আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ পঞ্চম সংখ্যা ● ১-১৫ মার্চ, ২০২৬ ● ১৫-৩০ ফাল্গুন, ১৪৩২
প্রবন্ধ
দান-অনুদানের রাজনীতি: মানব দরদী না কি উন্নয়ন পরিপন্থী?
গৌতম সরকার
সাম্প্রতিক রাজ্য বাজেটের বেশ কিছু ঘোষণা নিয়ে গোটা দেশে তোলপাড় চলছে। 'লক্ষীর ভাণ্ডার'-এর টাকার পরিমাণ হাজার থেকে বেড়ে পনেরোশো হয়েছে; একুশ থেকে চল্লিশ বছর বয়সীদের জন্য মাসিক পনেরোশো টাকা বেকারভাতার ঘোষণা হয়েছে। স্বভাবতই আসন্ন বিধানসভা ভোটের কথা মাথায় রেখে বিরোধীরা এটাকে ভোট কেনার অন্যতম প্রধান অস্ত্র হিসেবে দাবি করে সমালোচনার ঝড় বইয়ে দিচ্ছে। তবে এই পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি নতুন তো কিছু নয়, কিংবা আমাদের রাজ্যেই শুধু সীমাবদ্ধ সেটা ভাবারও কোনও কারণ নেই। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের সমর্থন পাওয়ার জন্য এই সমস্ত জনমনমোহিনী প্রকল্পের চিন্তা কেন্দ্র, রাজ্য সব সরকারের পরিকল্পনাতেই থাকে। বিহারের 'মুখ্যমন্ত্রী মহিলা রোজগার যোজনা', মহারাষ্ট্রের 'মাজি লেড়কি বহিন স্কিম', ছত্তিশগড়ের 'মাতারি বন্ধন যোজনা' এইরকম কয়েকটি উদাহরণ। এই সমস্ত স্কিমে ধার্য টাকার পরিমাণ, এবং নতুন নতুন সুযোগসুবিধা ভোটের প্রাক্কালে সব রাজ্যেই বাড়ানো হয়, সেই দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গ নতুন কিছু করেনি। কিন্তু সমস্যা হল, এই ধরনের ডোল অর্থনীতিতে উন্নয়নের গতিপথ সংকীর্ণ হতে হতে একসময় পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে যায়। সেটা ক্ষমতায় থাকা সরকার বোঝেনা তা নয়, তবে এখানে ভোটে জেতা ব্যাপারটি এতই প্রাধান্য পায়, নিজেদের অস্তিত্ব ও স্বার্থ বাঁচাতে দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের চিন্তাকে মাথা থেকে বের করে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করে। ফলে যেটুকু অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা থাকে সেটা কন্যাশ্রী, ঐক্যশ্রী, বিধবা ভাতা, যুব ভাতা, দুর্গাপুজোয় ক্লাবগুলোর মোচ্ছবের টাকা যোগাতেই খরচ হয়ে যায়। তারপরও যেটুকু অবশিষ্ট থাকে তাতে করে আর যাই হোক, শিল্পায়ন বা কর্মসংস্থান হয়ে ওঠে না। ফলে ভেঙে পড়া অর্থনীতি আরও ভেঙে পড়ে। রাজনীতির রাঘব বোয়ালরা আর্থিক প্রাচুর্যে ফেঁপে ওঠে আর সাধারণ মানুষকে অনুদানের ছিটেফোঁটা ছিটিয়ে খুশিয়াল রাখার চেষ্টা হয়। সাধারণ মানুষও কিছু না পাওয়ার চেয়ে কিছু পাওয়া ভালো ভেবে যুবসাথী প্রকল্পের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ায়, কিছুদিন পর কাজ না পাওয়ার দুঃখ ভুলে আস্তে আস্তে ডোল অর্থনীতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
শুধু ভারতে নয়, মুফতে পাইয়ে দেওয়া পলিসি নিয়ে রাজনীতি সারা বিশ্বজুড়ে। সময় সময় এই পলিসির আশু প্রয়োজন অস্বীকার করা না গেলেও দীর্ঘকালে অর্থনীতিতে এর ঋণাত্মক প্রভাব হয় ভয়ংকর। রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালনে বিনামূল্যে দ্রব্য ও সেবা বিতরণ থেকে শুরু করে জনগণের হাতে সরাসরি নগদ টাকা তুলে দেয়। এই 'ফ্রিবিস' প্র্যাকটিস নতুন কিছু না হলেও ইদানিং এর ব্যাপ্তি ধারে ও ভারে বিপজ্জনক হারে বেড়ে গেছে।
ফ্রিবিস কি?
