আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ পঞ্চম সংখ্যা ● ১-১৫ মার্চ, ২০২৬ ● ১৫-৩০ ফাল্গুন, ১৪৩২
সমসাময়িক
ইরানে মার্কিন আক্রমণ
আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া, ভেনেজুয়েলা হয়ে ইরান। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের গণতন্ত্র রপ্তানির নীতি চলছে, চলবে। একের পর এক দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার নামে সামরিক আক্রমণ চালিয়েছে আমেরিকা। আফগানিস্তানে তালিবানকে তৈরি করে, তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, গোটা দেশটাকে আবর্জনায় পরিণত করে, পরাজয় স্বীকার করে বিদায় নিয়েছে আমেরিকান সৈন্য। সেখানে এখন আবার চলছে তালিবানের অত্যাচার। ইরাকে সাদ্দাম হুসেনকে নিকেশ করে গণতন্ত্র আনার নামে গোটা দেশের যাবতীয় তেল ভাণ্ডারকে বেসরকারীকরণ করে, দেশটিকে গৃহযুদ্ধে পর্যবসিত করে, ইসলামিক স্টেট নামক একটি উগ্রপন্থী শক্তির জন্মের মধ্য দিয়ে ইরাকের গণতন্ত্রের অধ্যায় রচিত হয়। লিবিয়ার গদ্দাফিকে নিকেশ করে আপাতত সেখানে চলছে অরাজকতা। আফ্রিকার অন্যতম ধনী দেশটিকে দারিদ্রের অন্ধকারে নিক্ষেপ করার কৃতিত্ব আমেরিকার। সিরিয়ায় আসাদের অত্যাচারী শাসনের বিরুদ্ধে সেখানে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে আপাতত মসনদে বসানো হয়েছে প্রাক্তন আল-কায়দার জঙ্গী এক ব্যক্তিকে। ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতিকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ট্রাম্প সরাসরি বলেছেন যে ভেনেজুয়েলার তেল এখন আমেরিকার দখলে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী যুদ্ধবাজ মতাদর্শের সর্বশেষ উদাহরণ ইরান।
ইরানের সঙ্গে মার্কিন বিরোধ বহু দশকের পুরোনো। ১৯৫৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ ইরানের গণতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী মোসাদেঘের বিরুদ্ধে সামরিক ক্যু সংগঠিত করে কারণ তিনি তাঁর দেশের সম্পদকে রাষ্ট্রীয়করণ করেছিলেন। মোসাদেঘের পতনের পরে সেখানে ইরানের রাজা তথা শাহকে শাসনে বসানো হয়। দীর্ঘ প্রায় পঁচিশ বছর ধরে মার্কিন মদতে শাহ ইরানের মানুষের উপর অকথ্য অত্যাচার চালায়। এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে যত বাম তথা প্রগতিশীল মতামত ছিল সমস্ত ধারাকে সুপরিল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়। ফলত, শাহের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব চলে আসে ইরানের কট্টরপন্থী ইমামদের নেতৃত্ব, যার প্রধান ছিলেন খোমেইনি। ইরানের ইসলামিক বিপ্লবের পরে ইরাকের সাদ্দাম হুসেনকে খাড়া করা হয় সেই দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার জন্য।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা লাগাতার ইসরায়েলকে সামরিক এবং আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে থাকে। বলা যেতে পারে যে মধ্য প্রাচ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পাহারাদার হল ইজরায়েল। ইজরায়েল তথা আমেরিকার ভয়ে আরব দেশগুলি একের পর এক মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সামনে নতিস্বীকার করে। ইজরায়েলের সঙ্গে তারা সামরিকভাবে পেরে উঠবে না, এই কথা মেনে নিয়ে তারা আমেরিকার অঙ্গুলিহেলনে চলার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ইরান সেই নীতি মানতে পারেনি। কারণ ইরানের খোমেইনি এবং পরে খামেইনি দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্রকে ধ্বংস করাই আমেরিকা তথা ইজরায়েলের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
এই পরিস্থিতিতে ইরান বুঝতে পারে যে তাকে বন্ধু জোটাতে হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইজরায়েল তথা আমেরিকার বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি বাড়াতে হবে। এই লক্ষ্যে একদিকে তারা হামাস তথা হেজবুল্লাহকে সহায়তা করতে থাকে, অন্যদিকে সহায়তা করে সিরিয়ার আসাদকে। কিন্তু ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে হামাসের আক্রমণের পরে ইজরায়েল গাজায় যে নরসংহার চালায়, তার ফলে হামাস যেমন শক্তি হারায়, অন্যদিকে লেবাননের উপর আক্রমণে হেজবুল্লাহ-র পতন হয়। আসাদের পতনের পরে ইরান একদম একা হয়ে যায় মধ্যপ্রাচ্যে। ইরানের এক সময়ের বন্ধু রাশিয়া ইউক্রেণের যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার ফলে তাদের পক্ষে ইরানকে সাহায্য করা সম্ভব হয় না।
