আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ পঞ্চম সংখ্যা ● ১-১৫ মার্চ, ২০২৬ ● ১৫-৩০ ফাল্গুন, ১৪৩২

প্রবন্ধ

ভারতের স্বাধীনতার একমাত্রিক সহজ পাঠ

রঞ্জন রায়


১.০ পটভূমি

আজকাল শুনতে পাই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস নতুন করে লেখার আহ্বান। এতদিন যা পড়ানো হয়েছে সব নাকি ভুল।

এর সঙ্গে চলছে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের পুনর্লিখনের নামে গান্ধী এবং নেহরুর অবদানকে খারিজ করে নেতাজি সুভাষ ও সাভারকরকে বড়ো করে তুলে ধরার প্রচেষ্টা। সেটা করতে গিয়ে তথ্যনিষ্ঠ নতুন গবেষণা ও বিশ্লেষণের বদলে পরিবেশন করা হচ্ছে অ্যানেকডোট ও গালগল্প।

দুটো বিন্দুর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

এক, নেহরু পরিবার নাকি আদতে মুসলিম। এই গল্পে মতিলাল নেহরু থেকে ইন্দিরা গান্ধী এবং ফিরোজ গান্ধীর তথাকথিত 'আসল' মুসলিম নামও ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। সাক্ষী মানা হচ্ছে নেহরুর ব্যক্তিগত সচিব মাথাইয়ের স্মৃতিচারণ। অথচ, বিখ্যাত এবং সহজলভ্য বইটির পাতা ওলটালেই চোখে পড়বে এগুলো একেবারে যাকে বলে 'সফেদ ঝুঠ'। মাথাই তাঁর সরকারি পদে থাকাকালীন বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনা এবং ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যোগাযোগের কোলাজ এঁকেছেন, নেহরু পরিবারের ঠিকুজি কুষ্ঠি ঘাটেননি।

দুই, সাম্প্রতিক প্রচার হল ইংরেজ ভারত ছেড়ে 'রাতারাতি' পালিয়েছে ভয়ে। কার ভয়ে? অবশ্যই 'কুইট ইণ্ডিয়া' আন্দোলনের ভয়ে নয়। নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজের লড়াই ও মুম্বাই বন্দরে নৌবিদ্রোহের অভিঘাতে।

ইতিহাসের অমন সাদাকালো ব্যাখ্যা শুনলে দুটো প্রশ্ন মনে জাগে।

এক, ইংরেজ কি সত্যিই 'রাতারাতি' আমাদের দেশ ছেড়ে পালিয়েছিল? নাকি দীর্ঘ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিল? তথ্য কী বলে? তাহলে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দশ মাস ধরে লর্ড মাউন্টব্যাটেন কী করে ভারতের গভর্নর জেনারেল পদে থাকেন? আর জেনারেল স্যার ফ্রান্সিস রে বুচার কী করে ১৫ জানুয়ারি, ১৯৪৯ পর্যন্ত স্বাধীন ভারতের সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক রয়ে গেলেন?

দুই, গত শতাব্দীতে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে ৬৫টি দেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। তাতে আইএনএ এবং ভারতের নৌবিদ্রোহের ভূমিকা কোথায়?

দ্বিতীয় প্রশ্নটির উত্তর আগে খুঁজে দেখা যাক।

দু'শো বছরের ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকে ভেঙে পড়ছিল। মোট ৬৫টি দেশ গত শতাব্দীতে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আসে। এখানে শুধু ১৯৬৫ সাল অব্দি স্বাধীন হওয়া ২৯টি দেশের তালিকা দেয়া হল। দেশের নাম ও স্বাধীন হওয়ার সাল বন্ধনীর মধ্যে।

