আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা ● ১৬-৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ ● ১-১৫ মাঘ, ১৪৩২

সমসাময়িক

সংবিধান পরে, সাম্প্রদায়িকতা আগে!


উলু দাও, শাঁখ বাজাও - নরেন্দ্র মোদি তথা বিজেপির নেতৃত্বে বিজেপি-আরএসএস-এর ভারত আজ বিশ্বে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। না, না, ভুলেও ভাববেন না যে এই নজির জ্ঞানে-বিজ্ঞানে বা মানব কল্যাণে সৃষ্টি হয়েছে। না, একেবারেই তা নয়। বিজেপির মতো মৌলবাদীরা ভুল করেও এমন কিছু করে ফেলবে না। ভারত নজির স্থাপন করেছে পশ্চাৎপদতায়, ধর্মান্ধতায় এবং মেধার প্রতি চরম অবজ্ঞায়। সংবিধানকে সগর্বে জলাঞ্জলি দিয়ে, শিক্ষার মৌলিক অধিকারকে মাটিতে মিশিয়ে বিজেপির নেতা-কর্মীরা দেখিয়ে দিয়েছে, আগে স্বধর্ম তারপর বাকি সব। বুঝতে পারলেন না? হ্যাঁ, আমরা জম্মুর 'শ্রী মাতা বৈষ্ণো দেবী ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল এক্সিলেন্স' (SMVDIME)-এর কথাই বলছি। যেখানে কলেজটিকে মিথ্যে অজুহাতে শুধু বন্ধ করানো হয়নি, বন্ধ হওয়ার আনন্দে কলেজের সামনে গিয়ে বিজেপির নেতা-কর্মীরা ঢাক-ঢোল পিটিয়ে জান্তব উল্লাস প্রকাশ করেছে। একটা সময় যে দেশের মানুষ নতুন স্কুল-কলেজ তৈরি হলে উল্লসিত হতেন, এই দেশ এখন কলেজ বন্ধ হলে মিষ্টি বিতরণ করে উৎসব পালন করে। এটাই কি মোদিজির 'অমৃতকাল'? এটাই কি তাঁদের 'বিকশিত ভারত'?


শ্রী মাতা বৈষ্ণো দেবী ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল এক্সিলেন্স (SMVDIME)-এর ত্রিমাত্রিক চিত্র।

এই ন্যক্কারজনক উল্লাসের প্রেক্ষাপটটি তলিয়ে দেখলে যে সত্যটি বেরিয়ে আসে, তা যে কোনো গণতান্ত্রিক মানুষের জন্য শিরদাঁড়া দিয়ে হিমস্রোত বইয়ে দেওয়ার মতো। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের প্রথম ব্যাচে সর্বভারতীয় পরীক্ষা NEET-এর মেধা তালিকা অনুসারে ৫০ জন মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হয়েছিলেন। গোল বাধল তখনই, যখন দেখা গেল সেই তালিকায় ৪২ জন মুসলমান (যাদের বেশিরভাগই কাশ্মীরি), ৭ জন হিন্দু এবং ১ জন শিখ। মনে রাখবেন, মেধার ভিত্তিতে এই ভর্তি - কোনো কোটা ছিল না, ছিল না কোনো রাজনৈতিক দাক্ষিণ্য। কিন্তু এই মেধাই বিজেপি-সমর্থিত গোষ্ঠীর গলায় কাঁটা হয়ে বিঁধল। প্রতিবাদ শুরু হল 'শ্রী মাতা বৈষ্ণো দেবী সংঘর্ষ সমিতি' (আরএসএস-বিজেপি সংশ্লিষ্ট প্রায় ৬০টি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের জোট) থেকে। তাদের দাবি ছিল পরিষ্কার - যেহেতু কলেজটি 'শ্রাইন বোর্ড'-এর অধীনে এবং ভক্তদের দান হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের, তাই এখানে শুধু হিন্দুরাই পড়বে! অর্থাৎ, মেধার চেয়ে এখানে ছাত্রের ধর্মীয় পরিচয়ই বড় হয়ে উঠল।

বিজেপি নেতা তথা জম্মু-কাশ্মীর বিধানসভার বিরোধী দলনেতা সুনীল শর্মা খোদ কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে দরবার করে এই মেধা তালিকার বিরুদ্ধে দাবি তুললেন। টানা ৪৫ দিন ধরে চলা এই ঘৃণার আন্দোলনকে রাষ্ট্রীয় সিলমোহর দিতে আসরে নামল কেন্দ্রের তল্পিবাহক প্রতিষ্ঠান 'ন্যাশনাল মেডিকেল কমিশন' (NMC)। গত ২ জানুয়ারি ২০২৬-এ তারা যে 'সারপ্রাইজ ইন্সপেকশন' চালাল, তা ছিল জোচ্চুরি আর জালিয়াতির এক চূড়ান্ত নিদর্শন। যখন কলেজটি শীতকালীন ছুটির আওতায় ছিল এবং অধিকাংশ স্থায়ী শিক্ষক ছুটিতে ছিলেন, ঠিক সেই সময়টিকেই বেছে নিল এনএমসি। মাত্র ১৫ মিনিটের নোটিসে শুরু হওয়া এই পরিদর্শনে রিপোর্ট সাজানো হলো যে ফ্যাকাল্টি সংখ্যা কম এবং পরিকাঠামো নড়বড়ে।

