আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা ● ১-১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ● ১৬-২৯ পৌষ, ১৪৩২
প্রবন্ধ
তারেক রহমানের বাংলাদেশে আগমন
গৌতম লাহিড়ী
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান জিয়া ১৭ বছর পর বাংলাদেশে ফিরলেন। বিএনপি-র তিনি কার্যনির্বাহী চেয়ারম্যান। ৬০ বছর বয়সী নির্বাসিত নেতাকে ঘিরে প্রথম দিনে যে উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনা দেখা গেল তাতে কি বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থায়িত্ব বা স্থিরতা ফিরবে?
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময় গড়ে ওঠা ঢাকার উপকন্ঠের নয়া উপনগরী পূর্বাচলের ৩০০ ফুট প্রশস্ত সড়কে বিশাল সভায় তারেকের স্বদেশে উপস্থিত হয়ে প্রথম ভাষণ। প্রথম দিনেই জনতার উদ্দেশ্যে দেওয়া তাঁর ১৬ মিনিটের ভাষণ অনেক প্রশ্ন তুলে দিল। ভাষণের অন্তর্নিহিত বার্তা নিশ্চিত ভাবে দেশ স্বাধীন করা বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী প্রতিবেশী ভারত সম্পর্কে দার্শনিক ভাবে বিরোধী আদর্শ স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন। ভাষণে তিনি আমেরিকার মানবাধিকার আন্দোলনের প্রবাদ পুরুষ মার্টিন লুথার কিং-এর উদ্ধৃতি উল্লেখ করে বাংলাদেশে 'অধিকার' প্রতিষ্ঠার বার্তা দিলেন। কিন্তু যা বললেন তাতে রহস্য থেকেই গেল। ভাষণে তিনি বলেন - মার্টিন লুথার কিং যেমন বলেছিলেন "আই হ্যাভ এ ড্রিম", তেমন আমি বলি "আই হ্যাভ এ প্ল্যান"। অবিশ্যি তাঁর পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বিশদে কিছুই বলেননি।
সমাবেশে তারেক রহমান পৌঁছনোর আগে কয়েকটি তথ্যচিত্র দেখানো হয়। সেই তথ্যচিত্র হল তারেক সাহেবের 'প্ল্যান'। কাজেই প্রকাশ্য সমাবেশে ভাষণে তারেককে এই বিষয়ে কিছুই বলতে হয়নি।
তথ্যচিত্রে কোথাও স্বীকার করা হয়নি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা করেছিলেন। বরং বলা হলে ২৬ মার্চ, ১৯৭১ সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমান রেডিও বার্তায় স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। ১৯৭১ সালের পর থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত মুজিবুর রহমানের শাসনকালকে বলা হল 'আওয়ামী সন্ত্রাস'। তারেকের প্ল্যান হল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নতুন করে লেখা। বঙ্গবন্ধু নয় জাতির পিতা হবেন জিয়াউর রহমান।
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল কুষ্টিয়ার বৈদ্যনাথতলায় স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পরে যার নাম হয় মুজিব নগর। পাকিস্তান সেনা আত্মসমর্পণের আগেই ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারত সরকার ওই সরকারকে স্বীকৃত দেয়। এখন তারেক রহমানের বিএনপি বলছে, মেজর জিয়াউর রহমান-এর নেতৃত্বে রংপুর জেলার রও মারি-তে মুক্তিবাহিনী প্রথম পাক বাহিনীকে হারিয়ে মুক্তাঞ্চল তৈরি করে। সেখানে স্বাধীন প্রশাসন তৈরি হয়। তারেক-এর প্ল্যান কি মুজিব নগরের অবসান ঘটিয়ে রও মারি-কে প্রথম স্বাধীন সরকারের স্বীকৃতি দেওয়া!
