আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ পঞ্চম সংখ্যা ● ১-১৫ মার্চ, ২০২৬ ● ১৫-৩০ ফাল্গুন, ১৪৩২

প্রবন্ধ

এই সমস্যা শুধু মতুয়াদের নয়, তার ক্ষেত্র বহু দূর বিস্তৃত

নিখিল রঞ্জন গুহ


SIR-এর কাজ চলাকালীন সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় মতুয়া সম্প্রদায়কে বিপাকে ফেলেছে। এই রায়ের ফলে CAA-তে আবেদনকারীরা ভোটদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে চলেছেন। এমনকী ২০০২ সালের তালিকায় যাদের নাম আছে তাদেরও এই রায়ে সমস্যা দেখা দিতে পারে। বলা যায় CAA (2019) প্রশ্নে বামপন্থীসহ বিরোধীদলগুলির আশঙ্কাকেই এই রায় সীলমোহর দিয়েছে। কারণ CAA-তে আবেদনের প্রধান শর্ত ছিল ধর্মীয় বা অন্যান্য নিরাপত্তাহীনতা জনিত কারণে ভারতে আসা মানুষকে নিজেদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে স্বীকার করে নিতে হবে।

আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টিকে নির্দোষ মনে হলেও তার মধ্যে নিহিত এই শর্ত বিপদ ডেকে আনার পক্ষে যথেষ্ট। কারণ এই ক্ষেত্রে ভারতীয় 'ফরেনার্স এক্ট' লাগু হওয়ার সম্ভাবনা বর্তমান। মনে রাখতে হবে শরণার্থী এবং অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে মূল পার্থক্য হল; প্রথমটায় জেনেভা কনভেনশনে (১৯৫১) সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত মোতাবেক আন্তর্জাতিক আইনের সাহায্যে শরণার্থীদের স্বার্থ অনেকটাই সুরক্ষিত। দ্বিতীয়টিতে সেই সুরক্ষা নেই। প্রতিটি রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের আইনি অবস্থান নেবার সুযোগ বর্তমান আছে। ভারতের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান থেকে আগত কয়েকটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে কিছু সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও তা প্রতিষ্ঠা করার দায় সংশ্লিষ্ট পক্ষের উপর ন্যস্ত থাকায় তা সমস্যার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে।

২০১৯ সালের CAA আইনে ৩১.০৩.২০১৪ পর্যন্ত (যা পরে বর্ধিত হয় ৩১.১২.২৪ পর্যন্ত) যে সকল হিন্দু, জৈন, পার্শি, শিখ, বৌধ ও খ্রিস্টান ধর্মালম্বী মানুষেরা ভারতে এসেছেন তাদের ক্ষেত্রে প্রামাণ্য হিসেবে যে তথ্যগুলি চাওয়া হয়েছে তার মধ্যে প্রধান হল - Proof of Religious Identity and Nationality from Afghanistan, Bangladesh and Pakistan। সেই সাথে চাওয়া হয়েছে Visa / Immigration Stamp on Arrival, Registration Certificate (FRO/FRRO) প্রভৃতি। যদিও আরও নানা ধরনের অন্যান্য প্রমাণ দাখিলের সুযোগ আছে তবে সেগুলি প্রাথমিক প্রমাণ হিসেবে গ্রাহ্য নয়। উল্লেখিত প্রমাণগুলির ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয় আছে যেগুলি বৈরী দেশগুলির সহযোগিতার উপর নির্ভরশীল। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলি সেই দায় নেবে কিনা তা বিবেচ্য বিষয়।

এই প্রশ্নগুলির সাথে আর একটা প্রশ্ন জড়িয়ে আছে; যারা অবৈধ পথে কোনোরকমে এই দেশে এসে আশ্রয় নিয়েছেন তাদের কী হবে। তারা একাধারে সহায়সম্বলহীন অবস্থায় এই দেশে এসেছেন; তাদের অনেকেরই উল্লিখিত প্রমাণ থাকারও কথা নয়।

সদ্য প্রকাশিত খসড়া ভোটার তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, আটান্ন লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে - মৃত, একাধিক ভোটকেন্দ্রে নাম তোলা এবং স্থানান্তরিত ভোটারের নাম প্রভৃতিকে কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এখন বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় এক কোটি আটত্রিশ লক্ষের খসড়া ভোটার তালিকায় থাকা নামের লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সির কারণে যাচাইকরণের কাজ চলছে। সেখানেও নাম বাদ পড়ার সম্ভাবনা থাকবে। দেখা গিয়েছে একটা বড় অংশের নাম তোলার ফর্ম জমা পড়েনি। প্রকাশিত খসড়া তালিকায় শুধু যে মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষেরই নাম বাদ গিয়েছে এমন নয়। প্রচুর অমতুয়া বাঙালিদেরও নাম বাদ গিয়েছে এবং পররর্তী ধাপেও অনেকের নাম বাদ পড়ার সম্ভাবনা থাকবে। দেখা যাবে মতুয়াদের তুলনায় অমতুয়াদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী SIR-কে সামনে রেখে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশিদের (ঘুসপেটিয়াদের) বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেও, তা নেহাতই বিভ্রান্তিকর এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত। এটা ঠিক SIR-এর কারণে কিছু বাংলাদেশি তাদের স্বদেশভূমিতে ফিরে গিয়েছেন। কিন্তু তাদের সংখ্যা বাদ পড়া অমতুয়া ও মতুয়াদের তুলনায় নগণ্য। বিশ্বজোড়া অনুপ্রবেশ সমস্যার চিহ্নিত কারণগুলির মধ্যে অসম বিকাশ, সহিংসা, ড্রাগ, চোরাচালান এবং সন্ত্রাসবাদ উল্লেখযোগ্য হলেও প্রধান কারণ হিসেবে অসম বিকাশকে ধরা হয়ে থাকে। এই প্রশ্নে বাংলাদেশিদের ভারতে বা পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশের তেমন বাধ্যবাধকতা থাকার কথা নয়।
● মানবসম্পদ উন্নয়নের নিরিখে ভারত ১৯৩টি দেশের মধ্যে যখন ১৩৪, বাংলাদেশ তখন ১২৯ (March 19, 2023, United Nations Development Programme)।

