আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ সপ্তম সংখ্যা ● ১-১৫ এপ্রিল, ২০২৬ ● ১৬-৩০ চৈত্র, ১৪৩২

প্রবন্ধ

কামাল কিয়া গলগোটিয়া!

রঞ্জন রায়


কী ঘটেছিল?

দিল্লির ভারত মন্ডপম্‌ ক্যাম্পাসে ভারত সরকারের পাঁচ দিনের বিশ্বস্তরীয় 'আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইম্প্যাক্ট সামিট' গত ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে শেষ হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবের জারি বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা গেল তাতে ১১৮টি দেশের ২০ জন সরকারের শীর্ষস্থ নেতা ও বাকিদের সরকারি প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেছেন। ভারত সরকারের ইলেক্ট্রনিক্স ও ইনফরমেশন টেকনলজি মন্ত্রক এর আয়োজক। এখানে আমন্ত্রিত ছিলেন ১০০+ গ্লোবাল এ.আই. প্রমুখ, সিইও এবং ৫০০ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ।

তবে শুরুতেই বেসুর বাজলো। কী-নোট অ্যাড্রেসের আমন্ত্রিত বক্তা ছিলেন বিল গেটস। কিন্তু এপস্টিন যৌন কেলেংকারিতে নাম জুড়ে যাওয়ার ফলে তিনি এলেন না।

এ.আই. নিয়ে এত বড়ো বিশ্বসম্মেলন আগে কখনও হয়নি। নিঃসন্দেহে এটি ছিল আমাদের গর্বের বিষয়।

আশা ছিল, এতে ভারতে 'কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা' নিয়ে যত কাজ হচ্ছে, নতুন চিন্তাভাবনা হচ্ছে তার পরিচয় বিশ্বের দরবারে পেশ করা হবে। অনেক গবেষক তাঁদের মডেল নিয়ে এসেছিলেন। ছিল জনসাধারণের অসুখ হলে তাড়াতাড়ি ল্যাব টেস্ট এবং সাত আটটি ভারতীয় ভাষায় দ্রুত পড়া যায় এমনভাবে প্রেস্ক্রিপশন তৈরির কৃৎকৌশল, ভারতে কৃষি উৎপাদনে সেচ, সার, বীজ, কীটের সমস্যার সহজ সমাধান যা সময় এবং কৃষকের খরচ বাঁচাতে সক্ষম। কিন্তু এরা প্রচারের আলোক পায়নি। সরকার ও মিডিয়া থেকে তুলে ধরা হল গলগোটিয়া বলে এক ভুঁইফোড় ইউনিভারসিটির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে রিসার্চ ও আবিষ্কারের গল্প। ফল হল আত্মঘাতী। এদের এ.আই. টেকনোলজিতে ৩৫০+ কোটি টাকা বিনিয়োগের কথা বারবার করে বলা হল, কিন্তু কাজের ও আবিষ্কারের নমুনা?

প্রদর্শনীতে যা দেখানো হল তাতে মনে হয় এদের চোখে এ.আই. টেকনোলজি একটা আধুনিক বিনোদন বা খেলনামাত্র - একটি রোবো কুকুর যে নাচে, লাফায় এবং একটি ড্রোন যে ফুটবল খেলে আর একটি বিমানের মডেল। ভীড় মজা পেল। ওদের অধ্যাপিকা নেহা মিডিয়ার সামনে জোর গলায় বললেন - এগুলোর ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন থেকে শুরু করে সবকিছু আমাদের রিসার্চের ফল। আমরা এ.আই.-তে ৩৫০+ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে যাচ্ছি।

কিন্তু কয়েক ঘন্টার মধ্যে প্রচারের বেলুন ফেটে গেল। অনেকেই চিনে ফেলল, 'ওডিয়ন' লেবেল সাঁটা রোবো কুকুর আসলে চীন দেশের কোম্পানি 'ইউনিট্রি রোবোটিকস-এর তৈরি, মডেল Unitree Go2, যা এদেশে অনলাইনে তিন লাখ টাকার সামান্য কম দামে যে কেউ কিনতে পারে।

খানিকক্ষণ পরে জানা গেল সকার ড্রোনটি কোরিয়ার। ওদের তৈরি বলতে প্লাই ও কাগজ সাঁটা একটি জেট প্লেনের মডেল - যা প্রাইমারি স্কুলের বিজ্ঞান প্রদর্শনীতে দেখা যায়!

