আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ সপ্তম সংখ্যা ● ১-১৫ এপ্রিল, ২০২৬ ● ১৬-৩০ চৈত্র, ১৪৩২
প্রবন্ধ
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ?
গৌতম সরকার
মার্কিন-ইজরায়েলি যৌথ সামরিক অভিযানে ইরানের সুপ্রিম নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেইনির হত্যা কেবলমাত্র একজন রাষ্ট্রনেতার মৃত্যু নয়, এটি সমসাময়িক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। এর ক্ষতিকর প্রভাব অনুভূত হচ্ছে তেহরানের ক্ষমতার অলিন্দ থেকে ওয়াশিংটনের হোয়াইট হাউস পর্যন্ত, এবং এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতাবস্থাকে এক বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এরমধ্যে ইরান সরকার হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়ে আমেরিকাকে যে সমুচিত শিক্ষা দিতে চাইছে, তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে বিশ্ব-বাণিজ্য কার্যত অকেজো হয়ে ভয়াবহ মন্দা ও তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
২০২৪ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্টের মসনদে বসার পর থেকেই দাবি করে চলেছেন উনি সাত-দশটা যুদ্ধ বন্ধ করতে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন, যে কারণে ২০২৫ সালে নিজেই নিজেকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের প্রবল দাবিদার বলে প্রচার চালাচ্ছিলেন, তবে বিশ্ববাসীর জিজ্ঞাসা আদৌ তিনি যুদ্ধ থামাতে চাইছেন, নাকি যুদ্ধে ইন্ধন যোগাচ্ছেন! এটা বোঝার জন্য খুব বেশি বিজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই যে, ট্রাম্পের একমাত্র উদ্দেশ্য 'মেক আমেরিকা গ্রেট এগেন' বা 'আমেরিকা ফার্স্ট', আর সেটা সফল করতে গিয়ে মিত্র দেশগুলিকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও দায়দায়িত্ব রক্ষায় গাফিলতি থেকে যাচ্ছে, যেটা ইউক্রেন, তাইওয়ান এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলতে থাকা সহিংসতায় মার্কিনী ভূমিকার পর্যালোচনা করলেই স্পষ্ট বোঝা যায়।
এই মুহূর্তে উত্তপ্ত পশ্চিম এশিয়া, উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য। একটার পর একটা দেশ যুদ্ধ রাজনীতির শিকার হয়ে পড়ছে। তারই মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে শুরু করে পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কের তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সাবধানবাণী জনগণকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলেছে। গোটা বিশ্ববাসীর স্বার্থেই চলতে থাকা এইসব যুদ্ধ বন্ধ করা জরুরি। রাশিয়া-ইউক্রেন, কিংবা ইজরায়েল-ইরান আগ্রাসন এবং তার সাথে আমেরিকা ও চীনের নেপথ্য মদতে সন্ত্রাসের আগুন মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়লে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। এইসব যুদ্ধ ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশ্ব অর্থনীতি, সমাজনীতি, সর্বোপরি সাধারণ মানুষের জীবনে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংঘাতগুলি হল -
এক, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ:
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে এই যুদ্ধ চলছে, যদিও এই শুরুরও একটা শুরু ছিল। ২০১৪ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করে, তারপর থেকে এই দুই দেশের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। যুদ্ধের ফলে অসংখ্য মানুষের প্রাণ গেছে, ইউক্রেনের বেশ কিছু শহর রাশিয়ার সেনারা স্রেফ গুঁড়িয়ে দিয়েছে, আর দুই দেশেরই প্রভূত সম্পদ ধ্বংস হয়েছে। সম্প্রতি রাশিয়া নতুন উদ্যমে হাইপারসোনিক মিসাইলের মাধ্যমে হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছে।
দুই, প্যালেস্তাইন-ইজরায়েল যুদ্ধ:
