আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা ● ১৬-২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ● ১-১৫ ফাল্গুন, ১৪৩২

প্রবন্ধ

রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতি ও বাজেট ২০২৬-২৭

শোভিক মুখার্জ্জী


বাজেট মানেই সাধারণ মানুষের চোখে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, করছাড়ের প্রত্যাশা আর উন্নয়নের বড় বড় ঘোষণা। সংসদের মেঝেতে অর্থমন্ত্রীর বক্তৃতাই যেন জাতীয় অর্থনীতির দিশা নির্ধারণ করে। কিন্তু বাজেট ২০২৬-২৭-এর ক্ষেত্রে বাস্তব চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সংসদে বাজেট পেশ হওয়ার অনেক আগেই স্থির হয়ে গিয়েছিল সরকার কতটা ব্যয় করতে পারবে, কোথায় বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব, আর কোন খাতে কঠোর সংযম বজায় রাখতে হবে। এই সীমারেখা রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, বরং কঠোর আর্থিক তথ্য ও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে।

এই অদৃশ্য কাঠামো সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক-এর 'State Finances: A Study of Budgets 2025-26' প্রতিবেদনে। বাজেটের ঠিক কয়েক দিন আগে প্রকাশিত এই রিপোর্ট কার্যত কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের আর্থিক অবস্থার একটি সমন্বিত মানচিত্র তুলে ধরে। এতে রাজ্যগুলোর ঘাটতি, ঋণের ভার, মূলধনী ব্যয়ের প্রবণতা এবং জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই সব তথ্য মিলিয়ে রিপোর্টটি বাজেট ২০২৬-২৭-এর জন্য একটি আর্থিক ফ্রেমওয়ার্ক আগেই তৈরি করে দেয়। যার বাইরে গিয়ে কোনও বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।

আজকের ভারতের কেন্দ্রীয় বাজেট তাই রাজনৈতিক ইচ্ছার একক প্রতিফলন নয়। এটি তৈরি হয় এমন এক বাস্তবতার মধ্যে, যেখানে ঋণ টেকসই রাখা, বাজারের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখা এবং কেন্দ্র-রাজ্যের সম্মিলিত ভারসাম্য রক্ষা করা প্রধান বাধ্যবাধকতা।

সংসদে ওঠার আগেই লেখা হয়ে যাওয়া বাজেট

রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক-এর প্রতিবেদনের কেন্দ্রে রয়েছে রাজ্যগুলোর সম্মিলিত আর্থিক চিত্র। সেখানে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে রাজ্যগুলোর মোট আর্থিক ঘাটতি ছিল জিডিপির ২.৯ শতাংশ। ২০২৪-২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩.৩ শতাংশে এবং ২০২৫-২৬ সালের বাজেট অনুমানেও একই স্তরে থাকার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ রাজ্যগুলো ইতিমধ্যেই তাদের আর্থিক স্বস্তির ঊর্ধ্বসীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্রমবর্ধমান দায়। ২০২৪ সালের মার্চে যেখানে রাজ্যগুলোর মোট বকেয়া দায় ছিল জিডিপির ২৮.১ শতাংশ, সেখানে ২০২৬ সালের মার্চে তা বেড়ে ২৯.২ শতাংশে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই ঋণের একটি বড় অংশ এসেছে কেন্দ্রের দেওয়া ৫০ বছরের সুদবিহীন বিশেষ সহায়তা থেকে, যা মূলত পরিকাঠামো প্রকল্পে ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। যদিও এই ঋণ রাজ্যগুলোর ক্যাপেক্স বাড়াতে সাহায্য করেছে, একই সঙ্গে তা ভবিষ্যতের দায়ও বৃদ্ধি করছে।

এই পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকার চাইলেও বড় আকারে ঘাটতি বাড়িয়ে ব্যয় সম্প্রসারণ করতে পারে না। কারণ কেন্দ্র ও রাজ্যের সম্মিলিত ঋণ পরিস্থিতি বাজারে ভারতের আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। ফলে বাজেট ২০২৬-২৭ আদতে কোনও মুক্ত আর্থিক পরীক্ষাগার ছিল না বরং ছিল সীমাবদ্ধতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার একটি কৌশলগত প্রচেষ্টা।

সাময়িক চাপ নয়, স্থায়ী কাঠামোগত সংকট

রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে ভারতের বর্তমান আর্থিক চাপ আর সাময়িক নয়। অতীতে কোভিড, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বা নির্বাচনী ব্যয়কে দায়ী করা হলেও, এখন যে সমস্যাগুলি দেখা যাচ্ছে সেগুলি কাঠামোগত।