এমনকি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকদের হাতে বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নিহত হওয়াকে 'প্রয়োজনীয়' পরিণতি বলে বলা হল। ঘোষক বলছেন আওয়ামী সরকার দরিদ্রদের বিরুদ্ধে আগ্রাসী ভূমিকা নেয়। এবং ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হয়নি।
১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ক্ষমতায় আসে মুজিবের মন্ত্রী খোন্দকার মোস্তাক। কিন্তু ৪ মাসের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারান। ৭ নভেম্বর মিলিটারি জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসেন। মার্শাল আইন জারি করেন।
এই তথ্যচিত্রে বলা হচ্ছে ১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণের দিন। সেনা অভ্যুত্থানকে বলা হয়েছে 'সিপাহী জনতা বিপ্লব'। তারেক তাঁর ভাষণে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমানের ক্ষমতা দখলকে তুলনা করেন। ১৯৭৭ সালে জিয়া রাষ্ট্রপতি হন। তাঁকে এখন বলা হচ্ছে 'শহীদ রাষ্ট্রপতি'। তাঁকেও সেনা অভ্যুত্থানে প্রাণ হারাতে হয়। 'তিনি বাংলাদেশের আলোকবর্তিকা'।
বঙ্গবন্ধু সংবিধান গড়েছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ-এর ভিত্তিতে। জিয়াউর রহমান সংবিধানে প্রারম্ভেই জুড়ে দিলেন 'বিসমিল্লা রাহমানির রাহিম' এবং সংবিধানে জুড়লেন 'আল্লাহর কাছে আস্থা ও বিশ্বাস রাখা' হবে সকল কাজের ভিত্তি। তাঁর বিশ্বাস ছিল 'বাঙালি' জাতীয়তাবাদের নামে বাংলাদেশের পরিচয় বা আইডেন্টিটি হারিয়ে গেছে। রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের পরিচয় হবে 'বাংলাদেশী'। ধর্মনিরপেক্ষতা বিলোপ। বলা হল সভায়, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আকাঙ্খার এটাই প্রতিফলন। সংখ্যালঘুর অধিকার নেই। অথচ তারেক ভাষণে বলেন, হিন্দু মুসলমান, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ সকলের বাংলাদেশ। ভারতীয় আরএসএস যেমন মনে করে ভারতে বসবাসকারী সকলেই 'হিন্দুস্থানী'।
তারেক রহমান ভাষণে এবার নিয়ে এলেন খালেদা জিয়ার প্রথম ক্ষমতায় আসা। তাঁকে উল্লেখ করা হল 'দেশমাতা' বলে। শেখ হাসিনাকে বলা হয় 'দেশরত্ন'। একমাত্র তিনিই নাকি সেনা শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিলেন। আওয়ামী লীগের কোনো ভূমিকাই নেই। আওয়ামী লীগের ইতিহাস মুছে দিতে মুহাম্মদ ইউনূস যে কাজ শুরু করেছেন, তাকেই পরিণতির দিকে নিয়ে যাবেন তারেক। এটাই 'প্ল্যান'!
ভাষণে একবারের জন্যও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নাম উল্লেখ করেননি তারেক। অবশ্য ইউনূসের নামও বলেননি। যদিও দেশে ফেরার পর ইউনূসকে টেলিফোন করে তাঁর পৌঁছনোর সংবাদ দিয়েছেন। এখনও একবারের জন্যও দেখা করেননি।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে তারেক ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তারপর প্রবল ভারত বিদ্বেষী ইসলামিক ফ্রন্টের মুখপাত্র ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডকে ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের মতো মর্যাদা দেন। এতে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানহানি করা হল না?
ভিড়ের কারণে তিনি সাভারে শহীদ স্মৃতিতে শ্রদ্ধা জানাতে পারেননি। তাঁর হয়ে বিএনপি নেতারা স্মারকে মাল্যদান করেন। অথচ তিনি ওসমান হাদির কবরে গিয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেছেন। তিনি অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ চান। অথচ হিন্দু শ্রমিক দিপু দাসের পরিবারের সঙ্গে দেখা করলেন না। মৌলবাদীরা 'ছায়ানট', 'উদীচী'-র মতো উদারবাদী সাংস্কৃতিক সংগঠন জ্বালিয়ে দিলো। সেখানে শোক প্রকাশ না করে বুঝিয়েছেন তাঁর প্ল্যান কী এবং তিনি কোন ধরনের বাংলাদেশ গড়তে চান।
তারেক রহমান ইংল্যান্ডের গ্রেট ব্রিটেনে ২০০৮ সাল থেকে রয়েছেন। সেখানে তিনি রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন কারণ তাঁর নাকি জীবন সংশয় রয়েছে। ২০০৮ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের পর তারেক ইংল্যান্ড যেতে চান। তখন তিনি লিখিতভাবে সেনা সরকারকে লিখেছিলেন যে আর কোনোদিন রাজনীতি করবেন না। সেই তারেক লন্ডনে গিয়েই ২০০৯ থেকে রাজনীতি শুরু করেন। তাঁর মা খালেদা জিয়া অসুস্থ হওয়ায় তিনিই দল চালাতে শুরু করেন।
এখন যেহেতু আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ। ফলে একতরফা বিএনপি-র জয় অনেকেরই নিশ্চিত। অবিশ্যি যদি নির্বাচন হয়। এই কারণে জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখলেও মৌলবাদীদের সঙ্গে সমঝোতা চলছে। এটাই ভারতের পক্ষে চিন্তার বিষয়।