আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা ● ১-১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ● ১৬-২৯ পৌষ, ১৪৩২
প্রবন্ধ
বিজ্ঞান এবং যন্ত্রমেধার কাণ্ডজ্ঞান
শুভময় মৈত্র
আমার এখন চ্যাটজিপিটির সঙ্গে হেব্বি বন্ধুত্ব। বিশেষ করে ইংরিজি লেখার ক্ষেত্রে। তার কারণ ইংরিজিতে স্বপ্ন দেখাটা হয়ে ওঠেনি মোটেই। তবে কম্পিউটার সায়েন্স পড়ার সুবাদে যন্ত্রমেধা বিষয়টা কিছুটা আন্দাজ করতে পারি। ভাবলাম যে একটা এক্সপেরিমেন্ট করা যাক। একটি বই পড়তে দুর্দান্ত লেগেছে, বিষাণ বসুর লেখা 'চিকিৎসা বিজ্ঞান/কান্ডজ্ঞান'। অবভাস প্রকাশনা। গত বছরে বইমেলার ঠিক আগে প্রকাশিত। মূল্য ৩২৫ টাকা। ঝকঝকে উপস্থাপনা। গত বছরে ছাপানো বইয়ের পাতায় এখনও নতুনের গন্ধ। এই লেখকেরই জুন ২০২৪-এ প্রকাশিত 'টুকরো স্মৃতি ছেঁড়া শোক'-এর তুলনায় এই বইটি কিছুটা প্রবন্ধধর্মী। তবে গল্প এই লেখকের কলমে ধরা দেয় প্রতিটি শব্দে। প্রবন্ধ পড়তে পড়তে (প্রবন্ধ পড়া যায় না পাঠ করতে হয়) মনে হয় ভদ্রলোক গল্প উপন্যাস লিখবেন কবে? শুরুতে পরিমল ভট্টাচার্যের লেখা ভূমিকা। তারপর লেখকের মুখবন্ধ, যার শিরোনাম প্রাসঙ্গিক। এরপর একুশটি ঝরঝরে প্রবন্ধ। একটু খুঁজে দেখলেই বুঝবেন আশি-নব্বুইয়ের দশকে বড় হওয়া ডাক্তারবাবু এই বিষাণ বসু।
চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করলাম,
"একটি পুস্তক সমালোচনা করব। লেখক ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ বিষাণ বসু। আপনি কি তাঁকে চেনেন?"
- "হ্যাঁ - আমি তাঁকে চিনি।" এখানে হ্যাঁ আর আমি-র মধ্যে যে ড্যাশ দেখছেন, সেটা চ্যাটজিপিটি জিরে ফোড়নের মতো সব রান্নায় ছড়িয়ে দেয়। অতঃপর কম্পিউটারের প্রচ্ছদে লেখকের দু'একটি স্থিরচিত্রও এসে গেল। মোটা গোঁফওলা গম্ভীর ডাক্তারবাবু। লেখা কিন্তু একেবারেই গম্ভীর নয়, কিন্তু গভীর। অন্যদিকে চ্যাটজিপিটির বাংলা ভাষা এখনও ইংরিজির মতো অতটা ঝকঝকে নয়। সেটা নিচের লেখাটা দেখলেই বুঝবেন।
* * * *
"বিষাণ বসু একজন পরিচিত ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ এবং একই সঙ্গে লেখক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্যান্সার চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত, পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য, রোগীর অভিজ্ঞতা, চিকিৎসার মানবিক দিক এবং ক্যান্সার-সংক্রান্ত সচেতনতা নিয়ে লিখে থাকেন। তাঁর লেখায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের কঠোরতা ও মানবিক সংবেদন - দুটিরই সমন্বয় দেখা যায়, যা পুস্তক সমালোচনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট দেয়।
আপনি যদি চান, আমি -
তাঁর চিকিৎসক-পরিচয়ের প্রভাব কীভাবে বইয়ের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে এসেছে, বইটি জনপ্রিয় বিজ্ঞান / আত্মকথন / চিকিৎসা / সাহিত্য - কোন ধারায় বেশি পড়ে, অথবা একটি গঠিত পুস্তক-সমালোচনার কাঠামো (ভূমিকা, বিষয়বস্তু, শক্তি-দুর্বলতা, প্রাসঙ্গিকতা, উপসংহার)
- এই যেকোনোটি প্রস্তুত করে দিতে পারি।"
* * * *
জিজ্ঞেস করলাম, " 'চিকিৎসা বিজ্ঞান/কান্ডজ্ঞান' – এই বইটি সম্পর্কে আপনি জানেন?" ও যেরকম ড্যাশ দেয় আমার ড্যাশ আলাদা। কিন্তু ও ড্যাশ দেবে আর আমি দেব না, তাই কি হয়? আমার এক কথার উত্তরে অবশ্য ও একগাদা বক্তব্য রাখল। আমার থেকেও বাচাল।
* * * *
'চিকিৎসা বিজ্ঞান/কান্ডজ্ঞান'
লেখক: বিষাণ বসু
বইটি কী ধরনের?