তবে দূরদর্শনের সাংবাদিকের প্রশ্ন শুনে একটি ছাত্রী সত্যি কথাটা বলে দেয় - ওটা ডিপার্টমেন্ট আমাদের দিয়েছে শেখার জন্য।

ধরা পড়ে নেহা প্রথমে বললেন - তারা নাকি কখনোই বলেননি যে ওগুলো গলগোটিয়ায় তৈরি। তারা ওটা কিনেছেন বিদ্যার্থীদের শেখাবার জন্যে। অথচ সারা দুনিয়া দেখেছে ভিডিও। চীন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ইংরেজি সংবাদমাধ্যম 'গ্লোবাল টাইমস্‌' থেকে শুরু করে 'বিবিসি' সমেত বিশ্বের বিভিন্ন মিডিয়া এই স্ক্যান্ডালের কথা প্রচার করে চলেছে।

আন্তর্জাতিক মিডিয়ার ফোকাস ভারতের এ.আই.-এর প্রগতির খবর থেকে সরে গিয়ে দুটো বিন্দুতে আটকে গেছে -

এক,
বিশ্ব এ.আই. সম্মেলনে ডিজিটাল পেমেন্টের বদলে নগদ পেমেন্ট! প্রশাসনিক অব্যবস্থার ফলে ডেলিগেটদের হয়রানি - যেমন কয়েক কিলোমিটার পায়ে হাঁটতে বাধ্য হওয়া।

এ'নিয়ে ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী প্রেসের সামনে 'দুঃখপ্রকাশ' করে "সরি" বললেন। তবে নারায়ণমূর্তির জামাই ও ব্রিটেনের পূর্ব প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনকের গলায় ব্যঙ্গ - এ.আই. অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারলেও দিল্লির যানজটের সমাধান করতে পারবে না!

দুই,
চীনের রোবো ডগের গায়ে 'ওডিয়ন' লেবেল সাঁটিয়ে গলগোটিয়ায় তৈরি বলে প্রচার করা! কোরিয়ায় তৈরি সকার ড্রোনের গল্পও বাদ গেল না। শেষে সন্ধ্যের মধ্যে গলগোটিয়া স্টলের বিজলি বন্ধ করে ওদের তাড়িয়ে দেওয়া হল। মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব নিজের টুইটার হ্যান্ডল থেকে রোবো ডগের প্রশস্তি মুছে দিলেন।

আর ইউনি ম্যানেজমেন্ট সব দোষ ওই অধ্যাপিকার বলে হাত ঝেড়ে ফেলল। কিন্তু ক্ষতি যা হওয়ার তা ততক্ষণে হয়ে গেছে। ছাত্রছাত্রীরা পাবলিক ফোরামে উপহাসের পাত্র হয়েছে।

কিন্তু কেন এমন হল? এটা কি একটা ব্যতিক্রমী দুর্ঘটনা? আমরা এর উত্তর খুঁজব। আগে দেখা যাক ওদের রিসার্চের নমুনা।

ওদের রিসার্চ পেপার

গলগোটিয়া ইউনির দাবি - তারা ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ২,৪৩০টি পেটেন্টের দরখাস্ত জমা দিয়েছে। দারুণ ব্যাপার নিঃসন্দেহে!

কারণ, নিয়মিত রিসার্চ ও পেটেন্টের জন্য সবচেয়ে খ্যাতি মাদ্রাজ আইআইটি'র। তারা ১৯৭৫ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ২,৫৫০টি পেটেন্টের দরখাস্ত জমা করেছিল। তাহলে পাঁচ দশকে তারা যা রিসার্চ করেছে, গলগোটিয়ার ছাত্রেরা মাত্র সাত বছরে তাদের প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে!

