আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা ● ১-১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ● ১৬-২৯ পৌষ, ১৪৩২

প্রবন্ধ

নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানির জয়: এক প্রাক্তন মেয়রের কলম থেকে

অশোক ভট্টাচার্য


আমি যে বিষয়ে লিখছি, তা শুধু একটি নগরের মেয়র নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ নয় - এমন একটি নির্বাচনের ফল যা বিশ্ব পুঁজিবাদের হৃৎপিণ্ডে এক গভীর জিজ্ঞাসার জন্ম দিয়েছে। নিউ ইয়র্ক, যে শহর প্রাচুর্য আর বৈষম্যের এক আশ্চর্য নকশা বলে পরিচিত, সেখানেই এক বামপন্থী গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক প্রার্থীর বিজয়; এ ঘটনা কেবল আমেরিকার নাগরিক রাজনীতিতে নয়, সমগ্র বিশ্ব জুড়েই এক আলোড়ন সৃষ্টির ইঙ্গিত। এই নির্বাচন বিশ্লেষণ করলে পশ্চিমের নগর সরকারের ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে আমাদের ভারতের পৌর ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার যে তীব্র বৈপরীত্য ফুটে ওঠে, তা অত্যন্ত গভীর অনুধাবন দাবি করে। সাম্প্রতিক নিউ ইয়র্ক মেয়র নির্বাচনে একটি নগরের নির্বাচন রাজনীতির ভাষ্যকে বিমূর্ততা থেকে সরিয়ে সাধারণ মানুষের ভাষাতে রূপান্তরিত করেছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে স্পর্শ করছে।

বিশ্ব পুঁজিবাদের রাজধানী থেকে ভেসে আসা এক নতুন সুর

নিউ ইয়র্কের গগনচুম্বী অট্টালিকা, যেখানে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রগুলি স্থাপিত, সেখানেই এক মুসলিম, অভিবাসী, গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক - জোহরান মামদানি - মেয়র পদে বিজয়ী হয়েছেন। ২০২৫ সালের নভেম্বর ৪ তারিখে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে তিনি ৫০.৪ শতাংশ ভোট পেয়ে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাজিত করে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। এই নির্বাচনের ফলাফল কোনো বিপ্লবী বা রেডিক্যাল পরিবর্তন নয় তবে নিউ ইয়র্কের মতন একটি শহরে একটি নতুন ধরনের রাজনীতির সৃষ্টি করেছে।

মাত্র ৩৪ বছর বয়সী জোহরান মামদানি, যার জন্ম আফ্রিকায় (উগান্ডায়), সাত বছর বয়সে বাবা-মায়ের সঙ্গে তিনি নিউ ইয়র্কে আসেন। তিনি ২০১৮ সালে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে নিউ ইয়র্কের বিধানসভার লেজিসলেটার নির্বাচিত হন। তাঁর এই বিজয়কে অনেকে তাই কেবল একটি নির্বাচনী ফল হিসেবে দেখছেন না, দেখছেন একটি রাজনৈতিক ধারা হিসেবে, যা আমেরিকার প্রচলিত রক্ষণশীল কাঠামোর ওপর এক তীব্র আঘাত।

তথ্যের শুদ্ধিকরণ ও প্রতিদ্বন্দ্বীর পরিচয়

এই বিজয়ের আখ্যান শুরু হয় ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাথমিক মনোনয়নের দৌড় থেকে। মামদানি এই দৌড়ে প্রাক্তন গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমোর (Andrew Cuomo) মতো রাজনৈতিক স্তম্ভকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যান। কুওমো যখন প্রাথমিক পর্যায়ে মামদানিকে সহজে হারানোর আশা করেছিলেন, তখন প্রাথমিক নির্বাচনের ফল এক বিশাল রাজনৈতিক অঘটন হিসেবে সামনে আসে। পরবর্তীকালে, নির্দল প্রার্থী হিসেবে কুওমো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও, মামদানি সাধারণ নির্বাচনেও বিপুল সমর্থন লাভ করেন।

মামদানির এই উত্থান শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত ক্যারিশমার ফল নয়। এটি 'ডেমোক্রেটিক সোস্যালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অফ আমেরিকা' (DSA)-এর দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক প্রচেষ্টার ফসল। মামদানি নিজেকে একজন বামপন্থী গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক হিসেবে ঘোষণা করেন এবং DSA-কে তার রাজনৈতিক ঘর বলে পরিচয় দেন। মামদানি সবচেয়ে বেশি পরামর্শ ও আদর্শিক সহায়তা পেয়েছেন বার্নি স্যান্ডার্সের-এর কাছ থেকে, তিনি সমাজতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসী। বারলিংটন শহরের চারবারের মেয়র বার্নি স্যান্ডার্সের ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর মনোনয়ন প্রচারাভিযানের পর থেকে আমেরিকার বামপন্থী আন্দোলন, নিউইয়র্কে এক নতুন শক্তি অর্জন করেছে, এবং NYC-DSA এখন ১২,০০০-এর বেশি সদস্য নিয়ে দেশের সবচেয়ে গতিশীল বামপন্থী সংগঠনে পরিণত হয়েছে। মামদানির জয় প্রমাণ করে যে সমাজতন্ত্র একটি বিমূর্ত তত্ত্ব নয়, বরং কার্যকর নির্বাচনী কৌশলে রূপান্তরিত হয়েছে, যা পুঁজিবাদের কেন্দ্রস্থলে একটি রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে চলেছে।

