আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা ● ১৬-৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ ● ১-১৫ মাঘ, ১৪৩২
সমসাময়িক
বিষাক্ত জল ও 'ডবল ইঞ্জিন' সরকার
ছোটবেলা থেকেই বর্ণহীন, গন্ধহীন সেই তরল যাকে মানুষ চিনেছে বেঁচে থাকার আবশ্যিক উপাদান হিসেবে, আজ সেই জল, বিশেষত পানীয় জলের জোগান নিয়েই তৈরি হচ্ছে প্রবল শঙ্কা! এ দেশের বেড়ে ওঠা নগরজীবনে নগরায়নের দাপট বাড়ার সাথে সাথেই দেশের ছোট বড় শহরগুলোতে হৈহৈ করে বাড়ছে জনঘনত্ব। ফলে সেই বাড়তি জনঘনত্ব সামাল দিতে বাড়ছে জলের চাহিদা। স্নানের জল থেকে পানের জল, কৃষির জল থেকে শিল্পের জল, উত্তরোত্তর মহার্ঘ হয়ে উঠেছে দেশ জুড়ে। শুধু জলের পরিমাণ নয় বরং জলের গুনমান নিয়েও তৈরি হচ্ছে নিত্যনতুন আশঙ্কা। যে আশঙ্কা আরও বেশি ঘনিয়ে উঠেছে দেশের অন্যতম পরিচ্ছন্ন এবং আধুনিক শহর ইন্দোরের সাম্প্রতিক দূষিত পানীয় জলের বিপর্যয়ে বহু মানুষের মৃত্যুতে।
সাম্প্রতিককালে দেশের পুরোনো শহরগুলির মান উন্নয়নের লক্ষ্যে গৃহীত হয়েছে স্মার্ট সিটি প্রকল্প। সেই প্রকল্পের মাপকাঠিতে রয়েছে শহরের নিকাশি থেকে আবাসন, পরিবহন থেকে পরিবেশ কিংবা বিদ্যুতায়ন থেকে পানীয় জলের মতো শহর জীবনের অতি আবশ্যিক উপাদানগুলি। দেশজুড়ে ঝাড়াই-বাছাই করা এমন শহরগুলি কার্যত এদেশের শহুরে উন্নয়নের আধুনিক মডেল হয়ে উঠেছে। কিন্তু এমন মডেল শহরগুলির অন্যতম ইন্দোরেই পানীয় জলের দূষণের ঘটনায় শিশুসহ পনেরো জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। কেবল ইন্দোর নয় দেশের আরেক স্মার্ট সিটি গান্ধীনগরেও নতুন জল প্রকল্পের নলবাহিত জলে দূষণের দাপটে ত্রাহি ত্রাহি রব ছাড়ছে মানুষ। ফলে দেশের এমন আধুনিক স্মার্ট শহর জুড়েই যদি জলাতঙ্কের বহর বেড়ে চলে সেখানে দেশ জুড়ে ছোট-বড়-মেজো শহরগুলির কোটি কোটি মানুষ যে বিপদের প্রহর গুনছে প্রতিনিয়ত সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না!
ইন্দোর শহর, মধ্যপ্রদেশের মধ্যে অবস্থিত অন্যতম প্রাচীন শহর। ব্রিটিশ আমল থেকেই ইন্দোর শহরে পরিকল্পিত উপায়ে পরিশ্রুত পাইপলাইনের মাধ্যমে শহরে জল সরবরাহ থেকে বিদ্যুত পরিকাঠামো এবং নিকাশি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। পাশাপাশি ইন্দোর শহর ঐ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্মারক এবং ধারকও বটে। ফলে শহরের পরিকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণে যে দেশের অন্যতম পোক্ত 'ডবল ইঞ্জিন' রাজ্য সরকার অনেক বেশি সচেতন হবে সেটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু সাম্প্রতিক জল দূষণ বিপর্যয়ের পর স্পষ্ট হলো যে শহর জুড়ে উন্নয়নের প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মতোই রয়ে গিয়েছিল সেই শহরের পানীয় জলের পরিকাঠামো।