তাই একবার ওদের রিসার্চের নমুনা খতিয়ে দেখা যাক।

নামকরা পেপারটি

গত ২০২০ সালের 'জার্নাল অফ মলিকুলার ফার্মাসিউটিক্যাল অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স'-এর মার্চ-আগস্ট সংখ্যায় গলগোটিয়া ইউনি'র ফার্মেসি বিভাগের রিসার্চ স্কলার ধর্মেন্দ্র কুমারের একটি রিসার্চ পেপার প্রকাশিত হয় যার শীর্ষক হল 'কীভাবে থালি ও ঘন্টি বাজিয়ে শব্দতরঙ্গের মাধ্যমে করোনা ভাইরাসকে মেরে ফেলা যায়: একটি প্রকল্প' - হাসবেন না। বিশ্বাস না হলে অনলাইনে উঁকি মেরে দেখে নিন। পুরো পেপারটাই পড়া যাচ্ছে।

না হাসার একটি কারণ হল মার্চ ২০২০ সালেই আমাদের প্রধানমন্ত্রী করোনা রুখতে দেশজুড়ে থালি বাজানোর ডাক দিয়েছিলেন। কিছু নিন্দুক ছাড়া অনেকেই বাজিয়েছিল।

এই তথাকথিত রিসার্চ পেপারের অ্যাবস্ট্রাক্টে এবং প্রথম পাতার শেষ প্যারায় বলা হয়েছে এই রিসার্চের উদ্দেশ্য ও প্রেরণা ২০ ও ২২ মার্চ, ২০২০ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর 'শব্দ রণনীতি' অবলম্বনের আহ্বান।

এই ইউনিকেই প্রধানমন্ত্রী শিক্ষাক্ষেত্রে 'এক্সেলেন্স' অ্যাওয়ার্ড দিয়েছেন এবং মুখ্যমন্ত্রী যোগীজি নানান অবসরে এদের সম্মানিত করেছেন। এরা নাকি প্রথম ইউনি যারা নিউ এডুকেশন পলিসিকে এক বছরের মধ্যে ১০০ শতাংশ প্রয়োগ করেছে।

'নিউজ লন্ড্রি' চ্যানেলের সাংবাদিক মনীষা পাণ্ডে সরেজমিনে দেখে বলছেন প্যাভেলিয়নে তিনটে আইআইটিকে মোট যতটুকু জায়গা দেওয়া হয়েছে - একা গলগোটিয়াকে ততখানি!

গলগোটিয়া বিশ্ববিদ্যালয়

দিল্লির ন্যাশনাল ক্যাপিটাল রিজিয়ন বা এনসিআর এলাকার গ্রেটার নয়ডাতে ৫২ একর জমিতে তৈরি এই বিশ্ববিদ্যালয় ২০১১ সালে স্থাপিত। এর বিশাল ক্যাম্পাস, আধুনিক ল্যাব, ইঞ্জিনিয়ারিং, মেডিক্যাল সায়েন্স, কম্পিউটার টেকনোলজি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিজনেস ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদির আলাদা বিভাগ মিলে চোখ ধাঁধানো এলাহি ব্যাপার।

ওদের দবি অনুযায়ী ছাত্রসংখ্যা ২৫,০০০। 'ফার্স্ট পোস্ট'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বি.টেক. ডিগ্রি পড়ার খরচা ৫ থেকে ৭ লাখ। ওদের ২০১১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

ভারত সরকারের শিক্ষা বিভাগের ন্যাশনাল র‌্যাঙ্কিং সাইটে দেখা যাচ্ছে ২০২৪-২৫ সালে গলগোটিয়ার র‌্যাঙ্ক ২০০-২৫০ ব্যান্ডের মধ্যে।

দিল্লিতে বাবার বইয়ের দোকান থেকে জীবন শুরু করা সুনীল গলগোটিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালন কমিটির চেয়ারম্যান, ছেলে ধ্রুব গলগোটিয়া সিইও, এবং মেয়ে আরাধনা প্রশাসনের দায়িত্বে। কিন্তু এত অল্পসময়ে বিরাট উত্থানের চাবিকাঠি কী?