বামপন্থী চেতনার পুনর্জন্ম

দীর্ঘকাল ধরে নিউ ইয়র্ক শহর ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এমন নেতাদের হাতে পরিচালিত হয়েছে, যারা উদারনৈতিক পুঁজিবাদের প্রতি সহানুভূতিশীল। কিন্তু মামদানির বিজয় নিউ ইয়র্কের রাজনৈতিক অভিজাততন্ত্রের বিরুদ্ধে এক স্পষ্ট রায়। তাঁর রাজনীতি বিমূর্ত মতাদর্শ নিয়ে নয়, বরং নিউ ইয়র্ক শহরের শ্রমজীবী ও ভাড়াটে মানুষের দৈনন্দিন জীবন-জীবিকার সমস্যাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।

তাঁর প্রচারের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই শহরকে 'সাশ্রয়ী শহর' বা 'অ্যাফোর্ডেবল সিটি'তে পরিণত করা। এই এজেন্ডা তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করেছে, যারা উচ্চ বাড়ি ভাড়া, বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার খরচ এবং ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের কারণে হতাশ। এই হতাশা কেবল নিউ ইয়র্ক বা আমেরিকার নয়, বরং বিগত তিন দশক ধরে অনুসৃত নব-উদারনৈতিক আর্থিক নীতির প্রতি সারা বিশ্বের জনগণের অসন্তোষেরই প্রতিচ্ছবি।

নিউ ইয়র্কের বৈপরীত্যের নকশা

নিউ ইয়র্ক সিটির অর্থনৈতিক প্রাচুর্য বিশ্বের কাছে ঈর্ষণীয়। এর মোট জিডিপি ১.২৮ ট্রিলিয়ন ডলার - যা এটিকে বিশ্বের ১৪তম ধনী দেশ হিসেবে স্থান দিত, যদি এটি একটি পৃথক রাষ্ট্র হতো। বিশ্বের ৫০০ জন ধনকুবেরের মধ্যে ৪৩ জন এখানে ব্যবসা করেন বা বসবাস করেন। অথচ নিউ ইয়র্ক বিশ্বের সবচেয়ে অসম ও ব্যয়বহুল শহর।

কিন্তু এই প্রাচুর্যের আড়ালে যে গভীর বৈষম্য লুকিয়ে আছে, মামদানি তাঁর নির্বাচনী প্রচারে সেই ক্ষতগুলিকেই তুলে ধরেছেন। এই শহরে ৮৫ লক্ষ মানুষ বসবাস করে, যার মধ্যে ৩০ লক্ষ মানুষ শ্রমজীবী বা দরিদ্র। প্রায় ৩ লক্ষ মানুষ গৃহহীন, এবং ৫ লক্ষ শিশু প্রতি রাতে অর্ধাহারে ঘুমোতে যায়। লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষ তাদের আয়ের সিংহভাগ বাড়ি ভাড়া মেটাতে (যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রতি মাসে প্রায় চার লক্ষ টাকা পর্যন্ত হতে পারে) বাধ্য হন। উদারীকরণ আর্থিক নীতির ফলস্বরূপ জীবনযাত্রার খরচ (মুদিখানার জিনিসপত্র, চিকিৎসা, শিক্ষা) লাগামছাড়া ভাবে বেড়ে চলেছে, কিন্তু মজুরি বৃদ্ধি পাচ্ছে না। নিউ ইয়র্কের বহু মানুষ বর্তমান মার্কিন সরকারের ইজরাইলকে আর্থিক বা নানাভাবে সহায়তা করায় ক্ষুব্ধ।

সাশ্রয়ী শহরের সঙ্কল্প: নীতির মূল ভিত্তি

মামদানি তাঁর প্রচারে রাজনীতির ভাষা এবং জনগণের মৌলিক চাহিদার ভাষাকে একসূত্রে গেঁথে দেন। তিনি কেবল 'গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র' নিয়ে বিমূর্ত কথা বলেননি, বরং জনগণের প্রতিদিনের সমস্যাগুলির বাস্তব সমাধানকে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করেছেন। তাঁর কর্মসূচির তিনটি স্তম্ভ ছিল: আবাসন, খাদ্য এবং স্বাস্থ্য।

শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি: তিনি নিউ ইয়র্কে শ্রমিকদের প্রতি ঘণ্টা কাজের মজুরি ৩০ ডলারে উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছেন।

