আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা ● ১৬-৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ ● ১-১৫ মাঘ, ১৪৩২

প্রবন্ধ

পরিবেশের উপর পুঁজির খোলা আক্রমণ

অশোক সরকার


আরাবল্লী শুরুও নয় শেষও নয়। এ এক ধারবাহিকতা। উন্নয়নের নামে পরিবেশের উপর পুঁজির আক্রমণ। আসুন, এর সালতামামি একবার দেখে নিই।

২০১৪-এ ক্ষমতা বদলের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকার পূর্বতন ক্যাবিনেট সেক্রেটারি টি. এস. আর. সুব্রামানিয়ানের অধ্যক্ষতায় একটি কমিটি তৈরি করে। Ease of Doing Business-এর প্রেক্ষিতে পরিবেশ সংক্রান্ত ছয়টি আইনে কী কী রদবদল করা দরকার, তা পর্যালোচনা করে দেখতে বলা হয়। সময় মাত্র দু'মাস। অরণ্য ও পরিবেশ সুরক্ষার কাঠামো তৈরি করেছিল ৬টি আইন - ভারতীয় অরণ্য আইন ১৯২৭, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ১৯৭২, জল দূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৭৪, বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৮১, বন সংরক্ষণ আইন ১৯৮১, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৮৬।

কমিটি তিন মাসের মধ্যে একটি রিপোর্ট জমা দেয়। সেখানে অরণ্য ও পরিবেশ সংক্রান্ত ছাড়পত্র পাওয়ার প্রধান কাঁটা, জন শুনানি এবং গ্রাম সভার মতামত ও মঞ্জুরি, এক ধাক্কায় ঝেড়ে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়।আগে একাধিক আইনে জনগণের, বিশেষত প্রকল্পে যারা সরাসরি প্রভাবিত হবেন তাঁদের, কথা শোনার বিধান ছিল। কমিটি বলল, জাতীয় গুরুত্ব আছে এমন প্রকল্পের ক্ষেত্রে তার দরকার নেই। জাতীয় গুরুত্বের কোনো নির্দিষ্ট মাপকাঠি অবশ্য বলা হয়নি। এছাড়াও আরও কিছু পরিবেশ সংরক্ষণ সংক্রান্ত বিধান লঘু করার কথা বলা হয়েছিল। শতাধিক পরিবেশ সংগঠন, বহু পরিবেশ কর্মী প্রতিবাদ জানিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত লোকসভার পরিবেশ সংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটি এই রিপোর্টটি খারিজ করে। তাঁরা বলেন সময়ের অভাবে কমিটি সংশ্লিষ্ট অনেকগুলি বিষয়ের গভীরে যেতে পারেনি। সেটা ২০১৫ সাল।

এর পর ২০১৮ সালে সরকার একটা জাতীয় অরণ্য নীতি-র খসড়া জনসমক্ষে আনে। সরকারেরই আদিবাসী বিষয়ক মন্ত্রক লিখিত প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, তাদের সঙ্গে আলোচনাই করা হয়নি। অরণ্যের শাসনের এক্তিয়ার শুধু বন মন্ত্রকের নয়, আদিবাসী মন্ত্রকও সেই কাজে সমান অংশীদার। কথাটা ঠিক। বন বিভাগ গাছপালা উদ্ভিদ, পশুপাখি জন্তুজানোয়ার নিয়ে কাজ করে, অরণ্যবাসী মানুষদের নিয়ে নয়, সেই কাজটি করে আদিবাসী মন্ত্রক। এছাড়া ওই খসড়া নীতি-র নানা দুর্বলতা নিয়ে প্রায় ২ লক্ষ মতামত জমা পড়েছিল। এমনকী লোকসভার স্ট্যান্ডিং কমিটিও মতামত দিয়েছিল যে পর্যাপ্ত আলোচনা ব্যতিরেকেই নীতি তৈরি করা হয়েছে।

এই নীতিতে খোলাখুলিভাবে অরণ্যকে ব্যক্তিগত পুঁজির হাতে তুলে দেবার প্রস্তাব ছিল। প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপের মাধ্যমে। ২০০৬ সালের বন অধিকার আইনকে অবহেলা করে, Environment Impact Assessment-কে বাইপাস করে, গ্রাম সভার সম্মতিকে (যা কিনা একাধিক আইনের অঙ্গ ছিল) বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে অরণ্য ও পরিবেশের উপর পুঁজির আক্রমণের রাস্তা তৈরি করা হয়েছিল।

দেশব্যাপী প্রতিবাদের চাপে অবশ্য সেই খসড়া নীতি নিয়ে সরকার আর এগোয়নি।

২০১৯-এ ক্ষমতায় ফেরার পর আবার শুরু হল আক্রমণ। এবার ২০২০ সালে এল Environmental Impact Assessment নিয়মাবলীতে পরিবর্তনের খসড়া প্রস্তাব। বলা হল, শিল্প স্থাপনার আগে এই মূল্যায়ন করে ছাড়পত্র নেবার দরকারই নেই, মূল্যায়ন পরে করলেও হবে। জন-মতামত (public consultation) এবং জন-শুনানির সুযোগ কমিয়ে দেওয়া হল, এবং বলা হল কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে মূল্যায়ন, পরিবেশ ছাড়পত্র, জন-মতামত, জন-শুনানি - কোনোটারই প্রয়োজন নেই।

