৈশিষ্ঠ্য"।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে ব্যাসদেব দাশগুপ্ত, অরূপ মিত্র এবং জয়ন্ত আচার্য অধ্যাপক বাগচীর গবেষণা জীবনের প্রারম্ভিক পর্বের সোনালী ফসল হিসেবে চিহ্নিত 'প্রাইভেট ইনভেস্টমেন্ট ইন ইন্ডিয়া, (১৯০০-১৯৩৯)' গ্রন্থটির ঐতিহাসিক গুরুত্বের কয়েকটি বিশেষ তাৎপর্যের আলোচনা করেছেন। দাশগুপ্তের মতে, অমিয়বাবু দেখিয়েছিলেন যে 'ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী সার্থরক্ষার নীতিসমূহের' কারণেই ওই সময়কালে ভারতে বৃহৎ শিল্পে বেসরকারি বিনিয়োগের দৈন্যদশা ঘটেছিলো এবং মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পের ক্ষেত্রেও তাদের স্বার্থরক্ষাকারী পৃথক কোনো রাজকোষ কিংবা আর্থিক নীতি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সৃষ্ট বা প্রণীত হয়নি। বর্ণবৈষম্যমূলক ঔপনিবেশিক শোষণ তাই পরাধীন ভারতে শিল্পের প্রসারকে তীব্রভাবে ব্যাহত করেছিল, অভ্যন্তরীণ বা বৈদেশিক চাহিদার অভাব কিংবা জমি, শ্রম বা পুঁজির জোগানে ঘাটতি না থাকা সত্ত্বেও। পরবর্তীতে ভারতের উদীয়মান নব শিল্পপতিগোষ্ঠীর ও পরিবর্তনশীল বিশ্ব অর্থব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান চাপের কাছে ব্রিটেনের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের নতিস্বীকার করা এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অগ্রগতির ফলে উচ্চকোটির ভারতীয় ব্যবসায়ীদের কিছু সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলেও, অধ্যাপক বাগচী দেখিয়েছিলেন যে ভারতীয় পুজিঁপতিগোষ্ঠীগুলি যে ক্ষুদ্রকায় ধনতন্ত্র গড়ে তুলেছিল তার ভিত্তি খুব একটা মজবুত ছিল না। অরূপ মিত্রের মতে, এই পরিস্থিতিতে সর্বাধিক 'জোরালো চ্যালেঞ্জ'টি এসেছিলো মুসলিম লীগের পৃথক জাতিরাষ্ট্র গঠনের দাবিটি থেকেই। জয়ন্ত আচার্যের বিশ্লেষণে, এই গ্রন্থে অমিয়বাবু কেইনসের জৈবশক্তি বা জৈব প্রবৃত্তির (animal spirit) সংক্রান্ত তত্ত্বটির সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে বিনিয়োগ ও উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদী শ্লথতার অবসান ঘটানোর প্রক্রিয়ায় ভারতের সমাজ বিন্যাসের চরিত্র অনুধাবন করার প্রয়োজনীয়তাকেই প্ৰাধান্য দিয়েছিলেন। 'Stunted Industrialization' শীর্ষক অধ্যায়টির কথা উল্লেখ করে আচার্য অভিমত প্রকাশ করেছেন যে কার্ল মার্ক্সের সমাজ বিকাশের তত্ত্ব আত্মস্থ করে অমিয়বাবু ভারতীয় সমাজ, ইতিহাস এবং সংস্কৃতির গভীরে প্রবেশ করে খুঁজে নিতে চেষ্টা করেছেন কেন বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হলেও শিল্প বিকাশের যাত্রা রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলো।