খাদ্য নিরাপত্তা: খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি রোধ করতে প্রতিটি বরোতে মোট পাঁচটি সরকার-ভর্তুকিযুক্ত মুদিখানা (Grocery Store) খোলার প্রস্তাব দিয়েছেন। এগুলিকে তিনি 'উৎপাদনের জন্য সরকারি বিকল্প' হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা বাজার মূল্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করবে।

সর্বজনীন শিশু স্বাস্থ্যসেবা: ছয় সপ্তাহ থেকে পাঁচ বছর বয়সী সমস্ত শিশুর চিকিৎসার দায়িত্ব রাষ্ট্র বহন করবে - এই প্রতিশ্রুতি শ্রমজীবী বাবা-মায়েদের কাছে এক বিশাল আশ্বাস ছিল।

যাত্রী বাস ভাড়া নিঃশুল্ক করতে চাইছেন।

আবাসন সমস্যা ও রেন্ট ফ্রিজের কৌশল

আবাসন সমস্যা মামদানির এজেন্ডার কেন্দ্রে ছিল। নিউ ইয়র্কের প্রায় এক মিলিয়ন অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া-স্থিতিশীল (rent-stabilized) ব্যবস্থার অধীনে রয়েছে। মামদানি এই অ্যাপার্টমেন্টগুলিতে চার বছরের জন্য ভাড়া বৃদ্ধির ওপর স্থগিতাদেশ (Rent Freeze) চেয়েছেন।

আইনত একজন মেয়র একা ভাড়া বাড়ানো বা কমানোর ক্ষমতা রাখেন না, কিন্তু নিউ ইয়র্কের 'শক্তিশালী মেয়র' মডেলের কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ক্ষমতা তাঁর হাতে রয়েছে। মেয়র রেন্ট গাইডলাইনস বোর্ড (Rent Guidelines Board বা RGB)-এর ৯ জন সদস্যকেই নিয়োগ করেন। অতএব, একজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মেয়র এই বোর্ডকে ব্যবহার করে কার্যকরীভাবে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।

এই নীতির দুটি দিক রয়েছে। একদিকে, এটি ভাড়াটেদের জন্য চার বছরে প্রায় ৬.৮ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করতে পারে। মামদানিকে এই অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার কঠিন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে হবে। এর পাশাপাশি, তিনি কয়েক লক্ষ সামাজিক আবাসন নির্মাণ এবং সর্বজনীন রেন্ট স্টেবিলাইজেশন বাস্তবায়নের লক্ষ্য স্থির করেছেন। অতি ধনীদের উপর অতিরিক্ত দুই শতাংশ কর বৃদ্ধি করে আয়কর, কর্পোরেট কর, বিক্রয় কর, এক মিলিয়ন ডলারের উপর উপার্জনকারী মানুষদের উপর থেকে আদায় করলেই এই প্রতিশ্রুতি পূরণে বাড়তি ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা ও আস্থা তিনি আদায় করেছেন।

প্রতিরোধের ঝড় ও গণভিত্তির রাজনীতি

মামদানির নির্বাচনী বিজয় ছিল কর্পোরেট পুঁজির আধিপত্যের বিরুদ্ধে এক সাধারণ মানুষের লড়াই। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, অ্যান্ড্রু কুওমোর প্রচারে নিউ ইয়র্কের বড় বড় কর্পোরেট ধনী, রিয়েল এস্টেট, শিল্পপতি এবং ২০০ জন ধনকুবেরের সম্মিলিত সমর্থন ছিল, যারা কুওমোর প্রচারে প্রায় ৮১.৬ মিলিয়ন ডলার অর্থ দান করে। তাদের লক্ষ্য ছিল মামদানিকে পরাজিত করা এবং নিউ ইয়র্কের পুঁজিবাদী মডেলকে রক্ষা করা।

বিপরীতে, জোহরান মামদানির নির্বাচনী প্রচারে অর্থ জুগিয়েছেন ৫০,০০০ সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী মানুষ, ট্যাক্সি ড্রাইভার এবং ভাড়াটেরা। জনগণের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ ছিল ২৩.৭ মিলিয়ন ডলার। যদিও অঙ্কের দিক থেকে কর্পোরেট অর্থ বেশি ছিল, কিন্তু এই ছোট অনুদানের প্রক্রিয়াটি বামপন্থী এজেন্ডার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে এবং মামদানিকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করার সুযোগ দেয়। এটি ছিল 'অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের' এক নতুন উত্থান।

ডোনাল্ড ট্রাম্প, ইলন মাস্ক ও ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন

মামদানির উত্থানের সাথে সাথে তাঁর বিরুদ্ধে তীব্র কুৎসা প্রচার শুরু হয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইলন মাস্কের মতো ব্যক্তিত্বরা মামদানিকে 'কম্যুনিস্ট', 'লুনাটিক' বলে অভিহিত করেন। সবচেয়ে গুরুতর হুমকি আসে ট্রাম্পের কাছ থেকে। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে মামদানি মেয়র নির্বাচিত হলে নিউইয়র্কের উন্নয়নে কেন্দ্রীয় তহবিল (Federal Funds) বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং তাঁর বাজেটের অনুমোদন দেওয়া হবে না।

