আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা ● ১-১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ● ১৬-৩০ মাঘ, ১৪৩২

সম্পাদকীয়

নির্বাচন কমিশন না নির্যাতন


বিগত দুই মাস পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত মানুষকে আবারও লাইনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার তথা নির্বাচন কমিশন। ২০১৬ সালে আদর্শ দেশবাসী হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে, সীমান্তে প্রহরারত সেনানীদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের পকেটের নোট বদল করতে আপামর দেশবাসীকে লাইনে দাঁড় করিয়েছিল এই সরকার। এবারেও দেশ জোড়া সেই আয়োজন। তবে সবাই একসাথে নয়, ভাগে ভাগে। যার রাজ্যে আগে বিধানসভা নির্বাচন তাদের বরাত শিকে ছিঁড়েছে। তারা নিজেদের দেশের নাগরিক প্রমাণ করার ফরমান পেয়েছেন ঘুরপথে। ফলে তাঁরা আবার বাধ্য হয়েছেন লাইনে দাঁড়াতে। কী মজার কথা! মানুষ অনেক ভেবে বা না ভেবে যাদের নির্বাচিত করে সরকারে পাঠালেন, তারাই এখন তাদের নির্বাচকদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এখন নির্বাচকের দায় তার নিজের ভোটাধিকার রক্ষা করা। তার জন্য পারলে চোদ্দ পুরুষের নথি জোগাড় করে এনে তাকে লাইনে দাঁড়াতে হবে। রুজি, রুটি, বাসস্থান, মৌলিক অধিকার, সরকারের কাজের খতিয়ান সব চলে গিয়েছে বিস্মৃতির অতলে। চারপাশে শুধু একটাই প্রশ্ন, ভোট দিতে পারব তো!

নিন্দুকে প্রশ্ন তুলতেই পারেন, এর আগে কি ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধনের কাজ হয়নি? আলবাত হয়েছে, কিন্তু তা কি এভাবে জনমনে ভীতির সঞ্চার করেছিল? করেনি। তাহলে আজকে চারপাশে এই আতঙ্ক কেন? এর প্রথম এবং প্রাথমিক কারণ হল, নির্বাচন কমিশন তার স্বাভাবিক দায়িত্বের ঠিক উল্টোটা এবারে করছে। নির্বাচন কমিশন মানুষের গণতান্ত্রিক ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করার বদলে, প্রথমেই তাকে সন্দেহের তালিকায় ফেলেছে। খুব সহজভাবে বললে কমিশন যদি একজন নাগরিককে স্বাভাবিকভাবে ভোটার ধরে নিয়ে তারপর বিচার করত যে এই অনুমান সঠিক কিনা, তাহলে সেটা একটা অন্তর্ভুক্তির প্রচেষ্টা হতো। কিন্তু এখানে কমিশনের চিন্তা উল্টো। তারা আগেই ধরে নিয়েছে কেউই যোগ্য ভোটার নয়, ফলে সবাইকেই এখন প্রমাণ করতে হবে সে যোগ্য। এই পদক্ষেপ তাই বিতারণমূলক। এ তো গেল মানসিকতার সূক্ষ্ম বিচার। তাতে বিরাট জনতার বিশেষ কিছু যায় আসে না। সবচেয়ে বড় গোলমাল যা কমিশন তৈরি করেছে তা হল, তাদের এই তত্ত্বের প্রতিষ্ঠায় তারা একটি ত্রুটিপূর্ণ, বাস্তব বর্জিত নীতিমালা নিয়ে এগিয়েছে যা পরিস্থিতিকে নিপীড়নমূলক করে তুলেছে।

