আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা ● ১৬-২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ● ১-১৫ ফাল্গুন, ১৪৩২

প্রবন্ধ

জ্যোতিকে নিয়ে

অমিয় দেব


যিনি ২০২৫-এর ২৮ ডিসেম্বরের ভোরে ঘুমের মধ্যে চলে গেলেন, সেই জ্যোতির্ময় দত্তকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে বসেছি। প্রথম কথাই এ-ই যে তাঁকে আমি কখনো জ্যোতির্ময় বলিনি, বরাবরই জ্যোতি বলেছি। আমার অনেকদিনের বন্ধু। পরস্পরকে আমরা আপনি বলে এসেছি, তাই কিঞ্চিৎ ধোপদুরস্ত মনে হলেও বন্ধুতাটা বন্ধুতাই। আমার স্বভাব-মন্থরতা ও তার (চন্দ্রবিন্দু চালিয়ে যাওয়ার কোনো মানে হয় না) স্বভাব-চঞ্চলতা সত্ত্বেও। যদিও গড়ে উঠতে তা খানিক সময় নিয়েছিল। আর দৃশ্যত তার মাত্রার মাঝে মাঝে হেরফের হলেও তার নিহিত সত্য কখনো টাল খায়নি।

তার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় কবিতা ভবনে। আমি তখন যাদবপুরে বুদ্ধদেব বসুর ছাত্র, তুলনামূলক সাহিত্যে এম.এ. পড়ছি। ওই শ্বশুর-জামাতার সম্পর্ক ঠিক প্রথামাফিক ছিল না, কথা হতো সমানে সমানে। জ্যোতি কত কী জানে, কী অপার তার কৌতূহল, সেইসঙ্গে কী তর্কপ্রাণ! আবার স্বধর্মাচরণে রবীন্দ্রনাথের উত্তরসাধক বুদ্ধদেব বসুরই বা কি কোনো ক্ষান্তি আছে? এরই প্রেক্ষিতে বোধকরি এক ছড়াকার লিখে ফেলেছিলেন:

বুদ্ধদেব বসুর
নাইকো কোনো কশুর।
একমাত্র কশুর
জ্যোতির্ময়ের শ্বশুর।

মনে আছে একবার যাদবপুরে জ্যোতিকে দিয়ে বুদ্ধদেব বসু পাশ্চাত্য চিত্রকলায় আধুনিকতা নিয়ে কিছু কথা বলিয়েছিলেন। গোইয়ার এক বিখ্যাত ছবি বিশ্লেষণ করে একটা তত্ত্ব বোধকরি জ্যোতি দাঁড় করিয়েছিল। সে ততদিনে 'স্টেটসম্যান'-এ। পেশায় সাংবাদিক। কিন্তু যত সার্থক ও যত নির্ভীকই হোক তা, শুধু সাংবাদিকতাই যে করছিল না তার আরো অনেক অভিজ্ঞান ছিল তার ঝুলিতে। ইংরেজিতে এক উপন্যাসও বুঝি-বা লিখছিল। অন্তত ইংরেজিতে যে কতটা স্বচ্ছন্দ ছিল তার প্রমাণ দিয়েছিল 'কবিতা' শততম সংখ্যায় - যা বেরোয় 'International English-Language Number' রূপে - বেশ কয়েকটি বাংলা ও একটি ওড়িয়া কবিতার অনুবাদে। তার মধ্যে ছিল নরেশ গুহর 'রুমির ইচ্ছা'র মতো প্রায় অনুবাদ-অসাধ্য কবিতাও। তাছাড়া, ওই সংখ্যায় 'A Note on Modern Bengali Poetry'ও তার লেখা।

