আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ পঞ্চম সংখ্যা ● ১-১৫ মার্চ, ২০২৬ ● ১৫-৩০ ফাল্গুন, ১৪৩২

সম্পাদকীয়

এসআইআর – একটি ব্যর্থ প্রক্রিয়া


সম্প্রতি এসআইআর সংক্রান্ত বিতর্ক অন্তত পশ্চিমবঙ্গে একটি বিরাট আকৃতি ধারণ করেছে। বিগত ২০শে ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট, তার নজিরবিহীন রায়ে জানিয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর প্রক্রিয়ায় এআরও বা ইআরও-দের কোনও ভূমিকা আর থাকবে না। এবার বিচারবিভাগ, মূলত কলকাতা হাইকোর্টের তত্ত্বাবধানে অচিহ্নিত ভোটারদের আবেদনের নিষ্পত্তি করবে। এই রায়টি শুধু একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সংশোধন নয়, বরং ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক বিরল বিচারবিভাগীয় হস্তক্ষেপের উদাহরণ হয়ে উঠেছে। ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর রায়টি ছিল সত্যিই নজিরবিহীন। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী-সহ বেঞ্চ স্পষ্ট জানায় যে, রাজ্য ও কমিশনের মধ্যে চলমান অচলাবস্থা ভোটার অধিকারের ক্ষতি করছে।

সুপ্রিম কোর্টের এই হস্তক্ষেপ কি আদতে গণতন্ত্রের জয়, নাকি ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের (ECI) চরম বিশ্বাসযোগ্যতাহীনতার এক দাপ্তরিক সিলমোহর? প্রশ্নটি আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। যখন একটি গণতান্ত্রিক দেশের শীর্ষ আদালতকে সরাসরি বলতে হয় যে, ভোটার তালিকার অসঙ্গতি দূর করার ক্ষেত্রে নির্বাচনী আধিকারিক অর্থাৎ ইআরও বা এআরও-দের ওপর আর আস্থা রাখা যাচ্ছে না, তখন বুঝতে হবে প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা আজ ধ্বংসের দোরগোড়ায়। যে প্রক্রিয়ায় রাজ্যের মোট ৭.৬৬ কোটি ভোটারের মধ্যে প্রায় ৫০ থেকে ৮০ লক্ষ মানুষের নাম 'লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি' বা তথ্যগত অসঙ্গতির খাঁচায় বন্দি হয়, সেই প্রক্রিয়া কি আদৌ স্বচ্ছ ছিল? না কি প্রথম দিন থেকেই এই স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) প্রক্রিয়াটি একটি বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার নীল নকশা হিসেবে কাজ করছিল?

নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা আজ গভীর সন্দেহের অবকাশ তৈরি করেছে। এই রায় প্রমাণ করে যে, কমিশন তার সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা ভুলে কার্যত কেন্দ্রীয় শাসকদলের বিভাজনের রাজনীতিকে আইনি ও প্রশাসনিক বৈধতা দেওয়ার যন্ত্রে পরিণত হয়েছিল। শুরু থেকেই এই প্রক্রিয়াটি যে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত হচ্ছিল, তা এখন দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। বিজেপি নেতারা আজ অনায়াসেই উত্তরপ্রদেশ বা গুজরাটের উদাহরণ টেনে বলছেন যে সমস্যা কেবল বাংলাতেই। কিন্তু এই যুক্তি ধোপে টেকে না। আদতে দেখা যাচ্ছে, যেখানেই বিজেপি-বিরোধী সরকার বা শক্তিশালী আঞ্চলিক শক্তি বর্তমান, সেখানেই 'অনুপ্রবেশ' বা 'অসঙ্গতি'-র জুজু দেখিয়ে ভোটার দমনের এই নীল নকশা তৈরি করা হচ্ছে। বিহারের অভিজ্ঞতাই তার প্রমাণ, যেখানে বিধানসভা নির্বাচনের আগে তাড়াহুড়ো করে এসআইআর চালু করে প্রায় ৬৫ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়েছিল। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে আসামের মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যে এই প্রক্রিয়া চালানো হয়নি, যা কমিশনের দ্বিচারিতাকেই প্রকট করে।