আরও চরম জালিয়াতি করা হলো অপারেশন থিয়েটার বা ওটি-র (OT) পরিসংখ্যান নিয়ে। এনএমসি-র নিজস্ব নিয়ম (MSR 2023) অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ যখন এই কলেজটিকে ভর্তির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তখন সেখানে ৮টি সুসজ্জিত ওটি সচল থাকার প্রমাণ মিলেছিল। কিন্তু জানুয়ারির এই ষড়যন্ত্রমূলক রিপোর্টে দেখানো হলো মাত্র ২টি ওটি! কারণ ছুটির সময়ে রুটিন অপারেশন বন্ধ থাকায় জরুরি পরিষেবার জন্য সচল রাখা ২টি ওটি-কেই তারা সামগ্রিক চিত্র বলে চালিয়ে দিল। একটি জাতীয় স্তরের নিয়ন্ত্রক সংস্থা যখন ছুটির দিনের বিশেষ ব্যবস্থাকেই 'পরিকাঠামোগত ঘাটতি' হিসেবে রিপোর্টে পেশ করে, তখন বুঝতে আর বাকি থাকে না যে, এই রিপোর্টটি লেখা হয়েছিল কোনো ল্যাবরেটরিতে নয়, বরং বিজেপির সদর দপ্তরে।

কিন্তু যে সত্যটি বিজেপি কৌশলে ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল, তা হলো এই কলেজের পেছনে সাধারণ মানুষের করের টাকার পাহাড়প্রমাণ বিনিয়োগ। সরকারি নথি ও তথ্য বলছে, এই প্রতিষ্ঠানটি কেবল ট্রাস্টের টাকায় চলে না। ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে আজ পর্যন্ত জম্মু-কাশ্মীর সরকার ১২১ কোটিরও বেশি টাকা 'গ্রান্ট-ইন-এইড' হিসেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রদান করেছে। ১২১ কোটি টাকারও বেশি সরকারি অর্থ যে কলেজের শিরা-উপশিরায় বইছে, সেখানে ধর্মের ভিত্তিতে অধিকার দাবি করা কেবল অযৌক্তিক নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কোষাগারের সঙ্গে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা।

গত ৬ জানুয়ারি এনএমসি যখন লাইসেন্স প্রত্যাহার করল, তখন জম্মুর রাস্তায় দেখা গেল এক অকল্পনীয় দৃশ্য। সংঘর্ষ সমিতি বিজয় মিছিল বের করল, বাজি ফাটিয়ে জান্তব উল্লাস করল। বিজেপি নেতা আর. এস. পাঠানিয়া দম্ভভরে বললেন, "কোয়ালিটি ওভার কোয়ান্টিটি", আর সুনীল শর্মা একে "ঐতিহাসিক বিজয়" ঘোষণা করলেন। মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ এই উল্লাসকে "লজ্জাজনক" বলে ধিক্কার দিয়ে জানালেন, যেখানে দেশের অন্য প্রান্তে মানুষ মেডিকেল কলেজের জন্য লড়াই করে, সেখানে এরা কলেজ বন্ধ হওয়ায় উৎসব করছে।

আসলে এই ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, বিজেপি-আরএসএস-এর মদতপুষ্ট সাম্প্রদায়িকতা ও ঘৃণার রাজনীতি আজ গোটা দেশের জন্যই এক বিধ্বংসী মহামারীর নাম। মহামারী যেমন তিলে তিলে শরীরের জীবনীশক্তি শুষে নেয়, সাম্প্রদায়িকতা ঠিক সেভাবে এই দেশের বহু বছরের লালিত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা এবং শিক্ষার মেরুদণ্ডকে কুরে কুরে খাচ্ছে, রাষ্ট্রের মদতপুষ্ট আস্কারায়। তারা কেবল ভারতের মননকেই কলুষিত করছে না, সুকৌশলে দেশের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোকেও ভেঙে তছনছ করে দিচ্ছে। যে দল একটি কলেজ বন্ধ হলে উৎসবে মাতে এবং যে রাষ্ট্রযন্ত্র মিথ্যে রিপোর্ট দিয়ে মেধাকে হত্যা করে, তারা দেশের ভবিষ্যৎ গড়তে নয়, বরং ধ্বংস করতেই বেশি পারদর্শী। এই মারণ ব্যাধি থেকে ভারতকে রক্ষা করতে না পারলে আগামী প্রজন্ম কেবল সাম্প্রদায়িকতার ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে, যেখানে জ্ঞানের আলো নয় - জ্বলবে কেবল ঘৃণার আগুন।