পরিস্থিতির জটিলতা আরও বাড়ে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প রিপাবলিকান ভোটারদের নির্দেশ দেন, তাঁরা যেন তাদের দলীয় প্রার্থীকে ভোট না দিয়ে নির্দল প্রার্থী অ্যান্ড্রু কুওমোকে ভোট দেন। ট্রাম্পের যুক্তি ছিল, একজন কম্যুনিস্ট মেয়রের থেকে একজন ডেমোক্র্যাট মেয়র (কুওমো) অনেক ভালো। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরে যারা দক্ষিণপন্থী, তাঁরাও প্রকাশ্যেই মামদানিকে ভোট না দিয়ে কুওমোকে সমর্থনের কথা বলেন। প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও পরোক্ষভাবে মামদানির বিরোধিতা করেন। যদিও নিউ ইয়র্কের বর্তমান গভর্নর জোহরান মামদানিকে সমর্থন ঘোষণা করলেও ধনীদের উপর কর বৃদ্ধির বিরোধিতা করেন।

এই পরিস্থিতিতে মামদানিকে কার্যত 'ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট অফ আমেরিকা' (DSA)-এর মঞ্চ থেকে লড়াই করে বিজয়ী হতে হয়েছে - অর্থাৎ, তাঁকে লড়তে হয়েছে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে, ধনকুবেরদের অর্থবলের বিরুদ্ধে, এবং একই সাথে নিজ দলের প্রভাবশালী অংশের বিরুদ্ধে। তিনি কার্যত কঠিন জয় সম্ভব করেছেন।

DSA-এর সাংগঠনিক রণনীতি ও স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী

মামদানির বিজয় তাঁর দৃঢ় আদর্শগত অবস্থানের পাশাপাশি একটি অভূতপূর্ব সাংগঠনিক কৌশলের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। DSA তাঁর প্রচারের জন্য দুটি মূল পদ্ধতি গ্রহণ করে: মাঠের রাজনীতি ও জনসংযোগ (ক্যানভাসিং) এবং বহুমাত্রিক সংযোগ স্থাপন (কমিউনিকেটর)।

মামদানি তাঁর পক্ষে প্রায় ১ লক্ষ স্বেচ্ছাসেবক নিযুক্ত করেন। উল্লেখ্য, ১৯৬৫ সালে জন লিন্টসে যখন মেয়র নির্বাচিত হন, তখন তিনি ২৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবক নিযুক্ত করেছিলেন, যা ছিল রেকর্ড। মামদানি সেই সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যান। মে মাস থেকে জুন মাস পর্যন্ত প্রায় ৩১ লক্ষ বাড়িতে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবকরা ভোটারদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ স্থাপন করেন।

মামদানির কৌশল ছিল নিউ ইয়র্কের বহুজাতিক, বহুভাষিক, বহুসম্প্রদায় ও বহুসাংস্কৃতিক চরিত্রকে কাজে লাগানো। নিউ ইয়র্ক শহরের মানুষ কয়েক শত ভাষায় কথা বলে। মামদানি কমিউনিকেটর হিসেবে বেছে নেন বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতিকে, বিশেষ গুরুত্ব দেন দক্ষিণ এশীয়, অভিবাসী, শ্রমজীবী ও ভাড়াটে মুসলিমদের সাথে যোগাযোগকে। তিনি বাংলা, হিন্দি, উর্দু, আরবি, জার্মান, স্প্যানিশ ইত্যাদি ভাষায় তাদের সাথে কথা বলেন এবং তাদের সংস্কৃতিকে সম্মান জানিয়ে তাদের সঙ্গে মিশে যান, এমনকি খাওয়া-দাওয়াও করেন। তিনি নিজেই স্লোগান তোলেন - 'তোমার মেয়র আমার মেয়র মামদানি মামদানি'।

এই কৌশলের মূল দিক ছিল জনগণের মৌলিক চাহিদাকে রাজনৈতিক এজেন্ডায় পরিণত করা। রাজনীতি বা সমাজতন্ত্রের কোনো বিমূর্ত ধারণা তিনি প্রচার করেননি। বরং জনগণের দৈনন্দিন সমস্যার কথা শুনেছেন এবং সেই মানুষগুলিকেই তাঁর পক্ষে প্রচারের অংশীদার ও যোগাযোগকারীর কাজে যুক্ত করেছেন। এর ফলে, একটি শক্তিশালী জনভিত্তিক রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে, যা প্রচলিত দলীয় কাঠামোর বাইরে গিয়ে সংগঠিত শ্রমজীবী ও ভাড়াটেদের শক্তিকে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়।