নির্বাচন কমিশন প্রথমেই ধরে নিয়েছেন, যেহেতু পশ্চিমবঙ্গ একটি আন্তর্জাতিক সীমান্তে অবস্থিত এবং অ-বিজেপি সরকার চালিত রাজ্য, সুতরাং এখানে সবাই অনুপ্রবেশকারী। তারা মানুন না মানুন এ রাজ্যের আরএসএস নেতারা নির্বাচন কমিশনের মাথা থেকে জন্ম নেওয়া এই বিভাজন-বীজ মাথায় নিয়ে ঘুরছেন। রাজ্যের ইতিহাস এবং ভূগোল সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান না থাকায় তারা ধরে নিয়েছিলেন এ রাজ্যের অধিবাসী মুসলমান জনতার অধিকাংশই বেআইনি অনুপ্রবেশকারী। এ ছাড়া এ রাজ্যের বিজেপি নেতারা হিসেব কষে দেখেছেন, হিন্দু ভোট তারা সবটা পাবেন না। মুসলমান মানুষদের ভোট স্বাভাবিক নিয়মে তাদের ঝুলিতে আসবে না। ফলে রাজ্যে সরকার গড়তে একদিকে তাদের হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের রাজনীতি চালিয়ে যেতে হবে আরও উগ্রভাবে আর অন্যদিকে মুসলিম ভোট যথাসম্ভব কমাতে হবে। নির্বাচন কমিশন এই আব্দারটি মেনেই এগিয়েছে। ফলে বিহারের তুলনায় এ রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া হয়েছে আরও জটিল। যখন তারা দেখেছেন যে প্রাথমিক এনিউমারেশন ফর্ম রাজ্যের ৯০ ভাগ মুসলিম মানুষ ভর্ত্তি করে জমা দিয়েছেন তখনই তাদের হিসাবটা উল্টে গেছে। কারণ এই প্রক্রিয়াটি তৈরী হয়েছিল যাদের আটকাতে, দেখা গেল তাদের নিয়মে আটকানো যাচ্ছেনা। ফলে তৈরি হতে থাকল দৈনিক নীতিমালা। প্রতিদিন নতুন নির্দেশ, নতুন নতুন ঘোষণা। কোনও সরকারী প্রকল্প বা কাজের একটি Standard Operating Procedure বা SOP থাকে, যেখানে কাজের পদ্ধতি স্বচ্ছভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরা হয়। এসআইআর-এর ক্ষেত্র এমন কোনও বিধি প্রকাশিত হয়নি। বরং হোয়াটস্‌অ্যাপে নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এই অরাজকতার সর্বশেষ সংযোজন হল, যুক্তিগত অসঙ্গতি বা লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি। যদিও সর্বোচ্চ আদালত নির্বাচন কমিশনকে মৃদু কানমলা দিয়ে আদেশ দিয়েছেন যে এই কারণে সন্দেহভাজনদের তালিকা প্রকাশ্যে টাঙাতে হবে, কিন্তু তাতে মানুষের দুর্গতি কমবে এটা ভাবা ভুল।

নির্বাচন কমিশন যে সর্বশেষ যুক্তিটি আঁকড়ে ধরে নিজেদের পোড়া মুখ বাঁচাতে চাইছে তা হল, ‘আমরা নিজেরা কিছু করিনি। আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করেছি। সেই বুদ্ধিমত্তা আমাদের বলেছে কাদের নাম তালিকায় দেওয়া প্রমাণের ভিত্তিতে নেওয়া যাবে আর কাদের আরও তথ্য দিয়ে নিজেদের যোগ্যতা প্রমান করতে হবে’। কী শিশুসুলভ সারল্য! ভাবখানা এই যেন, যা দোষ তা সফটওয়্যারের, আমরা নিমিত্ত মাত্র। আসলে তারা যেটা চেপে যেতে চাইছেন তা হল, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজে কোনও যুক্তি তৈরি করতে পারেনা, তাকে যে নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয় তার ভিত্তিতে সে কাজ করে। অর্থাৎ আজকে যুক্তিগত অসঙ্গতির যে হাস্যকর কারণগুলো ধরা পড়ছে, তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নয়, নির্বাচন কমিশনের মস্তিষ্কপ্রসূত। এই সহজ সত্যটি তারা ধামাচাপা দিতে চাইছেন।