আফগানিস্তান (১৯১৯), মিশর (১৯২২), ইরাক (১৯৩২), জর্ডন (১৯৪৬), ভারত (১৯৪৭), পাকিস্তান (১৯৪৭), শ্রীলংকা (১৯৪৮), মায়ানমার (১৯৪৮), ইজরায়েল (১৯৪৮), লিবিয়া (১৯৫১), সুদান (১৯৫৬), মালয় (১৯৫৭), ঘানা (১৯৫৭), সাইপ্রাস (১৯৬০), নাইজেরিয়া (১৯৬০), সোমালিল্যান্ড (১৯৬০), কুয়েত (১৯৬১), সিয়েরা লিওন (১৯৬১), ট্যাঙ্গানাইকা (১৯৬১), জামাইকা (১৯৬২), ত্রিনিদাদ (১৯৬২), উগান্ডা (১৯৬২), কেনিয়া (১৯৬৩), জাঞ্জিবার (১৯৬৩), জাম্বিয়া (১৯৬৪), মালাউই (১৯৬৪), মাল্টা (১৯৬৪), মালদিভ (১৯৬৫), গাম্বিয়া (১৯৬৫)।

ভারত উপমহাদেশের অনেক আগে মিশর, আফগানিস্তান, ইরাক, এবং জর্ডন স্বাধীন হয়। আর ভারত-পাকিস্তানের পরের বছর স্বাধীন হয় ইজরায়েল, মায়ানমার ও শ্রীলংকা। আইএনএ-র বড়ো রিক্রুটমেন্ট যেখান থেকে হয়েছিল, মালয়, সেখানে স্বাধীনতা আসে আরও দশ বছর পরে ১৯৫৭ সালে। অতএব ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ার অন্য কোনো কারণ ছিল যা শুধু ভারত নয় আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর স্বাধীনতার কারক তত্ত্ব বা ক্যাটালিস্টের কাজ করেছে।

এখানে আমরা আলোচনা ভারত পাকিস্তানের স্বাধীনতা পাওয়ার রূপরেখার মধ্যে সীমিত রাখব।

অর্ত্থাৎ সত্যিই ইংরেজ আচমকা ভারতে ছেড়ে পালিয়েছিল কিনা। আগে দেখা যাক এই বিবরণের উৎস কোথায়।

এই প্রশ্নের গবেষণা ও বিশ্লেষণের জন্যে আমি দিল্লিবাসী বন্ধু সাংবাদিক শ্রী প্রিয়দর্শী দত্তের কাছে ঋণী।

২.০ 'মরা দেশ মরা মানুষ ছেড়ে পালালো ইংরেজ', কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়

২.১ গল্পের শুরু

ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদারের 'বাংলাদেশের ইতিহাস' (খন্ড ৪) প্রকাশিত হলে তাঁর প্রাক্তন ছাত্র এবং বইটির প্রকাশক সুরেশ চন্দ্র দাস একটি হাতে লেখা চিঠি পেলেন। লেখক ফণীভূষণ চক্রবর্তী কলকাতা হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি (১৯৫২-৫৮)। তিনি ১৯৫৬ সালে তিন মাসের জন্য পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালের অস্থায়ী দায়িত্ব সামলেছিলেন।

তিনি লিখেছেন, ব্রিটেনের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্স অ্যাটলী (যাঁর সময়ে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীনতা পায়) ১৯৫৬ সালে ভারত ভ্রমণে এসে কলকাতায় দুই দিনের জন্যে রাজভবনে অতিথি হয়েছিলেন।

জাস্টিস চক্রবর্তী অ্যাটলীকে প্রশ্ন করেছিলেন, ব্রিটেন যদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কুইট ইণ্ডিয়া আন্দোলনকে সামলে থাকে তাহলে যুদ্ধের পরে হঠাৎ তাড়াতাড়ি ভারত ছেড়ে চলে গেল কেন?