এই দুই দেশের যুদ্ধ শুরু হয় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর। সেই সময় হামাসের আকস্মিক আক্রমণের পাল্টা হিসেবে ইজরায়েল পুরোদস্তুর সামরিক আক্রমণ শুরু করে। ২০২৪ সালে নভেম্বর মাসে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াধে অনুষ্ঠিত আরব ও মুসলিম দেশগুলোর একটি সম্মেলনে ‘অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি’র দাবি জানানো হয় এবং দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের গুরুত্বের উপর জোর দেওয়া হয়। এরপরও ইজরায়েল কোনোভাবেই তার অবস্থান বদলায়নি, ফলত একাধিক দেশ বস্তুগত ও লজিস্টিক সহায়তা বন্ধ করে দেওয়ায় গাজাতে চরম সংকট তৈরি হয়। অন্যদিকে তেহরান থেকে ইরানের হামাসদের নিয়মিত সাহায্য ও সহায়তাদান মধ্যপ্রাচ্যে চলতে থাকে এই যুদ্ধকে বহুপাক্ষিক যুদ্ধে পরিণত করেছে।
তিন, সুদান গৃহযুদ্ধ:
সুদান দেশটি এমনিতেই যুদ্ধপ্রবণ দেশ বলে খ্যাত। দশকের পর দশক ধরে চলতে থাকা সহিংসতা ২০২৩ সালের এপ্রিলে নয়া মোড় নিয়ে গৃহযুদ্ধে পর্যবসিত হয়। মিলিটারি সরকার ও প্যারা-মিলিটারি র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সের মধ্যে শান্তিচুক্তি ভঙ্গ দেশটিকে বিশৃঙ্খলতার চরম সীমায় পৌঁছে দেয়। বিশেষ করে রাজধানী খারটোম এবং দারফুর এলাকায় চলতে থাকা সন্ত্রাস লক্ষ লক্ষ মানুষকে গৃহহারা এবং অসংখ্য প্রাণহানি ঘটাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেয়। আন্তর্জাতিক স্তরের বহু শান্তি আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি, পরোক্ষে দেশটি সহিংসতা ও অনিশ্চয়তার কুম্ভিপাকে হাঁসফাঁস করছে।
চার, কঙ্গো যুদ্ধ ২০২৫:
গত বছরের শুরুতে এম-২৩ বিদ্রোহীরা রিপাবলিক অফ কঙ্গোর নর্থ কিভু প্রদেশের রাজধানী গোমা শহরের আশপাশে নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে বড় ধরনের আক্রমণ চালায়। এর ফলে বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করে এবং একসময় গোমা শহর সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা বিদ্রোহীদের দখলে চলে যায়। কঙ্গো সরকারের অভিযোগ, রুয়ান্ডা সরকার এই এম-২৩ বিদ্রোহীদের অস্ত্র ও সেনা দিয়ে সাহায্য করছে, যা দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি করে আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। গত জুলাই মাসে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি সাক্ষরিত হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতা কমেনি। সন্ত্রাসের বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ। তারা ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছে, জাতিসংঘ শান্তি মিশন বিভিন্নভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, তৎসত্ত্বেও কঙ্গোর নিরাপত্তা সাংঘাতিকভাবে বিপন্নতার সম্মুখীন হয়েছে।
পাঁচ, মায়ানমার সিভিল ওয়ার:
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মায়ানমারের মিলিটারি শক্তি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে গদিচ্যুত করার সঙ্গে সঙ্গে দেশটিতে ব্যাপক নৈরাজ্য ও অশান্তি শুরু হয়। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী এবং গণতন্ত্রকামী শক্তিগুলির প্রবল প্রতিরোধের কারণে সহিংসতার আগুন দিন দিন বাড়তে থাকে। এই সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকেই ওখানকার জুনটা সরকার এবং গণতন্ত্রপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে তীব্র গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যেই ৫০,০০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং বিপুল সংখ্যক বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ব্যাপক বিক্ষোভ ও সশস্ত্র প্রতিরোধের মধ্যে বিদ্রোহীবাহিনী মায়ানমারের অর্ধেকের বেশি ভূখণ্ডের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে।