নির্বাচন কমিশন কেন প্রথম থেকেই স্বচ্ছতার নূন্যতম মানদণ্ড বজায় রাখতে পারল না? কেন ভোটারদের পরিচয়পত্রের প্রামাণ্য নথি নিয়ে এমন ধোঁয়াশা তৈরি করা হল যাতে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে? আজ আদালতকে কেন স্পষ্ট করে বলতে হচ্ছে যে আধার কার্ড, মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড বা পাস সার্টিফিকেটই যথেষ্ট? কমিশনের 'ট্রেনিং মডিউল' নিয়ে যে সংশয় খোদ বিচারবিভাগ প্রকাশ করেছে, তা প্রমাণ করে যে তারা ভোটারদের অধিকার রক্ষার চেয়ে দাপ্তরিক জটিলতা বাড়িয়ে দরিদ্র ও সংখ্যালঘু মানুষকে হয়রানি করতেই বেশি আগ্রহী ছিল। তথাকথিত 'কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা' বা AI-এর দোহাই দিয়ে যেভাবে 'মণ্ডল' আর 'মন্ডল' কিংবা 'শেখ' আর 'সেখ'-এর মতো সাধারণ বানান বৈচিত্র্যকে 'অসঙ্গতি' বলে দেগে দেওয়া হয়েছে, তা আদতে এক সুগভীর মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।

আসলে এই প্রযুক্তির আড়ালে চলছে এক দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও ত্রাস সৃষ্টি করার সুপরিকল্পিত খেলা। ২০১৬ সালের নোটবন্দির সময় যেভাবে সাধারণ মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে 'দেশপ্রেম'-এর পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল, আজ ভোটার তালিকার নামে ঠিক একইভাবে মানুষকে তাঁদের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। প্রযুক্তির এই গোলকধাঁধায় মানুষকে অকারণ ব্যতিব্যস্ত রেখে তাঁর নাগরিক অধিকারকে রাষ্ট্রীয় অনুগ্রহে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। যখন একজন মানুষকে তাঁর রুজি-রুটি ছেড়ে নথির পোঁটলা বগলে নিয়ে সরকারি দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হয়, তখন তিনি আর সচেতন নাগরিক থাকেন না; তিনি হয়ে পড়েন একজন আতঙ্কিত আবেদনকারী। এই আতঙ্কই তো শাসকের পরম কাম্য।

এই পরিস্থিতিতে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির ভূমিকা কেবল আদালতের রায়ের ওপর নির্ভর করে বসে থাকা হতে পারে না। শাসকদল তৃণমূল যেখানে একে 'বিচারবিভাগের জয়' বলে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চাইছে, সেখানে প্রকৃত বিরোধিতার কাজ হওয়া উচিত মানুষের অধিকারের পাহারাদার হওয়া। বিশেষ করে বামপন্থীদের ভূমিকা এই সন্ধিক্ষণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বামপন্থীদের কেবল সাংবাদিক সম্মেলন করলে চলবে না; তাঁদের উচিত তৃণমূল স্তরে 'হেল্প ডেস্ক' তৈরি করে প্রতিটি সাধারণ মানুষকে আইনি ও পদ্ধতিগত সহায়তা দেওয়া। বামপন্থীদের আদর্শগত লড়াই হওয়া উচিত এই 'প্রযুক্তিনির্ভর হয়রানি'-র বিরুদ্ধে। তাঁদের বোঝাতে হবে যে, ডিজিটাল ইন্ডিয়ার নাম করে আসলে গরিব মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার এই কর্পোরেট-সাফল্য আসলে ফ্যাসিবাদেরই নামান্তর।

বামপন্থীদের দায়িত্ব হবে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে তথ্য সংগ্রহ করা এবং বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তাদের সামনে নথিপত্র নির্ভুলভাবে পেশ করতে সাধারণ মানুষকে সাহায্য করা। শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিরোধিতা নয়, বরং একটি সামাজিক আন্দোলনের রূপ দিতে হবে এই লড়াইকে। বিজেপি সরকার সংসদে এমন আইন পাশ করিয়েছে যাতে কমিশনারদের ওপর কোনও শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় - এই তথ্যটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া জরুরি। বামপন্থীদের উচিত দাবি তোলা যে, নির্বাচন কমিশনকে কেবল ক্যাবিনেটের সিদ্ধান্ত নয়, বরং সর্বদলীয় সম্মতির ভিত্তিতে পরিচালিত হতে হবে।

