আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ সপ্তম সংখ্যা ● ১-১৫ এপ্রিল, ২০২৬ ● ১৬-৩০ চৈত্র, ১৪৩২
সম্পাদকীয়
জবাব দেবে কে
ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক লড়াইয়ের ময়দান নয়, বরং এক অভূতপূর্ব প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের সাক্ষী হতে চলেছে। তেইশে এপ্রিল এবং ঊনত্রিশে এপ্রিল - দুই দফায় ভোটগ্রহণের দিনক্ষণ ঘোষণা হয়ে গেলেও রাজ্যের কয়েক লক্ষ শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের কপালে আজ চিন্তার গভীর ভাঁজ। এই উদ্বেগের মূলে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের 'বিশেষ নিবিড় সংশোধন' বা এসআইআর প্রক্রিয়া। এককথায় বলতে গেলে, বাংলার কয়েক দশকের ভোটার তালিকার খোলনলচে বদলে ফেলার এই যান্ত্রিক ও কঠোর প্রক্রিয়ায় বর্তমানে লক্ষ লক্ষ সাধারণ নাগরিকের ভোটাধিকার এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে। প্রায় ৬০ লক্ষ নাম বর্তমানে 'বিচারাধীন' বা 'অ্যাডজুডিকেশন'-এর তালিকায় বন্দি। ভোটের বাকি আর হাতেগোনা কয়েকদিন, অথচ এই বিশাল সংখ্যক মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ কি আদৌ সম্ভব? এই প্রশ্নই এখন বাংলার রাজনীতির অলিন্দে সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
পুরো বিষয়টি বুঝতে গেলে এই ব্যবস্থার শ্রেণিকাঠামো এবং এর পেছনের আমলাতান্ত্রিক আধিপত্যকে চিনে নেওয়া প্রয়োজন। সাধারণত প্রতি বছর ভোটার তালিকার যে সংশোধন হয়, তাকে বলা হয় 'সামারি রিভিশন'। কিন্তু ২০২৬-এর আগে নির্বাচন কমিশন যে পথ বেছে নিয়েছে, তা হলো সম্পূর্ণ নতুনভাবে তালিকা তৈরি বা 'ডি নোভো' সংশোধন। এর লক্ষ্য ছিল ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে বর্তমান তালিকার শতভাগ শারীরিক যাচাই বা ফিজিক্যাল ভেরিফিকেশন করা। তথাকথিত 'স্বচ্ছতা' আনতে গিয়ে যে কঠোর নিয়মাবলি বা এসওপি জারি করা হয়েছিল, তা মাঠ পর্যায়ে কাজ করা নিচুতলার সরকারি কর্মীদের জন্য কার্যত যান্ত্রিক আদেশে পরিণত হয়েছিল। বিএলও-রা বাড়ি বাড়ি গিয়ে যদি কাউকে এক বা দুবার না পেয়েছেন, তবে সফটওয়্যারের মাধ্যমে সরাসরি তাকে 'অনুপস্থিত' বা 'সন্দেহজনক' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোনো শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার প্রয়োজনে সাময়িক অনুপস্থিতিকে এই ডিজিটাল ব্যবস্থা বিন্দুমাত্র আমল দেয়নি।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এই সংকটের ভয়াবহতা ও এর গভীর জনতাত্ত্বিক বৈষম্য স্পষ্ট হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হলো, দেখা গেল তালিকায় প্রায় ৬৪ লক্ষ নাম পুরোপুরি ছেঁটে ফেলা হয়েছে। এই বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য অত্যন্ত প্রকট। তথ্য অনুযায়ী, বাদ পড়া ভোটারদের প্রায় ৫২ শতাংশই মহিলা। গ্রামীণ এলাকায় বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শ্রমজীবী মহিলাদের ক্ষেত্রে নথির অমিল বা বিবাহের পর ঠিকানার পরিবর্তনের কারণে 'লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি' সবচেয়ে বেশি ধরা পড়েছে। অন্যদিকে, তৃতীয় লিঙ্গের ভোটারদের ক্ষেত্রেও তালিকায় বড়সড় কাটছাঁট হয়েছে; আগের ১,৭৭৭ জন থেকে কমে এই সংখ্যা এখন দাঁড়িয়েছে মাত্র ১,১৫২-তে।
ভাষাগত ও ধর্মীয় বিভাজনের দিকে তাকালে দেখা যায় এক পরিকল্পিত বঞ্চনার সমীকরণ। যদিও নির্বাচন কমিশন ধর্ম বা জাতির ভিত্তিতে কোনো তথ্য জনসমক্ষে আনেনি, তবে জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যান এবং বিধানসভা কেন্দ্রগুলোর বিচার বিশ্লেষণ করলে একটি নকশা পরিষ্কার হয়ে ওঠে। দেখা যাচ্ছে, কলকাতার হিন্দিভাষী ও উর্দুভাষী শ্রমজীবী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভোটারের নাম কাটার হার সবচেয়ে বেশি। বড়বাজার, জোড়াসাঁকো বা খিদিরপুরের মতো চটকল ও শিল্পাঞ্চল সংলগ্ন এলাকায় পরিযায়ী শ্রমিকদের নাম তালিকায় না মেলার হার প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। এর