ছয়, ২০২৫ ভারত-পাকিস্তান সংঘাত:
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণে ২৬ জন ভারতীয় পর্যটকের মৃত্যু ঘটলে দুই দেশের চলতে থাকা রাজনৈতিক তিক্ততা আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। পাকিস্তান অস্বীকার করলেও এই ঘটনার পিছনে পাকিস্তান সরকারপুষ্ট লস্কর-ই-তইবার হাত আছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। পাল্টা হিসেব মেটাতে মে মাসের সাত তারিখে ভারত সরকার 'অপারেশন সিন্দুর' অভিযান চালিয়ে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর এবং পাঞ্জাবের বেশ কয়েকটি মিলিটারি ক্যাম্প ধ্বংস করে দেয়। তারপর থেকে চলতে থাকে আক্রমণ-প্রতিআক্রমণের খেলা। ভারত রাফায়েল জেট, স্কাল্প মিসাইলস-এর মতো সামরিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করলে, পাকিস্তান 'FATAH-II' রকেট, ড্রোন সোয়ার্মস এবং সাইবার অ্যাটাকের সাহায্য নিয়ে পাল্টা আঘাত হানে। দুই দেশেই বেশ কিছু সামরিক ও অসামরিক মানুষের মৃত্যু ঘটে।
সাত, ইথিওপিয়ান সংঘর্ষ:
২০২০-২২ সময়কালে আবি আহমেদের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার এবং ইরিত্রিয়ার মদতপুষ্ট টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্টের মধ্যে লড়াই শুরু হয় এবং শীঘ্রই সেটি গৃহযুদ্ধের চেহারা নেয়। এই যুদ্ধের নিট ফল হল, হাজার হাজার নির্দোষ মানুষের মৃত্যু, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি এবং তীব্র মানবিক সংকট। ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে এক শান্তিচুক্তি সাক্ষরিত হয়, কিন্তু সেই চুক্তির শর্তগুলো বাস্তবসম্মত না হওয়ায়, চলতি বছরে নতুন করে ইথিওপিয়ায় যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে শুধু টাইগ্রে নয়, ওরোমো সংঘাত এবং ফানো বিদ্রোহের কারণেও ইথিওপিয়ায় সার্বিক অস্থিরতা দিনদিন বেড়েই চলেছে।
আট, মেক্সিকোর ড্রাগ সন্ত্রাস:
মেক্সিকোয় চলতে থাকা রাজনৈতিক সন্ত্রাসের মূলে আছে ক্ষমতা দখলের দ্বিমুখী লড়াই। একদিকে আছে একাধিক ড্রাগ কার্টেলস অর্থাৎ অবৈধ মাদক চোরাকারবারী সিন্ডিকেট এবং অন্যদিকে দেশের সরকার। ২০০৬ সালে মেক্সিকান সরকার এই সমস্ত ড্রাগ কার্টেলসের উপর সামরিক আক্রমণ চালালে সংঘাতের আগুন সারা দেশকে গ্রাস করে এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনহানি এবং দেশের নাগরিকদের মনে ভয় এবং অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে। ২০২৪ সালেও এই সংঘাতের তীব্রতা বিন্দুমাত্র কমেনি, সিনালোয়া এবং জালিস্ত নিউ জেনারেশন কার্টেলের মতো কিছু শক্তিশালী কার্টেলের মাদক পাচারের রুট নিয়ে লড়াই সংঘর্ষের আগুন আরও ছড়িয়ে পড়ছে। সরকারি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শান্তিপ্রচেষ্টা ড্রাগ মাফিয়াদের দৌরাত্ম্য কোনও অংশেই কমাতে সফল হয়নি, উল্টে দেশটিতে মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি, খুন, রাহাজানি, ধর্ষণ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
পৃথিবীব্যাপী চলতে থাকা এই সমস্ত যুদ্ধ, সন্ত্রাস ও সংঘাত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কা তীব্র করে তুলছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ন্যাটো জোটের সম্পৃক্ততা, সর্বোপরি সমস্ত বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাদাগিরি আর চীনের নীরব অথচ তীব্র উপস্থিতি পারমাণবিক যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করলে সেটা গোটা বিশ্ববাসীর জন্যই চরম উদ্বেগজনক হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে সহজেই বলা যায়, এবারেও প্রধান সামরিক শক্তিগুলো সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে বিশ্বজুড়ে এক ভয়াবহ আর্থিক বিপর্যয় নেমে আসবে।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আর কত দূরে?