তবে বাংলাও যে জ্যোতি লিখতে শুরু করেছে, তার নিদর্শন পাই 'কবিতা'তেই (গদ্য: ১৩৬৩-তে 'হাইনে: ফাউস্ট ও ফিনিক্স', ১৩৬৪-তে 'কবিতায় প্রাণী ও পুতুল' এবং ১৩৬৬-তে 'জীবনানন্দ দাশ ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়')। আর, ১৩৬৭-তে যখন 'কবিতা'র 'সুধীন্দ্রনাথ দত্ত - স্মৃতিসংখ্যা' বেরোল তখন জ্যোতি কেবল 'বাংলা কবিতা ও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত'ই লিখল না, সুধীন্দ্রনাথের অসমাপ্ত ইংরেজি আত্মজীবনী 'The World of Twilight' থেকে তার কাকা অমরেন্দ্রনাথের উপর লেখা অংশটার বাংলাও করল। সেইসঙ্গে তার কবিতাও বেরোতে শুরু করল 'কবিতা' পত্রিকাতে: ১৩৬৫-র পরপর দুটি সংখ্যায় দীর্ঘ কবিতা 'জলের পুরাণ'-এর দুটি অংশ, ১৩৬৫-রই পরের এক সংখ্যায় 'একজন ইঁদুরের কাহিনী' ও ১৩৬৬-তে 'ভিখারিণী'। শততম সংখ্যাতে তার দুই কবিতার স্বকৃত ইংরেজিও স্থান পেয়েছিল।

সুনীল (গঙ্গোপাধ্যায়), দীপক (মজুমদার) ও তারাপদর (রায়) বন্ধু - কোনো সমকালীন গোষ্ঠীভুক্ত না হলেও সেও 'পঞ্চাশ' বুকে নিয়ে বেড়ে উঠছিল। 'ষাট'-এ পৌঁছে এক অস্থিরতা দেখি তার 'ধিক জ্যোতি ধিক'-এ, 'ছাব্বিশ বছর বয়সেও কোনো বিস্ফোরণ' ঘটাতে না পারার ব্যর্থতা বুঝি তার তীব্র হয়ে বেজেছিল? সেই বিস্ফোরণ - যদি বিস্ফোরণই বলতে হয় তাকে - ঘটল আরো ছ'বছর পরে: 'কলকাতা' নামধারী এক লিটল ম্যাগাজিন, 'সাহিত্য সমাজ সংস্কৃতি বিষয়ক মাসিক পত্রিকা' যার এক মুখ্য লেখক, নামে-বেনামে-এ তার নামেও, জ্যোতি নিজে। কী গদ্য সে লিখতে পারে তা কী সে নিজেও আগে জানত! 'আত্মহত্যার বিবৃতি' অবিস্মরণীয়, বা 'দেবলোকে যুধিষ্ঠির', অবিস্মরণীয় 'বুদ্ধের নির্বাণ' যার শেষ অণুচ্ছেদ প্রায় বৈপ্লবিক:

"এইরূপে প্রবীণদের অজ্ঞাতে ভগবান একটি বিহ্বল গুবরে পোকাকে আবার সোজা ক'রে দিলেন; সে চিৎ হ'য়ে ছটফট করছিল। প্রভুর করুণায় সে আবার আপন স্বচ্ছন্দ পাখায় আকাশে উড়ে গেলো।"