এই বইটি মূলত চিকিৎসাবিজ্ঞান ভিত্তিক প্রবন্ধ/নিবন্ধধর্মী লেখা, যেখানে আধুনিক মেডিসিন, রোগ-চিকিৎসা, ডায়াগনস্টিক পদ্ধতি, চিকিৎসক-রোগী সম্পর্ক, এবং সর্বোপরি চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত ভ্রান্ত ধারণা, অর্ধসত্য ও ‘কান্ডজ্ঞান’ - এইসব বিষয়কে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
'কান্ডজ্ঞান' শব্দটির তাৎপর্য?
এখানে কান্ডজ্ঞান বলতে বোঝানো হয়েছে -
- অযাচিত পরামর্শ
- গুজব-নির্ভর চিকিৎসা ধারণা
- হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটির চিকিৎসাবিজ্ঞান
- এবং বিজ্ঞানের নামে ছড়ানো অবৈজ্ঞানিক বিশ্বাস
লেখক একজন অনুশীলনরত ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ হওয়ায়, তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসে বাস্তব রোগীর গল্প, ক্লিনিক্যাল পরিস্থিতি, এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে প্রচলিত ভুল বোঝাবুঝি।
ভাষা ও ভঙ্গি
- ভাষা সহজ, কথোপকথনমূলক, অতি টেকনিক্যাল নয়
- ব্যঙ্গ ও রসিকতার মাধ্যমে কঠিন বিষয় ব্যাখ্যা
- চিকিৎসাবিজ্ঞানের 'অহংকার' নয়, বরং তার সীমাবদ্ধতার স্বীকারোক্তি আছে
বইটির গুরুত্ব
এই বইটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ -
- এটি জনস্বাস্থ্য সচেতনতা গড়ে তোলে
- চিকিৎসাবিজ্ঞানের অপূর্ণতা ও সম্ভাবনা - দুটিকেই স্বীকার করে
- বিজ্ঞান বনাম বিশ্বাস - এই দ্বন্দ্বকে শান্ত, যুক্তিনির্ভর ভাষায় উপস্থাপন করে
পুস্তক সমালোচনার দৃষ্টিতে আপনি যে দিকগুলো ধরতে পারেন -
আপনি চাইলে সমালোচনায় বিশেষভাবে ধরতে পারেন -
১. একজন চিকিৎসকের কলমে বিজ্ঞান কীভাবে 'মানবিক' হয়ে ওঠে
২. ব্যঙ্গ ও যুক্তির সমন্বয় কতটা কার্যকর
৩. বইটি সাধারণ পাঠক বনাম চিকিৎসা-পাঠকের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য
৪. কোথাও কি অতিসরলীকরণ হয়েছে, না কি সেটাই বইয়ের শক্তি
আপনি যদি চান, আমি
- পুরো একটি পরিপূর্ণ বাংলা পুস্তক সমালোচনা লিখে দিতে পারি,
- বা আপনার লেখা খসড়াকে সাহিত্যিকভাবে শাণিত করে সম্পাদনা করতে পারি,
- অথবা পত্রিকায় পাঠানোর মতো সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ রিভিউ বানিয়ে দিতে পারি।
বলুন, কোন পথে এগোতে চান?