শ্রেণী ও পরিচয়ের রাজনীতির সমন্বয়

মামদানির রাজনীতি পরিচিতি সত্তার বিভাজনকে ব্যবহার করতে না দিয়ে শ্রেণী রাজনীতি এবং পরিচয়ের রাজনীতিকে একে অপরের পরিপূরক করে তুলেছে। তিনি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক জোটের উপর জোর দেন, যা তাঁকে এমন সব গোষ্ঠীর সমর্থন এনে দিয়েছে, যারা ঐতিহ্যগতভাবে পরস্পরবিরোধী অবস্থানে থাকে।

ফিলিস্তিন, ইহুদি ও বামপন্থী সমর্থন: এক অসামান্য সমীকরণ

নিউ ইয়র্ক বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইহুদি জনসংখ্যার শহর। এই সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে মামদানি তাঁর প্রো-প্যালেস্টাইন অবস্থান থেকে বিন্দুমাত্র সরে আসেননি। তিনি গাজায় গণহত্যার তীব্র নিন্দা করেছেন এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে নিউ ইয়র্ক ভ্রমণে এলে গ্রেফতারের হুমকিও দিয়েছেন। তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফ্যাসিবাদী এবং একনায়ক বলেছেন, এজন্য তিনি কোনো ক্ষমা চাইতে নারাজ। তিনি প্যালেস্তাইনের দাবির সমর্থনে মার্কিন মদতপুষ্ট ইসরাইলি বাহিনীর গাজার গণহত্যার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আন্দোলন ও জনমত সৃষ্টির আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর এই স্পষ্ট অবস্থানের ফলে ধারণা করা হয়েছিল, তিনি ইহুদি ভোট হারাবেন। কিন্তু এর বিপরীতে, তিনি ইহুদি তরুণ প্রজন্ম এবং প্রগতিশীল ইহুদি সংগঠনগুলির (যেমন ইহুদি ভয়েস ফর পিস) ব্যাপক সমর্থন পান। তিনি বারেবারেই বলেন তিনি একজন মুসলমান এবং গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক।

তরুণ ইহুদিরা তাদের ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচিতির চেয়ে আবাসন, স্বাস্থ্য, এবং আর্থ-সামাজিক সমতার মতো সার্বজনীন প্রগতিশীল মূল্যবোধ ও শ্রেণীভিত্তিক দাবিগুলিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। মামদানি সফলভাবে এই অর্থনৈতিক সংহতির ক্ষেত্রটি তৈরি করতে পেরেছিলেন। বলা হয়, ৪০ শতাংশ ইহুদি তরুণরা ভোট দিয়েছেন মামদানিকে।

LGBTQ+ সম্প্রদায়ের আস্থা

মামদানি একজন মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও এলজিবিটিকিউ+ সমাজের ব্যাপক সমর্থন অর্জন করেন। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে তাঁর রাজনীতি মানব অধিকারের বিশ্বাসের ওপর নির্মিত এবং এটি কুইয়ার ও ট্রান্স নিউ ইয়র্কবাসী সহ বিশ্বের সকলের জন্য প্রযোজ্য।

তাঁর নির্বাচনী প্ল্যাটফর্মে তিনি এলজিবিটিকিউ+ নিউ ইয়র্কবাসীর জন্য একটি সুরক্ষা পরিকল্পনা ঘোষণা করেন, যার মধ্যে জেন্ডার-অ্যাফার্মিং কেয়ারের জন্য ৬৫ মিলিয়ন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ছিল। তাঁর প্রতিপক্ষ অ্যান্ড্রু কুওমো যখন উগান্ডার সমকামী-বিরোধী নীতির বিষয়ে তাঁকে আক্রমণ করেন, তখন মামদানি জোর দিয়ে বলেন যে তাঁর নীতি উগান্ডার ট্রান্স ও কুইয়ার মানুষের প্রতিও প্রসারিত। এইভাবে, তিনি ধর্মীয় রক্ষণশীলতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেন।

বিশ্বনেতাদের প্রতি মামদানির স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান

জোহরান মামদানি কোনো আপোষের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নন। তিনি তাঁর আদর্শগত অবস্থান থেকে সরে না এসে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে 'ফ্যাসিস্ট' বলেছেন এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকেও 'গণহত্যাকারী' বলেছেন। এই কঠোর ও আপোষহীন রাজনৈতিক ভাষা তরুণ প্রজন্মকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট করেছে, যারা প্রচলিত দ্বিধাদ্বন্দ্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে হতাশ।