উত্তরে অ্যাটলী নাকি কয়েকটি কারণের কথা বলেছিলেন; তবে জোর দিয়েছিলেন ক্রাউনের প্রতি ভারতীয় ফৌজে আনুগত্যের হ্রাস, যা নেতাজি সুভাষ চন্দ্রের আজাদ হিন্দ ফৌজের বিদ্রোহের প্রভাবের ফল। হ্যাঁ, আনুগত্যের শপথ নেয়া সত্ত্বেও ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মির বন্দী সৈন্যদের অনেকে আজাদ হিন্দ ফৌজে যোগ দিয়েছিল। আজাদ হিন্দ ফৌজের মিশন ব্যর্থ হলেও লালকেল্লায় তাঁদের বিচারের ঘটনা (সেকেন্ড রেড ফোর্ট ট্রায়াল, ১৯৪৫-৪৬) গোটা দেশের জনমানসে এমন আবেগের জন্ম দিয়েছিল যে ব্রিটিশ সরকার কাউকেই দেশদ্রোহের শাস্তি দিতে পারেনি।

তারপর ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬-এ ঘটে বোম্বাই বন্দরে নৌবিদ্রোহ, অবশ্যই আজাদ হিন্দ ফৌজের লড়াইয়ের অপ্রত্যক্ষ প্রভাবে।

শেষে জাস্টিস চক্রবর্তী প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলীকে ভারত ছাড়ার পেছনে গান্ধীর আন্দোলনের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন করেন। তাঁর ভাষায় অ্যাটলী ব্যঙ্গাত্মক ঢঙে বলেন - 'mi-i-ni-mal'! চিঠিতে জাস্টিস ঠিক এভাবেই 'মিনিম্যাল' লিখেছেন।

ডঃ মজুমদার নব্বই পেরিয়ে তাঁর স্মৃতিকথা 'জীবনের স্মৃতিদীপে' (১৯৭৮)তে- এই ঘটনার উল্লেখ করেছেন বইটির পরিশিষ্টে (পৃ: ২২৮-২৩১), এবং হাতে লেখা চিঠিটির প্রতিলিপি সংযুক্ত করেছেন, তবে বিনা কোনো মন্তব্যে। তিনি তাঁর স্বাধীনতা আন্দোলনের গবেষণাভিত্তিক কোনো বইয়ে ঘটনাটির উল্লেখ করেননি।

কিন্তু, অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল জি. ডি. বক্সী তাঁর নেতাজিকে নিয়ে লেখা বই 'Bose, An Indian Samurai' (2016)-এ এই চিঠি নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তারপর নেতাজি গবেষক অনুজ ধর ও চন্দ্রচুড় ঘোষ অ্যাটলীর ১০৫৬ সালে কোলকাতা ভ্রমণের এবং জাস্টিস চক্রবর্তীর সঙ্গে তোলা ফটো উদ্ধার করে ট্যুইটারে পোস্ট করেন।

এবং ভারতের স্বাধীনতা লাভের এক সরলরৈখিক ব্যাখ্যা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার শুরু হয়।

২.২ যে সাক্ষ্যগুলো অগ্রাহ্য করা হয়

নেতাজি সুভাষের দেশপ্রেম, বীরত্ব ও নিষ্ঠা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। এটাও সত্যি যে কুইট ইন্ডিয়া আন্দোলন সমাপ্ত হলে কংগ্রেস নেতৃত্ব যেন দিশাহীন হয়ে পড়লেন।

১৯৪৫ সালের সিমলা সম্মেলন, পুণা সম্মেলন এবং বোম্বাইয়ে বৈঠক সব ব্যর্থ, পরবর্তী প্রোগ্রাম নিয়ে নেতারা একমত নন। মৌলানা আজাদ লিখছেন - গান্ধীজি সমেত নেতৃত্বের অধিকাংশের মত হল এই মুহূর্তে আন্দোলন না করে কিছু গঠনমূলক কাজ করা হোক। মৌলানা আজাদ নিজে, তখন কংগ্রেসের সভাপতি, বললেন - আমাদের প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলীর নেতৃত্বে তৈরি নতুন লেবার গভর্নমেন্টের উপর ভরসা রাখা উচিত। তাই নতুন আন্দোলন না করে যে সাধারণ নির্বাচনের আশ্বাস দেয়া হয়েছে তাতে অংশগ্রহণ করা উচিত। ('India Wins Freedom', Page: 141)