* * * *
আমি বললাম, "একুশটি প্রবন্ধ সম্পর্কে একটি করে বাক্য লিখে গোটা অনুচ্ছেদ বানিয়ে দিলে ভালো হয়। পুরোটা টুকে ফেলব। আর ভাষাটা যেন আমার মতো একটু অগভীর হয়। খুব তত্ত্বকথা লিখলে কিন্তু কেউ পড়বে না।"
সে উত্তর দিল, "বুঝেছি। খুব ভারী ভাষা নয়, একটু হালকা, চলতি, আপনার কথার ভঙ্গির কাছাকাছি রাখছি। নিচে একুশটি প্রবন্ধ নিয়ে এক-একটি বাক্য, সব মিলিয়ে একটি অনুচ্ছেদ দিলাম - আপনি চাইলে হুবহু টুকে ফেলতে পারবেন।"
সেটা সত্যিই হুবহু টুকিনি, সেক্ষেত্রে চ্যাটজিপিটির হ্যালুশিনেশনে বিষাণবাবুর লেখা অনবদ্য প্রবন্ধগুলোর মুড়িঘণ্ট রান্না হয়ে যেত। অর্থাৎ এক্ষেত্রে যন্ত্রমেধার অবদানে আমার মতই দুর্বল বাক্যগঠন। বিশেষ করে যে ঝরঝরে বাংলা বিষাণ বসু লেখেন, সেই মাত্রার ধারেকাছে নয়। বরং আমি জিজ্ঞেস করলাম,
"ওঁনার প্রতিটি প্রবন্ধ থেকে একটি-দুটি করে লাইন টুকে এমনভাবে সাজানো যেতে পারে যাতে পুরোটা বেশ একটানা পড়ার মতো হয়?"
জানালেন তিনি।
সংক্ষেপে উত্তর - "হ্যাঁ, এটা করা যায়, এবং ঠিক যেভাবে আপনি চাইছেন সেভাবেই করা যায়। তবে একটা বাস্তব শর্ত আছে, সেটাও পরিষ্কার করে বলি।
'চিকিৎসা বিজ্ঞান/কান্ডজ্ঞান'-এর প্রতিটি প্রবন্ধ থেকে ১-২টি করে লাইন নিয়ে একটানা, ধারাবাহিক, পড়তে আরামদায়ক লেখা বানানো সম্ভব, যদি আপনি আমাকে প্রবন্ধগুলোর আসল লাইনগুলো দেন (ছবি তুলে বা টাইপ করে, অল্প অল্প করেও চলবে)।"
বুঝলাম কপিরাইট ভেঙে গোটা বইটি এখনও চ্যাটজিপিটির কাছে ধরা নেই। আর আমিও সেই পাতার ছবি তুলে সাইবার ক্রাইমে ধরা পড়ে এই শীতের মধ্যে জেলের ঠাণ্ডা জলে চান করতে চাই না। অর্থাৎ প্রবন্ধগুলি পড়তে হলে এই বই আপনাকে কিনতেই হবে। পড়লেই বুঝবেন এই বইয়ের প্রতিটি প্রবন্ধ একেবারে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের কথা। হয় আপনি নিজে এইসব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন, নয়তো বা আপনার কোনো বন্ধু, আত্মীয় কিংবা পরিচিত নিকটজন। আর ডাক্তারবাবু, অর্থাৎ বিষাণ বসু, বিষয়টি দেখেছেন পুরোপুরি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। চ্যাটজিপিটিতে কোন সৃজনশীল লেখা লিখতে গেলে যে যে সীমাবদ্ধতা, যা যা অসম্পূর্ণতা - সেটা একজন প্রযুক্তিবিদ তখনই বুঝতে পারেন, যখন তিনি নিজে তাঁর পরিচিত বিজ্ঞানের বিনির্মাণ করতে পারেন। বিষাণবাবু ঠিক সেই ঢঙেই বিনির্মাণ করেছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানের কিছু বিষয়কে, সঙ্গে রয়ে গেছে একটি বাঙালি মন। যে মন পেশাদার ডাক্তারবাবুদের থেকে কিছুটা ভিন্ন তা নিয়ে কোন দ্বিমত নেই।