মামদানির বিজয় শুধু নিউ ইয়র্কের নয়, সমগ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি করবে। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, যিনি আমেরিকার সমাজতন্ত্রের পথের একজন অক্লান্ত যোদ্ধা এবং মামদানির প্রথম দিন থেকে পরামর্শদাতা ছিলেন, তিনি এই বিজয়কে সমাজতন্ত্রের বিজয় না বললেও, এটিকে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে এক স্পষ্ট রায় বলে চিহ্নিত করেছেন। পুঁজিবাদের রাজধানী নিউ ইয়র্কের মূল কেন্দ্র থেকে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী একজন প্রার্থীর বিজয় লাভ বিশ্ব রাজনীতিতে গভীর তাৎপর্য বহন করে। মামদানি সোশ্যাল জাস্টিস্-এর সাথে মিউনিসিপ্যাল জাস্টিসের কথাও তাঁর প্রচারে বলেছেন।

নিউ ইয়র্কের মেয়রের কার্যনির্বাহী কাঠামো: 'স্ট্রং মেয়র' মডেল

আমেরিকার শহরগুলিতে মেয়র পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু নিউ ইয়র্কের মেয়র পদ বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাবান পৌর নির্বাহী পদ হিসেবে পরিচিত। নিউ ইয়র্কের মেয়রকে 'স্ট্রং মেয়র' (Strong Mayor) বলা হয়, এবং এই শহরের মুখ্য কার্যনির্বাহী (Chief Executive) হিসেবে তাঁর ক্ষমতা ব্যাপক।

নিউ ইয়র্কের মেয়র সরাসরি তিন ধরনের ক্ষমতার অধিকারী: কার্যকরী ক্ষমতা, আর্থিক ক্ষমতা এবং জনসেবার উপর নিয়ন্ত্রণ। তিনি প্রায় ৩ লক্ষ কর্মীর নেতৃত্ব দেন - যা যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গ বা সিনসিনাটির মোট জনসংখ্যার প্রায় সমান। তিনি পুলিশ, স্কুল (শিক্ষা দপ্তর), স্যানিটেশন, আবাসন, পরিবহন এবং অগ্নি নির্বাপনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলি সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করেন।

বিশেষত আবাসন ও ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাঁর ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য। ইউনিফর্ম ল্যান্ড ইউজ রিভিউ প্রসিডিউর-এর (ULURP) মাধ্যমে মেয়র এলাকাভিত্তিক রি-জোনিং, বাধ্যতামূলক অন্তর্ভুক্তিমূলক আবাসন (Mandatory Inclusionary Housing - MIH) এর মতো নীতি প্রভাবিত করতে পারেন। উপরন্তু, আগেই আলোচিত হয়েছে, তিনি রেন্ট গাইডলাইনস্ বোর্ড (RGB)-এর সকল সদস্যকে নিয়োগ করে কার্যত শহরের প্রায় এক মিলিয়ন ভাড়া-স্থিতিশীল অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। নিউ ইয়র্কের মেয়রের নিজস্ব ক্ষমতা এত বেশি যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শারীরিক ভাষা থেকেই বোঝা গিয়েছিল যে মেয়র চাইলেই অনেক কিছু করতে পারেন। সম্প্রতি দুজনের সাক্ষাতে ট্রাম্প নিউ ইয়র্কে নির্বাচিত মেয়র জোহনার মামদানিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন, তাঁর সাফল্য কামনা করেছেন, সমস্ত রকম সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।

আর্থিক ও সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা: আলবেনির নিয়ন্ত্রণ

নিউ ইয়র্কের মেয়র একটি বিশাল বার্ষিক অপারেটিং বাজেট (প্রায় ১১৫ বিলিয়ন ডলার) এবং ১০ বছরের মূলধনী বাজেট (১৭৫ বিলিয়ন ডলার) পরিচালনা করেন। বাজেট প্রস্তুত করার ক্ষমতা রয়েছে তাঁর হাতে।

মামদানির এজেন্ডার মূল চাবিকাঠি হলো ধনী ও কর্পোরেটদের ওপর কর বৃদ্ধি করে ভর্তুকিযুক্ত পরিষেবাগুলির অর্থায়ন করা। তিনি অতি ধনীদের ওপর ২% অতিরিক্ত কর, কর্পোরেট কর বৃদ্ধি এবং উচ্চবিত্তের ওপর অতিরিক্ত আয়করের প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু নিউ ইয়র্ক সিটি মেয়র চাইলেই এসব কর বাড়াতে পারেন না। কর সংক্রান্ত যে কোনো বড় পরিবর্তন করার জন্য নিউ ইয়র্ক স্টেট আইনসভা (Albany) এবং বিশেষত গভর্নরের অনুমোদন অপরিহার্য। যদিও সেখানেও রয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাধান্য, মামদানিও সেই আইনসভার একজন সদস্য।

গভর্নরের বিরোধিতা ও বাজেট ঘাটতি

মেয়র-নির্বাচিত হওয়ার পর মামদানিকে যে প্রথম বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে, তা হলো নিউ ইয়র্কের স্টেট সরকারের বিরোধিতা। গভর্নর ক্যাথি হুচুল, যিনি নিজেকে প্রকাশ্যে 'কট্টর পুঁজিবাদী' ('staunch capitalist') হিসেবে বর্ণনা করেন, তিনি ধনীদের উপর বা নিউ ইয়র্কের ব্যবসার উপর কর বাড়ানোর তীব্র বিরোধী। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে "যে কোনো কর বৃদ্ধি আগে আমার ডেস্ক পেরিয়ে যেতে হবে"। যদিও দোসরা জুন এই নির্বাচনে মামদানিকে সমর্থন করেছেন গভর্নর হুচুল।