কিন্তু তেতো সত্যি কথা হল,

• ভারত ঔপনিবেশিক শাসকের সামরিক শক্তির সঙ্গে মুখোমুখি লড়াই করে স্বাধীনতা পায়নি, যেমনটি পেয়েছিল আমেরিকা (অষ্টাদশ শতাব্দী) গ্রিস (উনবিংশ শতাব্দী) এবং বাংলাদেশ (বিংশ শতাব্দীতে)।

• উপরের তিনটি উদাহরণেই অন্তিম বিজয় পর্যন্ত লড়াই থামেনি, টেবিলে বসে চা খেতে খেতে দু'পক্ষ আলোচনা করেনি, যা ভারতের আন্দোলনের ক্ষেত্রে একাধিকবার হয়েছে।

• খোলা চোখে এই সত্যিটা মেনে নেয়া বর্তমান শতাব্দীতে মুশকিল, কেননা আমরা এখন স্বঘোষিত বিশ্বগুরু।

• তাই ন্যারেটিভ তৈরি করতে হবে যাতে অষ্টাদশ শতাব্দীর আমেরিকানদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মতো ইংরেজদের মেরে তাড়ানোর কাছাকাছি কিছু বলা যায়। অতএব বলা হচ্ছে, ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬ সালের নৌবিদ্রোহের ফলে 'mortally afraid' ইংরেজ 'রাতারাতি' ১৫ অগাস্ট, ১৯৪৭ তারিখে দেশ ছেড়ে পালায়।

কোনো দেশে বিদ্রোহীরা তার সামরিক প্রভুদের আত্মসমপর্ণের জন্যে ১৮ মাস সময় দেয়! অথচ, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে কোনো বিদ্রোহ হয়নি। বরং বার্মা সীমান্তে ও মণিপুরে জাপানী ফৌজ ও আজাদ হিন্দ বাহিনীকে যারা সামরিকভাবে মোকাবিলা করেছিল তারা ভারতীয় ফৌজ। নেতাজির আশা সফল হয়নি। হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া কেউ দলত্যাগ করে আইএনএ-র পক্ষে যোগ দেয়নি।

• ফেব্রুয়ারি ১৯৪৬-এর নৌবিদ্রোহ দমনের সময় থেকে আঠারো মাস পরে ইংরেজ ভারত ছেড়ে যাবার দিন পর্যন্ত ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে ব্রিটিশ প্রভুদের বিরুদ্ধে কোনোরকম বিক্ষোভ, বিদ্রোহ বা অসন্তোষ দেখা যায়নি। বরং ওই সময়ে ফৌজের মধ্যে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনায় সাম্প্রদায়িক বিভেদ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। হিন্দু ও শিখ সৈনিকেরা ভারত রাষ্ট্রে এবং অধিকাংশ মুসলিম সৈন্য পাকিস্তানে যোগ দেবার পক্ষে মত প্রকাশ করে।

