আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা ● ১৬-২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ● ১-১৫ ফাল্গুন, ১৪৩২

প্রবন্ধ

বাংলাদেশে ভোট কারচুপি হয়েছে কি?

গৌতম লাহিড়ী


বাংলাদেশের চিরাচরিত প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি। দুটি দল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। তবে আদর্শগত অবস্থান ভিন্ন। আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না দেওয়ায় বিএনপির জয় নিয়ে সংশয় ছিল না। তবে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী জামায়েত ইসলামী নির্বাচনের প্রাক্কালে নিজেদের প্রভাব মজবুত করে ফেলেছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম সর্বোচ্চ আসন পেয়ে জামায়েত জোট জমি শক্ত করে ফেলেছে। জামায়েত নিজে পেয়েছে ৬৮টি আসন, সহযোগী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬ এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ ২টি - মোট ৭৭। এনসিপি হল প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস-এর মদতে তৈরি দল যারা শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলেছিল।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের ভোটাররা মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনকারী দলকে জিতিয়ে কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছেন। ১৭ বছর পর দেশে প্রত্যাবর্তন করে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন এটা প্রায় নিশ্চিত। কিন্তু নির্বাচনের জয়-পরাজয় বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শেষ কথা নয়। এই ভোটের সঙ্গে ছিল গণভোট। এই গণভোট হয়েছে জুলাই আন্দোলনের ভিত্তিতে তৈরি সনদ অনুযায়ী - মূলত বাংলাদেশের সংবিধান আমূল সংশোধনের জন্য। এর পক্ষে প্রচারে নেমেছিলেন ইউনূস নিজে। এবং তাঁকে সমর্থন করে জামায়েত ও এনসিপি। বিএনপি জুলাই সনদের অনেক বিষয়ে সহমত পোষণ করলেও বহু মৌলিক বিষয়ে 'নোট অফ ডিসেন্ট' দিয়েছে। যেমন প্রধানমন্ত্রীর তুলনায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়বে। দেশের সব সাংবিধানিক পদে নিয়োগ করবেন রাষ্ট্রপতি; প্রধানমন্ত্রী নয়। কার্যত রাষ্ট্রপতি ধাঁচের শাসন ব্যবস্থা লাগু হতে পারে।

ভোটের ফল নিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুথ ভিত্তিক তথ্য নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি ভোটের হার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

গণভোটের ফল দেখা গেছে; পক্ষে পড়েছে ৬৮ শতাংশ এবং বিপক্ষে ৩২ শতাংশ। বাংলাদেশের মোট ভোটার প্রায় ১৩ কোটি। 'হ্যাঁ'-র পক্ষে পড়েছে প্রায় ৫ কোটি এবং 'না'-তে ২ কোটি ৫০ লক্ষ। বাতিল হয়েছে প্রায় ৭৫ লক্ষ। এর থেকে প্রমাণিত প্রায় চার কোটি মানুষ গণভোটে ভোট দেননি। নীতিগত প্রশ্ন উঠতে পারে, বাংলাদেশের মানুষ আদৌ কি বঙ্গবন্ধু রচিত সংবিধান বদলাতে চান? ইউনূস যেহেতু মরিয়া সংবিধান পরিবর্তন করতে তাই বহু কেন্দ্রের কারচুপির তথ্য পাওয়া যাচ্ছে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্য থেকে। যেমন;

রাজশাহী-৪ আসনে মোট ভোটার ৩ লক্ষ ১৯ হাজার। অথচ ভোট পড়েছে ৭ লক্ষ ৮১ হাজার। অর্থাৎ ২৪৫ শতাংশ বেশি। একই কেন্দ্রে বিএনপি ও জামাতের ভোট তত নয় যতটা গণভোট পড়েছে।

সিরাজগঞ্জ-১ আসনে ভোটের শতাংশ যা তার থেকে অনেক কম গণভোট পড়েছে।

আবার নেত্রকোনা ৩, ৪ ও ৫ এই তিনটি আসনে মোট ভোটারের থেকে বেশি পড়েছে গণভোট।

প্রশ্ন উঠেছে ভোটের হার নিয়ে। ভোটের দিন সকাল ১১টায় নির্বাচন কমিশন ব্রিফিং করে জানায় প্রথম ৩ ঘণ্টা ৩০ মিনিটে ভোট পড়েছে ১৪.৯৬ শতাংশ; অর্থাৎ প্রায় ২ কোটি। এই হিসাবে প্রতি মিনিটে গড়ে ৯০ হাজারের কিছু বেশি ভোট পড়েছে। এরপর দুপুর ১২টায় বলা হল মোট ভোটের হার প্রায় ৩৩ শতাংশ। তাহলে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১২টা - এই এক ঘণ্টায় ভোট হয়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ ২ কোটি ২৮ লক্ষের কিছু বেশি; প্রতি মিনিটে প্রায় ৩ লক্ষ ৮১ হাজারের বেশি ভোট পড়েছে। এটা বিশ্বাসযোগ্য?