ফ্রিবিস হল সরকার, ব্যবসায়ী বা রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ কর্তৃক দেয় দ্রব্য ও সেবাসামগ্রী যার জন্য প্রাপককে কোনও মূল্য দিতে হয়না। স্বভাবতই এটা বিনা কারণে ঘটেনা। কারণগুলি মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, মানুষ অর্থাৎ ভোটারদের আস্থা অর্জন, রাজনৈতিক মতামত দ্বারা মানুষকে প্রভাবিত করা এবং নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা। নীতি প্রয়োগের দৃষ্টিকোণ থেকে ফ্রিবিসের মধ্যে সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্প, ভর্তুকি, করছাড় বা বিনামূল্যে বিতরিত দ্রব্যসামগ্রীর অন্তর্ভুক্তি থাকতে পারে। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে সামাজিক প্রয়োজন নিরসন করতে পারলেও, ফ্রিবিস নীতির প্রকোপ সরকারি রাজকোষে এবং সাহায্যপ্রার্থী জনগণের কর্মদক্ষতার প্রশ্নে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিতে পারে। সরকারের দেওয়া ফ্রিবিসের এই সুবিধা যদি সঠিক মানুষদের কাছে না পৌঁছে সমরাজনীতি মতাদর্শের মানুষদের তুষ্ট করার জন্য করা হয়, তখন সেটা সামাজিক বৈষম্য দূর করার পরিবর্তে অসাম্য ও বিভেদ আরও বাড়িয়ে তোলে। ফ্রিবিস পলিসি রাজনীতি, সার্বিক কল্যাণ এবং আর্থ-সামাজিক বিবেচনার মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংকট তৈরি করে।
রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া'র এক রিপোর্ট অনুযায়ী, 'ফ্রিবিস' শব্দটির কোনও নির্দিষ্ট সংজ্ঞা না থাকলেও এর সাথে সরকারি দ্রব্য অর্থাৎ পাবলিক গুডসের তফাৎ বুঝে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। বিনামূল্যে পাওয়া বিদ্যুৎ, জল, সরকারি পণ্য পরিষেবা, ঋণমুক্তি ইত্যাদি যখন ফ্রিবিসের আওতায় পড়ে, তখন সরকারি গণবন্টন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় ভর্তুকি ও অনুদান হল পাবলিক গুডস। রিপোর্টে ফ্রিবিস অর্থাৎ ডোল অর্থনীতির মূল সমস্যাগুলির কথা বলা হয়েছে - এক, ঋণ পরিশোধ করার অভ্যাস নষ্ট করে, দুই, দাম ব্যবস্থায় বিরূপ প্রভাব ফেলে, তিন, বেসরকারি বিনিয়োগে উৎসাহ হ্রাস ঘটায়, এবং চার, বাজার চলতি মজুরিতে শ্রমিকদের কাজ করার অনীহা তৈরি করে।
ভারতে ফ্রিবিস চর্চা
ফ্রিবিস হল বিনামূল্যে বিতরিত দ্রব্য ও সেবার চর্চা যেটি অব্যবহিত মুনাফা এবং দীর্ঘস্থায়ী কল্যাণের মধ্যে নির্বাচন সংকট তৈরি করে। ফ্রিবিসের সমর্থকদের মতে, একটি সুপরিকল্পিত ফ্রিবিস পলিসি ভর্তুকি ও অনুদানের মাধ্যমে সমাজের দরিদ্রতম মানুষদের দু'বেলার খাবার আর ন্যূনতম জীবনযাত্রা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। তাদের বিশ্বাস এই বণ্টন ব্যবস্থা অর্থনীতিতে একইসঙ্গে দক্ষতা (efficiency) ও সাম্যতা (equity) বজায় রাখতে সাহায্য করে। এই বিতরণ ব্যবস্থায় সামাজিক সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে সর্বাপেক্ষা উপযোগিতা লাভ করা সম্ভব হয়, যেটি পারদর্শিতা বা এফিসিয়েন্সিকে নিশ্চিত করে, অন্যদিকে ধনীদের উপর কর ধার্য করে সেই করের টাকা বিভিন্ন খাতে অনুদান হিসেবে দরিদ্রদের হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যমে ইক্যুইটি বা সাম্যতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়।
