আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ সপ্তম সংখ্যা ● ১-১৫ এপ্রিল, ২০২৬ ● ১৬-৩০ চৈত্র, ১৪৩২

সম্পাদকীয়

মানবতার শত্রু


ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বেঞ্জামিন নেতানইয়াহু মানবতার শত্রু। এই কথাটি আজ সোচ্চারে বলার সময় এসে গিয়েছে। নেতানইয়াহু ২০২৩ সাল থেকে লাগাতার গাজার উপরে বোমা বর্ষণ করে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছে। তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা রুজু করা আছে, তার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। কিন্তু 'বিবি'-কে ঠেকায় কে। গাজাকে ধ্বংস করার পরে এখন চলছে ইরান ধ্বংসের পালা। বিগত প্রায় তিন দশক ধরে নেতানইয়াহু চেয়েছিলেন ইরান আক্রমণ করতে। কিন্তু কোনও মার্কিন রাষ্ট্রপতি এই যুদ্ধ করতে রাজি হয়নি। ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধে সম্মতি দিয়েছেন এবং ইরানের উপর দুই দেশ মিলে লাগাতার আক্রমণ সংঘটিত করে চলেছে।

কিন্তু ইরান গাজা নয়। ইরানের সেনা আমেরিকার প্রভূত ক্ষতি করেছে বলে জানাচ্ছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম। তাই কখনও ট্রাম্প বলছেন যে তিনি যুদ্ধ থামাতে চান, আবার কখনও বলছেন যে ইরানকে প্রস্তর যুগে নিয়ে যাওয়া হবে বোমা মেরে। এই প্রস্তর যুগে নিয়ে যাওয়া কি পরমাণু বোমার ইঙ্গিত বহন করছে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থিত 'বুলেটিন অফ এটোমিক সাইন্টিস্ট' সংস্থা একটি ধ্বংসের প্রতীকী ঘড়ি তৈরি করেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে। এই ঘড়ি আসলে বলে যে আমরা পারমানবিক বোমায় সর্বাত্মক ধ্বংস হওয়া থেকে কতটা দূরে দাঁড়িয়ে রয়েছি। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে এই সংস্থা জানায় যে আমরা সর্বাত্মক ধ্বংস থেকে মাত্র ৮৫ সেকেন্ড দূরে (প্রতীকী অর্থে), যা এই ঘড়ি চালু হওয়ার পরে ধ্বংসের সবচেয়ে কাছে। জানুয়ারি মাসে তাঁরা এই নির্ণয় করেন। কিন্তু তারপরে ইরানের যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ইরানকে প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। অতএব ঘড়ির পরিচালকরা এখন কী বলবেন? আমরা ধ্বংসের কতটা নিকটে পৌঁছলাম? আমাদের মতে আমরা আসলে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।

শুধুমাত্র বোমাবর্ষণ ও বোমারু বিমান এই ধ্বংসের বার্তাবাহক নয়। ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ রেখেছে। দুনিয়ায় দেখা দিচ্ছে জ্বালানি সংকট। আমাদের দেশে গ্যাসের অভাবে রেস্টুরেন্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর আসছে। খনিজ তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলার হয়ে গেছে, যা যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ৮০ ডলারের কম ছিল। গোটা পৃথিবীর শেয়ার বাজারে ব্যাপক পতন শুরু হয়েছে। সাধারণ মানুষের সঞ্চয় দুই অমানবিক লোভী বৃদ্ধের যুদ্ধোন্মাদনায় চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন যে এই যুদ্ধ চলতে থাকলে খনিজ তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ২০০ ডলারও ছুঁতে পারে। গোটা দুনিয়ায় মন্দার ছায়া ঘনিয়ে আসছে। একদিকে যুদ্ধের জন্য বহু মানুষের প্রাণ যাচ্ছে এবং যাবে। কিন্তু এর অর্থনৈতিক অভিঘাতে বহু মানুষের জীবন নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু যুদ্ধবাজদের তাতে কোনও ক্ষতি নেই।