প্রথমত, জনসংখ্যাগত রূপান্তর রাজ্যগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। তরুণ জনসংখ্যা অধ্যুষিত রাজ্যগুলিতে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, ফলে রাজস্ব সংগ্রহের সম্ভাবনাও বাড়ছে। বিপরীতে, দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের কিছু রাজ্যে জনসংখ্যা দ্রুত বার্ধক্যের দিকে যাচ্ছে। সেখানে করভিত্তি সংকুচিত হচ্ছে এবং পেনশন ও স্বাস্থ্য খরচ ক্রমাগত বাড়ছে।

দ্বিতীয়ত, ঋণের গঠন এখন এমন যে সুদের হারে সামান্য ওঠানামা হলেও রাজ্য বাজেটে বড় ধাক্কা লাগে। সুদ পরিশোধ, বেতন ও পেনশন মিলিয়ে রাজ্যগুলোর মোট ব্যয়ের একটি বড় অংশ এখন বাধ্যতামূলক খাতে আটকে গেছে। এর ফলে নতুন সামাজিক প্রকল্প বা উৎপাদনমুখী বিনিয়োগের জন্য হাতে খুব কম অর্থ থাকছে।

তৃতীয়ত, কেন্দ্র-রাজ্য আর্থিক সম্পর্ক ক্রমশ শর্তসাপেক্ষ হয়ে উঠছে। অনুদান ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের সঙ্গে নির্দিষ্ট সংস্কার শর্ত জুড়ে দেওয়া হচ্ছে, যা রাজ্যগুলোর নীতিগত স্বাধীনতা সীমিত করছে। এই চারপাশের কাঠামোগত চাপ মিলিয়ে বাজেট ২০২৬-২৭-কে একটি সংযত, রক্ষণশীল কাঠামোর মধ্যেই আবদ্ধ করে ফেলেছে।

ভারতের আর্থিক ভারকেন্দ্র এখন রাজ্যগুলোর হাতে

বাজেট ২০২৬-২৭ কার্যত স্বীকার করে নিয়েছে যে ভারতের উন্নয়ন ব্যয়ের ভারকেন্দ্র এখন রাজ্যগুলোর হাতে। এই বাজেটে কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি মূলধনী ব্যয় বৃদ্ধির হার তুলনামূলকভাবে সংযত রাখা হয়েছে, অথচ রাজ্যগুলোর জন্য ৫০ বছরের সুদবিহীন ঋণ, পরিকাঠামো সহায়তা এবং সংস্কার-সংযুক্ত মূলধনী অনুদান আরও সম্প্রসারিত করা হয়েছে। বাজেটের এই নকশা স্পষ্ট করে দেয় যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন হিসেবে এখন রাজ্যগুলোকেই সামনে রাখা হচ্ছে।

এর আর্থিক ভিত্তি রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক-এর প্রতিবেদনে উল্লেখিত প্রবণতার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ। বর্তমানে মোট বাজার-ঋণের প্রায় ৭৬ শতাংশ রাজ্যগুলোর ঘাটতি মেটাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাজেট ২০২৬-২৭ এই বাস্তবতাকে উপেক্ষা না করে বরং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। কেন্দ্র নিজে ঘাটতি বাড়ানোর বদলে রাজ্যগুলোর ঋণগ্রহণ ক্ষমতাকে কাজে লাগাচ্ছে, যাতে সামগ্রিক বিনিয়োগ বজায় থাকে অথচ কেন্দ্রীয় ঘাটতি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে থাকে। ফলে সুদের হার, বন্ড বাজারের স্থিতি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার মতো সূচক এখন কেন্দ্র ও রাজ্য - উভয়ের সম্মিলিত আচরণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

এই প্রেক্ষিতে বাজেট ২০২৬-২৭ আর এককভাবে 'কেন্দ্রীয় বাজেট' নয়; এটি কার্যত একটি যৌথ আর্থিক কাঠামো। রাজ্যগুলোর ঋণক্ষমতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতাই এখন কেন্দ্রীয় বাজেটের কার্যকারিতা নির্ধারণ করছে। অর্থাৎ, জাতীয় অর্থনীতির গতি ক্রমশ একটি বিকেন্দ্রীভূত আর্থিক বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।