তৃতীয় অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে 'কলোনিয়ালিজম এন্ড ইন্ডিয়ান ইকোনমি' শীর্ষক গ্রন্থটি। উজ্জয়ন ভট্টাচার্যের 'ঔপনিবেশিক ভারতে অর্থনৈতিক ইতিহাস প্রসঙ্গে কিছু প্রশ্ন ও তথ্যের হাতছানি' প্রবন্ধে অভিমত প্রকাশ করা হয়েছে যে এই গ্রন্থে 'বিশ্ব ইতিহাস এবং ভারতের ইতিহাস সম্পর্কে যে দৃষ্টিভঙ্গি, বিচার এবং চিন্তার সূত্রগুলি অধ্যাপক বাগচী তুলে ধরেছেন তা যে কোনো মতাবলম্বী ঐতিহাসিকেরই প্রণিধানযোগ্য হবে। তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে ভট্টাচার্য তিনটি সূত্রের কথা উল্লেখ করেছেন, যেগুলি এই গ্রন্থটির তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তিটা প্রস্তুত করেছে বলে তিনি মনে করেছেন। প্রথমত, বিশ্ব ইতিহাসের ক্ষেত্রে মুখ্য বলে চিহ্নিত প্রবণতাগুলি দীর্ঘমেয়াদি এবং এই প্রবণতাগুলিই ধনতন্ত্র বিকাশের সাথে সাথে প্রথমে ঔপনিবেশিকতা এবং পরে সাম্রাজ্যবাদের বিকাশ ঘটায়। দ্বিতীয়ত, এই দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়াগুলিকে পর্যায়ক্রমে ভাগ করা যায়, যা শুরু হয়েছে বিশ্ব ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তরের মধ্যে দিয়ে। তৃতীয়ত, এই রূপান্তরের প্রক্রিয়ার সাথে সাথে এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশীয় অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর রূপান্তরের মাত্রা এতটাই এগোলো যে এই সব দেশ পূর্ণভাবে ধনতান্ত্রিক দেশগুলোর অধীনস্থ হল। ভট্টাচার্যর মতে, তিনটি কারণে এই গ্রন্থটি অবশ্যপাঠ্য বলে বিবেচিত হওয়া উচিত - এক, এই বিষয়টি বোঝার জন্যে যে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের একটা 'limit' (সীমা) আছে এবং যুক্তিকে যে কোনো প্রয়োজনে ব্যবহার করা যায়। যেমন করেছিলেন ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিকেরা আত্মপক্ষ সমর্থনে এবং তাই বাস্তবের কাছাকাছি আসার জন্যে ঐতিহাসিক জ্ঞান ও চেতনার প্রয়োজন হয়; দুই, ইতিহাসের ঘটনা বা নৃতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ কখনো বাস্তবকে নিজে থেকে বোধগম্য করে না। তার ব্যাখ্যার প্রয়োজন হয় এবং বস্তুগত জীবনের সঠিক বিশ্লেষণ দিতে পারলে অর্থশাস্ত্র সেই ব্যাখ্যা অবশ্যই দিতে পারবে; তিন, মানুষের জীবনে পরিবর্তন সম্বন্ধে যেকোনো ব্যাখ্যাই দেওয়া যায়। কিন্তু মুষ্টিমেয় মানুষের ধনবৃদ্ধি আর বেশিরভাগ মানুষের দারিদ্রকে একই ব্যাখ্যার আওতায় আনতে গেলে তা সমস্যার সৃষ্টি করবে এবং সেই কারণেই অধ্যাপক বাগচী সচেতনভাবে সঠিক ব্যাখ্যাটি খুঁজে বার করার উপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