অন্যদিকে এই পলিসির সমালোচকরা ভিন্নমত পোষণ করেন। তাঁদের মতে অনুদাননির্ভর অর্থনীতিতে উন্নয়ন পদে পদে বাধাপ্রাপ্ত হয়। মূলধনের বিনিয়োগ যদি অনুৎপাদন খাতে ব্যয় হয় তাহলে মোট জাতীয় উৎপাদন বাড়তে পারে না, উল্টে মূলধনের পরিমাণ কমে যাওয়ার ফলে পরবর্তী বছরগুলিতে জাতীয় উৎপাদন কমার সম্ভাবনা দেখা যায়। খরচ সামলাতে সরকারের ঋণের বোঝা বাড়ে। এই কারণে পাঞ্জাব ভারতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রাজ্য, এর ঋণ-রাজ্য স্থূল উৎপাদনের অনুপাত (debt-GDP Ratio) হল ৪৫ শতাংশ। রাজস্থান, কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গও পিছিয়ে নেই, তাদের এই অনুপাত হল ৩৫ শতাংশ। ফ্রিবিস পলিসি এই সমস্ত রাজ্যগুলির ঋণের বোঝা দিনের পর দিন বাড়িয়ে চলেছে, ঋণ জর্জরিত রাজ্যগুলোও নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আরও বেশি বেশি অনুদান ও ভর্তুকি দিয়ে নিজেদের ঋণের বোঝা বিপজ্জনক সীমায় নিয়ে গিয়ে তুলছে। উদাহরণস্বরূপ আবার রাজস্থানের কথা আসে। এই রাজ্যে বিধানসভার ভোট ছিল ২০২৩-২৪ সালে। ২০২৩ সালের বাজেটে রাজস্থান সরকার বিনামূল্যে স্মার্টফোন, স্কুটার, ল্যাপটপ বিলি করে এবং ঘরোয়া বিদ্যুৎ ও এলপিজি সিলিন্ডারে প্রচুর পরিমাণে ভর্তুকি দিয়েছিল। যার ফলশ্রুতিতে ২০২৩ সালের মার্চ মাসে এই রাজ্যের ঋণের পরিমাণ পৌঁছেছিল ৫.৩৭ লক্ষ কোটি টাকায়। রাজ্য ধরে ধরে এই হিসেবে করলে দেখা যাবে ভারতের অনেক রাজ্যই দেউলিয়া হওয়ার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছে।
ফ্রিবিস নিয়ে বিতর্ক: জনকল্যাণমূলক নাকি উন্নয়ন বিরোধী
ফ্রিবিস সমর্থকদের মতে এই পলিসির মূল লক্ষ্য তিনটি: এক, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটানো; দুই, তাদের সার্বিক কল্যাণ সুনিশ্চিত করা; এবং তিন, মানব উন্নয়নকে অর্থনৈতিক ও কর্পোরেট স্বার্থের উপরে স্থান দেওয়া। গবেষকদের মতে সরকার যদি জনগণের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকে কম ব্যয়বহুল বা ফ্রি করে দেয় তাহলে সেটা মানব সম্পদ উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। তাঁদের মতে উন্নত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য দক্ষ শ্রমিকের যোগান সুনিশ্চিত করবে, যেটি ভবিষ্যতে দেশের জাতীয় আয় বৃদ্ধির সহায়ক হয়ে উঠবে। গবেষণায় এটাও উঠে এসেছে, ফ্রিবিস পলিসি জনগণ বিশেষ করে প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মানুষদের সম্পদ ব্যবহারের