ট্রাম্প বলছেন যে পশ্চিম এশিয়ার খনিজ তেলের আর কোনও প্রয়োজনীয়তা আমেরিকার নেই, কারণ তারাই এখন বিশ্বে এক নম্বর তেল প্রস্তুতকারক। ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতিকে বেআইনিভাবে অপহরণ করার পরে সেই দেশের তেল ভাণ্ডারকেও ট্রাম্প নিজের তেল ভাণ্ডার ভাবছেন। যেহেতু আমেরিকার আর পশ্চিম এশিয়ার তেলের প্রয়োজন নেই, কিন্তু পৃথিবীর বাকি দেশগুলির রয়েছে, তাই ট্রাম্প বাকি পৃথিবীকে তাদের তেল ও গ্যাস বেচবেন। আমেরিকান তেল কোম্পানিগুলির ব্যাপক মুনাফা হবে। তাতে যদি আপনার আমার গ্যাস না জ্বলে বা বেশি দামে কিনতে হয় তাতে নিশ্চয়ই মার্কিন রাষ্ট্রপতির কিছু যায় আসে না। অতএব এই যুদ্ধের ফলে আসলে লাভবান হবে মার্কিন কোম্পানিগুলি। এও শোনা যাচ্ছে যে আমেরিকার যিনি যুদ্ধ সচিব, সেই ব্যক্তি যুদ্ধ শুরু হওয়ার দিন কয়েক আগে প্রচুর টাকার শেয়ার কিনেছেন মূলত সামরিক পণ্য তৈরি করে এমন কোম্পানির। অতএব, তাঁরও লাভ। তিনি জানতেন যে তিনিই যুদ্ধ পরিচালনা করতে চলেছেন, সেই তথ্যের ভিত্তিতে তিনি শেয়ার কিনে নিজের আখের গোছাবেন - একেই বোধহয় তারা বিচক্ষণতা বলবেন। আবার মুকেশ আম্বানি আমেরিকায় তেল পরিষোধনাগারে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবেন। বোঝাই যাচ্ছে যে, যেই বিজেপিকে তিনি নিয়মিত টাকা দেন, তাদের নেতারা আমেরিকার বিরুদ্ধে এমন কিছু বলবেন না, যাতে তার বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। পুঁজিপতি, কর্পোরেট এবং ধান্দাবাজ নেতাদের হাতে চলে গেছে পৃথিবী। এদের হৃদয়ে যে শুধু "প্রেম নেই, প্রীতি নেই" তা নয়, রয়েছে জিঘাংসা, বর্ণবিদ্বেষ ও মুনাফার লোলুপতা। মুনাফার এই খিদে, ক্ষমতার এই দম্ভের পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে আপামর পৃথিবীর জনসাধারণকে।

এহেন কালো-নিকষ আঁধারেও আলো জ্বালানোর জন্য মানুষ থাকে। ট্রাম্পের এই যুদ্ধোন্মাদনার বিরুদ্ধে আমেরিকার পথে নামলেন লাখো মানুষ। একের পর এক শহরে বিপুল জনসমাগমের মধ্য দিয়ে এই যুদ্ধের বিরোধিতা করলেন তাঁরা। ট্রাম্পকে বললেন যে তিনি রাজা নন, তাদেরই ভোটে নির্বাচিত একজন জনপ্রতিনিধি। তাই তাঁর ক্ষমতা সীমাহীন নয়, তা জনগণের ইচ্ছার অধীন। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা লাগাতার কমছে। সর্বশেষ জনমত সমীক্ষা অনুযায়ী মাত্র ২৮ শতাংশ মার্কিন জনগণ এই যুদ্ধের পক্ষে। সার্বিকভাবে ট্রাম্পের পক্ষে মত দিয়েছেন ৩৬ শতাংশ মানুষ এবং তার বিপক্ষে ৫৭ শতাংশ, ৭ শতাংশ কোনও মতামত দেয়নি। আমেরিকার ইতিহাসে এত কম জনসমর্থন নিয়ে কোনও রাষ্ট্রপতিকে যুদ্ধে যেতে হয়নি। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মার্কিন জনমত প্রমাণ করে যে তিনি যা করছেন তা মার্কিনদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। যেহেতু অধিকাংশ মানুষের তার যুদ্ধনীতির প্রতি সমর্থন নেই, তাই বলা যেতে পারে যে এই যুদ্ধ সম্পূর্ণভাবে মার্কিন দেশের জনগণের স্বার্থ তথা ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে হচ্ছে। মানবতার শত্রু ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আমেরিকান জনগণের লড়াইয়ের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে, আমাদের দেশেও এই ভয়াবহ যুদ্ধের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামতে হবে। মোদীর ট্রাম্প-প্রেমের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে হবে।