খামেইনির নেতৃত্বে ইরান নিজেদের দেশের মানুষের উপরে যে অগণতান্ত্রিক অত্যাচার চালিয়েছে তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। বিশেষ করে মহিলাদের অধিকারের বিরুদ্ধে ইরানের মোল্লাতন্ত্র যে আক্রমণ বহু দশক ধরে চালিয়ে এসেছে তা গোটা পৃথিবীতে তাদের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করেছে। আবার মোল্লাতন্ত্রের বিরোধী শক্তিদের উপরে লাগাতার অত্যাচার চালানো হয়েছে, এই কথাও ঠিক। কিন্তু কোনও সার্বভৌম দেশকে এই কারণে আক্রমণ করা যেতে পারে না যে সেখানে মানুষের উপরে অত্যাচার হচ্ছে। আমেরিকার দোস্ত সৌদি আরবে রাজার রাজত্ব চলে, যেখানে গণতান্ত্রিক অধিকার কথাটির কোনও মানেই নেই। এই রাজতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রেখেছে আমেরিকা। অতএব আমেরিকার গণতন্ত্রের জন্য প্রাণ কাঁদে এই কথাটি সম্পূর্ণ ভাঁওতা। অতএব ইরানের বন্ধুরা যখন পরাজিত, যখন ইরানের মানুষের একটি বড়ো অংশ মোল্লাতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে শামিল, তখন ইরানের উপরে বর্বরোচিত আক্রমণ নামিয়ে আনা হল।
ইরানের আনবিক শক্তি তৈরি করার নীতির বিরুদ্ধে বহু বছর ধরে ইরানের উপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপিত রয়েছে, আমেরিকা দ্বারা। এর ফলে ইরান বহু গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ও সামগ্রী আমদানি করতে পারে না। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে সাধারণ মানুষের দুর্দশা লাগাতার বেড়েছে। তাদের ক্ষোভ গিয়ে পড়েছে ইরানের সরকারের উপরে। বেশ কিছু বছর ধরে খামেইনি সরকার আমেরিকার সঙ্গে আলোচনায় বসেছে আনবিক শক্তি নিয়ে। ২০১৫ সালে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে চুক্তি হয় যে ইরান আনবিক অস্ত্র বানাবে না, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের তাদের নিউক্লিয়ার প্লান্ট পর্যবেক্ষণ করতে দেবে। এরপরে ওবামা সরকার ইরানের উপরে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। কিন্তু ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে এই চুক্তি বাতিল করে।
তারপরেও ইরান, এই আক্রমণ শুরু হওয়ার আগের দিন পর্যন্ত আমেরিকার সঙ্গে আলোচনায় ব্যস্ত ছিল। ওমানের বিদেশমন্ত্রীর বয়ান অনুযায়ী ইরান আমেরিকার সমস্ত শর্ত মেনে নেয়। এমনকি তারা আনবিক শক্তি বিকাশের সমস্ত নীতি থেকে সরে আসবে এই মর্মেও রাজি হয়ে যায়। কিন্তু তা যদি ট্রাম্প এবং ইজরায়েল মেনে নেয় তাহলে আর ইরানে আক্রমণ করা যাবে কী করে! অতএব ইরান আনবিক শক্তি সম্পর্কিত সমস্ত শর্ত মেনে নিলেও ইজরায়েল এবং আমেরিকা তাদের উপর আক্রমণ নামিয়ে আনে। কারণ খুব সহজ। ইরানের নিউক্লিয়ার শক্তিকে বন্ধ করা তাদের লক্ষ্য কখনই ছিল না। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের মসনদে তাদের পেটোয়া শক্তিকে বসানো।
সেই লক্ষ্যে আপাতত ইজরায়েল এবং আমেরিকা ইরানের রাষ্ট্রপ্রধান খামেইনিকে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এখনও ইরানের রাষ্ট্রশক্তিকে সম্পূর্ণভাবে দখল করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ইরান বলছে তারা এই যুদ্ধের শেষ দেখে ছাড়বে। গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ইরান মিসাইল ছুঁড়েছে। সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য চূড়ান্ত বিপজ্জনক অবস্থার মধ্যে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
আসলে একমেরুর বিশ্ব তথা একমেরুর মধ্যপ্রাচ্য চায় আমেরিকা এবং ইজরায়েল। যেকোনো শক্তি যারা এই নীতিকে চ্যালেঞ্জ জানাবে তাদের খতম করার নীতি নিয়ে চলেছে ইজরায়েল এবং আমেরিকা। এই দুটি দেশে এই মুহূর্তে ইতিহাসের সর্বাধিক ভয়ংকর দুই ব্যক্তি ক্ষমতাসীন রয়েছে। কিন্তু তারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়নি। ভিয়েতনাম থেকে শুরু করে ইরান, ইরাক, আফগানিস্তান সমস্ত ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে আমেরিকার সামরিক শক্তির জয় ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু দেশের মানুষের উপরে চাপিয়ে দেওয়া মার্কিনদের হাতের পুতুলের বিরুদ্ধে মানুষ লাগাতার লড়াই চালিয়ে যায়। এই সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বলি হতে হয় লক্ষ লক্ষ মানুষকে। ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু বর্তমান দুনিয়ার সর্বাধিক যুদ্ধবাজ দুই নেতা। ট্রাম্প বলেছিলেন যে তাঁর নেতৃত্বে আমেরিকা কোনও যুদ্ধ করবে না। কিন্তু তাঁর মিথ্যা ধরা পড়ে গেছে। ভেনেজুয়েলা থেকে ইরান সর্বত্র যুদ্ধের ছায়া দীর্ঘতর হচ্ছে। মার্কিন জনগণ, চিন, রাশিয়া এবং অন্যান্য দেশ যদি ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর যুদ্ধকামী নীতিকে না রুখতে পারে, তাহলে আগামীদিনে বিশ্বে অশান্তি আরও বাড়বে।