রর্বীন্দ্রনাথ যেমন 'কবিতা' পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় ছিলেন অনামন্ত্রিত, তেমনি ছিলেন বুদ্ধদেব বসুও 'কলকাতা'র প্রথম সংখ্যায়। তারপর তাঁকে শুধু আমন্ত্রণই জানানো হল না, তাঁর ষষ্টিপূর্তিতে এক বিশেষ সংখ্যাও বের হল 'কলকাতা'র যার অতিথি সম্পাদকরূপে বৃত হলেন 'চল্লিশ'-এর দুই কবি, নরেশ গুহ ও অরুণ কুমার সরকার। এখন বোধকরি তা ক্লাসিক। তেমনি ক্লাসিক সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে দীর্ঘ সাক্ষাৎকার সংবলিত সংখ্যাটিও (তার পুনর্মুদ্রণ চলছে অর্ধশতাব্দী পরেকার নবপর্যায়ে আবির্ভূত 'কলকাতা'য়)। এর একটা গল্প আছে। সত্যজিতের 'গুপী গাইন ও বাঘা বাইন' আমরা দেখেছিলাম দল বেঁধে, গড়িয়ার পদ্মশ্রী সিনেমা হলে। বেরিয়েই প্রথম যে-কথা জ্যোতি বলল, তা! সত্যজিতের ইন্টারভিউ নিতে হবে 'কলকাতা'য়। ঠিক হল ইন্টারভিউটা মুখ্যত নেবে জ্যোতি-মিমি (মীনাক্ষী [বসু] দত্ত) - সুবীরের (রায়চৌধুরী) প্রেসিডেন্সি কলেজের সহপাঠী, আমাদের সকলের বন্ধু, করুণাশঙ্কর (রায়)। সে চলচ্চিত্র শিল্পের খুঁটিনাটি জানে - বিস্তর সিনেমা দেখেছে লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়বার সময় - সত্যজিতের সঙ্গে পরিচয়ও সেখানেই। তাঁর যথার্থ গুণগ্রাহীও। জ্যোতি তার আত্মজীবনী 'আমার নাই বা হল পারে যাওয়া'-র প্রথম খণ্ডে এই ইন্টারভিউ প্রসঙ্গে সত্যজিতের ভদ্রতা ও উদারতার কথা বিশেষভাবে বলেছে। এতে করুণা-জ্যোতি-সুবীরের সঙ্গে আমিও কখনো কখনো গেছি (কেন জানি না ওই দীর্ঘদেহী ও গাঢ়স্বর মানুষটি প্রত্যেক সাক্ষাৎশেষে করুণাকে কিরণবাবু বলতেন)। 'কলকাতা'র একটি দ্বিতীয় বুদ্ধদেব বসু সংখ্যাও বেরোয় ১৯৭৪-এ তাঁর মৃত্যুর পরে - প্রথমটির সঙ্গে মিলে ঘটাল এক পূর্ণাঙ্গ বুদ্ধদেবপ্রেক্ষা। আর তার আগে পুলিনবিহারী সেনকে নিয়ে এক সংখ্যা যার মলাটে জ্যোতি লিখে দিয়েছিল, কিঞ্চিৎ তাৎকালিক বাগর্থসহই, 'এমন সংশোধনবাদ জিন্দাবাদ'। বেরিয়েছিল এক 'গুজরাট সংখ্যা'ও, কলকাতাবাসী গুজরাটি লেখক শিবকুমার যোশী-র প্রত্যক্ষ সহযোগিতায়।

স্বল্পায়ু হলেও জ্যোতির 'কলকাতা' - নাম যোগ করে বা না করে আমরা কেউ কেউ সঙ্গে থাকলেও, 'কলকাতা' পুরোপুরি জ্যোতিরই - বাংলা লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাসে ভাস্বর হয়ে থাকবে। পত্রিকার পাশাপাশি এক 'কলকাতা প্রকাশন'ও জ্যোতি ফেঁদেছিল: মাথায় ছিল এক 'কলকাতা গ্রন্থমালা'। এই প্রকাশন থেকে প্রথম বেরোল বিনয় মজুমদারের 'ফিরে এসো, চাকা' (নব মুদ্রণ); দ্বিতীয়, বুদ্ধদেব বসুর 'একদিন: চিরদিন ও অন্যান্য কবিতা'; তৃতীয়, 'কোথায় যাচ্ছেন তারাপদবাবু?'; চতুর্থ, জ্যোতির নাটক 'আমরা সবাই যাবো কুল পাড়তে'। (নাটক আরো লিখেছিল জ্যোতি এবং তার অভিনয়ও হয়েছিল: 'সতীশ সেন', 'নাট্যকার হজম পালা' ও 'মশারি'।) আর 'কলকাতা' উঠে গেলে জ্যোতি একসময় কয়েক সংখ্যা 'কলকাতা ২০০০'ও বার করে।

