আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ অষ্টদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ● ১-১৫ আশ্বিন, ১৪৩৩

প্রবন্ধ

পুঁজির পৃথিবীতে প্রবীণ মানুষ

উৎপল সরকার


প্রবীণ মানুষকে আমরা প্রায়ই 'অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার', 'পরিবারের বটগাছ' কিংবা 'সমাজের সম্পদ' বলে অভিহিত করি। কথাগুলি শুনতে সুন্দর। কিন্তু বাস্তব জীবনের নির্মম হিসাব অনেক সময় এই আবেগময় অভিধাগুলিকে মিথ্যা প্রমাণ করে। কর্মক্ষমতা কমে গেলে, উপার্জনের ক্ষমতা হারালে, শরীর অসুস্থ হলে কিংবা পরিবারের অর্থনৈতিক কাঠামো বদলে গেলে প্রবীণ মানুষটির সামাজিক গুরুত্বও যেন ক্রমশ কমতে থাকে। আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস তাই শুধু প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়; এটি আমাদের সমাজব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং মানবিকতার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলারও একটি সুযোগ।

জাতিসংঘ ১৯৯০ সালে ১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। প্রবীণ নাগরিকদের অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সামাজিক অংশগ্রহণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিই ছিল এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য। কিন্তু আন্তর্জাতিক দিবস ঘোষণা করলেই কি প্রবীণ মানুষের জীবনের সংকট দূর হয়? বরং প্রশ্নটি হওয়া উচিত - কেন এমন একটি দিনের প্রয়োজন হল, যেখানে সমাজকে বিশেষভাবে মনে করিয়ে দিতে হয় যে প্রবীণ মানুষও পূর্ণ মর্যাদার অধিকারী?

মার্কসীয় দৃষ্টিতে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ব্যক্তিগত আবেগের পাশাপাশি উৎপাদনব্যবস্থা ও শ্রেণিসম্পর্কের দিকে তাকাতে হয়। পুঁজিবাদী সমাজে মানুষের মূল্য ক্রমশ তার উৎপাদনক্ষমতা ও বাজারে তার অর্থনৈতিক ভূমিকার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। যে শ্রমিক সারাজীবন কারখানায়, খেতে, নির্মাণক্ষেত্রে, অফিসে, পরিবহণে কিংবা গৃহস্থালির অদৃশ্য শ্রমে নিজের জীবন ও শ্রম ব্যয় করেছেন, অবসরের পর তাঁর সামাজিক পরিচয় যেন অনেকটাই মুছে যায়। অথচ তাঁর শ্রমেই তো সমাজের বর্তমান কাঠামো গড়ে উঠেছে।

একজন বৃদ্ধ শ্রমিকের দিকে তাকানো যাক। চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ বছর তিনি কাজ করেছেন। কখনও ভোরের অন্ধকারে কারখানায় গিয়েছেন, কখনও বৃষ্টির মধ্যে মাঠে দাঁড়িয়েছেন, কখনও শহরের নির্মাণস্থলে ইট-বালি বহন করেছেন। মাসের শেষে সামান্য মজুরি নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। সেই আয়ে সন্তান পড়েছে, সংসার চলেছে, ঘর তৈরি হয়েছে। কিন্তু বার্ধক্যে এসে যখন তাঁর হাঁটু আর আগের মতো চলে না, চোখে ঝাপসা দেখে, তখন সমাজের কাছে তাঁর পরিচয় হয়ে যায় - 'অক্ষম বৃদ্ধ'। তাঁর সারাজীবনের শ্রমের সামাজিক মূল্য যেন একটি পেনশনের অঙ্কে এসে থেমে যায়।

আরও কঠিন বাস্তবতা নিম্নবিত্ত ও অসংগঠিত শ্রমজীবী প্রবীণদের। তাঁদের অনেকেরই নিয়মিত পেনশন নেই, সঞ্চয় নেই, স্বাস্থ্যবিমা নেই। বার্ধক্য তাঁদের কাছে অবসর নয় - বরং কাজ করতে না পারার অপরাধবোধ। শরীর ভেঙে গেলেও কেউ চায়ের দোকানে বসেন, কেউ বাজারে ছোটখাটো কাজ করেন, কেউ রিকশা বা ভ্যান চালানোর চেষ্টা করেন। কারণ ক্ষুধা অবসর বোঝে না।

