আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ পঞ্চম সংখ্যা ● ১-১৫ মার্চ, ২০২৬ ● ১৫-৩০ ফাল্গুন, ১৪৩২
সমসাময়িক
থমকে গেল শুল্ক যুদ্ধ
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্কের হুঁশিয়ারি দিলেও বাস্তবে কার্যকর হল মাত্র ১০ শতাংশ শুল্ক। ২৪ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে যুক্তরাষ্ট্রে শুল্ক ও সীমান্ত রক্ষা সংস্থা, ইউনাইটেড স্টেটস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন, নতুন নিয়ম কার্যকর করেছে।
সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নানা দেশের ওপর শুল্ক বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিলেও, দেশটির প্রধান আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তা মেনে নেয়নি। তবে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুল্ক ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে।
গত শুক্রবার ২০ ফেব্রুয়ারি দেশের সুপ্রিম কোর্টের রায় স্পষ্ট করে দিয়েছে যে প্রেসিডেন্টের উদ্যোগে বিভিন্ন দেশের ওপর একপক্ষীয়ভাবে আরোপিত শুল্ক অবৈধ। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, জাতীয় জরুরি অবস্থার আইন ব্যবহার করে, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই প্রেসিডেন্ট যে শুল্ক আরোপ করেছেন, তা 'প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা'র অপব্যবহার। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "সাম্প্রতিক রায় অনুযায়ী আইইইপিএ-এর অধীনে আরোপিত অতিরিক্ত শুল্ক আর কার্যকর থাকবে না। যত দ্রুত সম্ভব এর আদায় বন্ধ করা হবে।" প্রসঙ্গত, সুপ্রিম কোর্টের রায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়নি। প্রস্তাবের পক্ষে নয় জন ও বিপক্ষে ছয় জন বিচারক মত দিয়েছেন। নয় জন বিচারকের মধ্যে দু'জন আবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনোনীত।
এই পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট নতুন ফতোয়ায় স্বাক্ষর করেছেন। দেশে আমদানি করা সমস্ত পণ্যেই ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের কথা নতুন নির্দেশে বলা হয়েছে; ভবিষ্যতে তা ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর হুঁশিয়ারিও প্রেসিডেন্ট দিয়েছেন।
আইন অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালের মার্কিন বাণিজ্য আইনের ১২২ নম্বর ধারা প্রাথমিকভাবে অনুমোদন ছাড়া এই শুল্ক ১৫০ দিনের বেশি কার্যকর রাখা সম্ভব নয়। কাজেই এই নির্দেশকে কেবল সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবেই মেনে নেওয়া হচ্ছে। ফলে গত কয়েক মাস ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্টের শুল্ক সংক্রান্ত হম্বিতম্বি একেবারে চুপসে গেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে এই আইন জানেন না এমনটা মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু তিনি ভয় দেখিয়ে চোখ রাঙিয়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। নিজের ইচ্ছেমতো একেকটি দেশের জন্য একেক রকম শুল্ক ধার্য করে চলছিলেন। যেমন ভারতীয় পণ্যের জন্য ২৫ শতাংশ শুল্ক ধার্য করা হয়েছিল। ভারত কম দামে রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত খনিজ তেল আমদানি করে বলে ভারতীয় পণ্যের উপর আরও ২৫ শতাংশ শুল্ক জরিমানা হিসেবে ধার্য করা হয়। মাস কয়েক আগের কথা। ভারতকে তখন নিয়মিত তুলোধোনা করছেন তিনি। রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করার জন্য হুমকি দিয়ে বলে যাচ্ছিলেন যে বেশি দিন ওয়াশিংটনকে অগ্রাহ্য করে রুশ আমদানি বহাল রাখতে পারবে না নয়াদিল্লি। তিনি বলেছিলেন যে আমেরিকার চাপের মুখে দু'মাসের মধ্যে 'দুঃখিত' বলে ক্ষমা চেয়ে বাণিজ্য চুক্তি করতে হবে।