তবে এই শব্দজগতের বাইরেও এক 'বিস্ফোরণ' জ্যোতি শিগগিরই ঘটাল। তার নাম 'মুক্তমেলা'। চৌরঙ্গিস্থিত টাটা বিল্ডিঙের উল্টোদিকে যে-বৃক্ষপুঞ্জ আছে ময়দানে, তার তলায় শনিবার শনিবার এক বৈকালিক মেলা। কোনো টিকিট নেই, কোনো আমন্ত্রণ নেই, কোনো সভা নেই, নেই কোনো প্রোগ্রাম। শুধু আসা, এসে মিলিত হওয়া। প্রথম দিন আমরা ক'জন। কিন্তু কথাটা চাউর হতেই আরো অনেকে। ভিড় বাড়তে লাগল। ছোটো ছোটো দলে কোথাও গান, কোথাও আবৃত্তি, কোথাও ঠাট্টাতামাশা, গালগল্প - যার যা খুশি। মুক্তির নানান সওদা। একসময় বোধকরি বিপ্লবীদেরই মনে হল এটা 'অপসংস্কৃতি'। একটা বোমাও ফাটল। পুলিশ এল, ঘোড়সওয়ার পুলিশ। ব্যান্ডমাস্টার তুষার রায়ের নিরীহ কণ্ঠ শোনা গেল: 'পুলিশ, ওরে পুলিশ,/ কবির দিকে চাইবি যখন টুপিটা তোর খুলিস।' শেষ পর্যন্ত জ্যোতির 'মুক্তমেলা' তার চরিত্র হারিয়ে একটু পোশাকি হয়ে উঠল। জ্যোতি এক 'মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়'-এর কথাও ভেবেছিল - আর আমরা কেউ কেউ অদূরে আরেক বৃক্ষপুঞ্জের তলায় 'দর্শন', 'ইতিহাস', 'সাহিত্য' ইত্যাদি পোস্টার নিয়ে বসেছিলাম। তবে সেখানে তেমন সমাগম হয়নি। কিন্তু সমাগম না চেয়ে, তার স্বভাব অনুযায়ীই 'মুক্ত'র পর এক 'গুপ্তমেলা'ও করেছিল জ্যোতি বালিগঞ্জের একটি পোড়ো বাড়িতে; যদিও তাতে আমার যাওয়া হয়ে ওঠেনি। সাক্ষ্য অদেয়।

কিন্তু যে-সাক্ষ্য অবশ্যই দেয় তা জ্যোতির আপন জীবনযাত্রায় বদল। 'কবিতা' পত্রিকায় তার প্রবেশ হাইনের উপর যে-গদ্য লেখায়, তার শিরোনাম্নী 'ফিনিক্স' কথাটা হয়তো কিঞ্চিৎ আত্মজৈবনিক। তখন তারা থাকছে ২০২, রাসবিহারী অ্যাভিনিউ-এর দোতলায় - বুদ্ধদেব বসুরা বাড়ি করে নাকতলা উঠে গেছেন, সেই নাকতলা যেখানে একবার এক ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছাজ্ঞাপনে আমরা কয়েকজন মাঝরাতে জ্যোতির নেতৃত্বে হেঁটে গিয়েছিলাম। 'কলকাতা' পত্রিকার কার্যালয়ও ২০২, অর্থাৎ সুবীর ও আমি প্রায়ই খানিকটা সময় ওখানে কাটাই। একদিন দেখা গেল জ্যোতি, বাড়ির বাইরেও, খালিপায়ে হাঁটছে। পরনের জামাকাপড়ও ঈষৎ মলিন। বাড়ির বাথরুমে চান করছে না, করছে বাইরে রাস্তার টিউবওয়েলে। আর হবি তো হ, সেই টিউবওয়েল টিপছি আমি কি সুবীর। রাস্তায় শুয়ে যারা কাতরায়, তাদের প্রতি মনোযোগও দিতে শুরু করল। এক রোগীকে তো প্রতিভা বসুর করা বৈষ্ণবঘাটার সেই মুহূর্তে খালি একতলার বারান্দায় নিয়ে গিয়ে তুলল। শুশ্রূষার মানসে। জ্যোতির সঙ্গে যে তাল রাখা সত্যিই মুশকিল তা সে বারবার প্রমাণ করেছে। তার এই বিবেকায়নের আগেই একবার এক 'চার হাজার দাতার তহবিল' খুলে বসেছিল। কী কারণে? না, বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাস 'রাত ভ'রে বৃষ্টি'-কে নিয়ে অশ্লীলতার মামলায় তাঁর জরিমানা হয়েছিল। সেই জরিমানা কি সামান্যতম দানে তাঁর চার হাজার পাঠক তাঁর হাতে তুলে দিতে পারে না?