এক্ষেত্রেও দেশব্যাপী বিরূপ প্রতিক্রিয়ার ফলে সরকার খসড়া প্রস্তাব নিয়ে আর এগোয়নি। কিন্তু সরকার এর পর থেকে নতুন পথ ধরে। নীতির বদলে নির্দেশিকা। একের পর এক নির্দেশিকায় সরকার পরিবেশ, অরণ্য ও মানুষের অধিকার সংক্রান্ত নিয়মগুলি শিথিল করতে শুরু করে। যেমন,

• একটা প্রশাসনিক নির্দেশিকায় বলা হয়, সীমান্তবর্তী হাইওয়ের ক্ষেত্রে পরিবেশ ছাড়পত্রের দরকার নেই।
• আরেকটি নির্দেশিকায় বলা হয়, মাওবাদী অধ্যুষিত অঞ্চলে বন দপ্তরের আঞ্চলিক অফিসই পরিকাঠামো সংক্রান্ত প্রজেক্টগুলিতে ছাড়পত্র দেবে, ফরেস্ট অ্যাডভাইসরি কমিটি নয়।
• আরেকটি নির্দেশিকায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ১০ বছর থেকে বাড়িয়ে ১৩ বছরর জন্য পরিবেশ সংক্রান্ত ছাড়পত্র দেওয়া হল।
• খনি প্রকল্পের জন্য ৩০ বছর থেকে বাড়িয়ে ৫০ বছরের জন্য ছাড়পত্র দেওয়া হল।

এগুলি সবই environmental impact assessment Rule ২০০৬-র পরিপন্থী।

এর পাশাপাশি ২০১৮ থেকে ২০২২-র মধ্যে পরিবেশ, অরণ্য ও উপকূল সংক্রান্ত ছাড়পত্রের সংখ্যা পূর্ববর্তী ৫ বছরের তুলনায় ২১ গুণ বেড়ে গেছে - ৫৭৭ থেকে ১২,৪৯৬। আগে পরিবেশ সংক্রান্ত ছাড়পত্র পেতে দেড় বছর লাগত, সেটা কমে ১৬২ দিন হয়ে গেছে। অর্থাৎ খোলাখুলি পুঁজি-বান্ধব অরণ্য ও পরিবেশ নীতি তৈরিতে সরকার ধাক্কা খেলেও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে কব্জা করে সেই কাজ সম্পন্ন করেছে সরকার।

২০২১ সালে এলো জীব-বৈচিত্র্য সংশোধনী আইন, যা স্ট্যান্ডিং কমিটি হয়ে ২০২৩ সালে লোকসভায় একদিনের আলোচনায় আইন হয়ে গেল। এই আইনটিকেও AYUSH শিল্পের সমৃদ্ধির উদ্দেশ্যে আনা হয়েছে, বলা হল। আয়ুর্বেদ, ঊনানি সিদ্ধা, হোমিওপ্যাথি ওষুধ শিল্পকে একসঙ্গে 'AYUSH' বলা হয়ে থাকে। আইনে আগে যাকে ফৌজদারি অপরাধ বলে গণ্য করা হতো, সেই বায়ো-পাইরেসিকে ফৌজদারি অপরাধ থেকে মুক্তি দেওয়া হল, সেগুলি শুধুই দিওয়ানী মামলা হিসেবে গৃহীত হবে। এই শিল্পগুলি অনেক ক্ষেত্রেই লোকায়ত জ্ঞান ও উদ্ভিদ-কে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। আইনে আগে সেই জ্ঞান ও বিশেষ উদ্ভিদগুলি ব্যবহার করতে হলে স্থানীয় সমুদায়কে আয়ের ভাগ দিতে হতো, কারণ জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও জ্ঞান আহরণ - দুটিই এই সমুদায়গুলির হাতে হয়েছে বলে জানা ছিল। সংশোধনীতে বলা হল, AYUSH শিল্পের ক্ষেত্রে তার দরকার নেই। অনেকেই বললেন যে 'পতঞ্জলি', 'ডাবর' এবং ওই জাতীয় কোম্পানিগুলির অনুকূলে এই সংশোধনী। এমনকী বিচারের ভারও আদালতের থেকে সরিয়ে আমলাদের হাতে তুলে দেওয়া হল। এই সংশোধনীতে এক ধাক্কায় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, লোকায়ত জ্ঞানের স্বীকৃতি, স্থানীয় সমুদায়কে সেই জ্ঞান ব্যবহার করার জন্য আয়ের ভাগ - সব কিছুই শিল্প উন্নয়নের খাতিরে সরিয়ে দেওয়া হল।