বাস্তবে তা অনেকটাই সফল হয়েছিল। ভারত রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত খনিজ তেল আমদানি কমাতে থাকে। নতুন বাণিজ্য চুক্তি প্রণয়নের জন্য ভারতীয় প্রতিনিধিরা দফায় দফায় নয়াদিল্লি-ওয়াশিংটন যাতায়াত শুরু করেন। বিদেশ মন্ত্রী ও বাণিজ্য মন্ত্রী ঘনঘন আমেরিকার দরবারে হাজিরা দিতে থাকেন। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। আমেরিকার কৃষি পণ্য ও দুগ্ধজাত পণ্যের জন্য ভারতীয় বাজারের দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। দেশের কৃষিজীবীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করে আমেরিকার কৃষকদের ভারতের বাজারে স্বাগতম জানানোর ব্যবস্থা করা হয়। সর্বোপরি আগামী পাঁচ বছরে আমেরিকা থেকে পঞ্চাশ হাজার বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধাস্ত্র কেনার নিশ্চয়তা সংক্রান্ত চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়। দেশের স্বার্থ বিপন্ন করে ভারত সরকার যখন এইসব চুক্তির রূপরেখা নির্ধারণ করছিল তখন সংসদের অধিবেশন চললেও সাংসদদের সামনেও খসড়া চুক্তিপত্র পেশ করা হয়নি। আর জনগণের সামনে এমন চুক্তিপত্র হাজির করার মানসিকতা এই আধিপত্যবাদী সরকারের নেই। সবকিছুই গোপনে এবং অতি সন্তর্পণে হয়ে যাচ্ছিল।
তবে গোপন কথাটি কখনোই রহে না গোপনে। ভারতের কৃষক সংগঠনগুলি দেশের স্বার্থ বিরোধী এমন গোপন চুক্তির বিরোধিতা শুরু করে। সংগঠিত কৃষক আন্দোলনের প্রত্যয় সম্পর্কে ভারতের শাসকদলের সম্যক ধারণা আছে। সাম্প্রতিক অতীতে তাদের বর্ষাধিক কালের অবস্থান আন্দোলন সরকারকে আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য করেছিল। কাজেই সরকার পিছিয়ে যাওয়ার পথে চিন্তা ভাবনা শুরু করে।
সেইরকম একটা সঙ্কটজনক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায় একেবারেই না চাইতেই জলের মতো এসে পড়ে। শুরু হয় সরকারি কর্মকর্তাদের উল্টো যাত্রা। হুঙ্কার দেওয়া মার্কিন বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লুটনিক বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) চুপিসারে ভারত সফর করে গেলেন। ভারতে নিযুক্ত আমেরিকার রাষ্ট্রদূত সেরিগো গোরকে সঙ্গে নিয়ে বৈঠক করলেন বাণিজ্য মন্ত্রী পীযূষ গয়ালের সঙ্গে। লুটনিকের ভারতে আসা থেকে গয়ালের সঙ্গে বৈঠক, পুরো বিষয়টিই সারা হয়েছে গোপনে। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রী বৈঠকটির ছবি দিয়ে সমাজ মাধ্যমে প্রকাশ না করলে বিষয়টি হয়তো গোপনই থেকে যেত। সময় বিষম বস্তু। কয়েক মাসের তফাতে পাশার দান উল্টে গিয়েছে। চড়া শুল্ককে অস্ত্র করেই নিজেদের সুবিধাজনক শর্তে ভারত-সহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করছিল ট্রাম্প প্রশাসন। সে দেশের সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সেই শুল্ক বেআইনি তকমা পেয়ে খারিজ হতেই সুর নরম। চুক্তি সারতে মরিয়া হয়েই হয়তো লুটনিকের ভারত সফর।
বৈঠকের কথাবার্তা বিশদে জানানো হয়নি। ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রী শুধু বলেছেন, দু'দেশের আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে সফল আলোচনা হয়েছে। বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, লুটনিকের আচমকা এবং গোপন সফরের সময়কাল তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতের সঙ্গে চুক্তির কথা ঘোষণা করে ট্রাম্প এ দেশের উপর শুল্কের যে হার ৫০% থেকে ১৮ শতাংশে নামানোর কথা জানিয়েছিলেন, তারই আর অস্তিত্ব নেই। আর শুল্কের খাঁড়া সামনে না থাকায় চুক্তির শর্ত নিয়ে ফের দরাদরির সুযোগও খুলেছে ভারতের সামনে। ইতিমধ্যেই ভারতীয় বাণিজ্য প্রতিনিধিদের আমেরিকা সফর স্থগিত হয়েছে। তাতেই প্রমাদ গুনতে শুরু করেছেন ট্রাম্প ও তাঁর সহযোগীরা। আঁচ করছেন, দ্রুত না এগোলে অচিরেই বদলে যেতে পারে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে গোটা ছবিটাই। ভারতের শাসকদেরও তখন লজ্জায় মুখ লুকানোর জায়গা থাকবে না।