আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ প্রথম সংখ্যা ● ১-১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ ● ১৬-২৯ পৌষ, ১৪৩২

সম্পাদকীয়

নয়া ভারতের সালতামামি: ঘৃণা যখন রাষ্ট্রনীতি


২০২৫ সালের তামামি করতে গেলে আর কোনো বিভ্রান্তি থাকে না যে এটা কোনো বিচ্ছিন্ন হিংসার বছর নয়, কোনো 'আইন-শৃঙ্খলার অবনতি'-র দুর্ঘটনাও নয়। ২০২৫ ছিল পরিকল্পিতভাবে নির্মিত এক 'নয়া ভারত'-এর বছর যেখানে ঘৃণা আর ব্যতিক্রম নয়, বরং শাসনের পদ্ধতি; যেখানে সহ নাগরিকের প্রতি হিংসা আর বিচ্যুতি নয়, বরং রাজনৈতিক কৌশল। এই রাজনীতির আদর্শগত উৎস আজ আর কোনো গোপন রহস্য নয়। আরএসএস-বিজেপির রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক ধারণা যেখানে ভারত একটি বহুত্ববাদী রাষ্ট্র নয়, বরং একটি 'হিন্দু রাষ্ট্র'; যেখানে নাগরিকত্ব কোনো সাংবিধানিক অধিকার নয়, বরং সাংস্কৃতিক আনুগত্যের ফল। সংবিধান এখানে চূড়ান্ত নয়; 'সংস্কৃতি'ই শেষ কথা। আর সেই সংস্কৃতির সংজ্ঞা নির্ধারণের একচেটিয়া অধিকার থাকে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির হাতে। এই দর্শনে 'অপর' থাকা অপরিহার্য; মুসলিম, খ্রিস্টান, দলিত, আদিবাসী, ভাষাগত সংখ্যালঘু এরা সবাই শর্তসাপেক্ষ নাগরিক।

বছরের শুরুতেই এর ইঙ্গিত মিলেছিল। পাহেলগাঁওয়ের ঘৃণ্য সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের পর যে রাজনৈতিক আবহ তৈরি করা হল, তা ছিল এই দর্শনেরই প্রয়োগ। দায়, নিরাপত্তা ব্যর্থতা, রাষ্ট্রের জবাবদিহি সবকিছুই আড়ালে চলে গেল। সামনে এলো 'ঘুসপেটিয়া', 'অপর', 'দেশদ্রোহী'। এখান থেকেই শুরু হয় গত বছরের দীর্ঘ হিংসার অধ্যায়। জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর গোটা সময় ধরে চলল গণপিটুনি, খুন, গোরু-রক্ষার নামে মানুষ পুড়িয়ে মারা, ধর্মীয় মিছিলের পরে সংখ্যালঘু পাড়ায় আগুন। সবকিছুর মধ্যে একটি সুস্পষ্ট মিল রয়েছে। প্রতিটি ঘটনার আগে ছিল উস্কানিমূলক ভাষ্য। সংগঠিত হিংসা এখানে দুর্ঘটনা নয়; এটি সংকেত যে রাষ্ট্র আদতে কার পক্ষে। ২০২৫ সালের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মোড়টি আসে তখনই, যখন এই ঘৃণার রাজনীতি ধর্মের গণ্ডি ছাড়িয়ে ভাষা ও পরিচয়ের দিকে এগোয়। বাংলায় কথা বলা অপরাধ হয়ে ওঠে। 'বাংলাদেশি' শব্দটি রাষ্ট্রীয় অস্ত্রে পরিণত হয়। দিল্লির বস্তি উচ্ছেদ হয়, গুজরাট ও রাজস্থানে পরিযায়ী শ্রমিকদের ধরপাকড় শুরু হয়, মহারাষ্ট্র ও ওডিশায় মধ্যরাতে পুলিশ হানা দেয়। আধার কার্ড, ভোটার আইডি কিছুই আর প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয় না। মানুষকে থানায় আটকে মারধর করা হয়, কাগজ ছিঁড়ে ফেলা হয়, তারপর সীমান্তে নিয়ে গিয়ে ঠেলে দেওয়া হয়। সরকারি ভাষায় একে বলা হয় 'পুশব্যাক'। বাস্তবে এটি ছিল পুশ-ইন - ভারতীয় নাগরিককে জোর করে অন্য দেশে ছুঁড়ে ফেলা। এই অমানবিকতার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় সীমান্তে যেখানে মানুষকে পে-লোডারে তুলে সীমান্তের ওপারে ফেলে দেওয়া হয়েছে, যেন তারা মানুষ নয়, আবর্জনা। পুলিশ, প্রশাসন, এমনকি সীমান্তরক্ষী বাহিনী পর্যন্ত এই প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে ওঠে। এখানেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে ঘৃণা আর কেবল সমাজে নেই; ঘৃণা আজ প্রশাসনের ভেতর প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ করেছে।