৩.০ আজাদ হিন্দ ফৌজের লড়াই এবং নৌবিদ্রোহ বনাম স্বাধীনতা

৩.১ ভারতের স্বাধীনতা লাভ কোনো হঠাৎ একদিনে পাওয়া ঘটনা নয়।

গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়া অ্যাক্ট, ১৯১৯-এর ঘোষিত লক্ষ্য ছিল ভারতে একটি 'দায়িত্বশীল সরকার' স্থাপন করা, যার অধীনে আঞ্চলিক ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আইনসভা গঠিত হবে। অবশ্যই গোড়াতে ভোটাধিকার 'সার্বজনীন' ছিলনা, ভিত্তি ছিল অনেক সংকীর্ণ। এই আখ্যান মূর্ত রূপ পেল ইংল্যান্ডের পার্লিয়ামেন্টে গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়া অ্যাক্ট, ১৯৩৫ পাশ হওয়ায়, যার অধীনে নির্বাচন হলে কংগ্রেস ১১টি রাজ্যে প্রাদেশিক সরকার গঠন করে। উল্লেখযোগ্য, এটাই ছিল ২০১১ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ সংসদে পাশ হওয়া সবচেয়ে দীর্ঘ আইন।

৩.২ কেন ব্রিটিশরা ভারতে কাঠামোগত পরিবর্তন করে দেশ পরিচালনার ক্ষমতা হস্তান্তরে আগ্রহী ছিল?

বিভিন্ন রাজ ঘরানার শাসনে থাকা দেশীয় করদ রাজ্যগুলো প্রজাদের হাতে ক্ষমতা দেওয়ার কথা কখনও ভাবেনি। অথচ, আমাদের দেশের ৪৫ শতাংশ ভৌগলিক এলাকা ও ২৫ শতাংশ জনসংখ্যা তাদের অধীনে ছিল।

ভারতে স্বায়ত্ত শাসনের পরিকল্পনা ব্রিটিশদের চিন্তায় অনেক আগে থেকেই ছিল। কীভাবে সেটা দেখা যাক।

তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র‍্যাশমজে ম্যাকডোনাল্ড ১৯৩০ সালের প্রথম গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতির ভাষণে বললেন, গ্রেট ব্রিটেনের সার্বভৌম ক্ষমতায় আসীন বিভিন্ন দেশনায়কেরা সময়ে সময়ে যা যা ঘোষণা করেছেন তার থেকে এটা স্পষ্ট যে ব্রিটেনের ভারতে কাজকর্মের লক্ষ্য হচ্ছে দেশকে স্বায়ত্ত শাসনের জন্যে প্রস্তুত করা।

কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ বা ওজনদার - ৮৯ প্রতিনিধির সামনে (ব্রিটিশ ভারতের ৫৭, দেশী রাজন্যবর্গের ১৬ এবং ব্রিটিশ রাজনৈতিক দলগুলোর ১৬) ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সরকারি ঘোষণা? নাকি একান্ত ব্যক্তিগত আলোচনায় কোনো প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর তথাকথিত আলাপচারিতা? ডক্টর আর. সি. মজুমদার এটাকে কোনো ইতিহাসের বইয়ে উল্লেখ করার যোগ্য মনে করেননি।

ব্রিটিশ যে ভারতে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য নৌবিদ্রোহ বা আজাদ হিন্দ ফৌজের বিচারের আগে থেকেই নির্ণয় নিয়ে ফেলেছে তার প্রমাণ চার্চিল মন্ত্রীসভার সেক্রেটারি অফ স্টেট (আমাদের গৃহমন্ত্রীর সমতুল্য) লিওপোল্ড আমেরি'র হাউস অফ কমন্সে ১৫ জুন, ১৯৪৫ তারিখের অভিভাষণ। (অনিল চন্দ্র বন্দোপাধ্যায় সম্পাদিত 'The Making of Indian Constitution 1939-47', Vol. 1, Page: 95)

একই দিনে দিল্লিতে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে সাড়ে পাঁচ ঘন্টার অভিভাষণে ভাইসরয় লর্ড ওয়াভেল ব্যাখ্যা করলেন যে প্রস্তাবগুলো তাঁরা ব্রিটিশ সরকারের থেকে অধিকৃত হয়ে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে পেশ করছেন, তার মাধ্যমে ভারত স্বায়ত্তশাসনের দিকে এগিয়ে যাবে।

