আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যা ● ১৬-২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ● ১-১৫ ফাল্গুন, ১৪৩২
সমসাময়িক
ভারত-ভাগ্য-বিধাতা

উত্তরাখণ্ডের কোটদ্বারে দীপক কুমার নামে যে যুবকের স্পর্ধিত উত্থান আমরা দেখলাম, তা আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং তা ভারতের সেই চিরন্তন, শাশ্বত ও সনাতন আত্মার এক জীবন্ত প্রতিফলন। ভারতাত্মার যে মূল সুরটি 'বিবিধের মাঝে মিলন মহান'-এর মন্ত্রে দীক্ষিত, দীপক কুমার এবং তাঁর বন্ধু ওয়াকিল আহমেদ সেই আবহমান ভাবনারই মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছেন। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে ভারতবর্ষ শিখিয়েছে যে, বর্হিরঙ্গভেদে মানুষের অন্তরাত্মা এক ও অভিন্ন। গত ২৬শে জানুয়ারি, ২০২৬ - প্রজাতন্ত্র দিবসের সকালে যখন দেশজুড়ে সংবিধানের জয়গান হওয়ার কথা, ঠিক তখনই কোটদ্বারের এক প্রবীণ মুসলিম দোকানি ওয়াকিল আহমেদকে কেন্দ্র করে আধুনিক ভারতের হৃৎপিণ্ডে ঘনিয়ে আসা এক গভীর অসুখের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ ঘটল।
দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে 'বাবা স্কুল ড্রেস' নামে একটি দোকান চালিয়ে আসছিলেন ওয়াকিল আহমেদ। স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি অত্যন্ত পরিচিত এবং সমাদৃত মুখ। কিন্তু সেই সকালেই বজরং দল এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদের একদল উন্মত্ত কর্মী তাঁর দোকানে চড়াও হয়। তাদের দাবি ছিল অত্যন্ত অদ্ভুত এবং উস্কানিমূলক - একজন মুসলমান কেন তাঁর দোকানের নামে 'বাবা' শব্দটি ব্যবহার করবেন? তাঁদের মতে, 'বাবা' শব্দটি হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যের একচেটিয়া সম্পদ, যা কোনো মুসলমান ব্যবহার করলে তা 'অপবিত্র' হয়। বৃদ্ধ ওয়াকিল আহমেদ যখন একদল উত্তেজিত যুবকের তর্জন-গর্জনের সামনে কুঁকড়ে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই পাশের জিম থেকে স্পর্ধিত উচ্চতায় বেরিয়ে আসেন তরুণ দীপক কুমার।
দীপক কুমারের প্রতিবাদ ছিল সপাট এবং নির্ভীক। তিনি যখন ওই উন্মত্ত ভিড়কে প্রশ্ন করেন যে, একজন মানুষ দীর্ঘ তিন দশক ধরে যে নামে ব্যবসা করছেন, আজ হঠাৎ সেই নামে কী দোষ খুঁজে পাওয়া গেল - তখন ভিড় তাঁর দিকে তেড়ে আসে। যখন তাঁকে তাঁর পরিচয় জিজ্ঞেস করা হয়, দীপক কুমার এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে নিজের পরিচয় দেন 'মহম্মদ দীপক' হিসেবে। এই একটি নাম ঘোষণা ছিল ভারতের সেই সনাতন দর্শনের জয়গান, যা শিখিয়েছে 'বিবিধের মাঝে মিলন মহান'। তিনি কেবল নিজের নাম বলেননি, বরং সপাটে চড় মেরেছেন সেই সংকীর্ণতাকে, যা ধর্ম দিয়ে মানুষকে ভাগ করতে চায়। তিনি সশরীরে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, প্রকৃত ভারতীয়ত্ব কোনো বিশেষ পোশাক বা তিলকে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা প্রতিবেশীর বিপদে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানোর সাহসিকতায় নিহিত। দীপক এবং তাঁর বন্ধু ওয়াকিল আহমেদ আজ সেই আবহমান ভারতাত্মার মূর্ত প্রতীক, যা সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পেও অমলিন।