২০২৩ সালে এলো বন সংরক্ষণ আইনের সংশোধনী যা কিনা বনের সংজ্ঞাতেই আঘাত করে। ১৯৯৬ সালে সুপ্রিম কোর্টের বিখ্যাত গোদাবর্মণ জাজমেন্ট অনুযায়ী বনের সংজ্ঞায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হয়েছিল। বলা হয়েছিল, বন হিসেবে সরকারিভাবে ঘোষিত না হলেও যেগুলি আসলে বন হিসেবেই মানা হয়, সেগুলিও বন সংরক্ষণ, বন অধিকার, ইত্যাদি আইনের আওতায় আসবে। সংশোধনী বলল; শুধু ঘোষিত বনগুলিই বন হিসেবে গণ্য হবে। দেশের ২৫ ভাগ বন এতে বাদ পড়ে যায়, এবং সেখানে শিল্প বা খনি করতে গেলে আর অরণ্যের ছাড়পত্রের দরকার হবে না। সংশোধনীতে আরও বলা হল দেশের সীমা থেকে ১০০ কিলোমিটার ভিতর পর্যন্ত অরণ্য এলাকাকে প্রতিরক্ষার প্রয়োজনে নেওয়া প্রকল্পগুলির জন্য কেটে ফেলা যাবে। সেখানে বন সংরক্ষণ আইন লাগু হবে না। এর মারাত্মক প্রভাব পড়বে উত্তর-পূর্ব রাজ্য এমনকী পশ্চিমঘাট পর্বতমালার উপরে; সমগ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলগুলিতে। সংশোধনী এখানেই থেমে রইল না, বলল চিড়িয়াখানা ও পরিবেশ ট্যুরিজমও 'বন সংরক্ষণ' বলে গৃহীত হবে! এটিও কয়েক ঘণ্টার আলোচনায় লোকসভায় পাশ হয়ে যায়।

২০২৫-এ এসে সরকার আরাবল্লীর প্রায় সমগ্র পর্বতমালাই উড়িয়ে দিতে চাইল, এবং সুপ্রিম কোর্টের সম্মতিও পেয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত জনতার প্রতিবাদের চাপে সুপ্রিম কোর্টই আবার সেই সম্মতির উপরে নিষেধাজ্ঞা লাগিয়েছে।

এই সরকারের মন বুঝতে অসুবিধে হয় না। সরকার বৃহৎ শিল্পকে সুবিধা দিতে চায়, এবং বৃহৎ পরিকাঠামো রূপায়ণ করতে চায়, সেই পথের কাঁটা হল অরণ্য ও পরিবেশ সংক্রান্ত আইনগুলি, কাজেই সহজ কথায় বললে ওই আইনগুলিকে 'মেরে' ফেলতে সরকার উদগ্রীব। পরিবেশ ও অরণ্য সংরক্ষণ বিষয়টিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে একের পর এক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, হয়েই চলেছে। চার ধাম হাইওয়ে প্রকল্প (উত্তরাখণ্ড), মহারাষ্ট্র, উত্তরাখণ্ড এবং উত্তরপূর্ব রাজ্যগুলিতে একাধিক সেচ প্রকল্প (পড়ুন নদীর উপর বড়ো বাঁধ প্রকল্প), মুন্দ্রা বন্দর প্রকল্প (গুজরাত), তালভিরা কয়লা খনি প্রকল্প (ওড়িশা), হসদেও কয়লা খনি প্রকল্প (ছত্তিসগড়), উপকূলবর্তী অঞ্চলে অনেকগুলি ট্যুরিজম প্রকল্প, রাজস্থানে বেদান্ত গ্রুপের তেল প্রকল্প এইভাবে গড়ে উঠেছে।

প্রতিবাদ যে হয়নি তা নয়, প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষের এবং অনেক নাগরিক সংস্থার পক্ষ থেকে প্রতিবাদ হয়েছে। কিন্তু গণমাধ্যম তাকে উপেক্ষা করায়, নয়তো গণমাধ্যমে সেগুলিকে উন্নয়ন বিরোধী আখ্যা দেওয়ায় তা প্রসার পায়নি। আরও একটা কারণ আছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এইসব প্রকল্পের বেনিফিসিয়ারি হল শহরের এলিট; আর ক্ষতিগ্রস্ত হল গ্রাম ও অরণ্যবাসী মানুষ। আরাবল্লির ঘটনার সঙ্গে এটাই প্রধান তফাত, আরাবল্লি ধ্বংস হলে ক্ষতি দিল্লি, জয়পুর, গুরুগ্রামের এলিটের। বাকি জনতার ক্ষতি তো বটেই, কিন্তু দেশের এলিট চেঁচামেচি করলে সরকার, মিডিয়া, মায় সুপ্রিম কোর্টও যে তৎপরতার সঙ্গে জেগে ওঠে, আরাবল্লির ঘটনা তাই প্রমাণ করল। এও আরেকবার প্রমাণ হল, অরণ্য ও পরিবেশ সম্পর্কে চেতনার পরিসর কতটা সংকীর্ণ।