বিবাদিত জমি দখল, অত্যন্ত চড়া সুদে ধার নিয়ে পুঁজি জোগাড় এবং বিশাল চোখ ধাঁধানো প্রচার আর বর্তমান ক্ষমতায় থাকা দলটির সঙ্গে বিশেষ ঘনিষ্ঠতা।

জমি বিবাদ

'The Yamuna Expressway Industrial Development Authority' বা YEIDA চাষিদের থেকে জমি নিয়ে বিভিন্ন সংস্থাকে সরকারি দরে বণ্টন করে। কিছু আদালতের নির্ণয় ও আইনের সংশোধনের ফলে জমি পাওয়া সংস্থাদের বলা হয় কৃষকদের আরও ক্ষতি পূরণ পাওনা হয়েছে, তাই সবাইকে বাড়তি কিছু টাকা দিতে হবে।

গলগোটিয়া ইউনির পরিচালক 'শকুন্তলা এডুকেশন সোসাইটি'কে বলা হয় ১২ কোটি দিতে। তারা হাইকোর্টে গিয়ে অর্ডার খারিজ করায়। কিন্তু YEIDA সুপ্রীম কোর্টে আপিল করলে শীর্ষ ন্যায়ালয় হাইকোর্টের রায় খারিজ করে দেয়। এখনও জমির আইনি অধিকার নিয়ে সুপ্রীম কোর্টে কেস চলছে। তাতে সেই জমির উপর ক্যাম্পাস বানিয়ে কাজ চালাতে গলগোটিয়া পরিবারের কোনো অসুবিধে হয়নি।

পুঁজি বিবাদ

'শকুন্তলা এডুকেশন অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার সোসাইটি' ২০০০ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে একটি বেসরকারি ফিনান্স কোম্পানি S. E. Investments Ltd. থেকে ধাপে ধাপে প্রায় ১০০ কোটি টাকার ঋণ নেয়। সুদের হার অত্যন্ত চড়া - ২০ থেকে ২৬ পার্সেন্ট! বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি পাওয়ার পর ২০১১-১২ সালে আরও ৩৬.৭ কোটি ঋণ নেওয়া হয়, সুদের হার ২৬ শতাংশ! কিছুদিন পরে কিস্তি জমা হওয়া বন্ধ হয়ে যায়, পোস্টডেটেড চেক ফেরত আসে, কারণ চেকের মালিক নাকি উত্তমর্ণকে না জানিয়ে ব্যাংককে চেক অনার না করতে নির্দেশ দিয়ে রেখেছিল!

টাকা নিয়ে বিবাদ আদালত অবধি যায়। সেপ্টেম্বর, ২০১৪ সালে ফিনান্স কোম্পানি ঠকানো ও জাল দস্তাবেজ দেওয়ার অভিযোগ করে এফআইআর করলে ধ্রুব গলগোটিয়া, তার মা পদ্মিনী এবং আরও একজনকে গুরগাঁওয়ের বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তারা জামিন পেয়ে যায়। তারপর এলাহাবাদ হাইকোর্ট সব কাগজপত্র দেখে রায় দেয় যে এটা আসলে সময়ে লোনের কিস্তি বাকি থাকার দেওয়ানি মামলা, কোনো অপরাধিক কৃত্য দেখা যাচ্ছে না।

সেই দেওয়ানি কেস ২০১৭ সালে আরবিট্রেশনে গেলে এদের সুদ সমেত বকেয়া টাকা ফেরত দিতে বলা হয়, তারা টাকা না দিয়ে মিথ্যে ক্রিমিনাল কেস লাগানোর অভিযোগে বিরাট টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে। মামলা এখনও ঝুলে আছে।

কোম্পানি টাকা ফেরত পাবে কিনা বলা মুশকিল। কারণ এদের মাথায় আছে ক্ষমতার হাত।

রাজনৈতিক সংরক্ষণ ও মিডিয়া ঘনিষ্ঠতা

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই এর উদ্দেশ্য নিয়ে সুনীল গলগোটিয়া স্পষ্ট বলেছেন: 'We remain committed to realising Prime Minister Narendra Modi's vision of making India a developed nation and a global leader and Vishwa Guru, and to Uttar Pradesh Chief Minister Yogi Adityanath's dream of establishing UP as a global knowledge superpower.'