যদিও সুপ্রিম কোর্ট বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তাদের নিয়োগ করে একটি রক্ষাকবচ দেওয়ার চেষ্টা করেছে, কিন্তু মনে রাখতে হবে, মাত্র ২৫০ জন বিচারক দিয়ে ৮০ লক্ষ মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করা এক প্রকার অসম্ভব প্রচেষ্টা। আদালত হস্তক্ষেপ করলেও সাধারণ মানুষের নির্বাচনী অধিকার কি পূর্ণ সুরক্ষিত থাকবে? বাস্তব এটাই বলছে যে, এই দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষকে এক দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার অন্ধকূপের দিকেই ঠেলে দিচ্ছে।

এই সম্পাদকীয় লেখা হওয়ার সময়েই জানা গেল যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। যেখানে ডিসেম্বর ২০২৫-এর খসড়া তালিকায় নাম ছিল ৭ কোটি ৮ লক্ষের একটু বেশি মানুষের, সেখানে ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত তালিকায় নাম রয়েছে ৬ কোটি ৪৪ লক্ষ মানুষের। পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের ইতিহাসে প্রথমবার একটি ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হল, যেখানে প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষের নামের পাশে 'বিচারাধীন' শব্দটি বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, তাদের নাম চূড়ান্ত তালিকায় থেকেও নেই। নির্বাচন কমিশন কতটা অসংবেদনশীল এবং অপদার্থ হলে এমন একটি তালিকাকে চূড়ান্ত তালিকা বলে প্রকাশ করতে পারে। এই তালিকার ফলে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তথা ভয় আরও বাড়বে। অনেক গবেষক ইতিমধ্যেই তালিকা যাচাই করে দেখেছেন যে বিশেষ করে মুসলমান অধ্যুষিত জেলা, এবং মুসলমান মানুষের নাম এই 'বিচারাধীন' তালিকায় বেশি রয়েছে। তাছাড়াও প্রচুর সাধারণ মানুষ যারা বছরের পর বছর এই দেশে ভোট দিয়ে এসেছেন, তাদেরকে এখন সন্দেহভাজন নাগরিক হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যদি চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করতেই হবে, তাহলে সমস্ত ভোটারদের তালিকাভুক্ত করে এই তথাকথিত চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হল না কেন? এর প্রশ্নের উত্তর নির্বাচন কমিশনকে দিতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের আসন্ন নির্বাচন এই অসমাপ্ত এবং ত্রুটিপূর্ণ তালিকা মেনে করা উচিত হবে না। সমস্ত 'বিচারাধীন' ভোটারের নামের নিষ্পত্তি করতেই হবে নির্বাচন কমিশনকে।

অন্য প্রশ্নটি মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের কাছে থাকবে। বিহারের এসআইআর হওয়ার সময় থেকেই এই প্রক্রিয়ার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে আদালতের সামনে মামলা রুজু করা হয়েছে। একের পর এক রাজ্যে এই প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। কোটি কোটি মানুষের হয়রানি হয়েছে। বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে উঠেছে। একটি অসমাপ্ত তালিকাকে চূড়ান্ত তালিকা বলে প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু মহামান্য আদালত এখনও মূল প্রশ্নটির মীমাংসা করে উঠতে পারেননি। কখনও কখনও তাঁরা নির্বাচন কমিশনের কার্যাবলি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ঠিকই। কিন্তু মৌলিক সাংবিধানিক প্রশ্ন এবং এসআইআর প্রক্রিয়ায় যে খামখেয়ালি আচরণ নির্বাচন কমিশন করেছে, তা নিয়ে তাঁরা চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছতে পারেননি। এতে ভারতের গণতন্ত্র তথা মানুষের ক্ষতি হয়েছে।

পরিশেষে এটাই বলা জরুরি যে, বর্তমান এসআইআর প্রক্রিয়াটি একটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার নগ্ন রূপ এবং এটি অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। গণতন্ত্র কেবল ভোটিং মেশিন বা সংখ্যার খেলা নয়, এটি মানুষের আস্থার নাম। আর যখন সেই আস্থাই খোদ নির্বাচন কমিশনের হাত ধরে ভেঙে পড়ে, তখন বিচারবিভাগীয় প্রলেপ সাময়িক স্বস্তি দিলেও ব্যবস্থার গভীরে থাকা ক্ষতটি থেকেই যায়। আজ বাংলা যা দেখছে, কাল তা সারা দেশের জন্য এক ভয়াবহ সতর্কতা। এই লড়াই কেবল ভোটার কার্ড বাঁচানোর নয়, নাগরিক হিসেবে সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার লড়াই। বামপন্থীদের এই লড়াইয়ে অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে তাঁরা এখনও মেহনতি মানুষের শেষ ভরসাস্থল।