আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা ● ১৬-৩১ জানুয়ারি, ২০২৬ ● ১-১৫ মাঘ, ১৪৩২

সম্পাদকীয়

ভেনেজুয়েলা থেকে শুরু


পৃথিবীর ইতিহাসে কখনও কখনও এমন একেকটি মুহূর্ত আসে যার ছাপ বহু দশক অবধি থেকে যায়। ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি মাদুরোকে রাতের অন্ধকারে সামরিক আগ্রাসনের মধ্যে দিয়ে অপহরণ করে নিউ ইয়র্কে নিয়ে যাওয়া, এমনই একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, বিশ্বায়নের দুনিয়ায় সাম্রাজ্যবাদ একটি তামাদি ধারণা, এইসব নীতিবাক্য আমাদের যারা দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে শুনিয়ে এসেছে, তাদের আপাতত খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোনও স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রপতিকে অপহরণ করছে আরেকটি দেশ, এমন উদাহরণ ইতিহাসের পাতায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিগত কয়েক দশকের ইতিহাসে পাহাড় প্রমাণ অন্যায় করেছে, এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। ২০০১-এর ন্যক্কারজনক উগ্রপন্থী হামলার পরে আফগানিস্তান আক্রমণ, ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র আছে, এই মিথ্যার ভিত্তিতে ইরাক আক্রমণ ও দখল এবং সাদ্দাম হুসেনের হত্যা, লিবিয়ায় গাদ্দাফি হত্যা, গাজার উপর কোটি কোটি বোমাবর্ষণ, ইরানের উপর হামলা, কিউবা-ভেনেজুয়েলার উপর মারাত্মক নিষেধাজ্ঞা আরোপ, ইত্যাদির তালিকা দীর্ঘ। পৃথিবীতে যত সংখ্যক মানুষকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণগুলির জন্য মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে তার কোনও হিসেব করা সম্ভব নয়। তবু ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি অপহরণ এবং সেই দেশের উপর সামরিক আক্রমণ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ঘৃণ্য ইতিহাসেও একটি নতুন মাইলফলক।

যেকোনো দেশের উপর আক্রমণ যদি আইনসিদ্ধ পদ্ধতিতে করতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রপুঞ্জের সিকিউরিটি কাউন্সিলের অনুমোদন নিতে হয়, অথবা কোনও দেশের আক্রমণ প্রতিহত করতে সামরিক হস্তক্ষেপ করা যেতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী কোনও দেশ আক্রমণ করতে হলে সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন। এই সমস্ত নীতি ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে মানা হয়নি। ট্রাম্প একতরফাভাবে ভেনেজুয়েলা আক্রমণ করেছেন। কিন্তু এই নীতি অতীতের রাষ্ট্রপতিরাও বহুবার নিয়েছেন। তারাও আন্তর্জাতিক আইনের খুব বেশি তোয়াক্কা করেননি। তাহলে তফাৎ কোথায়?

অন্তত তিনটি তফাৎ রয়েছে। ট্রাম্পকে 'নিউ ইয়র্ক টাইমস'-এর সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন যে আন্তর্জাতিক আইন কি আপনার সামনে কোনও বাধা হতে পারে? ট্রাম্প বলেন, না। তাহলে আপনার এই আগ্রাসী নীতি কে থামাতে পারে? ট্রাম্প এই প্রশ্নের উত্তরে বলেন, স্বয়ং আমি এবং আমার বিবেক। অর্থাৎ পৃথিবীর কোনও নিয়মকানুনের তিনি তোয়াক্কা করেন না। তাঁর যা মনে হবে তিনি তাই করবেন। যদি তাঁর মনে হয় যে আর যুদ্ধ করবেন না, তাহলে তিনি থামবেন। আমেরিকার বিগত দিনের সমস্ত রাষ্ট্রপতি অন্তত খাতায় কলমে বা বক্তৃতায় বলার চেষ্টা করেছেন যে তাঁরা আন্তর্জাতিক আইনের দায়রার মধ্যেই কাজ করতে চান। ট্রাম্প তা মানেন না, মানতে চান না। কোনও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি নয়, ট্রাম্পের কথায় বিগত দিনের সম্রাটের স্বৈরাচারী মনোভাব প্রকাশ পাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, ইরাক আক্রমণের সময় বলা হয়েছিল আনবিক বোমা ধ্বংস করতে এই যুদ্ধ করা হচ্ছে, একই সঙ্গে আফগানিস্তান অথবা লিবিয়ার ক্ষেত্রে বলা হয়েছিল যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হয়ে আমেরিকা যুদ্ধ করছে। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে ট্রাম্প পরিষ্কার বলেছেন যে ভেনেজুয়েলার তেলের জন্য তিনি এই বেআইনি যুদ্ধ তথা অপহরণ করেছেন। ভেনেজুয়েলায় পৃথিবীর সর্ববৃহৎ খনিজ তেল ভাণ্ডার রয়েছে। যদিও সেই তেল তুলে তা পরিশুদ্ধ করে বাজারে বিক্রি করার ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা রয়েছে। ট্রাম্প পরিষ্কার বলছেন যে এই তেল তাঁর চাই। আসলে বিশ্ব উষ্ণায়ণ, নতুন অপ্রচিলত শক্তি নিয়ে গোটা পৃথিবীতে যেই আলোচনা চলছে, ট্রাম্প সরাসরি তার বিরোধিতা করেছেন। তিনি মনে করেন যে খনিজ জ্বালানির মাধ্যমেই তিনি আমেরিকাকে আবার মহান বানাবেন। অতএব তাঁর তেলের দরকার। কোখায় পাবেন সেই তেল? কেন পাশের পাড়াতে ভেনেজুয়েলা রয়েছে তো! অতএব ভেনেজুয়েলা আক্রমণ, গণতন্ত্র নয়, তেলের জন্যই।