বিপরীতে, গ্রামীণ মুসলিমপ্রধান এলাকাগুলোতে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার হার তুলনামূলকভাবে কম। উদাহরণস্বরূপ, মুর্শিদাবাদের ডোমকল বা রানীনগরের মতো কেন্দ্রে নাম কাটার হার ১ শতাংশের নিচে। এর ফলে শাসক ও বিরোধী উভয় পক্ষের সস্তা 'অনুপ্রবেশকারী' তত্ত্বের চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে 'স্থায়ী বাসিন্দা বনাম উদয়াস্ত খাটা পরিযায়ী' বিতর্ক। যারা পেটের দায়ে ভিন রাজ্যে শ্রম দিতে যান, তারাই এই যান্ত্রিক সংশোধনের সহজ শিকারে পরিণত হয়েছেন।
আঞ্চলিক বা জেলাভিত্তিক বিচার করলে দেখা যায়, বর্তমানে 'বিচারাধীন' ভোটারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং নদীয়া জেলায়। বিশেষ করে মতুয়া অধ্যুষিত বনগাঁ ও রানাঘাট লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত বিধানসভাগুলোতে ভোটারদের এক বিশাল অংশ এখন ট্রাইব্যুনালের বারান্দায় ঘুরছেন। নদীয়া জেলায় এই সংখ্যা প্রায় ৪.৫ লক্ষ। এর কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে, ২০০২ সালের নথির সঙ্গে বর্তমান তথ্যের অমিল এবং দেশভাগ ও উদ্বাস্তু পটভূমি থেকে আসা প্রান্তিক মানুষের কাছে উপযুক্ত নথিপত্রের অভাব। উত্তরবঙ্গের ক্ষেত্রে মালদহ ও উত্তর দিনাজপুরেও বিচারাধীন নামের সংখ্যা কয়েক লক্ষ ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে, কলকাতা ও হাওড়ার মতো শিল্পাঞ্চলগুলোতে 'শিফটেড' বা স্থানান্তরিত ভোটারের তকমা দিয়ে কয়েক লক্ষ মানুষের নাম সরাসরি কেটে দেওয়া হয়েছে, যার সিংহভাগই উত্তর ভারত থেকে আসা হিন্দিভাষী শ্রমিক শ্রেণি এবং নদী ভাঙনের শিকার ঘরহারা মানুষ।
এই সংকটের মূলে রয়েছে এক চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য। বিএলও-রা যখন বাড়ি বাড়ি গিয়ে শারীরিক যাচাই করেছেন, তখন উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পাড়ায় নথিপত্রের প্রাচুর্য থাকলেও বস্তি বা কলোনি এলাকায় চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। পশ্চিমবঙ্গের মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর দিনাজপুরের মতো জেলাগুলো থেকে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে বাইরে যান। তাদের অনুপস্থিতিকে 'স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত' ধরে নিয়ে নাম কাটা হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে যেখানে ডিজিটাল নথি বা বিকল্প প্রমাণপত্র জোগাড় করা সহজ, সেখানে এই দিনমজুর শ্রেণির মানুষের কাছে দুই দশক আগের বংশলতিকার প্রমাণ পেশ করা কার্যত অসম্ভব। যারা বস্তি উচ্ছেদ বা নগরায়নের ফলে ঘর হারিয়েছেন, তাদের নতুন ঠিকানায় ভোটার কার্ড স্থানান্তরের প্রক্রিয়াটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।
বিচারাধীন বা 'আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন' থাকা নামগুলোর দায়ভার মূলত একটি যান্ত্রিক ও পুঁজিনির্ভর প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর বর্তায়। ভারতের সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ভোটার তালিকা তৈরির চূড়ান্ত দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। কিন্তু কমিশন যেভাবে এই 'এসআইআর' প্রক্রিয়াটিকে একটি করপোরেট প্রজেক্টের মতো চালিয়েছে, তাতে সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার গৌণ হয়ে পড়েছে। পর্যাপ্ত পরিকাঠামো বা প্রশিক্ষিত কর্মী ছাড়াই ডিজিটাল অ্যালগরিদমের ওপর অতিনির্ভরশীলতা এই বিপর্যয়ের জন্য দায়ী। বর্তমানে যে ৫০০টি ট্রাইব্যুনাল বা ইউনিট তৈরি করে বিচার প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে, সেখানেও এক অদ্ভুত প্রহসন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৭৫ হাজার আবেদনের নিষ্পত্তি হলেও নিম্নবিত্ত ভোটারের জন্য শুনানিতে হাজির হওয়া মানেই একদিনের মজুরি হারানো। অর্থাৎ, পেটের টান বড় নাকি ভোটের অধিকার - এই নিষ্ঠুর দ্বন্দ্বে দরিদ্র মানুষকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা এবং স্থানীয় বিএলও-দের সীমাবদ্ধতাও এই সংকটকে ঘনীভূত করেছে। মাঠ পর্যায়ে কাজ করা কর্মীদের ক্ষমতা ছিল অত্যন্ত নগণ্য। কমিশন যে 'এনিউমারেশন ফর্ম' বা সফটওয়্যার ধরিয়ে দিয়েছিল, তার বাইরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। এর ফলে কোনো মানুষের ব্যক্তিগত বা সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনার বদলে কেবল নথির শুষ্ক বিচারে ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, কারো নাম বাদ দেওয়ার আগে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু বর্তমানে যে দ্রুততার সাথে শুনানি চলছে, তাতে 'ন্যাচারাল জাস্টিস' বা প্রাকৃতিক বিচারের নীতি ধূলিসাৎ হচ্ছে। ২৩শে এপ্রিল প্রথম দফার ভোটের আগে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভাগ্য নিষ্পত্তি হওয়া সম্ভব নয়। আর এই ঝুলে থাকা ভোটাররা কার্যত ভোটাধিকারহীন নাগরিকে পরিণত হবেন।
স্বাভাবিকভাবেই মানুষ প্রতিবাদে পথে নামছেন। মালদায় যে ঘটনা ঘটে গেল, তা মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। বিচারবিভাগের অধিকর্তাদের ঘেরাও করে রাখা যেমন সমর্থন করা যায় না, তেমনি বিচারবিভাগ, সুপ্রিম কোর্ট এবং নির্বাচন কমিশনকেও বুঝতে হবে যে মানুষের ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙছে। রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কায় ভীত মানুষের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। তাঁরা এখন প্রতিবাদে সামিল হচ্ছেন। সেই প্রতিবাদের অধিকার তাদের রয়েছে। নিশ্চিতভাবেই তা শান্তিপূর্ণ পথে পরিচালিত করতে হবে। রাজ্যের গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তিদের উচিত মানুষের ক্ষোভকে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের দিকে পরিচালিত করা।
সবশেষে বলা যায়, ২০২৬-এর নির্বাচন এক ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে। যদি লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষ নিজেদের বৈধতা প্রমাণ করার সুযোগ না পেয়েই ভোটাধিকার হারান, তবে তা ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে। যান্ত্রিক ত্রুটি বা আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতের ফাঁসে যদি একজনও প্রকৃত নাগরিক বঞ্চিত হন, তবে তার দায় সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্র ও নির্বাচন কমিশনের। কমিশনের উচিত ছিল এই প্রক্রিয়াটিকে আরও বেশি দরিদ্র-বান্ধব করা এবং শুনানির জন্য প্রতিটি মানুষকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া। এখন দেখার বিষয়, তেইশে এপ্রিলের প্রথম দফার ভোটের আগে এই জট কতটা খোলে। বাংলার সাধারণ মানুষ আজ শুধু এটুকুই চান যে, তাদের গণতান্ত্রিক পরিচয় যেন কোনো যান্ত্রিক অ্যালগরিদমের কাছে বন্ধক না থাকে। কারণ একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মূল শর্তই হলো দেশের প্রান্তিকতম নাগরিকটির সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার অন্তরালে আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন অমীমাংসিত থেকে গেল। এই 'শোধন' প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপি ক্রমাগত এক বিষাক্ত রাজনৈতিক ভাষ্য আমদানি করছিল যে, এ রাজ্য নাকি 'রোহিঙ্গায় ভরে গেছে'। জনমানসে আতঙ্ক ছড়িয়ে ভোট মেরুকরণের সেই যে ঘৃণ্য রাজনীতি, তাকে কি এই এসআইআর প্রক্রিয়া আদৌ কোনো বৈধতা দিতে পারল? পরিসংখ্যান তো উল্টো কথা বলছে; দেখা যাচ্ছে নাম কাটার খড়্গ সবচেয়ে বেশি নেমে এসেছে শহুরে হিন্দিভাষী শ্রমিক আর প্রান্তিক উদ্বাস্তু হিন্দুদের ওপর। তাহলে কি এই পুরো কর্মযজ্ঞটি আসলে বাংলার প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার হস্তান্তর সুনিশ্চিত করতে বাছাই করে বিশেষ কিছু মানুষের নাম বাদ দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত প্রকল্প? গণতন্ত্রের নামে এই দেউলিয়া রাজনীতির জবাব হয়তো আসন্ন নির্বাচনই দেবে।