আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা ● ১-১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ● ১৬-২৯ পৌষ, ১৪৩২

সম্পাদকীয়

আরাবল্লী - উন্নয়নের শিকার


নগরায়নের অংশ হিসেবে নির্মাণক্ষেত্র দেশের অর্থনীতিতে এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। কার্যত এই ক্ষেত্রটি এখন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। নির্মাণক্ষেত্রে খুব জরুরী সিমেন্ট থেকে ইস্পাত, মার্বেল থেকে গ্রানাইট পাথর, কুচি পাথর থেকে বালি সবকিছুই। আর এই সমস্ত কাঁচামাল আসে সরাসরি প্রাকৃতিক সম্পদ থেকেই। ফলে যত বেশি নির্মাণ ক্ষেত্রে দাপট বাড়ছে দেশের অর্থনীতিতে তত বেশি বাড়ছে প্রকৃতির ধ্বংসলীলাও। হাল আমলে জল, জঙ্গল, পাহাড় দখল হয়ে যাচ্ছে লুঠের সম্পদ হিসেবে। আর সেই চার অক্ষরের শব্দ 'উন্নয়ন'-এর মরীচিকার পেছনে ছুটতে ছুটতে আত্মঘাতী লক্ষ্য স্থির করছে দেশের সরকার। ফলে একুশে আইনের মতোই দেশে চালু হতে চলেছে পাহাড়-পর্বতের নতুন সংজ্ঞা। সরকারি ফর্মুলায় এখন থেকে আরাবল্লী অঞ্চলে পাহাড়ের সংজ্ঞায় বিবেচিত হবে স্থানীয় ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০০ মিটারের বেশি উচ্চতার টিলা, ভূমিস্তুপ কিংবা পাহাড়েরা। পাহাড় হিসাবে মান্যতা পেলে সেগুলি সরকারি সংরক্ষণের বিধি-নিষেধের আওতায় পড়বে। কিন্তু আরাবল্লী অঞ্চলের সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী ১০০ মিটারের বেশি উচ্চতার পাহাড়ের পরিমাণ মাত্র ৯ শতাংশ। ফলে ১০০ মিটারের কম উচ্চতার ৯১ শতাংশ পাহাড় সরকারের নতুন নিয়মে সংরক্ষণের আওতার বাইরে চলে যাবে। ফলে আরাবল্লী অঞ্চলের সিংহভাগ পাহাড় ছেঁটে ফেলার ক্ষেত্রে কিংবা ধ্বংস করার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে তেমন কোনো আইনি বাধা থাকবে না। ফলে আরাবল্লী জুড়ে, পাহাড় ফাটিয়ে খাদান কিংবা খনি তৈরির ক্ষেত্রে আর কোনো পরিবেশ সংক্রান্ত কঠোর বিধিনিষেধ থাকবে না। এই আইন কার্যকরী হলে গুজরাতের হিম্মতনগর থেকে শুরু করে রাজস্থান, হরিয়ানা হয়ে দিল্লির গুরুগ্রাম অবধি চার রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা সাঁইত্রিশটা জেলার পরিবেশ এবং বাস্তুতন্ত্র নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠবে।

ফলে এদেশে অবস্থিত পৃথিবীর প্রাচীনতম পাহাড়মালা আরাবল্লীর ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত পরিবেশপ্রেমী থেকে শুরু করে মানবাধিকার রক্ষায় সোচ্চার হওয়া মানুষজনেরা।

দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা পরিবেশ রক্ষার লড়াইকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি আরাবল্লী সংরক্ষণের নামে গোটা আরাবল্লী পাহাড়কে পরিণত করেছে হরির লুটের সম্পদে। কার্যত দেশের নির্মাণ ক্ষেত্রে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারকারী শিল্পপতিদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখতেই আরাবল্লী পাহাড়মালার টিলা-পাহাড়গুলিকে বাজারের বিক্রির পণ্য বানিয়ে ছাড়ছে দেশের সরকার। নির্মাণক্ষেত্রের অন্যতম দামি সামগ্রী, সিমেন্টের কাঁচামালের অন্যতম যোগানদার হয়ে উঠতে পারে আরাবল্লী অঞ্চল। পাশাপাশি বালি, পাথরকুচি থেকে শুরু করে মার্বেল পাথরের মতো লাভজনক ইমারতি পদার্থের ঢালাও জোগান দেশ-বিদেশের বাজারে নিশ্চিত করতে এখন দেশের পাহাড় বিক্রি শুরু হচ্ছে। যেমন টেলিকম পরিষেবার ক্ষেত্রে আকাশ বাতাসের লিজ পেয়ে গেছে আদানি থেকে শুরু করে এয়ারটেল, ভোডাফোনের মতো বড় কর্পোরেট শিল্পগোষ্ঠীগুলি। কার্যত এবার আদানি-আম্বানি-আদিত্য বিড়লাদের মতো বড়ো বড়ো শিল্পপতিদের হাতে পাহাড়ের সম্পদ তুলে দিতে উদ্যত হয়েছে দেশের সরকার।