এখানেই অগণিত প্রশ্ন এসে ভিড় করে। কমিশন এই তথাকথিত 'লজিক্যাল ভিত্তি' তৈরি করার আগে কি কোনও স্যাম্পেল সার্ভে করেছিল? সামাজিক বা জাতিগত বিন্যাসে যে নামের হেরফের হয়, তার কোনও বাস্তব তালিকা কি তাদের কাছে আছে? গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের নথিতে 'মণ্ডল' কোথাও 'মন্ডল' আবার কোথাও 'মন্ডোল' হতে পারে; 'শেখ' হতে পারে 'সেখ'। উচ্চারণের বৈচিত্র্যে বা কেরানির কলমের টানে এই যে সামান্য তফাৎ, তা তো একই মানুষের পরিচায়ক। এই অতি সাধারণ ভাষাগত ও সামাজিক বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে কমিশন যখন এগুলোকে 'অসঙ্গতি' বলে দেগে দেয়, তখন বুঝতে হবে এর পেছনে বুদ্ধিমত্তা নয়, কাজ করছে এক গভীর রাজনৈতিক অভিসন্ধি। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, পিতা-মাতার সাথে সন্তানের বয়সের স্বাভাবিক বা সামান্য ফারাককেও 'লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি'র খাঁচায় বন্দি করা হচ্ছে। অথচ আমাদের দেশের পুরোনো নথিতে জন্ম তারিখ বা বয়সের হিসাব অনেক ক্ষেত্রেই অনুমানের ওপর ভিত্তি করে লেখা হতো। আবার এক পিতার সন্তান বেশি থাকলে সপরিবারে শুনানিতে ডাক দেওয়া হচ্ছে। যেন একই পিতার একাধিক সন্তান থাকা কোনো অপরাধ বা অলৌকিক ঘটনা! এক একজন প্রান্তিক মানুষকে দিনমজুরি ফেলে নথিপত্র হাতে নিয়ে সপরিবারে বারবার হাজিরা দিতে হচ্ছে। আদালত তালিকা প্রকাশের নির্দেশ দিলেও আসল প্রশ্নটা রয়েই যায় - যে যুক্তির ওপর ভিত্তি করে এই নাম বাছাই করা হচ্ছে, সেই যুক্তিজাল আদৌ বাস্তবসম্মত কিনা তার বিচার কীভাবে হবে? যদি সেই প্রাথমিক যুক্তিই ভ্রান্ত হয়, তবে তালিকা প্রকাশ করে কি হয়রানি কমানো সম্ভব?

সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো, আজকের ডিজিটাল যুগে যখন বিগ ডাটা অ্যানালাইসিস (Big Data Analysis) একটি প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি, তখন কেন রাজ্যের কাছে থাকা বিশাল নাগরিক তথ্যভাণ্ডারকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হলো না? রেশন কার্ড থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের যে বিশাল তথ্যভাণ্ডার রাজ্যের কাছে রয়েছে, তা ব্যবহার করলে তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অতি সহজেই নির্ভুল তালিকা তৈরি করতে পারত। মানুষকে রাস্তায় রোদে দাঁড় করিয়ে এই মধ্যযুগীয় হেনস্থার কোনও প্রয়োজনই পড়ত না। কিন্তু কমিশন সেই পথে হাঁটেনি। কারণ তাদের লক্ষ্য সম্ভবত নিখুঁত তালিকা তৈরি নয়, বরং একটা জটিল গোলকধাঁধা তৈরি করা। মানুষকে অকারণ ব্যতিব্যস্ত রেখে তাঁর নাগরিক অধিকারকে অনুগ্রহে পরিণত করা।

আসলে এই প্রযুক্তির আড়ালে চলছে এক সুগভীর মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া যতটা না লক্ষ্য, তার চেয়ে বড় লক্ষ্য হলো এক দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা ও ত্রাস সৃষ্টি করা। যখন একজন মানুষকে তাঁর রুজি-রুটি ছেড়ে নথির পোঁটলা বগলে নিয়ে সরকারি দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হয়, তখন তিনি আর সচেতন নাগরিক থাকেন না; তিনি হয়ে পড়েন একজন আতঙ্কিত আবেদনকারী। এই আতঙ্কই তো শাসকের পরম কাম্য। প্রযুক্তির পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই অভিসন্ধি যদি মানুষ একবার ধরে ফেলে, তবে সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ সামলানোর ক্ষমতা কোনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নেই। গণতন্ত্রে শেষ কথা ভোটাররাই বলেন, আর সেই ভোটারদেরই 'যোগ্যতা' নিয়ে প্রশ্ন তুলে কমিশন আসলে নিজের নিরপেক্ষতাকেই নিলামে তুলে দিয়েছে। এই লড়াই তাই কেবল ভোটার কার্ড বাঁচানোর লড়াই নয়, এ লড়াই নাগরিক হিসেবে সম্মানের সাথে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার লড়াই।