চার্চিলের মন্ত্রী আমেরির এবং দিল্লিতে ভাইসরয় ওয়াভেলের বেতারে জারি বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে বহু প্রচলিত মিথ - চার্চিল ভারতে ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘোর বিরোধী - কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। তবে একথা অনস্বীকার্য যে বিশাল জনমত নিয়ে লেবার পার্টি জিতে ক্ষমতায় আসার ফলে প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলীর ক্ষমতা হস্তান্তরণ সহজ হয়ে যায়।

কিন্তু আইএনএ ও নৌবিদ্রোহের জেরে ইংরেজের পালিয়ে যাওয়ার তত্ত্বটি দাঁড় করাতে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলী নিজে তাঁর স্মৃতিকথায় 'As it happened (1954)'-এ ভারতের স্বাধীনতা নিয়ে কী বলেছেন।

"Successive British Governments had declared their intention of giving India full self-government. The end of the war would certainly bring a demand for these promises to be implemented. Furthermore, our allies the American people had very strong views, shared by the Administration, of the evils of imperialism."

নেতাজি সুভাষের উল্লেখ মাত্র একবার করা হয়েছে। বরং বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার আগেই ভারতের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে এবং সংবিধান সভার গঠন নিয়ে তাঁর ক্রিপস ও নেহরুর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার উল্লেখ রয়েছে। ('As it happened', পৃষ্ঠা: ১৮০-১৮১)।

নীরদ সি চৌধুরী ১৯৫৫ সালে প্রথমবার ইংল্যান্ডের মাটিতে পা রাখেন। তাঁর চোখে -
"I have never read about people,who have been so happy to lose an empire and so ready to think that the loss is really a great gain. That simply shows that in spite of having created the greatest empire the history has seen, the English people never had any real understanding of empires. Those who have do not lose them in less than two hundred years." ('A Passage To England', Page: 194).

নেতাজি সুভাষ স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য সৈন্যবাহিনী গঠন করে যুদ্ধে নেমে জীবন উৎসর্গ করে আমাদের ভালবাসার ও শ্রদ্ধার পাত্র হয়েছেন। তিনিও কিন্তু শুধু সামরিক শক্তিতে দেশ স্বাধীন করার কথা ভাবেননি। জার্মানি ও জাপান এবং বার্মা থেকে বিভিন্ন বেতার ভাষণে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, দেশের ভেতর কংগ্রেসের 'কুইট ইণ্ডিয়া' আন্দোলন এবং বাইরে থেকে আজাদ হিন্দের সামরিক অভিযান একে অন্যের পরিপূরক।

'দিল্লি চলো' নামে ওই বক্তৃতাগুলোর সংকলনে দেখা যায় তিনি গান্ধীজিকে 'জাতির জনক' আখ্যা দিচ্ছেন এবং আশীর্বাদ চাইছেন। তাই আজাদ হিন্দ ফৌজে সুভাষ বিগ্রেডের সঙ্গে গান্ধী ব্রিগ্রেড, নেহরু বিগ্রেড থাকে, সাভারকর ব্রিগ্রেড নয়।

ভারতে যেটা ঘটল তাকে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর বললে ভুল হবে না। সাংবাদিক ও ইতিহাসের গবেষক প্রিয়দর্শী দত্তের সিদ্ধান্ত -
"British rule thus came to end in India without bitterness towards former rulers, in sharp contrast to how French rule came to an end in Algeria or Vietnam".

পুরো অর্ধশতাব্দীব্যাপী অহিংস এবং সহিংস আন্দোলনের সমাহারকে এড়িয়ে কেবল আইএনএ এবং নৌবিদ্রোহকে দেশ স্বাধীন হওয়ার নির্ণায়ক বলে ঘোষণা করা সাময়িক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সিদ্ধ করতে পারে কিন্তু তা ইতিহাস চর্চা নয় এবং নেতাজির প্রতি সম্মান প্রদর্শনও নয়।