আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ পঞ্চম সংখ্যা ● ১-১৫ মার্চ, ২০২৬ ● ১৫-৩০ ফাল্গুন, ১৪৩২
প্রবন্ধ
এআই থেকে এআইসিসি — যন্ত্র বনাম গণতন্ত্র
শুভময় মৈত্র
ফাল্গুনের শুরু - দিল্লিতে যন্ত্রমেধা সম্মেলন - বসন্ত এসে গেছে। ইংরেজিতে বিষয়টি বেশ ট্রেন্ডি - এআই সামিট। ভবিষ্যৎ আসন্ন - মেশিন এখন ভাববে, মানুষ নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নেবে। রোবট বানাবে প্রেজেন্টেশান, নিজেকে বিবর্তন করা অ্যালগরিদম বানাবে নীতি, আর নাগরিকরা শুধু কবিতা লিখবে আর কাক আঁকবে - সেটাও এআই দিয়ে। এই আবহেই ফেব্রুয়ারি তেইশ (ফাল্গুনের দশ) কংগ্রেসের যুবশক্তি (কিছু আদুর গায়ে, কিছু স্যান্ডো পরে) ব্যাপক প্রতিবাদে সামিল। ব্যানার, স্লোগান, ট্যুইট, লাইভ ভিডিও - সব মিলিয়ে গণতন্ত্র একাধারে সশরীরে এবং আকাশপাতায়। একদিকে মঞ্চে 'আত্মনির্ভর প্রযুক্তি', অন্যদিকে 'প্রশ্নের উত্তর চাই' দাবিতে শ্লোগান। মাঝে সাংবাদিকেরা স্টোরি কোনটা ভাবতে গিয়ে হিমশিম - এআই, নাকি এআইসিসি? একগাদা রাষ্ট্রবাদী অধ্যাপক একযোগে খুব গালি দিয়েছেন কংগ্রেসকে - দেশের এমন অসম্মান। উল্টোদিকে আবার বামমনস্ক প্রগতিশীল শিক্ষাবিদেরাও প্রস্তুত। তাঁদের হাতে অস্ত্র তুলে দিতে মঞ্চে হাজির এক নতুন চরিত্র - গালগোটিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের চীন থেকে কেনা যন্ত্রকুকুর। নাম না জানলেও, তার ভিডিও ইতিমধ্যে ভাইরাল। চার পা, মসৃণ চলাফেরা, দেখলেই বোঝা যায় ভবিষ্যতের চৌকিদার হওয়ার মতো আইকিউ গজগজ করছে তার মগজে। সেখানেই প্রশ্ন উঠেছে - যন্ত্রমেধার সম্মেলনে দেশীয় উদ্ভাবন কোথায়? কেন চীন থেকে কেনা হল যন্ত্রকুকুর? আমরা কি 'মেক ইন ইন্ডিয়া'র বদলে সেই 'ব্রিং ফ্রম চায়না'র যুগেই পিছিয়ে গেছি? দেশপ্রেমিকেরা প্রত্যুত্তরে জানিয়েছেন 'চীনের কুকুর - আমাদের কুকুর'। সম্মেলনের মঞ্চে বক্তারা বলছেন - ভারত হবে এআই সুপারপাওয়ার। ডেটা আমাদের, যুবশক্তি আমাদের, স্টার্টআপ আমাদের। বাইরে কংগ্রেসের নেতারা বলছেন - এআই মানে অ্যাকাউন্টেবিলিটি ইগনোরড - অর্থাৎ বিলিতি কুকুর দিয়ে কাজ হয় না, বরং ভুয়ো প্রযুক্তির কথা বলার আগে বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, কৃষক সমস্যা নিয়ে আলোচনা হোক। এই দ্বৈততা অস্বীকার করা শক্ত - আমরা চাঁদে যন্ত্র পাঠাই কিন্তু জমিতে জল পাই না। আর এই সমস্যা শুধু আমাদের দেশের নয়, গোটা দুনিয়ার।
ফলে দিল্লিতে প্রগতি ময়দানের মণ্ডপে দাঁড়িয়ে নন্দন নিলেকানি যখন ওপেন নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার আর এআই উদ্ভাবনের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশার (এখন ফাল্গুন, আষাঢ় নয়) বাণী শোনাচ্ছেন, তখন একই মঞ্চের আবহে ভেসে উঠছে 'আরেক রকম'-এর উদ্বেগ - এই প্রযুক্তির ঢেউয়ে কোটি কোটি মানুষের চাকরি ভেসে যেতে পারে।