অধিকার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ সুনিশ্চিত করে। একথা অনস্বীকার্য, এই অনুদান নীতির (dole economy) ফলে কিছু মানুষ উপকৃত হচ্ছে। বিশ্বের কিছু দেশে বিনামূল্যের এই সামাজিক পরিষেবা সুফল পেয়েছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার কথা ধরা যাক, যেখানে এই ফ্রিবিস পলিসি বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু ভারত বা পশ্চিমবঙ্গের সাথে এই দেশটির তফাৎ হল - এক, ওখানে টাকা খরচ করা হয় জনকল্যাণমূলক খাতে, ভোট কেনার জন্য নয়; দুই, এই দেশগুলিতে দুর্নীতি প্রায় নেই বললেই চলে। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটা হয়না। বিনামূল্যে বিতরিত দ্রব্য ও পরিষেবা দিতে গিয়ে যেসমস্ত উন্নয়ন বা সমাজকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোকে জলাঞ্জলি দিতে হয় তাতে অর্থনীতির দীর্ঘকালীন উন্নয়ন ব্যহত হয়। ক্ষমতায় থাকা সরকার এই 'কস্ট-বেনিফিট পর্যালোচনা'র পথে হাঁটে না, সাধারণ মানুষও আপাত প্রাপ্তিকে উন্নয়ন মনে করে ভোট বাক্সে তাঁদের সমর্থন জারি করে। তাই সমর্থকদের দাবি মতো সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার বিষয়গুলো যেমন সত্য তেমনই অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে একটা পর্যায়ের পর আপোস করলে সেটা আদতে গোটা সমাজের জন্যেই বিপদ ডেকে আনবে, সেটাও ভুললে চলবে না।
আরেক দলের মতে এই জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলি দীর্ঘকালে দেশের আর্থিক সংস্থানকে দুর্বল ও পঙ্গু করে তোলে। বিরোধীদের মতে ফ্রিবিস পলিসি হয়তো সমাজের নির্দিষ্ট কোনও শাখাকে সাময়িক স্বস্তি দেবে, কিন্তু তার ফলে সরকারি কোষাগারে বিরূপ প্রভাব ফেলার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে টেকসই উন্নয়নকে ব্যাহত করবে। রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ফ্রিবিস স্বল্পকালে রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে পারলেও, সময়ের সাথে রাজস্ব ঘাটতি এবং সরকারি ঋণের বোঝা বাড়িতে তোলে। তাই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও আর্থিক দায়বদ্ধতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে ওঠে। যার নিট ফল হয় উন্নয়নের সাথে রফা। এছাড়া ফ্রিবিসের ফলে জনগণের হাতে অতিরিক্ত অর্থ এসে পড়ায় বাজারে কৃত্রিম চাহিদার সৃষ্টি হয়, এই বৃদ্ধি যেহেতু বাজার সূত্র মেনে ঘটেনা তাই সঙ্গে সঙ্গে যোগানের বৃদ্ধি ঘটানো সম্ভব হয়না। ফলস্বরূপ দামের বৃদ্ধি ঘটে এবং অর্থনীতিতে এক অনভিপ্রেত মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অনেকসময় উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে অল্পবিস্তর অনুদান বিকাশের গতিকে পুরোপুরি রুদ্ধ করেনা, যদি কিনা পাশাপাশি সরকার উৎপাদন ও পরিকাঠামো উন্নয়নেও বিনিয়োগ অব্যাহত রাখে। বিশ্বের