এই 'নয়া ভারত'-এ হিন্দু পরিচয়ও নিরাপদ নয় যদি সে দলিত হয়। গত এক বছরের মধ্যেই নথিভুক্ত হয়েছে শতাধিক জাতিগত নির্যাতনের ঘটনা, উচ্চবর্ণের হাতে দলিত নিগ্রহ, খুন, বাড়ি পোড়ানো। কেরালায় এক দলিত পরিযায়ী শ্রমিককে 'বাংলাদেশি' সন্দেহে পিটিয়ে মারা হয়। উত্তরপ্রদেশে পুলিশের সামনে দলিত যুবককে হত্যা করা হয়। অর্থাৎ হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রে দলিতও তখনই গ্রহণযোগ্য, যতক্ষণ সে প্রশ্ন তোলে না। ডিসেম্বর মাসে এসে এই প্রকল্পের পূর্ণচিত্র স্পষ্ট হয়। বড়দিনের প্রাক্কালে একের পর এক রাজ্যে খ্রিস্টানদের উপাসনালয়, স্কুল, দোকান ভাঙচুর হয়। প্রার্থনাসভা ভেঙে দেওয়া হয়, নারী ও প্রতিবন্ধীকে মারধর করা হয়। বার্তাটি একটাই এই রাষ্ট্রে নিরাপত্তা কোনো অধিকার নয়; এটি আনুগত্যের বিনিময়ে দেওয়া একধরনের পুরস্কার। এই হিংসর প্রধান শিকার কারা? দরিদ্র মানুষ, অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক আর নারী, মূলত দলিত বা জনজাতিভুক্ত। যাদের দৈনিক আয় কয়েকশো টাকার বেশি নয়। মুসলিম, দলিত, বাংলাভাষী পরিযায়ী এই মানুষগুলিই 'অপর', কারণ তারা দুর্বল। আর্থিক ও রাজনৈতিক ভাবে। এই দুর্বলতাকেই রাজনীতি অস্ত্রে পরিণত করেছে আরএসএস-বিজেপি। একই সঙ্গে এই ঘৃণার রাজনীতি সমাজের নিচু তলায় দলিত-মুসলিম বিভাজন তৈরি করে, পারস্পরিক অবিশ্বাস ছড়ায় যা ক্ষমতাসীনদের জন্য সবচেয়ে লাভজনক।

কিন্তু প্রশ্ন হল, বিগত এক বছরে এই জাতীয় ঘটনা উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে কেন। মূলত দুটি কারণ। একদিকে বিজেপির শাসনে ভারতীয় অর্থনীতির বেহাল দশা। উন্নয়নের হাজার ঢাক পেটানোর পরেও আয়ের বৈষম্য, ধনী-অতি ধনীদের সাথে সমাজের বাকি অংশের বেড়ে চলা ফারাক আজ আর চেপে রাখা যাচ্ছে না। ফলে দরকার হয়ে পড়েছে এই সংকটে শ্রেণীর বদলে, রাজনৈতিক অপরকে শত্রু হিসাবে খাড়া করা। বিগত এক দশকে, বিজেপি-আরএসএস-এর প্রচারের রাজনীতি তার সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছে গেছে। এবার দরকার হয়ে পড়েছে আরও উগ্র, আক্রমণাত্মক বিভাজনের।

পাশাপাশি রয়েছে এক গভীর মনস্তাত্বিক কৌশল। উপর্যুপরি এই জাতীয় বিদ্বেষের খবর একসময় তৈরী করে সামাজিক নিস্পৃহতা, যখন মানুষ প্রতিবাদ না করে কেবল ঘটনা না ঘটার সম্ভাবনাতেই তৃপ্ত হয়। আর তখনই সমাজে তৈরী হয় সেই রাজনীতির প্রতি নীরব সমর্থন। যেভাবে আজ দুর্নীতি ভারতীয় শাসনব্যবস্থায় এক অন্তর্নিহিত সত্যে পরিণত হয়েছে, একইভাবে সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত বিদ্বেষেও রাজনীতির অন্তর্নিহিত সত্যে পরিণত হবে। এটাই আরএসএস-এর সামাজিক পুনর্নির্মাণ।