যদিও সঠিক করে বলা সম্ভব নয় ঠিক কতদিন পর বা সত্যি করেই ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির জটিল বদল আমাদের বৃহত্তর সামরিক সংঘাতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে কিনা, তবে এটা অনস্বীকার্য যে গত কয়েক বছরে পৃথিবী জুড়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেছে যার পরিপ্রেক্ষিতে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে একটা শঙ্কা মানুষের মনে তৈরি হয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম হল,
এক, ইজরায়েল-প্যালেস্তাইন সংঘর্ষ এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত:
এই সংঘাত শুরু হয়েছে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, এখন এই ইজরায়েল-হামাস যুদ্ধ বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের রূপ নিয়েছে। এর প্রধান কারণ ইজরায়েলকে প্রদেয় মার্কিনী মদত আর অন্যদিকে ইরান ও তার মিত্রবাহিনীর সক্রিয় মদতে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের মিলিশিয়ারা একযোগে ইজরায়েল আর যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে চাইছে। ইজরায়েলের নিরাপত্তা রক্ষা করতে মার্কিনী সেনারা ফিলিস্তিনিয়দের সামরিক ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালাচ্ছে, অন্যদিকে ইরান সরাসরি ইজরায়েলকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এই প্রক্সি যুদ্ধ ধীরে ধীরে সত্যিকারের যুদ্ধের দিকে এক পা এক পা করে এগিয়ে যাচ্ছে।
দুই, বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব:
একটা সময় পর্যন্ত আমেরিকা ইউক্রেনের পাশে ছিল। তবে ২০২৫ সালে দুই দেশের প্রেসিডেন্টের মধ্যে সম্পর্ক শীতল হতে শুরু করে। এই প্রেক্ষিতে ইউক্রেনের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ পাশে দাঁড়িয়েছে। ইতিমধ্যেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউক্রেনের যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরগুলি পুনর্গঠনের জন্য ৪৫ বিলিয়ন ডলার সাহায্য পাঠিয়েছে, জার্মান এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমস (IRIS-T) এবং প্রচুর সামরিক অস্ত্রশস্ত্রের যোগান সুনিশ্চিত করেছে। একইসাথে রাশিয়াকে ক্রমশ শক্তিহীন করার নিমিত্তে স্মার্ট স্যাংশনের মধ্য দিয়ে রাশিয়ার যুদ্ধাস্ত্রকে নিষ্ক্রিয় করা, তেল, গ্যাস ও ব্যাঙ্কিং খাত এবং প্রযুক্তি রফতানির ওপর নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞা জারি শুরু হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প চাইছেন, আলোচনার টেবিলে বসে দুই দেশ দ্রুত যুদ্ধাবসানের সিদ্ধান্ত নিক, এটি পশ্চিমা মিত্রদের সাথে মার্কিন কৌশলের পার্থক্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আশঙ্কার কথা একটি দ্বিপাক্ষিক যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে কৌশলগত ফারাক এই সংঘাতের পরিসর বাড়তে বাড়তে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে পর্যবসিত হবে না তো!