অনেক দেশে এটা দেখা গেছে। কিন্তু আমাদের দেশে, বিশেষ করে আমাদের রাজ্যে, দুর্নীতি ও পাইয়ে দেওয়া রাজনীতি এমন একটা মাত্রায় পৌঁছেছে, যেটা উন্নয়নের সম্ভাব্য সমস্ত রাস্তাগুলিই বন্ধ করে দিয়েছে। দুর্নীতির উপর কোনও নিয়ন্ত্রণ না থাকলে বা সরকার ও দুর্নীতি সমার্থক হয়ে পড়লে অর্থনীতি স্থবির ও পঙ্গু হয়ে পড়ে। চিন্তার কথা হল, আমরা সেই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। এখানে দুর্নীতি হচ্ছে শিক্ষা নিয়ে, স্বাস্থ্য নিয়ে, শিল্প, পরিকাঠামো, সেবাক্ষেত্র কোনোকিছুই তার বাইরে থাকছে না। এই তথ্য প্রযুক্তির যুগে যখন 'এআই'-এর প্রয়োগ দিনদিন বেড়ে চলেছে, তখন দেশের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের স্থান অনেক পিছনে। বেঙ্গালুরু বা হায়দরাবাদের কথা ছেড়েই দিলাম, আমরা পুনের তুলনাতেও কয়েক আলোকবর্ষ পিছিয়ে আছি। রাজনৈতিক মদতপুষ্ট সিন্ডিকেটরাজ আর অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে নতুন বিনিয়োগকারীরা এই রাজ্যে আসতে ভয় পাচ্ছেন। অন্য রাজ্যের সরকারের মতো এই রাজ্য পরিকাঠামো উন্নয়নে নজর দিচ্ছেনা। উত্তরপ্রদেশ বা গুজরাটের মতো রাজ্যে পরিকাঠামো খাতে বাজেটের ২০-২২ শতাংশ বরাদ্দ করা হয়, সেখানে পশ্চিমবঙ্গে খরচ হয় মাত্র ৫-৭ শতাংশ। এইটুকু বরাদ্দে যা হওয়া সম্ভব এরাজ্যে তাই হচ্ছে। বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, শিল্প নেই, কাজ নেই, শিক্ষা-চাকরির খোঁজে যুবসমাজ ভিন রাজ্যে পাড়ি দিচ্ছে, মেধা পাচার ঘটছে; আর যারা পড়ে থাকছে তারা না পাচ্ছে যথাযথ শিক্ষা, না চাকরি, ফলে বাধ্য হয়েই তারা এই ডোল অর্থনীতির শিকার হয়ে সরকারের দয়াদক্ষিণ্যের উপর নির্ভর করে দিন গুজরান করছে।
যে সরকার তার কাজের মধ্যে দিয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেনা, তারা ভোট জেতার জন্য ডোল অর্থনীতির উপর বেশি করে নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। তারা চায়না মানুষ দারিদ্র্যের ফাঁস কাটিয়ে বেরিয়ে আসুক। কারণ স্বনির্ভর মানুষ নিজেদের অধিকার সম্বন্ধে সচেতন হয়, স্বাবলম্বী নাগরিক সমাজ প্রশ্ন করতে শেখে। তাই মানুষের স্বনির্ভরতা তাদের রাজনৈতিক অস্তিত্বের পক্ষে বিপজ্জনক। অন্যথায় ডোলনির্ভর সমাজ দাতা ও সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। রাজ্যের অর্থনীতি আস্তে আস্তে দেউলিয়া হওয়ার পথে হাঁটতে শুরু করেছে, তাই চার আনা, ছয় আনা, আট আনার নেতা থেকে শুরু করে, মন্ত্রী-সান্ত্রী-পাত্র-অমাত্য নিজেদের সম্পদ গোছাতে মত্ত যাতে করে রাজ্য তথা দেশের ভবিষ্যৎ ছারখার হয়ে গেলেও নিজেদের কয়েক পুরুষের ভবিষ্যৎ যেন সুরক্ষিত থাকে। গত এক দশকে জিম্বাবোয়ে, শ্রীলঙ্কা, লেবাননের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলেই বিষয়টির সম্যক অবধাবন ঘটবে। তাই আমরা কিভাবে অন্য কিছু আশা করতে পারি?