'কলকাতা' উদিত হবার আগে একবার জ্যোতিরা দু-বছর মতো মার্কিনবাস করেছিল। মিমির ও তার বাংলাপ্রেমী বন্ধু এডওয়ার্ড ডিমক-এর আমন্ত্রণে জ্যোতি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের 'দক্ষিণ এশীয় ভাষা ও সভ্যতা' বিভাগে বাংলা সাহিত্য পড়াতে যায়। একই সঙ্গে আওয়ায়া বিশ্ববিদ্যালয়ে কবি পল এঙ্গেল-এর 'রাইটার্স ওয়ার্কশপ'-এও আতিথ্য নেয়। তার শিকাগোর ছাত্র ক্লিন্টন সিলি পরে কলকাতায় এসে বেশ কিছুদিন থাকেও জীবনানন্দের উপর প্রামাণ্য কাজ করে। এই প্রসঙ্গে জ্যোতির জীবনানন্দ-প্রীতিরও উল্লেখ করতে হয়। তার লেখায় যে-কবির মাঝে মাঝেই প্রায় অনিবার্য দেখা পাই তিনি জীবনানন্দ। অন্যদিকে, বাষট্টি সালে যে-সখ্য শুরু হয়েছিল বীট কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের সঙ্গে কলকাতায় (অ্যালেন গিন্সবার্গ ও পিটার অর্লভস্কির তোলা ঢেউয়ে উত্থান হাংরি জেনারেশনের, যার রক্ষাকল্পে জ্যোতিও সাক্ষ্য দিয়েছিল) তা এই মার্কিনবাসে আরো গভীর হল - 'আমার নাই বা হল পারে যাওয়া'র প্রথম খণ্ডে তার বিশদ বিবরণ আছে। ছেষট্টিতেই বোধকরি একবার আমার সঙ্গেও একটু সময় কাটে - এক প্রাচ্য-প্রতীচ্য সাহিত্য-সম্মিলনে আমার তদানীন্তন বিশ্ববিদ্যালয় ইন্ডিয়ানায় আসে। মার্কিনদেশে সেটা আমার তৃতীয় বছর - তার কি কোনো ছাপ আমার কথাবার্তায় জ্যোতি দেখেছিল? হয়তো।