তিন, ন্যাটোর ভূমিকা:
এই মুহূর্তে ন্যাটো ইউক্রেনকে যে সামরিক সাহায্য প্রদান করছে সেটা যেমন জরুরি, তেমনই তাদের এই কার্যকলাপ আগামীদিনে সহিংসতার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেবে না সেটাও জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। বলাবাহুল্য, ন্যাটোর এই সরাসরি জড়িয়ে পড়া রাশিয়া ভালোভাবে নিচ্ছে না, ফলে আগামী দিনে এই সংঘাত আরও বড় সংঘর্ষ তথা যুদ্ধে পৌঁছে গেলে এবং সেই যুদ্ধে রাশিয়ার ইউরোপীয় মিত্রবাহিনী জড়িয়ে পড়লে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধকে আর আটকে রাখা যাবে না।
চার, চীন বনাম মার্কিনী লড়াই:
দিনদিন চীনের শক্তিবৃদ্ধি আমেরিকার উদ্বেগ ও অস্বস্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে, এবং একইসঙ্গে বিশ্ব মানচিত্রে ক্ষমতার সমীকরণের বদল ঘটছে। বিশ্বের সর্বোচ্চ শক্তিধর দুই দেশের বিবাদ ও মতপার্থক্য যত বাড়ছে বৈশ্বিক স্থায়িত্ব তত বেশি টলমলে হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। তাই আগামীদিনে যদি সত্যিই বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, আর এই দুই দেশ বিবদমান দুই পক্ষ নেয় তাহলে পরমাণু যুদ্ধ এড়াতে পারা যাবে কি? আর সেই যুদ্ধের ভয়ংকর পরিণতি কি হতে পারে সেটা ভাবলে আতঙ্কিত হতে হয়।
যদি যুদ্ধ লাগে তবে কে কার পক্ষ নেবে?
যুদ্ধ যদি সত্যি লেগেই যায় তাহলে বিশ্বব্যাপী এক জটিল মেরুকরণ ঘটবে। আর বিশ্বের বিভিন্ন শক্তির মধ্যে এই আঁতাত তৈরি হবে সার্বিক পরিস্থিতি, স্বার্থ ও নিরাপত্তার মাপকাঠিতে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষিত সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি জোটের নাম উঠে আসে -
এক, আমেরিকা ও জোটসঙ্গী:
ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে আমেরিকা তার সুপার পাওয়ার স্টেটাস আর সামরিক শক্তির নিরিখে ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। তাদের সম্ভাব্য জোটসঙ্গী হতে পারে সেইসব ন্যাটো সদস্য, যারা মূলত রাশিয়ার নিকটসঙ্গী বলে পরিচিত। এছাড়া জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং ফিলিপিন্সের মতো এশিয়া প্যাসিফিক দেশগুলোও সেই জোটে অংশ নিতে পারে। রাশিয়া ও চীনের সাম্প্রতিক সামরিক উত্থানের নেপথ্যে মার্কিন সরকারের সাথে অন্যান্য দেশের এই জোট কৌশলগত স্বার্থ, পারস্পরিক প্রতিরক্ষা অঙ্গীকারের উপর নির্ভর করবে।
দুই, রাশিয়া এবং সম্ভাব্য মিত্রবাহিনী:
ইউক্রেনের সাথে চলতে থাকা যুদ্ধ এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমা দেশগুলির সাথে সংঘাত এই মুহূর্তে রাশিয়াকে অন্যতম প্রধান খেলোয়াড় করে তুলেছে। বৃহত্তর সংঘর্ষকালে চীন যদি এই দেশটির সাথে হাত মেলায় তাহলে আন্তর্জাতিক ক্ষমতার দিকবদল ঘটবে বলাই বাহুল্য।
চীন, যখন একক, একমেবাদ্বিতীয়ম:
দিনদিন বেড়ে চলা অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি, তাইওয়ানের ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের কৌশলগত অবস্থান এবং দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের আধিপত্য দেশটিকে শিকারী হাঙরের সাথে তুলনা করা হচ্ছে। চীনের এই আগ্রাসন নীতি, ক্ষমতার দম্ভ এবং তাইওয়ান প্রসঙ্গে তাদের অবস্থান আগামীদিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের জোটসঙ্গীদের সাথে বৃহত্তর সামরিক সংঘাতে অবতীর্ণ করতে পারে। কে বলতে পারে, সেই সংঘাতই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেহারা নিয়ে সামগ্রিক বিশ্বের নিরাপত্তাকে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দেবে না!