গোর্কি চক্রবর্তী ঔপনিবেশিক ভারতের অর্থনীতি ও বাজার সংকট সংক্রান্ত পর্যালোচনায় লিখেছেন, অধ্যাপক বাগচী এই গ্রন্থটির বিভিন্ন অধ্যায়ে ভারতবর্ষের অনুন্নয়নের কারণানুসন্ধান করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে ঔপনিবেশিক অনুশাসনের কাছে নতিস্বীকার করানোর জন্যে অস্ত্রশস্ত্র ও সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বাজারমুখী ও বাজার-বহির্ভূত শক্তি প্রয়োগের ব্যাপারে উপনিবেশবাদের ভূমিকা ছিল অতীব প্রকট এবং এই দুটি শক্তির আন্তঃসম্পর্ক নিয়েও তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সুপ্রতিম দাস উপনিবেশ, সাম্রাজ্য ও অর্থনীতির পারস্পরিকতার পুনঃপাঠে মনোনিবেশ করে বলেছেন যে ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক শাসনের অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে প্রভূত তারিফ ও গুণকীর্তন লক্ষ্য করা গেলেও, ইত্যাকার বিষয় সংক্রান্ত অধ্যাপক বাগচীর গবেষণার ক্ষুরধার প্রাসঙ্গিকতা এখনো অনস্বীকার্য এবং তার পুনঃপাঠও একইভাবে জরুরি হয়ে আছে।
এই নিবন্ধটিকে আরও দীর্ঘায়িত করব না। তাই সংক্ষিপ্তাকারে অধ্যাপক বাগচীর গবেষণা জীবনের অন্তিম চরণে লেখা 'প্যারিলাস প্যাসেজ: ম্যানকাইন্ড এন্ড দি গ্লোবাল আসেনডেন্সি অফ ক্যাপিটাল' শীর্ষক গ্রন্থটির যে বিস্তারিত আলোচনা চতুর্থ অধ্যায়ে করা হয়েছে তার সারমর্মটুকুই এখানে তুলে ধরছি। গ্রন্থটি নিয়ে আলোচনায় শুভনীল চৌধুরী পুঁজির উত্থানের সাথে মানব কল্যাণের তাত্ত্বিক যোগসূত্রগুলির নানান প্রতিষ্ঠিত বিতর্কের মধ্যে প্রবেশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, বাজার তথা প্রতিষ্ঠানের জন্যে ইউরোপীয় পুঁজিবাদ শক্তিশালী হয়েছে বলে অমিয়বাবু মনে করেননি। তাঁর মতে, ইউরোপীয় পুঁজিবাদের উত্থানের ক্ষেত্রে যুদ্ধ, যুদ্ধের জন্যে সামরিক প্রযুক্তির উন্নতি, অ-ইউরোপীয় দেশের উপর আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে তাদের শ্রম এবং প্রাকৃতিক সম্পদের শোষণ নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছে এবং এই যুক্তিবিন্যাসের পথ ধরেই চৌধুরী মনে করেছেন যে অধ্যাপক বাগচী ছিলেন প্রকৃত অর্থেই 'জনগণের বুদ্ধিজীবী', যিনি ভারত তথা তৃতীয় বিশ্বের নিপীড়িত জনমণ্ডলীর স্বার্থেই নিজের গবেষণাকে নিরন্তর পরিণত করেছেন ধারালো প্রতিবাদী দলিলপত্রে।
জিনিয়া মুখার্জীর 'এক আকাঙ্ক্ষিত এনথ্রোপসিনের পথে 'প্যারিলাস প্যাসেজ এবং প্রাকৃতিক বিশ্বের পুঁজিবাদী রূপান্তর' তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণী দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছে অধ্যাপক বাগচীর পুঁজিবাদী ধংসলীলায় প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাহীন বিনষ্টিকরণ সংক্রান্ত বক্তব্যের দিকে। মুখার্জী 'পরিবেশকেন্দ্রিক বিপ্লবের' প্রয়োজনীয়তার প্রসঙ্গটিও উত্থাপন করেছেন অমিয়বাবুর অন্তর্দৃষ্টি ও ভাবধারাটিকে অনুসরণ করে। সীমন্তিনী মুখোপাধ্যায় অমিয়বাবুকে একজন 'স্বতন্ত্র অর্থনীতিবিদ' আখ্যা দিয়ে