জ্যোতিকে আমার বরাবরই খুব সাহসী লেগেছে। খুলনার 'সাহস' গ্রামে জন্মানো তার বাবা ভোলানাথ দত্ত ছিলেন একেবারেই ভয়ডরহীন। তারই উত্তরাধিকার? আমার একবার হৃদ্যন্ত্রে 'ইস্কিমিয়া' ধরা পড়েছিল। জ্যোতির সঙ্গে আমার বন্ধুতার গোড়ার দিকের কথা এটা। আমি ভয় পেলাম ও সবরকমের বিধিনিষেধ মেনে নিলাম। জ্যোতি শুনে অভয় দিয়ে বলল, ও কিছুই নয়, মশার কামড়। ইন্দিরা গান্ধী ঘোষিত 'জরুরি অবস্থা'য় গোড়ায় গা না করলেও (কলকাতার পাশাপাশি তো তার গঙ্গার মোহানাবর্তী গ্রাম 'নিশ্চিন্তপুর' ছিলই যেখানে গিয়ে সে যেমন মাটির কুটিরবাস করত তেমনি অভিজ্ঞ মাঝির সংসর্গে নৌকো বাইতেও পারত), তার অভিভাবকতুল্য বন্ধু হামদি বে-র উপদেশেই হোক বা চারপাশের সন্ত্রস্ত সমর্থনমূলক আচরণে রেগে গিয়েই হোক, সে যা করল তা অবিস্মরণীয়। গৌরকিশোর ঘোষের ও তার নিজের প্রতিবাদ প্রকাশের জন্য 'কলকাতা - বিশেষ রাজনীতি সংখ্যা' (১৯৭৫) ছাপল। দুঃসাহসের আর কী সংজ্ঞা হতে পারে? তার এক বছর অজ্ঞাতবাস ও সাত মাস কারাবাসের গল্প আমরা জানি।

আবার, বেরিয়ে পরে সে যা করল - এক ডিঙি নিয়ে দুই সঙ্গীসহ শ্রীলঙ্কা অভিমুখে বঙ্গোপসাগরে ভাসা - তাও কি কম সাহসের কথা? আমি খালি ম্যান অব ওয়ার বা মানোয়ার জেটিতে আরো অনেকের সঙ্গে দাঁড়িয়ে মনে মনে 'শুভা স্তে সন্তুপন্থানঃ' বললাম। সম্প্রতি, তার আত্মজীবনীর দ্বিতীয় খণ্ডের দুই-তৃতীয়াংশ জোড়া ওই ভাসমানতার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। তবে 'মণিমেখলা' নাম্নী ওই ডিঙি চড়েই, পরে, তার মাঝগঙ্গায় ভাসিয়ে রাখা বাড়িঘর-তথা-রেস্তোরাঁ-নৌকো 'কন্টিকি'তে গিয়ে মাঝে মাঝেই আড্ডা দিয়েছি। আবার, তার গল্ফ ক্লাব রোডের বাড়িতে গিয়েও যে কত আড্ডা দিয়েছি তার শেষ নেই। তার 'পিকাসো চেয়ার'-এ বসবার লোভও সংবরণ করতে পারিনি। বস্তুত, তার বইয়ের র‌্যাকের আদলেই আমার বইয়ের র‌্যাকও বানিয়েছিলাম। বলছি যতীন দাশ রোড ও গর্চা রোডের কথা।

এর আগেকার এক মজার গল্পও আছে। ষাটের গোড়ার দিকের। থাকি রাধারানী দেবী ও নরেন্দ্র দেবের 'ভালো-বাসা' বাড়িতে। ফুলব্রাইট বৃত্তি জুটেছে, আমেরিকা যাব। একটা স্যুট করাতে হবে। জ্যোতি তখন ভালো জায়গা থেকে কাপড় কিনে ভালো দর্জিকে দিয়ে বানানো জামাপ্যান্ট পরে। একদিন এক দর্জি এলো আমার কাছে। বলল জ্যোতিবাবু পাঠিয়েছেন। আমার চেহারা দেখে তার বিশ্বাস হচ্ছিল না যে স্যুটটা আমারই হবে। সত্যিই তো, স্যুট পরার আত্মবিশ্বাস আমার কোথায়!