● সেই ২০১৪ সালেই নরেন্দ্র মোদী গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন গলগোটিয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে at the 'DQ Cybermedia Awards' in Delhi, recognising the institution for academic excellence and global linkages প্রদান করেছিলেন।
● প্রধানমন্ত্রী মোদীজির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে ছিলেন সুনীল ও ধ্রুব গলগোটিয়া।
● গলগোটিয়ারা মাঝে মাঝেই রাষ্ট্রীয় এবং আন্তর্জাতিক ওয়ার্কশপ এবং সেমিনারের আয়োজন করে। কখনও কখনও শিক্ষা মন্ত্রকের সহযোগে। তাতে উপস্থিত থাকেন কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের মন্ত্রী ও সাংসদ, কখনও মুখ্য অতিথি, কখনও প্রধান বক্তা হিসেবে।
● যেমন, ইউপি সরকারের মন্ত্রী যোগেন্দ্র উপাধ্যায়, সাংসদ ও বিজেপি মুখপাত্র সম্বিত পাত্র, কেন্দ্রীয় মানব সংসাধন মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।
● আরএসএস-এর ইকো সিস্টেমের সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ। এরা ওদের শিক্ষা মন্ডলের 'ভিশন অফ বিকসিত ভারত' ইভেন্টে অংশগ্রহণ করলে স্বয়ং মোহন ভাগবত ওদের প্যাভিলিয়ন দেখে বলেন - 'Best Exhibitor'.
● গলগোটিয়া দাবি করেছিল যে তারাই 'the first campus to implement 100 percent NEP 2020 in [the] true sense'. তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী রমেশ পোখরিয়ালের সামনে তারা যে ১২ বিন্দু রোডম্যাপ প্রয়োগের শপথ নিয়েছিল তাতে উল্লেখযোগ্য হল integration of 'Indian knowledge systems' into its curriculum.
● ওদের ক্যাম্পাসে 'বিবেকানন্দ রিসার্চ সেন্টার'-এর সঙ্গে 'অটলবিহারী' এবং 'দীনদয়াল উপাধ্যায় সেন্টার'ও আছে। আরএসএস-এর রাষ্ট্রীয় সহ-প্রচারক প্রমুখ আলোক কুমার ওদের ক্যাম্পাসে গিয়ে ছাত্রদের রাষ্ট্রীয় বিকাশের বিষয়ে মার্গদর্শন দিয়েছেন।
● ফিরিস্তি না বাড়িয়ে এটা বলা যথেষ্ট যে জুলাই, ২০২৫ নাগাদ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এস. পি. সিং বাঘেল ঘোষণা করেছিলেন - ভারত সরকারের শিক্ষা ও খেলাধুলোর দফতরে পরামর্শদাতা কমিটির জন্য ধ্রুব গলগোটিয়ার নাম প্রস্তাব করা হয়েছে!

মিডিয়ার আলোর ছটা

বিশ্বের মিডিয়ায় লজ্জা ও হাসির খোরাক হওয়ার পর যে মিডিয়া হাউসগুলো এখন গলগোটিয়া ইউনি'র সমালোচনায় মুখর, তারা অনেকেই এতদিন বিজ্ঞাপন পেয়ে ওদের মাথায় তুলে রেখেছিল। কিছু উদাহরণঃ
● গত বছর গলগোটিয়া ইউনি 'ইন্ডিয়া টুডে' গ্রুপের 'ইন্ডিয়া টুডে ইনস্টিটিউট'-এর ডিজিটাল মিডিয়া ও কমিউনিকেশন (অনার্স) কোর্সের পার্টনার হয়েছিল।
● সন ২০১২ থেকেই এরা দিল্লিতে ইন্ডিয়া টুডে''র বার্ষিক কনক্লেভের প্রচার প্রসারের পার্টনার। এবছর ফেব্রুয়ারির গোড়ায় এডুকেশন কনক্লেভে ধ্রুব গলগোটিয়া অন্যতম বক্তা।
● গত জুলাই, ২০২৪ মাসে 'রিপাবলিক মিডিয়া নেটওয়ার্ক' তাদের প্রথম 'Republic Youth Summit'-এর আয়োজন গ্রেটার নয়ডায় গলগোটিয়া ক্যাম্পাসে করেছিল।
● এমনকী এত তামাশার পরের দিন সকালে 'ইকনমিক টাইমস'-এ দেখা গেল আধপাতা জুড়ে গলগোটিয়া ইউনিভার্সিটির বিশাল বিজ্ঞাপন যাতে ওদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে ৩৫০+ কোটি টাকা বিনিয়োগের খবর।