● শেখ হাসিনার আমলে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও বিশ্বের গড় যখন ৫.১ শতাংশ (ILO-23) তখন বাংলাদেশে তা ছিল ৪.২ শতাংশ (World Bank)। ভারতে সেই সময় এই হার ছিল ঊর্ধ্বমুখী।

● মাথাপিছু ঋণকে বিবেচনায় রাখলে দেখা যাবে, বাংলাদেশে যখন তা ৫৮০ ডলার (২০২৩) তখন ভারতের ক্ষেত্রে তা প্রায় চারগুণ ১৯৪৩ ডলার।

● মাথাপিছু জিডিপি এবং মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ভারত থেকে খুব একটা পিছিয়ে ছিল এমন নয়।

এই রকম একটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাতে সে দেশের মানুষের কাছে জীবিকার প্রয়োজনে প্রধান গন্তব্য ভারত হতে যাবে কেন তা একটা প্রশ্ন। সমীক্ষা বলছে এই প্রশ্নে তাদের কাছে প্রাধান্য পেয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলি, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর এবং ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার কিছু দেশ (যুক্তরাজ্য, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র) ও অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি। এই দেশগুলির বিকাশমান শ্রমবাজার এবং উন্নত পারিশ্রমিক তাদের কাছে প্রধান আকর্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বিপরীতে শিল্পে খরাক্লিষ্ট পশ্চিমবঙ্গে কর্মসংস্থানের সুযোগ ক্রমসংকোচনমুখী হওয়ায় তা পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে প্রতিভাত হয়।

ভারত-বাংলাদেশ চুক্তিতে অনুপ্রবেশের সমস্যা রোধে 'শুট অ্যাট সাইট'-এর ঝুঁকি রয়েছে। প্রকৃতপ্রস্তাবে SIR প্রকাশিত খসড়া তালিকাতেও তারই প্রতিফলন ঘটতে দেখা যায়। এই রাজ্যে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে - এমন প্রচারেরও কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। বরং বলা যায় তা রাজ্যবাসীকে বিভ্রান্ত করা এবং তাদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে।

সর্বোচ্চ আদালতে ভারত সরকারের হলফনামায় তাদের সংখ্যা বলা হয়েছে চল্লিশ হাজারের কাছাকাছি যারা ভারতের প্রধানত ছয়টি রাজ্য [মূলত জম্মু, হায়দরাবাদ (তেলেঙ্গানা), নূহ (হরিয়ানা), দিল্লি, ত্রিপুরা এবং পশ্চিমবঙ্গ] সহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে আছে। উল্লেখ্য নথিবদ্ধ রোহিঙ্গারা প্রায় সাতাশ হাজার যারা সরকারের নানা সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকে। জেনেভা চুক্তিতে ভারত স্বাক্ষর না করলেও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চুক্তিতে দায়বদ্ধ ভারতের পক্ষে তাদের বিরুদ্ধে তেমন কঠিন পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

বিপরীতে পূর্ব পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ থেকে হিন্দুদের আগমন কীভাবে ঘটেছে তা পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন আদমশুমারি থেকেই স্পষ্ট।

Year 1947 1951 1961 1974 1981 1891 2001 2011 2022
% of Hindu 28 22 18.8 13.5 12.9 10.5 9.3 8.5 7.95

স্বাধীনোত্তর ভারতে বসবাসকারী হিন্দুদের নিকট আত্মীয়দের ভরসায় অথবা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে ছিন্নমূল মানুষ পূর্ব পাকিস্তান/বাংলাদেশ থেকে এদেশে এসেছেন। পরিস্থিতি ভেদে তাতে হ্রাসবৃদ্ধি ঘটলেও তাদের আগমন ঘটেছে ধারাবাহিক ভাবে। তাদের অনেকের কাছেই যেমন তেমন প্রামাণ্য কাগজপত্র নেই, বর্তমানে তাদের পক্ষে তা সংগ্রহ করাও কষ্টসাধ্য। SIR-উত্তর-কালে নাগরিকত্ব লাভের আশায় ব্যাপকভাবে আবেদন করার ঝোঁক দেখা দেবার সম্ভাবনা আছে। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়াদের মধ্যে স্বাভাবিক ভাবেই এই প্রবণতা দেখা দেবে ধরে নেওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে শুধু মতুয়া নয় তার বাইরেও বিপুল সংখ্যক মানুষকে সমস্যায় পড়তে হবে। শ্রীলঙ্কা থেকে আগত ভারতে বসবাসকারী তামিল হিন্দু এবং প্রাক-স্বাধীন সময় থেকে ভারতে বসবাস করছে এমন গোর্খা জনগোষ্ঠী সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে CAA নীরব। তাই বাংলাদেশ থেকে ভারতে আগত হিন্দুদের পক্ষেও তা খুব নিরাপদ না হবার সম্ভাবনা রয়েছে।