ফ্রিবিস পলিসির সবচেয়ে বড় ত্রুটি হল, এর ফলে মানুষ দিনে দিনে অলস, অক্ষম ও অদক্ষ হয়ে ওঠে। বিনায়াসে জীবনধারণের প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো মুফতে পেয়ে গেলে মানুষ কাজ করার আগ্রহ হারায়, ব্যবহারের অভাবে তাদের পারদর্শিতা নষ্ট হয়। এর ফলে সুদূর ভবিষ্যতে টেকসই উন্নয়নের পরিবর্তে আর্থিক প্রগতি থমকে যায় এবং একসময় মুখ থুবড়ে পড়ে। এই পলিসির সমর্থকরা যতই সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের আর্থিক উন্নয়নের কথা বলে বক্তৃতাসভা গরম করুকনা কেন, এই অনুদান পদ্ধতি মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে ব্যবহার করা হয়, আসল লোকেরা বাদ পড়ে যায়, বেছে বেছে তাদেরই দেওয়া হয় যাদের কিছু পাইয়ে দিয়ে সহজেই ভোটবাক্সের অঙ্কটা নিজেদের অনুকূলে আনা যায়৷ ফ্রিবিস পলিসির সঠিক রূপায়ণ ও ফলের জন্য দরকার হল, স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা, এবং শক্তিশালী ডেলিভারি সিস্টেম, দুর্ভাগ্যবশত এর কোনোটাই এই পোড়া রাজ্যে নেই। তাই ডোল-নির্ভর অর্থনীতির যা পরিণতি হয় সেই দিকেই চোখ বন্ধ করে আমরা এগিয়ে চলেছি।
বিশ্ব অর্থনীতি ও ফ্রিবিস পলিসি
বিশ্বের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ফ্রিবিস পলিসির প্রভাব তার প্রয়োগ ও উদ্দেশ্যের উপর নির্ভর করে। ব্রাজিলে 'বোলসা ফ্যামিলিয়া প্রোগ্রাম' দারিদ্র্য মোচনে সহায়তা করলেও দেশের আর্থিক অস্থিরতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অন্যদিকে 'শর্ত সাপেক্ষে ক্যাশ ট্রান্সফার পলিসি' কেনিয়ায় অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিপন্থী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। এমনকি উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বহু দেশে এই অনুদানের নীতি সরকারি কোষাগারের উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে এবং অন্যদিকে জনগণ আরও বেশি বেশি করে সরকারের অনুদানের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
মানব সভ্যতা সৃষ্টির প্রথম থেকেই এই উপঢৌকন বা দান-অনুদানের চর্চা চলে আসছে। একটা সময় প্রভাবশালী রাজাগজারা সাধারণ প্রজাবর্গের কাছ থেকে উপঢৌকন পেতেন, এখন প্রবাহটি উল্টে গেছে। এখন রাজা তথা শাসককে তার মসনদ তথা গদি রক্ষার্থে ভোটারদের অনবরত ভেট দিতে হয়। আধুনিক রাজনীতিতে সেই নীতিরই প্রয়োগ ঘটছে। রাজনৈতিক দলগুলো যদি এর পরিবর্তে শিক্ষা, শিল্প, স্বাস্থ্য, পরিকাঠামো উন্নয়নে নজর দেয় তাহলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল সমাজের সমস্ত শ্রেণির মানুষের কাছেই পৌঁছবে। মানুষ শিক্ষা পাবে, কাজ পাবে, স্বাবলম্বী হবে, নতুন ও উন্নত কলাকৌশল আবিষ্কৃত হবে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নতুন নতুন উদ্ভাবন ঘটবে৷ তখন স্বাবলম্বী মানুষ সরকারের সাহায্যের উপর নির্ভর না করে নিজেদের মেধা ও কর্মদক্ষতার সঠিক প্রয়োগ ঘটিয়ে নিজেদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন তথা রাজ্য ও দেশের সার্বিক কল্যাণ ঘটাবে। মাদ্রাজ হাইকোর্টের ২০২১ সালের সুপারিশে ঠিক এই কথাগুলোই বলা আছে। শ্রীলঙ্কার আর্থিক বিপর্যয় আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেছে আর্থিক স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীল প্রশাসন যেমন জরুরি, তেমনই হ্যান্ডসআউট সংস্কৃতি থেকে অতি সত্বর বেরিয়ে আসাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।