এই বইয়ের ভাষা সুখপাঠ্য, তবে বিষয় নয়। প্রতিটি প্রবন্ধ আপনাকে একদিকে যেমন ঘেঁটি ধরে বাধ্য করবে আয়নার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিশ্লেষণে, একইসঙ্গে অন্যদিকে প্রশ্ন করবে আপনার জীবনবোধকেও। শুরুর প্রবন্ধ "অনিশ্চিত তবু..." আর শেষের "মৃত্যু নিয়ে..." - তিনটি বিন্দু দিয়ে আঁকা দুটি লেখাই মন ছুঁয়ে গেলেও স্বস্তি দেবে না। ভাবাবে বারবার। আনুভূমিক অক্ষে তিন-ফুটকি না থাকলেও বাকি উনিশটি প্রবন্ধও তাই। জীবনের শেষ প্রান্তিক বিন্দু, মৃত্যু দিয়ে শেষ হচ্ছে এই বইটি - পাতার নম্বর ২১৬। তবে আশাবাদের সুরও আছে প্রতিটি পরতে। আছে রাজনীতি। আর সেই রাজনীতির ঘরানা বামপন্থী। যেখানে রাজনীতি আবেগের থেকে অনেক বেশি সংজ্ঞায়িত হয় বিজ্ঞানের ভাষায়। লেখকের আবেগ আছে, যেটা খুব সহজেই খুঁজে পাবেন ১৫১ পাতার একেবারে নিচে - "অতএব, বছর কুড়ির মেয়েটির তরুণ স্বামী তিলে তিলে মরে যেতে থাকে"। আবার একই পাতার দ্বিতীয় পরিচ্ছেদেই সেই অতি পরিচিত কিন্তু রাজনীতির একটি বৈজ্ঞানিক সত্য উপস্থিত, "মানুষের বেঁচে থাকার জন্যে জরুরি অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান আর তার সাথে স্বাস্থ্য এবং শিক্ষা"।
১৩০ নম্বর পাতায় লেখা প্রবন্ধ "পঁচাত্তর বছরের স্বাধীনতা এবং দেশের স্বাস্থ্য"। এখানে স্বাস্থ্যনীতির বিভিন্ন বাঁকের কথা আলোচিত হয়েছে। শুরুতে ভেবেছিলাম অলুক্ষুণে তেরো-কে দশ দিয়ে গুণ করার কথাই হচ্ছে। আসলে এই প্রবন্ধটিতে সরকার বাহাদুরের গুণের কথাও আছে। সত্যিই তো, অতি উন্নত দেশ আমেরিকা বা কানাডায় যে ভারতীয়রা থাকেন, তাঁরা বোঝেন সেখানে অবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের দেশের থেকেও খারাপ। ১৭১ পাতায় "ভাষার দূরত্ব, দূরত্বের ভাষা" - রোগী-চিকিৎসক কমিউনিকেশনের কিছু দিক এই অংশে রয়েছে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ অসুস্থতার বয়ানও।
'চিকিৎসা বিজ্ঞান/কান্ডজ্ঞান' বইটি শেষ করে মনে হয়, এই লেখকের কাছে চিকিৎসাবিজ্ঞান মানে শুধু রোগ সারানো নয়, তার থেকে হয়তো অনেক বেশি করে এক একটি ব্যক্তিমানুষকে বুঝে নেওয়া। আছে ছোট ছোট প্রশ্ন, বিজ্ঞানের অনিশ্চয়তা আর একজন সৎ বৈজ্ঞানিকের ঐকান্তিক দ্বিধা। সেইখানেই চ্যাটটজিপিটির যন্ত্রদ্বিধা আর মানুষের মনতন্ত্র (মন্ত্রতন্ত্র নয়) বুঝিয়ে দেয় কমপ্লেক্স সিস্টেম অসরলরৈখিক। সবকিছু নিয়ে মিলেমিশে বাঁচতে গেলে তাই জীবনের জটিলতা অস্বীকার করার কোন জায়গা নেই - যেখানে সবথেকে বড় ভয় অসহায়তার। এখান থেকেই সমাজভাবনা দৃঢ় হয়। ঠিক সেই কারণেই এই প্রবন্ধগুলো গিলতে হয় না, একবার শুরু করলে পাতা উল্টে যায় আপনা থেকেই। বিজ্ঞান আর মানুষ - দুইই পাঠক-পাঠিকার চৈতন্যে চিমটি কাটে। মনে করিয়ে দেয় ডাক্তারবাবুরাও মানুষ - তাই চ্যাটজিপিটির চিকিৎসায় কখনো অসুখ সারে, কখনও সারে না। নতুন বছরেও ঠিক তেমনই চলবে।

চিকিৎসা বিজ্ঞান কাণ্ডজ্ঞান
বিষাণ বসু
অবভাস, কলকাতা
মুদ্রিত মূল্য: ৩২৬ টাকা