যে আরাবল্লী পাহাড় লুটের জন্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে, নির্মাণক্ষেত্রের কর্পোরেট গোষ্ঠীদের সন্তুষ্ট করতে, সেই পাহাড়কেই 'উত্তর ভারতের ফুসফুস' বলা হয়। ওই পাহাড় থেকে তৈরি হওয়া চম্বল, কসাবতি, বানস, গাম্ভীরির মতো প্রচুর নদী-নালা বিস্তীর্ণ অঞ্চলের জলসম্পদকে নিয়ন্ত্রণ করে। কেবল নদী দিয়ে বয়ে চলা জল নয় উপরন্তু আরাবল্লী পাহাড়ের শিলাস্তরের উপস্থিতির জন্য বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ভূগর্ভে জল সঞ্চয় সুরক্ষিত থাকে সেই রুক্ষ অঞ্চলে। কিন্তু ভবিষ্যতে আরাবল্লীর নিধন যজ্ঞ চলতে থাকলে উত্তর ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জল সংকটের কবলে পড়তে পারে। বিপন্ন হতে পারে, সেই অঞ্চলের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ। ফলে নিশ্চিহ্ন হতে পারে পাহাড় সংলগ্ন অঞ্চলের প্রাচীন জনপদ। এমনকী দেশের পশ্চিমের থর মরুভূমি ছড়িয়ে পড়তে পারে উত্তর ভারতের বিভিন্ন অংশে যদি আরাবল্লী পাহাড় প্রহরীর মতো মরুঝড়ের ধুলো বালি আটকে রাখতে না পারে। অদূর ভবিষ্যতে দেশের রাজধানী দিল্লিও মরুভূমির গ্রাসে পড়তে পারে আজকের এমন ভয়াবহ পাহাড় ধ্বংসের সিদ্ধান্তে।

পাশাপাশি আরাবল্লী ধ্বংস হলে কিংবা সেই অঞ্চলের পাহাড়ের গড় উচ্চতা কমে গেলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের জলবায়ু পরিবর্তনে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। ইতিমধ্যে গত দু' দশকে দিল্লির উপকণ্ঠে আরাবল্লী পাহাড় সংলগ্ন সবুজ জঙ্গলের পরিমাণ ২০১৩ সালের ২২৯ বর্গকিলোমিটার থেকে ৫০ শতাংশ কমে ২০২৩ সালে হয়েছে ১১৩ বর্গকিলোমিটার। শহরের উপকণ্ঠে সবুজ জঙ্গলের পরিমাণ যখন কমেছে তখন কংক্রিটের জঙ্গল ছেয়ে ফেলেছে শহর। এর ধাক্কায় দিল্লি শহরে বেড়েছে বায়ু দূষণের পরিমাণ। 

পাশাপাশি পাহাড় সংলগ্ন সবুজ ধ্বংস করে নতুন নির্মাণের কারণেও শহরজুড়ে বেড়েছে মিহিদানা (PM-2.5) কিংবা মোটা দানার (PM-10) বায়ু দূষণ। আজ পৃথিবীর দূষণের মানচিত্রে দেশের রাজধানী দিল্লির অবস্থানের অন্যতম কারণ এই বল্গাহীন নগরায়ন। ধারণ ক্ষমতা ছাড়িয়ে বেড়ে ওঠার পরিণতিতে যেমন পরিত্যাক্ত হয়েছে জোশিমঠের মতো জনপদ, ভবিষ্যতে তেমনটা হতে পারে দেশের রাজধানী দিল্লির ক্ষেত্রেও। ভবিষ্যতে রাজধানীর দূষণ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নির্ণায়ক ভূমিকা নেবে আরাবল্লী পাহাড়ের উপস্থিতি কিংবা অনুপস্থিতি যা প্রকৃত অর্থেই ফুসফুসের কাজ করে।

আরাবল্লী ধ্বংসের প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে হিমালয় সন্নিহিত বাস্তুতন্ত্রেও। বিশেষত মরুঝড়ের ধুলোর বিরুদ্ধে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে আরাবল্লী; সেই পাঁচিল ভেঙ্গে গেলে ধূলিকণার চাদরে ঢাকা পড়তে পারে হিমালয়ের উপরে অবস্থিত বহু হিমবাহ। ধূলিকণার দূষণে আক্রান্ত হিমবাহগুলি সূর্যের বাড়তি তাপ শোষণ করার পরিণতিতে দ্রুত গলে যেতে পারে হিমবাহের বরফের স্তুপ। হিমবাহের অকাল গলনে বিঘ্নিত হতে পারে হিমালয় পর্বতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ভুপ্রাকৃতিক ভারসাম্য। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের আবহে উষ্ণায়নের ধাক্কায় উচ্চ হিমালয়ের বাস্তুতন্ত্রে যখন নাজেহাল অবস্থা তখন আরাবল্লী ধ্বংসের প্রভাবে সেই নেতিবাচক পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করবে বলে আশংকা হয়। বিশ্বজোড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে দেশের সরকার দেশ বিদেশের মঞ্চে যখন পরিবেশ রক্ষার শপথ নিচ্ছে তখন দেশের অভ্যন্তরেই যদি সরকারের নীতির বেহাল অবস্থা হয় তা বিশ্বের দরবারে দেশের মাথা হেঁট করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।

বর্ষশেষে স্বস্তির খবর দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫ সুপ্রিম কোর্ট আরাবল্লী সংক্রান্ত নিজের আগের সিদ্ধান্তর উপর আপাতত নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। আরাবল্লী নিধনের প্রক্রিয়ায় এর ফলে সাময়িক বিরতি হলেও ধারাবাহিক ভাবে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়া দরকার। কারণ, একমাত্র গণ বিক্ষোভই আরাবল্লী নিধন প্রক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ করতে পারে।