আরেকটা গল্প। আমার পিতৃবিয়োগ হল ১৯৭৩-এ। শিলচর গেলাম। ফিরে এলে পর জ্যোতি এল। দরজা খুলে দিতে অবাক। সেকী! আপনাকে মুণ্ডিতমস্তক দেখব ভেবে এসেছিলাম। কিন্তু পিতৃশোকের সঙ্গে মস্তকমুণ্ডনের সম্পর্ক যে মুখ্যত আচারের, তা যে সে জানে তার প্রমাণ তো পাওয়া গেল পরের বছরই। বুদ্ধদেব বসুর মৃত্যুতে সে ধ্বস্ত, আর তার দু'দিনের মধ্যেই যখন তার বাবাও মারা গেলেন, তার শোকের সীমা রইল না। তবে পিতৃবিয়োগজনিত কোনো আচার সে পালন করল না, সেসব করল তার পরের ভাই, আলোকময়। তার মানে, আমায় যে ওই কথা বলেছিল জ্যোতি তা হয়তো প্রকাশ এক ধরণের উচ্ছ্বাসের যার রেশ তার কথাবার্তায় কখনো কখনো থাকত।

জ্যোতির সাহসের আরেক উদাহরণতার মরিচঝাঁপি আন্দোলনে যোগ। রুক্ষভূম দণ্ডকারণ্যের শিবির থেকে যখন দেশভাগজনিত উদ্বাস্তুরা এসে সুন্দরবনের মনুষ্য বিবর্জিত সজল-শ্যামল মরিচঝাঁপি দ্বীপে আশ্রয় নিল - শুধু আশ্রয়ই নিল না, বসতও গাড়ল - আর সেখান থেকে তাদের উৎখাত করতে বদ্ধপরিকর হয়ে উঠল রাজ্য সরকার, তখন 'যুগান্তর'-এর সাংবাদিক জ্যোতি প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে উঠল। পুলিশ-বেষ্টনীর দৃষ্টি এড়িয়ে সেখানে গেলও, এবং উদ্বাস্তু বসতের সাক্ষী হবার জন্য নিয়েও গেল তার মাতা ও শ্বশ্রুমাতাকে। গঙ্গাবক্ষে তার সাধের 'কন্টিকি' যা দিনদিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল - কে না যাচ্ছেন সেখানে - তা যে একদা হঠাৎ ডুবল, তা কি ইত্যাকার দুঃসাহসেরই অলিখিত মাশুল?

জ্যোতিদের এক দ্বিতীয় ও দীর্ঘতর মার্কিনবাসের পর্যায় ঘটল একটা সময়। প্রথম গেল ছেলে গোগো সহ মিমি, যতদূর মনে পড়ছে নিউ ইয়র্ক শহরের উত্তরের পাড়ায় এক স্কুলে পড়াবার কাজ নিয়ে। তিতির তখন বিবাহিত, সে রয়ে গেল। জ্যোতি গেল একটু পরে তার হাতের কাজ (পরিকল্পিত 'বঙ্গোপসাগর' পত্রিকা সংক্রান্ত?) মিটিয়ে, ও তিতির-কল্যাণকে গল্ফ ক্লাব রোডে বসিয়ে। এর পর জ্যোতি-মিমিকে কলকাতায় দেখছি ২০০৬-এ, মার্কিনফেরত নয়, মার্কিনবাস থেকে ছুটি নিয়ে। প্রতিভা বসু অসুস্থ, তাঁকে হাসপাতালে দিয়েছে তিতির (পুত্র পাপ্পা তথা, 'কলকাতা'য় 'অতর্কিতে হঠাৎ অমলা'র লেখক, এবং তার আগে ব্লূমিংটন, ইন্ডিয়ানায় আমার রুমমেটও পরে যাদবপুরে আমার তরুণ সহকর্মী শুদ্ধশীল, আগেই চলে গেছে যার শোক প্রতিভা বসু কখনো ভুলতে পারেননি)। কনিষ্ঠ কন্যা রুমিও (দময়ন্তী) তখন তার ছেলের কাছে বিদেশে; মায়ের দেখাশোনা করছে বিদেশ থেকে সদ্য-আগত মিমি। প্রতিভা বসু যেদিন চলে গেলেন, তাঁকে নাকতলা নিয়ে আসা হল, সেদিন জ্যোতিকে পেলাম নাকতলার এক ঘরে (ওখানেই উঠেছে তারা)। তার সঙ্গে আছে দু-তিনজন। আমিও বসলাম। শোক মোকাবেলা করতেই কিনা জানি না, জ্যোতি বলল, ও একটু জিন খাবে। অন্যেরা খেল না, কিন্তু ওকে সঙ্গ দিতে আমি নিলাম। তখন দ্বিপ্রহর। মনে পড়ল কীভাবে, লর্ড সিনহা রোডে ড. সুধীন মুখার্জির ক্লিনিকে যাওয়ার পথে, জ্যোতি প্রতিভা বসুকে কোলে করে গাড়িতে তুলত। আবার, বত্রিশ বছর আগে, ১৯৭৪-এর ১৮ মার্চ ভোরে ক্যালকাটা হসপিটাল থেকে নাকতলার পথে, বুদ্ধদেব বসুর দেহ কোলে করে তুলে নিয়ে পাপ্পার সঙ্গে ট্যাক্সির পিছনের সীটে বসেছিল - জ্যোতি।