কিন্তু এই সাহসিকতার মূল্য দীপককে চোকাতে হয়েছে অত্যন্ত চড়াভাবে। ঘটনার পর থেকেই উত্তরাখণ্ডের বিজেপি সরকার এবং সঙ্ঘ পরিবারের আইটি সেল তাঁর বিরুদ্ধে এক পরিকল্পিত যুদ্ধ ঘোষণা করে। যে জিম চালিয়ে দীপক সংসার চালাতেন, সেখান থেকে রাতারাতি ১৫০ জন সদস্যের মধ্যে প্রায় ১৪০ জনকেই ভয় দেখিয়ে বা সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়িয়ে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। তাঁর ওপর নেমে আসে সামাজিক ও আর্থিক বয়কট। এমনকি, এক কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী তাঁর মাথার দাম ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঘোষণা করে। প্রশাসনের ভূমিকা এখানে ছিল অত্যন্ত নক্কারজনক। যে গুন্ডারা বৃদ্ধের দোকান ভাঙচুর করতে গিয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া তো দূরস্থ, উল্টে দীপক কুমারের বিরুদ্ধেই পুলিশ এফআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করে। এই ঘটনা প্রবাহ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, বর্তমান শাসনে বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসন কীভাবে একপাক্ষিক ও মেরুকরণের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
এই শাসকরা আজ জাতীয় সংগীত কিংবা দেশপ্রেমের স্লোগানকে সম্প্রীতির বদলে বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে উদ্যত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে ভারততীর্থের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে সকল নদী এসে এক সাগরে মেশে, সেই উদার ও মানবিক ভারতাত্মাকে কলুষিত করতে চাইছে এই ঘৃণা-সর্বস্ব রাজনীতি। রবীন্দ্রনাথের 'ভারততীর্থ'-এর ধারণা এঁদের কাছে কেবলই ভোটব্যাংক তৈরির কৌশল। কিন্তু দীপক কুমারের মতো সাধারণ মানুষেরাই আজ ক্ষমতার দম্ভকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। তাঁরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন যে, ক্ষমতার অলিন্দে বসে থাকা ফ্যসিস্ট শক্তির চেয়ে জনমানুষের সংহতি অনেক বেশি শক্তিশালী। আরএসএস-বিজেপি-বজরং দলের সাম্প্রদায়িক ঘৃণার বিরুদ্ধে এই 'মহম্মদ দীপক' পরিচয়টি আসলে এক সুতীব্র আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধ।
দীপক কুমারের লড়াই তাই কেবল কোটদ্বারের লড়াই নয়, এটি ভারতের সংবিধান রক্ষার লড়াই। রবীন্দ্রনাথের অসাম্প্রদায়িক ভারতের উত্তরাধিকারকে যদি রক্ষা করতে হয়, তবে এই বিকৃত রাজনৈতিক শক্তিকে যেকোনো মূল্যে রুখে দেওয়া আজ সময়ের দাবি। দীপক কুমার আজ একলা লড়ছেন না। তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে সারা দেশের বিবেকবান মানুষ। দীপক কুমারের এই জয়গাথা যেন প্রতিটি ভারতীয়র হৃদয়ে সেই প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে দেয়, যা পুড়িয়ে খাক করে দেবে ঘৃণা আর বিদ্বেষের বিষবাষ্পকে। কারণ, ভারতের আসল পরিচয় ঘৃণা নয়, বরং সেই প্রেম ও ভ্রাতৃত্ব যা আবহমান কাল ধরে এই মাটিকে পবিত্র করে রেখেছে। মোদী-শাহ-যোগীদের এই ঘৃণা সর্বস্ব রাজনীতিকে পরাজিত করে রবীন্দ্রনাথের ভারতাত্মাকে পুনরুদ্ধার করাই হোক আমাদের বর্তমান সময়ের প্রধান শপথ। কবির সেই শাশ্বত আহ্বান আজ দীপক কুমারের লড়াইয়ের মধ্যে দিয়েই আমাদের কানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে:
অহরহ তব আহ্বান প্রচারিত, শুনি তব উদার বাণী
হিন্দু বৌদ্ধ শিখ জৈন পারসিক মুসলমান খ্রিস্তানী
পূরব পশ্চিম আসে তব সিংহাসন-পাশে
প্রেমহার হয় গাঁথা,
জনগণ-ঐক্য-বিধায়ক জয় হে, ভারত-ভাগ্য-বিধাতা!
জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয় জয় হে॥