ইতিমধ্যে প্রমাণিত যে পানীয় জলের পাইপ লাইনের একেবারে কান ঘেঁষে তৈরি হয়েছিল সেই অঞ্চলের শৌচালয়। আর শৌচালয়ের নিকাশি পাইপ ফুটো হয়ে বিষাক্ত তরল বর্জ্য পদার্থ, নিকটস্থ পানীয় জলের পাইপ লাইনের ফাটল দিয়ে মিশেছিল পানীয় জলের সাথে। ফলে দূষিত বিষাক্ত পানীয় জল হাজারে হাজারে মানুষ পান করার পরিণতিতেই বেঘোরে বহু মানুষের প্রাণ গেল। কার্যত বেশ কয়েকদিন ধরেই সেই অঞ্চলের পানীয় জলে শৌচালয় বর্জ্যের তরল মিশে গিয়ে জলের রং এবং গন্ধ পাল্টে যাওয়া সত্ত্বেও 'ক্লিন সিটির' পুর প্রশাসন কোনও কার্যকরী ভূমিকা নিতে পারেনি। ফলে প্রশাসনিক গাফিলতির কারণে ওই বিপর্যয় মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে পুরসভা। এমন প্রেক্ষিতে এই ভয়ঙ্কর মৃত্যুর ঘটনা বেশ কিছু জরুরি প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে দেশের শহরের সার্বিক জল সরবরাহের নিরাপত্তা নিয়েই।
এদেশে নলবাহিত পানীয় জলের প্রায় ৪০ শতাংশ নষ্ট হয় সেই জল পরিবহনের অরক্ষিত পরিকাঠামোর কারণে। নলবাহিত জল নষ্টের অন্যতম কারণ পাইপলাইনের ফাটল। ইস্পাত কিংবা কনক্রিটের পাইপ লাইন মাটির নিচে থাকায় সেই পাইপের ফাটল, সাধারণভাবে খালি চোখে ধরা পড়ে না। এমন পাইপগুলির বয়স বাড়ার সাথে সাথেই বাড়তে থাকে সেগুলির ফাটলের বিপদ। ফলে ভূপৃষ্ঠের উপর থেকে অধরা ঐ পাইপলাইনের ফাটলের ছিদ্রপথে বিশুদ্ধ জলের সাথে মাটির নিচে ছড়িয়ে থাকা দূষিত জল মিশে গেলেই তৈরি হয় জল দূষণের বিপদ। সেই কারণেই মাটির নিচে পানীয় জলের পাইপের নিকটবর্তী অঞ্চল দিয়ে নিকাশি পাইপ বসানো উচিত নয়। অথচ শহরে স্থানাভাবের কারণে হামেশাই রাস্তার নিচ দিয়ে জলের, নিকাশির, গ্যাসের কিংবা বিদ্যুতের কেবল পাইপ গা ঘেষাঘেষি করেই বসানো হয়। ফলে সেক্ষেত্রে নিকাশি পাইপ রাস্তার নিচে ফেটে গেলে ওই নিকাশি তরল মাটির সাথে মিশে ভূপৃষ্ঠের নিচের জলকে বিষাক্ত করে তোলে। আমাদের শহর কলকাতাতেও বহু অংশে এমন বিভিন্ন পাইপের সহাবস্থান রয়েছে ভূপৃষ্ঠের নিচে অল্প পরিসরে। ফলে পানীয় জল থেকে নিকাশি নালার পাইপগুলি মূলত যেখানে রাস্তার নিচ দিয়ে ছুটে চলে সেখানে প্রযুক্তি নির্ভর উপায়ে ওই পাইপগুলির ফাটলের ভৌগোলিক অবস্থান এবং ব্যাপ্তি নজরবন্দী করা প্রয়োজন।
বলাই বাহুল্য ইন্দোর 'ক্লিন সিটির' তকমা পেলেও সেই শহরের ভগিরথপুরা অঞ্চলে পাইপের ওই ফাটল নির্ধারক কার্যকরী কোনও ব্যবস্থা ছিল না। এমনকি ঐ অঞ্চলে জলের পাইপলাইনগুলি ৪৫ থেকে ৫০ বছরের পুরোনো হওয়া সত্ত্বেও সেগুলির নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়নি। ফলে শৌচাগারের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে থাকা মাটির নিচে পানীয় জলের পাইপলাইনের স্বাস্থ্যে নজর এড়িয়ে যাওয়ায় এই ভয়াবহ বিপত্তি ঘটেছে। এমন প্রেক্ষিতে দেশের প্রতিটি জনবহুল শহরেই পানীয় জল ও নিকাশি পাইপলাইনের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ফাটল নির্ণয়ের প্রযুক্তি নির্ভর পরিকাঠামো তৈরি করা উচিত। যাতে শহরের এক একটি অঞ্চলের কন্ট্রোলরুমে বসেই ভূপৃষ্ঠের নিচে বিভিন্ন পাইপলাইনের ফাটলের যাবতীয় তথ্য হাতের মুঠোয় নিয়ে আসা যায়। বিশেষত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং রোবটিক্স-এর প্রয়োগের মাধ্যমে হাল আমলে এমন ফাটল নির্ণয় অনায়াসেই করা যাচ্ছে। ফলে ফাটল তথ্য হাতের কাছে থাকলে সেই ফাটলের মেরামতি কিংবা পাইপ বদলের মতো কার্যকরী সিদ্ধান্ত দ্রুত নিতে পারলে পানীয় জলের দূষণ বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব। ফলে আমজনতার জল সুরক্ষায় প্রয়োজন শহরাঞ্চলে প্রযুক্তি নির্ভর পরিকল্পনা।