চার, উত্তর কোরিয়া, লাস্ট বাট নট দ্য লিস্ট:
এই প্রসঙ্গে উত্তর কোরিয়ার ভূমিকা হালকা করে দেখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। এই দেশটিকে রেমোরা মাছের সাথে তুলনা করা হচ্ছে, যে মাছ হাঙরের সাথে একজোট হলে ভয়ংকর ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। বলাই বাহুল্য এখানে হাঙরের ভূমিকা পালন করছে স্বয়ং চীন। উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে চীনের কাছ থেকে আর্থিক, বাণিজ্যিক এবং কূটনৈতিক সহযোগিতা পেয়ে আসছে। তাই প্রধান খেলোয়াড়দের অন্যতম না হলেও উত্তর কোরিয়া তার সামরিক সম্ভার এবং খেয়ালখুশি আচরণের মধ্যে দিয়ে স্থানীয় রাজনীতিতে নৈরাজ্য ও অচলাবস্থা সৃষ্টি করার ক্ষমতা ধরে।
যদিও এইসব জোটের ভবিষ্যতবাণী খুবই জটিল, কারণ রাজনৈতিক জোট চিরকালই অস্থির ও পরিবর্তনশীল। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সম্পর্কগুলো ভূ রাজনৈতিক স্বার্থ, পারস্পরিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং অন্যান্য অদৃশ্য শক্তির উপর নির্ভর করে। আন্দাজ বা ভবিষ্যতবাণী কোনোটাই চরম নয়, সবটাই আপেক্ষিক, তাই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে সত্যি করে কী হবে, কে কার সাথে হাত মেলাবে সেটা সময়ই বলবে। তবে যেটি নিশ্চিত করে বলা যায় সেটি হল এই যুদ্ধ সত্যি ঘটলে এই গ্রহের চরম সর্বনাশ ঘটবে। আপামর বিশ্ববাসী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। চলুন সেই হিসেবটা দেখে নেওয়া যাক।
জনজীবনে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব
এক, ধ্বংস ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল আজকের মূল্যে ৪ ট্রিলিয়ন ডলার। যদি আগামী দিনে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংগঠিত হয় তাহলে ধ্বংসের ঘাত ও আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বেশ কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। আধুনিক যুদ্ধ হবে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র প্রয়োগ করে, তার সাথে যোগ হবে সাইবার আক্রমণ ও বায়োলজিক্যাল এজেন্টসের প্রয়োগ। এসবের ক্ষতিকর প্রভাব শুধুমাত্র প্রাণহানির মধ্যে আটকে থাকবে না, বর্তমানে বিশ্বায়নের যুগে পারস্পরিক নির্ভরতা (খাদ্য, শক্তি, প্রযুক্তি, অর্থ) সাঙ্ঘাতিক সংকটের সম্মুখীন হবে।
দুই, জ্বালানি ও অন্যান্য দ্রব্যের দামবৃদ্ধি:
যুদ্ধ মানেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির অন্তর্ভুক্তি, এবং তার অবশ্যম্ভাবী ফল হল তেলের দাম বৃদ্ধি। যেহেতু জ্বালানি তেল ও গ্যাস যেকোনো উৎপাদনে অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে কাজ করে, তাই তেলের দাম বৃদ্ধির অর্থই হল শৃঙ্খল প্রতিক্রিয়ায় সমস্ত দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি। তাই যুদ্ধের সাথে মুদ্রাস্ফীতি সমার্থক হয়ে উঠেছে।
তিন, যোগান ও চাহিদার ভারসাম্যহীনতা:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্যাপক যোগান সংকট তৈরি হয়। এই সংকটের প্রধান কারণগুলি ছিল বিভিন্ন দেশে সমুদ্রপথ ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা আর উৎপাদনের বেশিরভাগটাই যুদ্ধের প্রয়োজনে ব্যবহার। ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনে অভাব ও সংকট তৈরি হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে বিশ্বায়ন ও উদারীকরণ ছিল না, দেশগুলোও ছিল অনেকটাই স্বনির্ভর, তাই যুদ্ধকালীন সময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বেশিরভাগ দেশই সংকটের মাত্রা একটা সীমার মধ্যে ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছিল। তবে আজকের যুগে যখন বিশ্ব একটা 'গ্লোবাল ভিলেজে' পরিণত হয়েছে, তখন এই যোগান শৃঙ্খলের কোনও একটি যোগসূত্র ছিন্ন হয়ে গেলে তামাম বিশ্ব অর্থনীতি স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে সেমিকন্ডাক্টরের কথা ভাবা যেতে পারে। এর উৎপাদন নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশে সীমাবদ্ধ, যেমন, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া। এখন যুদ্ধের কারণে যোগান অনিশ্চিত হয়ে পড়লে সারা বিশ্বে প্রযুক্তি উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে যাবে।
চার, হাইপারইনফ্লেশন ও মুদ্রার অবমূল্যায়ন:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরেই ব্যাপক হারে মুদ্রাস্ফীতি সামগ্রিক অর্থনীতিকে গ্রাস করে। এই উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির মূল কারণ ছিল, অত্যধিক সরকারি ব্যয়, দ্রব্য ও সেবার অপ্রতুলতা এবং দেশীয় মুদ্রার উপর জনগণের আস্থা হ্রাস। অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলির অভিজ্ঞতা এই তথ্যকে প্রতিষ্ঠা করে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সাম্প্রতিক পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ এই হাইপারইনফ্লেশনের মাত্রাকে আরও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেবে। এছাড়া পরিকাঠামোর ধ্বংসযজ্ঞ, ব্যাপক মানুষের বাস্তুচ্যুতি, আর্থিক কাঠামোর সম্ভাব্য ধস সাধারণ মানুষের মনে আন্তর্জাতিক বিনিময় মুদ্রার উপর ভরসা নষ্ট করে দিতে পারে। এই সুযোগে ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং পণ্যসঞ্চয় বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠবে। এটি সাময়িকভাবে জনগণকে আর্থিক নিরাপত্তার আশ্বাস যোগালেও আগামীদিনে আর্থিক পরিকাঠামোকে ভঙ্গুর ও অস্থির করে তুলবে।
পাঁচ, আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থায় রদবদল:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতা দিতে ১৯৪৪ সালে ব্রেটন উডস চুক্তির মাধ্যমে মার্কিন ডলারকে প্রধান বিশ্ব রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বিশ্বব্যাপী যুদ্ধপরবর্তী সংস্কারকার্য চালানোর জন্য একটি স্থিতিশীল মুদ্রা খুবই জরুরি ছিল। সেইসময় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে বেশি সোনা মজুত ছিল, স্বভাবতই এই ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমেরিকার প্রভাব বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেয়। তবে যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংগঠিত হয়, তাহলে এতদিনকার ডলার চালিত আর্থিক ব্যবস্থা হোঁচট খেতে পারে। ইতিমধ্যেই মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এড়াতে এবং নিজেদের মুদ্রাকে শক্তিশালী করতে রাশিয়া, চীন, ভারত, ইরান, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা এবং সি.আই.