এইখানে এসে বাংলার আসন্ন নির্বাচন শুধু একটি রাজ্য নির্বাচনের প্রশ্ন থাকে না; তা হয়ে ওঠে জাতীয় রাজনীতির এক নির্ণায়ক মুহূর্ত। কারণ আজ বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় নেই, কিন্তু রাজনৈতিক ভাষ্য আজ তারাই নিয়ন্ত্রণ করছে। বিরোধী আসনে থেকেও বিজেপি ঠিক করে দিচ্ছে কী নিয়ে রাজ্যে রাজনীতি হবে। ধর্ম, অনুপ্রবেশ, সাম্প্রদায়িক পরিচয় এইসব প্রশ্ন নির্বাচনের কেন্দ্র দখল করে নিয়েছে। শাসকদল প্রতিক্রিয়ায় ব্যস্ত, বাম শক্তি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে। কিন্তু সামগ্রিক রাজনৈতিক কথাবার্তা ঘুরছে ঘৃণার অক্ষেই। এটি এক গভীর সাংস্কৃতিক স্খলন।

যে বাংলায় এক সময় রুজি-রুটি, শ্রম, ভূমি, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ছিল নির্বাচনের মূল প্রশ্ন, সেই বাংলায় আজ মানুষের জীবিকার প্রশ্ন, মূল্যবৃদ্ধি, কাজের অনিশ্চয়তা পেছনে চলে গেছে। এমনকি যেখানে বামেরা এখনও সংগঠিত উপস্থিতি ধরে রেখেছে, সেখানেও নির্বাচনী রাজনীতির কাঠামো নির্ধারিত হচ্ছে সাম্প্রদায়িক ভাষ্যে।

ফলে আজ নাগরিক সমাজকে সবচেয়ে সতর্ক হতে হবে। আজ স্পষ্ট করে বলা দরকার তৃণমূলের দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার বা প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিরোধিতা করা মানেই বিজেপির রাজনীতিকে বৈধতা দেওয়া নয়। আবার বিজেপির সাম্প্রদায়িক, কর্তৃত্ববাদী প্রকল্পের বিরোধিতা করতে গিয়ে শাসকদলের সব অন্যায়কে আড়াল করাও সমান বিপজ্জনক। এই দুইয়ের মাঝখানে একটি স্পষ্ট, নৈতিক ও গণতান্ত্রিক অবস্থান নেওয়াই আজ একমাত্র সুস্থ পথ। এই অবস্থান কোনো আপস নয়। এটি একটি রাজনৈতিক দায়। কারণ বিজেপির রাজনীতি কোনো একক দলের বিরুদ্ধে নয়। এটি সংবিধান, বহুত্ববাদ এবং নাগরিক অধিকারের বিরুদ্ধে। আর সেই রাজনীতিকে ঠেকাতে হলে, তাকে শাসকদলের দুর্নীতির বিকল্প হিসেবে গ্রহণ না করে, একই সঙ্গে দু'দিককেই প্রশ্ন করার সাহস রাখতে হবে।

২০২৫ আমাদের দেখিয়েছে, ঘৃণার রাজনীতি কত দূর পর্যন্ত যেতে পারে। জনতা থেকে প্রশাসন, রাস্তা থেকে সীমান্ত পর্যন্ত। ২০২৬-এর নির্বাচন তাই শুধু সরকার বদলের প্রশ্ন নয়। এটি ঠিক করবে বাংলা কি 'নয়া ভারত'-এর পরীক্ষাগারে পরিণত হবে, নাকি এখান থেকেই এই রাজনীতির বিরুদ্ধে একটি যুক্তিবাদী, মানবিক ও সাংবিধানিক প্রতিস্পর্ধা গড়ে উঠবে। ইতিহাস একটাই শিক্ষা দেয়, যে সমাজ সময় থাকতে সতর্ক হয় না, তাকে পরে সতর্ক হওয়ার সুযোগ আর দেওয়া হয় না।