এই পরিস্থিতিতে স্পষ্ট হয় যে মামদানির সংগ্রাম কেবল রিপাবলিকান বা ধনকুবেরদের বিরুদ্ধে নয়, বরং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অভ্যন্তরের রক্ষণশীল অর্থনৈতিক কাঠামোর বিরুদ্ধেও। তাঁর সাফল্য নির্ভর করবে স্টেট সরকারের ওপর জনগণের চাপ বজায় রাখার ক্ষমতার ওপর, যার জন্য ডিএসএ ইতিমধ্যেই 'ট্যাক্স দ্য রিচ' নামে প্রচার শুরু করেছে। একই সাথে তিনি দিয়ে রেখেছেন ব্যাপক জন আন্দোলনের আহ্বান।

প্রাচুর্যের নিয়ন্ত্রণ ও ভারতের পৌরসভার বন্দিদশা

নিউ ইয়র্কের শক্তিশালী নগর সরকারের বিপরীতে যখন আমরা ভারতের পৌর ব্যবস্থার দিকে তাকাই, তখন তার দুর্বলতা ও কাঠামোগত পরাধীনতা প্রকট হয়ে ওঠে।

দ্বাদশ তফসিল ও আকাঙ্ক্ষার জন্ম: সাংবিধানিক ভিত্তি

ভারতে ১৯৯২ সালে সংবিধানের ৭৪তম সংশোধনীর মাধ্যমে পৌরসভাগুলিকে স্থানীয় স্বশাসনের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই সংশোধনীতে সংবিধানে দ্বাদশ তফসিল (Twelfth Schedule) যুক্ত করা হয় (অনুচ্ছেদ ২৪৩W), যেখানে মোট ১৮টি বিষয় পৌরসভার হাতে হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছে। এই বিষয়গুলির মধ্যে নগর পরিকল্পনা, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, সড়ক ও সেতু, জল সরবরাহ, জনস্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন, বস্তি উন্নয়ন, এবং নগর দারিদ্র্য হ্রাসকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অন্তর্ভুক্ত। সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের এই পদক্ষেপটি স্থানীয় গণতন্ত্রের প্রতি এক গভীর অঙ্গীকারের জন্ম দেয়।

ক্ষমতার বিভাজন ও নামমাত্র মেয়র (Weak Mayor Model)

কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতির বিপরীত। নিউ ইয়র্কের মেয়র তার প্রশাসনের মুখ্য কার্যনির্বাহী হলেও, ভারতে মেয়র (বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে) প্রধানত একটি আনুষ্ঠানিক বা প্রতীকী পদে অধিষ্ঠিত থাকেন (Ceremonial role)।

পৌরসভার অধিকাংশ নির্বাহী ক্ষমতা রাজ্য সরকার কর্তৃক নিযুক্ত মিউনিসিপ্যাল কমিশনার বা চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসারের হাতে ন্যস্ত থাকে। পুলিশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ লাইন ডিপার্টমেন্টগুলিও রাজ্য সরকারের নিয়ন্ত্রণেই থাকে। ৭৪তম সংশোধনীতে ১৮টি বিষয় হস্তান্তরের কথা বলা হলেও, বহু রাজ্য সরকার এই ক্ষমতা বা দপ্তর আজও মেয়র বা পৌর সরকারের হাতে পূর্ণাঙ্গভাবে হস্তান্তর করেনি। সংবিধানে ৫ বছর অন্তর পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত করা বাধ্যতামূলক বলা হলেও, এমন বহু পৌরসভা পশ্চিমবঙ্গে আছে যেখানে ১০ বছরের উপর নির্বাচন হয় না।

ভারতীয় পৌর ব্যবস্থা 'শাসনতান্ত্রিক' নয়, বরং 'প্রশাসনিক' কাঠামো - যা রাজ্য সরকারের ইচ্ছা দ্বারা পরিচালিত হয়। ফলে, স্থানীয় সরকারগুলি কার্যকরভাবে স্বাধীনভাবে নীতি প্রণয়ন বা তা বাস্তবায়নে অক্ষম।

শিলিগুড়ির এক 'রেড মেয়র': অসহযোগিতার রাজনীতির এক অভিজ্ঞতা -

শিলিগুড়ির প্রাক্তন মেয়র হিসেবে এই লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এই কাঠামোগত দুর্বলতাগুলিকে মর্মান্তিকভাবে তুলে ধরে। বামপন্থী আদর্শের কারণে আমাকে প্রতি পদে পদে অসহযোগিতা রাজনীতির শিকার হতে হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষতার কারণে পৌর সংস্থাকে জেলাশাসক, পুলিশ কমিশনার, এবং অন্যান্য লাইন ডিপার্টমেন্টের অসহযোগিতার শিকার হতে হয়েছে। এমনকি শারীরিক আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে, যদিও একটি শহরের 'রেড মেয়র' হিসাবে নাগরিকদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সমর্থন সহযোগিতা ও ভালোবাসা পাওয়া গিয়েছিল।