"আর্থিক স্থিতিশীলতা"-র নীরব নকশা

বাজেট ২০২৬-২৭-এ আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষার কৌশলটি প্রকাশ্য ঘোষণার চেয়ে কাঠামোগত নকশার মধ্যেই বেশি লুকিয়ে আছে। রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক যেমনটি বলেছে, ব্যয়ের গুণগত মান উন্নত হয়েছে মূলত মূলধনী ব্যয়ের অনুপাত বাড়িয়ে। বাজেটেও সেই ধারা বজায় রাখা হয়েছে - কিন্তু সরাসরি কেন্দ্রের খরচ বাড়িয়ে নয়, বরং রাজ্যগুলিকে দীর্ঘমেয়াদি সুদবিহীন ঋণ ও শর্তসাপেক্ষ সহায়তার মাধ্যমে। এর ফলে অবকাঠামোতে বিনিয়োগ চলমান থাকছে, অথচ কেন্দ্রীয় ঘাটতির পরিসংখ্যান তুলনামূলক সংযত দেখানো যাচ্ছে।

একই সঙ্গে বাজেট ২০২৬-২৭-এ ‘অফ-বাজেট’ প্রবণতা আরও প্রাতিষ্ঠানিক হয়েছে। বিভিন্ন বিশেষ উদ্দেশ্য বাহন, সরকারি সংস্থা ও সংস্কার-সংযুক্ত প্রকল্পের মাধ্যমে ব্যয়ের একটি অংশ সরাসরি মূল বাজেটের বাইরে পরিচালিত হচ্ছে। বিদ্যুৎ খাত সংস্কার, নগর প্রশাসনের আধুনিকীকরণ কিংবা রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধির মতো ক্ষেত্রে কেন্দ্র অর্থনৈতিক সহায়তার বদলে নীতিগত শর্ত জুড়ে দিয়েছে। অর্থাৎ অর্থ আসছে, কিন্তু তার সঙ্গে আসছে বাধ্যতামূলক সংস্কার।

এই লক্ষ্যভিত্তিক বরাদ্দ আসলে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক-এর রিপোর্টে উঠে আসা জনসংখ্যাগত ও আর্থিক বিভাজনের সরাসরি প্রতিফলন। বাজেট ২০২৬-২৭-এ তাই আর সার্বজনিক উদ্দীপনা বা সমান অনুদানের প্রবণতা দেখা যায় না। বরং প্রতিটি রাজ্যের আর্থিক স্বাস্থ্য, কর্মক্ষম জনসংখ্যার প্রবণতা এবং বিদ্যমান দায়ের বোঝা অনুযায়ী প্রকল্প বাছাই করা হয়েছে। এই পদ্ধতিতে সামগ্রিক আর্থিক স্থিতি বজায় থাকলেও, রাজ্যগুলোর নীতিগত স্বাধীনতা সীমিত হচ্ছে।

উপসংহার: রাজনীতি নয়, আর্থিক তথ্যই লিখেছে বাজেট

বাজেট ২০২৬-২৭ আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে - ভারতের আর্থিক নীতি আর কেবল রাজনৈতিক ইচ্ছার ফল নয়। সংসদে ঘোষিত প্রতিটি উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি বা ব্যয়ের সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে কঠোর আর্থিক সীমারেখা, যা আগেই নির্ধারণ করেছে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক-এর পরিসংখ্যান-ভিত্তিক মূল্যায়ন। এটি বোঝায় যে কেন্দ্র একা বাজেটের গতি নির্ধারণ করে না; রাজ্যগুলোর ঘাটতি, জনসংখ্যাগত কাঠামো এবং বাজার-ঋণের চাপ মিলিয়ে তৈরি হয় একটি যৌথ আর্থিক বাস্তবতা।

এই বাস্তবতার প্রভাব ভবিষ্যতের বাজেট নীতিতেও স্পষ্ট। বড় রাজনৈতিক ঘোষণা বা প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে আর্থিক স্থিতিশীলতা, ঋণের টেকসই ব্যবহার এবং প্রাতিষ্ঠানিক হিসাবনিকাশের নীতি। রাজনীতি ঠিক করে কোথায় খরচ হবে। সংসদে বিতর্ক ও রাজনৈতিক বক্তব্য পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু কতটা খরচ করা যাবে, সেই স্বাধীনতা নির্ধারিত হয়েছে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক-এর আর্থিক মূল্যায়নের মাধ্যমে। এটাই বাজেট ২০২৬-২৭-এর নীরব সত্য।