রোগের লক্ষণঃ একটি অদ্ভূত ঘটনা

২০২৪ সালে সংসদীয় নির্বাচনের সময় এই ইউনিভার্সিটি ও তার ছাত্রছাত্রীরা কংগ্রেসের কার্যালয়ের সামনে মিছিল করে গিয়ে বিরোধ প্রদর্শন করে। তাদের হাতে নানান প্ল্যাকার্ড যাতে লেখা: কংগ্রেস হল আর্বান নকশাল, দেশের বিরোধী, জিতলে বাড়িঘর, মঙ্গলসূত্র ছিনিয়ে নেবে ইত্যাদি।

ক্যামেরার সামনে 'আজ তক' চ্যানেলের সংবাদদাতা যখন ওদের প্রশ্ন করলেন তখন দেখা গেল তারা কেউ 'আর্বান নকশাল' শব্দটার সঙ্গে পরিচিত নয়, কংগ্রেসের ইলেকশন ম্যানিফেস্টো পড়েনি। জানে না তাতে ওইসব লেখা আছে কিনা। ওদের হাতে কাগজ ধরিয়ে দিয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে - তাই তারা এসেছে।

সেই সময় দিল্লি ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে গিয়ে কিছু ছাত্রকে 'নিউজ লন্ড্রি' চ্যানেলের সাংবাদিক মনীষা পান্ডে প্রশ্ন করলে তারা বলে - খুব লজ্জাজনক ব্যাপার। ছাত্রদের প্রশ্ন করতে শেখানো হচ্ছে না। শুধু ক্ষমতাসীন দলের প্রচার তোতাপাখির মতো আওড়াতে বলা হচ্ছে। তার নমুনা এই।

শেষপাতে

এই বেলুন ফাটতো, আজ নয় কাল। একটা সময় বাবা রামদেবের দিন ছিল। সমস্ত টিভি চ্যানেলে ও পত্রিকায় তার 'পতঞ্জলি'র বিশাল বিজ্ঞাপন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কোভিড আতঙ্কের দিনে তার ম্যাজিক ওষুধের প্রচারে সহায়ক হয়েছেন। চেপে যাওয়া হয়েছে তার চীনে রক্তচন্দন কাঠের বে-আইনি পাচার করতে গিয়ে ধরা পড়ার গল্প। তাকে দেওয়া হয়েছিল জেড প্লাস সিকিউরিটি। তারও ইউনিভার্সিটি আছে।

সুপ্রীম কোর্টের কিছু রায় এবং অন্যান্য ঘটনার পর আজ তিনি বিস্মৃতপ্রায়।

যতদিন বিজ্ঞানমনস্কতা না শিখিয়ে আলু থেকে সোনা তৈরি, নর্দমার জল থেকে গ্যাস ও পৌরাণিক যুগে 'ব্যাকগিয়ার' সম্পন্ন বিমানের গল্পকে রিসার্চের সম্মান দেওয়া হবে আর টাকার অঙ্কে শিক্ষার মূল্য আঁকা হবে ততদিন আমাদের দেশে 'পতঞ্জলি' ও 'গলগোটিয়া' গজাতেই থাকবে।

গলগোটিয়ার 'কৃত্রিম মেধার' রিসার্চের সবচেয়ে ভাল মডেল তার ছাত্ররা - যারা প্রশ্ন করতে শেখে না, রোবোর মতো শেখানো কোডিং অনুসরণ করে।