উন্নয়নমূলক প্রকল্পের অর্থের জন্য কেন্দ্র বা রাজ্যের 'দয়া'র উপর নির্ভর করে থাকতে হতো। সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও, রাজ্য সরকারের অনুমোদন ব্যতীত বহু সিদ্ধান্ত কার্যকরী করা সম্ভব হয় না [Query]। মেয়র হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা বলে, প্রতিটি প্রাপ্য অধিকার পেতে আমাকে জনমত সৃষ্টি এবং নাগরিক আন্দোলনের মাধ্যমে চাপ তৈরি করতে হতো। এটি প্রমাণ করে যে ভারতে স্থানীয় সরকারের নির্বাহী ক্ষমতা নেই, বরং এটি রাজ্য-নিয়ন্ত্রিত একটি কাঠামোর মধ্যে রাজনৈতিক সংগ্রামের ক্ষেত্র মাত্র।

নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকে কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক সহায়তা বন্ধ করার হুমকি দেওয়া হলেও, ভারতে এই ধরনের অসহযোগিতা কার্যত একটি প্রথায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে মেয়র যদি রেড মেয়র বা বিরোধী দলভুক্ত হন। মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে নিউ ইয়র্কের নির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি তাঁর কর্মসূচি তুলে ধরেছেন এবং ট্রাম্পকে ফ্যাসিবাদী বলে উল্লেখ করতে দ্বিধাবোধ করেননি।

উপসংহার: সমাজতন্ত্রের জয় নাকি নগর পুঁজিবাদী নীতির প্রত্যাখ্যান?

জোহরান মামদানির নিউ ইয়র্ক সিটি মেয়র পদে বিজয় আমেরিকান রাজনীতিতে এক গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। এটি কেবল একজন বামপন্থী প্রার্থীর বিজয় নয়, বরং নিউ ইয়র্কের মতো বৈশ্বিক পুঁজিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে নব-উদারনৈতিক অর্থনৈতিক মডেলের প্রতি সাধারণ মানুষের গভীর ও ব্যাপক অসন্তোষের প্রতিফলন। এই রাজনীতি বিশ্বজুড়ে তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করছে।

মামদানি রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে পুঁজিবাদের আর্থিক অমানবিকতা এবং বর্ণবাদী বিদ্বেষের রাজনীতিকে দূরে সরিয়ে সামাজিক ও মানবিক রাজনীতিকে সামনে এনেছেন।

নিউ ইয়র্কের মেয়র হিসেবে মামদানির চ্যালেঞ্জ এখন জনসমর্থনকে প্রশাসনিক ও আর্থিক বাস্তবতায় রূপান্তরিত করা। তাঁকে একদিকে বাজেট ঘাটতির মোকাবিলা করতে হবে, অন্যদিকে ধনীদের ওপর কর বৃদ্ধির জন্য রাজ্য সরকার এবং গভর্নর হুচুলের শক্তিশালী রক্ষণশীল প্রতিরোধের মোকাবিলা করতে হবে।

এই তুলনামূলক আলোচনা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা স্পষ্ট হয়: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বামপন্থী রাজনীতি ক্ষমতার মাধ্যমে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে (institutional governance)। তাদের সংগ্রামটি ক্ষমতা প্রয়োগের পথে আসা আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধাগুলির বিরুদ্ধে। অন্যদিকে, ভারতে বামপন্থী স্থানীয় রাজনীতি ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কাঠামোগত দুর্বলতা এবং নির্বাহী ও আর্থিক স্বায়ত্তশাসনের অভাবে ক্রমাগত 'আন্দোলনমুখী' (agitational politics) থাকতে বাধ্য হচ্ছে।

নিউ ইয়র্কের এই পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে নগর রাজনীতিকে একটি নতুন পথ দেখাচ্ছে, যেখানে শক্তিশালী স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন এবং জনগণের ইস্যুভিত্তিক রাজনীতিই পারে পরিবর্তনের হাতিয়ার হতে। ভারতের মতো দেশে, এই বিজয় স্থানীয় গণতন্ত্রের প্রকৃত সাফল্য নিশ্চিত করতে পৌর সংস্থাগুলির পূর্ণ নির্বাহী ও আর্থিক ক্ষমতা অবিলম্বে হস্তান্তরের প্রয়োজনীয়তা পুনর্বার স্মরণ করিয়ে দেয়। মামদানির জনসংযোগ ও প্রচার কৌশল অবশ্যই ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের শহরগুলিতে শিক্ষণীয়।