তাদের এই দীর্ঘ মার্কিনবাস তুলে দিয়ে পাকাপাকিভাবে ফিরে আসবার আগে জ্যোতিরা আরো এসেছে। থেকেছে তিতিরের সঙ্গে। তিতির তাদের নিয়ে ঘরোয়া আসরও বসিয়েছে। তেমন আসরে গেছিও। আঁচও পেয়েছি আমাদের না-ফুরোনো বন্ধুতার। আবার, তাদের মার্কিনবাসের শেষদিকে, মাঝে মাঝে, জ্যোতির ফোন পেয়েছি নিউ জার্সি থেকে: জ্যোতি বলছি, অমিয়। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। ফিরে এল যখন, মিমি আমার ভূতপূর্ব বাসস্থান ৬৭, যতীন দাশ রোডের তিনতলার মতো এক ছাতওয়ালা ফ্ল্যাট খুঁজে নিল। যোধপুর পার্কের দক্ষিণ প্রান্তে প্রিন্স আনওয়ার শাহ্ রোডের উপর। সেটাই ওদের শেষ ঠিকানা। (পরিবর্তমান ঠিকানা নিয়ে একবার লিখেওছিল বুঝি জ্যোতি 'কলকাতা'য়, কিঞ্চিৎ সমাজবিদ - ও দার্শনিকসুলভ।) সেখানেই জ্যোতির সঙ্গে আমার শেষ দেখা, মিমির মৃত্যুর পর। সারাজীবনের সঙ্গী মীনাক্ষীকে (মিমি নয়, মীনাক্ষীই বলত তাকে) হারিয়ে তার সেই চেহারা আমি ভুলবো না। পরলোকে বিশ্বাস থাকলে বলতাম, তার সঙ্গ নিতেই বুঝি 'ভূতলে অতুল দুহিতা'র বাড়ি গিয়ে ঘুমের মধ্যে রওয়ানা হল!

যে-প্রতিভার স্পর্শ নিয়ে জ্যোতি এসেছিল তা প্রকৃতই বহুমুখী। তার 'কোমল ক্যাকটাস' ও 'Prickly Pears'-এর কথা আমাদের মনে আছে। তার অ-সাংবাদিক গদ্য-পদ্যের পরিচয়ও আমরা পেয়েছি। তার সম্পাদনার ঠাটও আমরা দেখেছি। সে যেমন নৌকো বাইতে শিখেছিল তেমনি শিখেছিল আকাশে ভাসতে বা গ্লাইডিং-ও। 'মুক্তমেলা' বা 'গুপ্তমেলা' যে তারই মস্তিষ্কজাত তা কি আমরা ভুলব? বা গঙ্গাবক্ষে ভাসমান রেস্তোরাঁ? কিন্তু আমাদের কি মনে আছে তার সেই প্রদর্শনীর কথা যেখানে তার মাটি দিয়ে গড়া নানান কাজও শোভা পেয়েছিল?