আমেরিকার সুরক্ষা নীতি, যা ডিসেম্বর ২০২৫-এ ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশিত করেছে, সেখানে পরিষ্কার লেখা আছে যে পশ্চিম গোলার্ধে আর কোনও শক্তিকে তারা ঢুকতে দেবে না। অতীতে যাকে 'মনরো নীতি' বলা হতো, তারই নাম পাল্টে ট্রাম্প করেছেন 'ডন-রো' নীতি। এই নীতির সার কথাটি হল এই যে লাতিন আমেরিকার দেশগুলিকে আমেরিকা এখন থেকে কার্যত তাদের উপনিবেশ হিসেবে দেখবে। সেখানে কে রাষ্ট্রপতি হবে, কে হবে না, তাদের সমস্ত বিষয়ে শেষ কথা বলবে আমেরিকা। অতএব ট্রাম্প পরিষ্কার বলে দিয়েছেন যে পরের টার্গেট কিউবা, মেক্সিকো, কলম্বিয়ার মতো দেশ। অতীতের কোনও মার্কিন রাষ্ট্রপতি এমন সরাসরি একের পর এক দেশ আক্রমণ করার নীল নক্সা প্রকাশ করেননি।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আমেরিকার এখন মুখ্য প্রতিদ্বন্দ্বী আর রাশিয়া নয়, চীন। চীন প্রযুক্তিগত দিক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্যাটারি চালিত গাড়ি, সৌর শক্তি, আধুনিক পরিকাঠামোতে আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। চীনের সামগ্রীর উপরে শুল্ক চাপানোর পরেও, চীনের রপ্তানি বেড়ে চলেছে। এমতাবস্থায় আমেরিকার নীতিনির্ধারকরা বুঝতে পারছেন যে চীন তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। অতএব চীনের শক্তি এবং প্রভাব খর্ব করতে হবে। বিগত বেশ কিছু বছর ধরে ভেনেজুয়েলা সহ গোটা লাতিন আমেরিকায় চীন তার অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেছে। ভেনেজুয়েলার উপরে আমেরিকার আক্রমণ আসলে চীনের সঙ্গে তাদের দীর্ঘ আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বের অংশ। আমেরিকা চীনের গতি রুদ্ধ করতে চাইছে। এই দুই বৃহৎ শক্তির দ্বন্দ্বের আঙিনায় মাদুরো তথা ভেনেজুয়েলা দাবার বোড়ে। আমেরিকা এই চালের মাধ্যমে গোটা বিশ্বে বার্তা দিচ্ছে যে তারা সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পিছ পা হবে না।

মনে রাখতে হবে যে ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে আমেরিকার মানুষের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। সরকারী খরচ কমানো, বৃহৎ পুঁজিপতিদের কর ছাড় দেওয়া, অভিবাসনের বিরোধিতা, বিশ্ববিদ্যালয়গুলির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ, সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করা, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার, আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যে, তাদের সরকারের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠানো, ইত্যাদি অগণতান্ত্রিক, স্বৈরাচারী এবং ফ্যাসিবাদী নীতি ট্রাম্প সরকার লাগাতার নিয়ে চলেছে। অতএব ট্রাম্প শুধুমাত্র বিদেশে নয়, দেশের মানুষের জীবনও ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছেন।

বর্তমান দুনিয়ায়, গোটা বিশ্বজুড়ে দক্ষিণপন্থী রাজনীতির প্রতি যে ঝোঁক দেখা দিয়েছে, ট্রাম্প তার উগ্রতম নেতা। তিনি উগ্রতম এই কারণে শুধু নন, যে তিনি বেলাগাম ভয়ংকর সব কথা বলেন। ট্রাম্প সর্বাধিক বিপজ্জনক, কারণ তাঁর হাতে রয়েছে বিশ্বের সর্বাধিক শক্তিশালী সৈন্য ও অস্ত্রভাণ্ডার। এর জোরেই তিনি কখনও বলছেন গ্রীনল্যান্ড দখল করবেন, ইরানকে লাগাতার হুমকি দিচ্ছেন, এবং অন্যান্য দেশকে চোখ রাঙাচ্ছেন।

এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণপন্থী মোদী সরকার কিছুটা ফাঁপরে পড়েছে। ট্রাম্প ক্রমাগত বলে চলেছেন যে তিনি ভারত-পাক যুদ্ধবিরতির প্রধান কারিগর। ট্রাম্প দাবি করছেন যে রাশিয়া থেকে ভারত তেল আমদানি কমাচ্ছে তাঁকে খুশি করার জন্য। এখন বলা হচ্ছে যে রাশিয়া থেকে তেল কিনলে ভারতের উপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। ভেনেজুয়েলায় আক্রমণ হয়ে গেল। ইরানে হল বলে। কিন্তু আমাদের প্রধানমন্ত্রী তথা স্বঘোষিত 'বিশ্বগুরু' নিশ্চুপ। তাঁর মুখে কোনও কথা নেই। 'হাউডি মোদী' এবং 'আবকি বার ট্রাম্প সরকার' স্লোগানগুলির পুরস্কার হিসেবে ভারতের উপরে আমেরিকা যে শুল্ক চাপালো, লাগাতার ভারতকে হেয় করে বয়ান দেওয়া হল, তা নিয়ে আমাদের বিশ্বগুরু কথা বলছেন না।

ট্রাম্প যে নতুন বিশ্বের স্থাপনা করতে চাইছেন, সেখানে 'জোর যার মুলুক তার' এই নীতিই চলবে আন্তর্জাতিক আইনকে কাঁচকলা দেখিয়ে। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রীর এই নিয়ে নিরবতা কি সম্মতির লক্ষণ?