প্রথম সাড়ে তিন ঘণ্টায় ভোট পড়ল ঘণ্টা প্রতি ৪.২৭ শতাংশ। অথচ পরের ঘণ্টায় ১৭.৯২।

দেশের সব কেন্দ্রে যদি এক হারে ভোট হতে থাকে (৩২,৭৮৯) তাহলে প্রতি মিনিটে ভোট পড়েছে ১১.৬৩টি ভোট। প্রতি সেকেন্ডে ৫.১৬। এটা সম্ভব? বাংলাদেশে অতীতে যে ভোট হয়েছে তাতে দেখা গেছে সকাল ১১টা পর্যন্ত ভোট হয় সবচেয়ে স্বাভাবিক। তাহলে প্রথম পর্যায়ে কম ভোট হলে পরে বাড়ল কি করে? এরপর দুপুর ২টায় নির্বাচন কমিশন বলল, ২টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৪৭.৯১ শতাংশ; অর্থাৎ ১২টা থেকে ২টার মধ্যে দুই ঘণ্টায় ভোট বেড়েছে ১৫ শতাংশ; বা প্রায় ২ কোটি। প্রতি মিনিটে ১ লক্ষ ৬০ হাজার ভোট পড়েছে।

সর্বশেষ বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটে মোট ভোটের হার দেখানো হল ৫৯.৪৪ শতাংশ (যদিও পরে বাড়ানো হয়েছে) অর্থাৎ আড়াই ঘণ্টায় ভোট বাড়ল ১১.৫৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি মিনিটে প্রায় দশ হাজার ভোটে পড়ল। সাংবাদিকরাই বলেছেন প্রতি কেন্দ্রে ভোট দিতে গড়ে দেড় মিনিট থেকে তিন মিনিট লেগেছে। তাহলে এত ভোট হল কী করে। বিভিন্ন অঞ্চলে বাস্তব চিত্র ছিল ফাঁকা কেন্দ্র, নিষ্ক্রিয় বুথ - পুলিশ ফুটবল খেলছে।

কারাগারে রয়েছে ৮৬ হাজার ভোটার। ভোট পড়েছে ৫ হাজার। প্রবাসী ভোট দেড় কোটির মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৫ লক্ষ।

তাই ৬০ শতাংশ ভোট গল্প ছাড়া কিছু নয়।

গণভোটের পক্ষে নেমেছিল রাষ্ট্র নিজেই। 'হ্যাঁ'-র পাশে টিক আবার 'না'-র পাশে ক্রস। দু' রকম পদ্ধতিতে বিভ্রান্তি হয়েছে। ১৮ ঘণ্টা ধরে আসন ভিত্তিক ফল ঘোষণা হলেও গণভোটের ফল প্রকাশ করতে পাঁচ ঘণ্টা দেরি করা হয়েছে।

বিতর্কিত ফলাফল দেশে স্থিরতা আনতে পারবে না। অনেক অনিয়ম প্রকাশিত হয়েছে। এক কেন্দ্রে দেখা গেছে আগের রাতে চার জন মহিলা ব্যালটে সিল মারছেন। অনেকের ভোট আগেই দেওয়া হয়েছে। একই প্রার্থীর একাধিক এজেন্ট দেখা গেছে, কেন অনুমতি দেওয়া হল।

আওয়ামী লীগের আমলে বিএনপি নিজেরাই নির্বাচন বয়কট করেছিল। নির্বাচন বানচাল করার জন্য ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল। আওয়ামী লীগ এবার নির্বাচন বয়কট করেনি। তাদের জোর করে নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়েছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচন বাতিল করার জন্য কোনো সহিংসতা করেনি। ভোট বয়কটের ডাক দিয়েছিল। এই জন্য ইউনূস সম্ভবত ভোটের হার বাড়িয়ে দেখিয়েছেন।