এস. ভুক্ত (সাবেক সোভিয়েত) দেশগুলি ডলারের পরিবর্তে নিজেদের মুদ্রায় ব্যবসা করছে। ব্রিকসের মতো বিকল্প পাওয়ারব্লকগুলির উত্থান এবং বহুমেরু আর্থিক পদ্ধতির সমর্থন বিশ্বব্যাপী এক নতুন আর্থিক পরিকাঠামো গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর ফলে আর্থিক কাঠামো ক্রমশ আঞ্চলিক বা ডিজিটাল মুদ্রাব্যবস্থা, বা পণ্য বিনিময় মুদ্রাব্যবস্থায় পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে। আর এই আশঙ্কায় সিঁদুরে মেঘ দেখছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাম্প্রতিক মার্কিন সরকারের ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেফতার তার অন্যতম উদাহরণ। ২০১৮ সালে মাদুরো ঘোষণা করেছিলেন, তিনি নিজের দেশকে ডলার বাণিজ্য থেকে মুক্ত করতে চান। সেইমতো ইউয়ান, ইউরো, রুবলে নিজেদের তেল বিক্রি করতে শুরু করেছিল, আর SWIFT-কে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে চিনের সঙ্গে সরাসরি পেমেন্ট চ্যানেল তৈরি করেছে।
ছয়, দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক ও সামাজিক পুনরুত্থান:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা বলছে যুদ্ধপরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলিকে দীর্ঘকালীন আর্থিক কষ্ট, অত্যধিক ঋণের বোঝা, এবং সামাজিক অস্থিরতার পর্ব পেরিয়ে যেতে হয়। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিণতি হতে পারে আরও ভয়ংকর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের দেশগুলো কিছু সুবিধা (মার্শাল প্ল্যান) পেলেও সোভিয়েত ব্লকের অন্তর্গত অঞ্চলগুলোকে প্রচুর সংগ্রাম করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে হয়েছিল। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কিন্তু কাউকে রেহাই দেবে না। পাহাড় প্রমাণ ঋণের ভার, ধ্বংসের ব্যাপকতা, এবং সম্ভাব্য আবহাওয়াগত পরিবর্তন সার্বিক বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিতে স্থায়ী প্রভাব ফেলবে। এছাড়াও বাস্তুচ্যুতি, দারিদ্র্য, অনাহার এবং সর্বোপরি মানসিক এবং সাংস্কৃতিক ক্ষত মানবজীবনে ক্ষতিকর প্রভাব বয়ে আনবে।
সাত, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশে প্রভাব:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তামাম বিশ্ব বন উজাড়, দূষণ এবং মানব অভ্যাসের অবনতি প্রত্যক্ষ করেছে। তবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব হবে আরও বিপর্যয়কর কারণ এই যুদ্ধে পারমাণবিক, রাসায়নিক এবং বায়োলজিক্যাল অস্ত্র ব্যবহৃত হবে। এইসব অস্ত্র প্রয়োগের দীর্ঘকালীন প্রভাবে সারা বিশ্বে খাদ্য ও জলের অভাব প্রকট হবে, ব্যাপক হারে অভিবাসীর সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটবে। এইসব ক্ষতি পূরণ করতে যে আর্থিক সক্ষমতা দরকার সেটা বেশিরভাগ দেশেরই নেই। অর্থনীতিবিদদের মতে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটা মানে বিশ্ব অর্থনীতির আবার একশো বছর পিছিয়ে যাওয়া।
পরিশেষে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে কিছু অনুমান করা সত্যিই কঠিন। বর্তমান সময়ের অর্থনীতি, রাজনীতি সবকিছুরই এতগুলো অভিমুখ আছে যে কোন ঘটনা কোন কোন অভিমুখকে কত ডিগ্রি কোণে কোনদিকে ঘুরিয়ে দেয় সেটা আন্দাজ করা খুব শক্ত। রাজনীতি, সমাজনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সর্বোপরি দেশগুলির নিরাপত্তা বিষয়ক কৌশলগত অবস্থান নির্দিষ্ট করে দেবে যুদ্ধের অভিমুখ ও দিকবদল। সত্যি কী হবে তা সময়ই বলে দেবে। আমরা শুধু সম্মিলিতভাবে প্রার্থনা করতে পারি -
"অনেক হয়েছে রক্তপাত, আর নয়,
ভেঙে ফেলো যুদ্ধের সব হিংস্র পরাজয়।
নিভে যাক কামানের গর্জন, বারুদের ধোঁয়া,
সবুজ ধরণী পাক শান্তিময় ভালবাসার ছোঁয়া।
যুদ্ধ তো শুধু শ্মশান বোঝে, ধ্বংসের গান গায়,
শান্তি আসুক, প্রেম আসুক, এই কামনায়।
আলোর পথে চলি সবাই, আঁধার কেটে যাক,
যুদ্ধ নয়, শান্তির নীড়ে পৃথিবী জেগে থাক।"
(কবি অজানা)