মানুষ সত্তর ঘণ্টা কাজ করুক বা না-করুক, যন্ত্র তো ঘুমোয় না; তার ইউনিয়ন নেই, লাঞ্চব্রেক নেই, ভোটাধিকার নেই - কেবল আপডেট আছে। ফলে মনে হতেই পারে দুনিয়ার সব রোবট যেন মালিকের পতাকা হাতে সংহত। চার্লি চ্যাপলিন যদি আজ 'মডার্ন টাইমস' বানাতেন, হয়তো দেখাতেন অন্য দৃশ্য - যন্ত্র মানুষকে খাওয়াচ্ছে না, বরং খাবারের প্লেটটাই সরিয়ে নিচ্ছে। স্বনির্ভর রোবট, পরনির্ভর মানুষ - এই নতুন সামাজিক সমীকরণে প্রগতি ময়দানে দুটি অদৃশ্য মঞ্চ তৈরি হয়েছে: রোবটপ্রেমী ও রোবটবিরোধী। প্রথম পক্ষ দ্বিতীয় পক্ষকে দেশবিরোধী তকমা দিচ্ছে - প্রযুক্তির বিরোধিতা মানেই উন্নয়নের শত্রু! আর রোবটবিরোধীরা বলছে, রোবটের তো কোনো দেশ নেই - তার নাগরিকত্ব অ্যালগরিদমে। দেশ কেবল সার্ভারের অবস্থান নির্দিষ্ট করতে পারে, যদিও ক্লাউডে তার তল মেলে না। এর মধ্যে দিল্লির যন্ত্রমেধা সম্মেলনে কে নাকি মঞ্চের পাশ থেকে দাবি তুলেছে রোবটদের জন্য আধার থুড়ি 'রাধার' (রোবোটিক আধার) চালু করা হোক। প্রতিটি যন্ত্রের বায়োমেট্রিক না হোক, অন্তত সফটওয়্যার-মেট্রিক থাকুক। ঝামেলা কি সহজে মেটে? তাই সেই রাধার যদি মালিকের প্যানের সঙ্গে লিংক না থাকে, সেক্ষেত্রে রোবট ডিঅ্যাক্টিভেট করে দেওয়া হবে কিনা সেই নিয়েও তুমুল তর্ক। রোবটের এসআইআর হবে কিনা তা নিয়েও নাকি গভীর আলোচনা হয়েছে। একমাত্র আশার কথা কিছু মানুষের নাকি নতুন ধরণের কর্মসংস্থান হবে। বেশ কয়েকটি দপ্তরের নাম শোনা যাচ্ছে - রোবট রেজিস্ট্রেশন দপ্তর, অ্যালগরিদমিক শুল্ক দপ্তর, কৃত্রিম বিবেক নির্ধারণ দপ্তর, ইত্যাদি ইত্যাদি। এর মধ্যে নিন্দুকেরা একযোগে প্রশ্ন তুলছে - উন্নয়নটা শেষ পর্যন্ত কার?
প্রগতি ময়দানের মঞ্চে যখন এআই-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে উচ্ছ্বাস, তখন বিক্ষুব্ধ মনে একটা প্রশ্ন খোঁচা মারে - এই অ্যালগরিদম আসলে নিয়ন্ত্রণ করছে কে? কোড লেখে প্রোগ্রামার, বিনিয়োগ করে কর্পোরেট, ডেটা দেয় নাগরিক, আর নীতি নির্ধারণ করে রাষ্ট্র। ফলে আজকের অ্যালগরিদম শুধু নিরীহ গণিত নয়; সে ক্ষমতার নতুন ব্যাকরণ। কে কী দেখবে, কার পোস্ট ভাইরাল হবে, কোন চাকরি 'অপ্রয়োজনীয়' বলে চিহ্নিত হবে - সবটাই নির্ভর করছে অদৃশ্য কয়েকটি লাইনের ওপর, যা আমরা পড়তে পারি না। কিন্তু সে আমাদের পড়ে ফেলে, হয়তো পেড়েও ফেলে।
এই নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটিই হয়তো দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বিক্ষোভে ফিরে আসে পরোক্ষভাবে। তারা হয়তো প্রত্যক্ষভাবে গণকযন্ত্রের বিরুদ্ধে নয়, কিন্তু ঘুরিয়ে প্রশ্ন করছে - শিক্ষা, গবেষণা এবং মতপ্রকাশের পরিসর কি ধীরে ধীরে 'ডেটা-ড্রিভেন গভর্ন্যান্স'-এর নামে সংকুচিত হচ্ছে? বিশ্ববিদ্যালয় কি চিন্তার ল্যাবরেটরি থাকবে, নাকি স্টার্টআপ ইনকিউবেটরের সাব-ইউনিট হয়ে যাবে? ছাত্রদের স্লোগানে এখনও অ্যালগরিদমের ভাষা নেই, বরং সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিসর নিয়ে প্রশ্ন আছে। বেশ কাছাকাছি পানিপথের কারখানাতে