পরিশেষে বলেছেন, অমর্ত্য সেনের সক্ষমতার ধারণার সঙ্গে মার্ক্সীয় পলিটিকাল ইকোনমি যোগ করে অমিয়বাবু বিচ্ছিন্নতার ধারণাটির বিশ্লেষণী ধার কমানোর বদলে বাড়িয়ে দিয়েছেন। এই অধ্যায়ের সর্বশেষ লেখাটিতেও, কুমার রাণা'র "অমিয় বাগচীর বিশ্লেষণে উন্নয়নের 'বিধ্বংসী যাত্রা', প্যারিলাস প্যাসেজ'কে 'একটি দিক-পরিবর্তনকারী, গভীরভাবে গবেষণাধর্মী এবং নৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বই' বলেই চিহ্নিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, এই মৌলিক গ্রন্থটি "উন্নয়নকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে, যেখানে মানব কল্যাণ ও মানব দুর্দশাকে কেন্দ্রে রেখে যুদ্ধ, সাম্রাজ্য, বর্ণবৈষম্য ও বলপ্রয়োগকে প্রান্তিক টিকা নয় বরং কাহিনীর অবিচ্ছেদ্য অংশ করে তোলে... পশ্চিমী বিশ্ব কিভাবে শক্তিশালী হলো তা নয়, বরং বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের জন্য তার অর্থ কি দাঁড়ালো তা বোঝার জন্য, এবং এই অর্থকে প্রকৃত মানব উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাবার জন্য এই বই অপরিহার্য"।
গ্রন্থ-পর্যালোচনার কোনো নিবন্ধে উপসংহার লেখার কোনোই রীতি নেই। তৎসত্ত্বেও আমি অধ্যাপক বাগচীকে যেমন দেখেছি, ভাবনা-চিন্তায় আর কাজেকর্মে চেনাজানা বাক্সের বাইরে চলে যেতে অবলীলাক্রমে (মনে পড়ছে, কলকাতার সেন্টার-এর একটি Occasonal Paper'র শিরোনাম দিয়েছিলেন 'চোরের মা'র বড় গলা' (Mother of a Thief Has a Loud Voice), যতদূর মনে পড়ছে ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক বা আইএমএফ'র ওপরেই কিছু লিখেছিলেন ওই OP'টিতে)। সেই কথাটা মনে রেখে আমি এই পর্যালোচনা শেষ করছি ২০১৮ সালে লেখা ওঁরই একটি রিভিউ নিবন্ধের কথা উল্লেখ করে: What an Obsession with GDP Denotes, EPW, Vol-53, Issue No-35, September, 2018 (The World after GDP: Economics, Politics and International Relations in the Post-Growth Era by Lorenzo Fioramonti, Cambridge, UK and Malden, US: Polity Press, 2017; pp viii+276, £15.99 (pb)/£50 (hb); উনি শুরু করেছিলেন এইভাবে - Lorenzo Fioramonti's book is a well-grounded assault on the fetishism of international development agencies, governments, and run-of-the-mill economists - এই উক্তির মধ্যেই আমি অধ্যাপক অমিয় বাগচীকে তাঁর একান্তই স্বকীয়তায় পুষ্ট অপ্রাতিষ্ঠানিক স্বত্তায় পাই, ওঁকে যেমন দেখেছি খুব কাছ থেকে, অনুভব করেছি যাঁর প্রতিবাদী মননের উষ্ণতা।