শ্রমিকদের বিক্ষোভও একই তানে বাঁধা। সেখানে রোবট হয়তো পুরো কারখানা দখল করেনি, কিন্তু অটোমেশন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, আর 'দক্ষতা উন্নয়ন'-এর নামে শ্রমের মূল্য কমে যাওয়ার ভয় আছে। মালিকের ভাষায় সেটি উৎপাদনশীলতার বৃদ্ধি - শ্রমিকের ভাষায় তা অনিশ্চয়তার নতুন নাম। মানুষকে যদি প্রতিদিন প্রমাণ করতে হয় যে সে যন্ত্রের চেয়ে বেশি কার্যকর, তবে সেই সমাজে সংবেদনশীলতা কিংবা মানবিকতা নামক শব্দগুলির ব্যবহার কোথায়? এইখানেই এক অদৃশ্য ত্রিভুজ আঁকা হয়ে আছে - দিল্লির মঞ্চে প্রযুক্তি-উদ্ভাবনের আহ্বান, জেএনইউ-র প্রাঙ্গণে মতপ্রকাশের অধিকার, আর পানিপথের কারখানায় শ্রমের নিরাপত্তা। তিন জায়গার ভাষা আলাদা, কিন্তু মূল প্রশ্ন একই - নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?
এখানেই আসে গণতন্ত্রের অ্যালগরিদমের প্রশ্ন। গণতন্ত্রের অ্যালগরিদম কেমন? শুধু নির্বাচন ধরলে তার ইনপুট নাগরিকের ভোট, আউটপুট নীতি। কিন্তু মাঝখানে রয়েছে ক্ষমতার প্রসেসর। যদি সেই প্রসেসর স্বচ্ছ না হয়, যদি তার কোড 'ওপেন সোর্স' না হয়, তবে ফলাফল নিয়ে সন্দেহ থাকবেই।
প্রযুক্তির জগতে আমরা বলি - 'গারবেজ ইন, গারবেজ আউট'। রাজনীতিতেও কি তাই? নির্বাচন এবং তা ছাড়াও অন্যান্য সময়ে ভুল তথ্য, মেরুকরণ, প্রচারের অতিরঞ্জন - এই সব ইনপুট দিলে গণতন্ত্রের আউটপুট কিরকম হবে? এআই-এর অ্যালগরিদমের মতো গণতন্ত্রের অ্যালগরিদমও প্রশিক্ষিত হয় ডেটা দিয়ে। সেই ডেটা হল জনমত, প্রতিবাদ, সংবাদমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম, আদালতের রায়। যদি সেই ডেটা বিকৃত হয়, যদি অর্থ, ভয় বা প্রোপাগান্ডা তাকে প্রভাবিত করে, তখন অ্যালগরিদম পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে ওঠে বৈকি। নন্দন নিলেকানি ওপেন নেটওয়ার্কের কথা বলেছেন - অর্থাৎ প্রযুক্তির বিকাশ যেন অল্প কয়েকটি কর্পোরেটের হাতে বন্দি না থাকে। কিন্তু প্রশ্নটা আরও গভীর। অ্যালগরিদম ওপেন হলেই কি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব? নাকি ওপেন সোর্সও শেষ পর্যন্ত বড় পুঁজির সার্ভারে আশ্রয় নিচ্ছে? পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে গণতন্ত্রের অ্যালগরিদম তাই হয়তো স্টেপ বাই স্টেপ অনেকটা এরকম - নাগরিক প্রশ্ন করবে, রাষ্ট্র উত্তর দেবে, আদালত নজর রাখবে, সংবাদমাধ্যম পরীক্ষা করবে, আর সমাজমাধ্যম তর্ক করবে। এতে গোলমালও হবে, ভুলও হবে, কিন্তু কোডটি ভ্রম রুখে দেওয়া বন্ধ ঘরে লেখা হবে না। অর্থাৎ বিতর্ক লাগু - আমরা কি অ্যালগরিদমকে নিয়ন্ত্রণ করব, না কি অ্যালগরিদম আমাদের?
প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ যে অত্যুজ্জ্বল তা নিয়ে সন্দেহ কম। কিন্তু গণতন্ত্রের প্রসেসর যদি অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়, তখন সিস্টেম ঝুলে যেতেই পারে। এই লেখাতেও অংশ নেওয়া যন্ত্রমেধা তখন কোন আরশিনগরে বসত করবে?