পঞ্চম অধ্যায়ে সংযোজিত হয়েছে ছয়টি পরিশিষ্ট। প্রথমটি উনিশশো নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় প্রখ্যাত ঐতিহাসিক অমলেশ ত্রিপাঠির লেখা অমিয়বাবুর 'দি ইভোল্যুশন অফ দি স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া' শীর্ষক গ্রন্থটির পর্যালোচনা, যেখানে অমিয়বাবুর নেতৃত্বে পরিচালিত এই সুবিশাল দলগত প্রচেষ্টা প্রসূত ইতিহাসকে 'সাম্রাজ্যের স্বার্থ রক্ষা করা থেকে জনকল্যাণের আদর্শ অভিমুখে যাত্রা' করার প্রক্রিয়া বলে অভিহিত করা হয়েছিল। দ্বিতীয় পরিশিষ্টে জয়ন্ত আচার্য অমিয়বাবুর বেড়ে ওঠার পারিবারিক, সামাজিক ও বৌদ্ধিক বৈশিষ্ট্যগুলির নিরিখে ইতিবৃত্তায়িত করেছেন এক 'নাস্তিকের মানব স্বপ্ন'। তিনি তুলে ধরেছেন প্রায় ছয় দশকেরও অধিক সময়কালে বিস্তৃত এবং মার্ক্সবাদী তত্ত্ব ও অন্তর্দৃষ্টি-নির্ভর এক উদার ও গভীর বিদ্যাচর্চার কথা যেখানে 'কমোডিটি ফেটিশিজম-আশ্রয়ী সংকীর্ণ অর্থনৈতিক ইতিহাস রচনার বেড়াজাল ভেঙে চুরমার করে বলিষ্ঠ থেকে বলিষ্ঠতর জানমুখীনতায় ঋদ্ধ হয়ে অধ্যাপক বাগচীকে আমরা দেখতে পাই পাঁচ শতাব্দী দীর্ঘ সময়ের প্রেক্ষাপটে পেরিলাস প্যাসেজ'র মতো মানব উন্নয়ন ও দুর্গতির ইতিহাস রচনা করতে।
তৃতীয় ও চতুর্থ পরিশিষ্ট দুটিতে স্থান পেয়েছে দুটি স্মৃতিলেখ - অমিয়বাবুর সুদীর্ঘ কালের বন্ধু ও সহকর্মী অধ্যাপক প্রভাত পট্টনায়েক বিশ্লেষণ করেছেন কোন কোন বিশেষ কারণে অমিয়বাবুর প্রয়াণে আমাদের বৌদ্ধিক জগতের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বলে তিনি মনে করেছেন। অপর স্মৃতিলেখটিতে 'দি রিসার্চ ইউনিট ফর পলিটিকাল ইকোনমি (রূপে)'র তরফে বলা হয়েছে যে অধ্যাপক বাগচী মানব সংগ্রামের ওপরেই বিশেষ আস্থাবান ছিলেন।
পঞ্চম পরিশিষ্টে অমিয়বাবুর দীর্ঘকালের সহকর্মী ও ছাত্র, উত্তম ভট্টাচার্য, স্মৃতিচারণ করেছেন ওঁর মানবিকতা ও সমমর্মিতা-পুষ্ট পিএইচডি গবেষণার তদারক স্বত্তার এবং সেই সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন নাম ও গবেষণার বিষয় সম্বলিত পঁচিশজন গবেষকের একটি তালিকা, যাঁরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে যুক্ত থেকে অমিয়বাবুর তদারকিতে পিএইচডি'র কাজ সম্পন্ন করেছেন।
সর্বশেষ পরিশিষ্টে সঞ্জয় কর প্রস্তুত করেছেন ছয় দশকেরও অধিক সময় ধরে লিথিত ও সম্পাদিত অধ্যাপক বাগচীর বিপুল রচনা সম্ভারের একটি ছিমছাম রচনাপঞ্জী। বলাই বাহুল্য যে কাজটি অতীব শ্রমসাধ্য এবং সকল অর্থেই নিয়মানুসারী হয়েছে।
পরিশেষে সংকলনটি প্রকাশের কাজে আরো দুই সহযোগী কর্মীর কথা উল্লেখ করবো। লক্ষণীয় শৈল্পিক উৎকর্ষে প্রচ্ছদ ও প্রতিকৃতিটি করেছেন স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায় এবং বিশেষ সহায়কের ভূমিকাটি পালন করেছেন সায়ন্ত চ্যাটার্জী।
______________________________
অর্থনৈতিক ইতিহাস চর্চায় অমিয়কুমার বাগচী-র ভাবনা ও দর্শন
অরুণ বন্দোপাধ্যায় এবং রামকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত
প্রগতিশীল প্রকাশক, কলকাতা, ২০২৬
পৃষ্ঠা: ১৮৩
ISBN: 978-93-47420-82-5