প্রবীণ মানুষের যন্ত্রণার আরেকটি বড় নাম - একাকিত্ব। যৌথ পরিবার ভেঙে ছোট পরিবার, কর্মসংস্থানের জন্য সন্তানদের দূর শহর বা বিদেশে চলে যাওয়া, দ্রুত বদলে যাওয়া জীবনযাপন - সব মিলিয়ে বহু বৃদ্ধ-বৃদ্ধার বাড়ি আজ মানুষের উপস্থিতির চেয়ে স্মৃতিতে বেশি পূর্ণ। সকালে দরজা খোলে, সন্ধ্যায় বন্ধ হয়; কিন্তু কথা বলার মানুষ থাকে না।

একজন বৃদ্ধা প্রতিদিন বিকেলে বারান্দায় বসে থাকেন। তাঁর স্বামী নেই। ছেলে অন্য শহরে চাকরি করে, মেয়ে সংসারে ব্যস্ত। মোবাইল ফোনে সপ্তাহে দু-একদিন কথা হয়। কিন্তু ফোনের ওপারে কণ্ঠস্বর থাকলেও পাশে বসে জল এগিয়ে দেওয়ার কেউ নেই। তাঁর সবচেয়ে বড় কষ্ট অর্থের অভাব নয় - নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে হওয়া। এই অপ্রয়োজনীয়তার অনুভূতিই বার্ধক্যের গভীরতম সামাজিক নিঃসঙ্গতা।

মার্কসীয় বিশ্লেষণ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ব্যক্তিগত দুঃখের পেছনেও সামাজিক কাঠামো থাকে। প্রবীণের একাকিত্ব শুধু পরিবারের নৈতিক ব্যর্থতা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নগরায়ণ, শ্রমের অনিশ্চয়তা, আবাসনের সংকট, কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘ সময়, সামাজিক নিরাপত্তার দুর্বলতা এবং বাজারকেন্দ্রিক জীবনযাপন। পরিবারকে যতটা সম্ভব দায়িত্ব নিতে হবে, কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্বকে কেবল পরিবারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে সমস্যার কাঠামোগত চরিত্রটি আড়াল হয়ে যায়।
অন্যদিকে প্রবীণ নারী ও প্রবীণ শ্রমজীবী মানুষের সংকট আরও গভীর। সারাজীবন গৃহস্থালির বিনা মজুরির শ্রম করা বহু নারী বার্ধক্যে এসে নিজের নামে সম্পদ, পেনশন কিংবা আর্থিক নিরাপত্তা পান না। তাঁদের শ্রমকে 'কাজ' হিসেবেই গণ্য করা হয়নি। ফলে বার্ধক্য তাঁদের জন্য শুধু শারীরিক দুর্বলতা নয়, অর্থনৈতিক নির্ভরতারও দীর্ঘ ছায়া।

তবু প্রবীণ মানুষ কেবল করুণার পাত্র নন। তাঁরা সংগ্রামেরও সাক্ষী। যে প্রজন্ম দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, শ্রমিক আন্দোলন, সামাজিক পরিবর্তন কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে জীবন কাটিয়েছে, তাদের স্মৃতির মধ্যে একটি সমাজের জীবন্ত ইতিহাস লুকিয়ে থাকে। তাঁদের অভিজ্ঞতা মুছে ফেলা মানে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মুছে ফেলা।

তাই আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য 'বৃদ্ধদের ভালোবাসুন' - এই নীতিবাক্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। প্রশ্ন হওয়া উচিত - কীভাবে এমন একটি সমাজ তৈরি করা যায় যেখানে বার্ধক্য ভয়ের নয়, মর্যাদার সময় হবে? সর্বজনীন ও পর্যাপ্ত পেনশন, বিনামূল্যে বা সুলভ স্বাস্থ্য পরিষেবা, নিরাপদ আবাসন, সামাজিক সুরক্ষা, গণপরিবহণে সুবিধা, মানসিক ও সামাজিক সহায়তা এবং প্রবীণদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ - এসবকে অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
মার্কসের ভাষায় মানুষের মুক্তি কেবল অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তন নয়; মানুষের বহুমাত্রিক মানবিক অস্তিত্বের স্বীকৃতিও তার অংশ। সেই অর্থে প্রবীণ মানুষের মর্যাদা রক্ষা আসলে একটি সমাজ কতটা মানবিক, তারই পরীক্ষা।
যে হাত একদিন আমাদের ঘর তৈরি করেছে, যে চোখ একদিন সন্তানের ভবিষ্যৎ দেখেছে, যে শরীর সারাজীবন শ্রম দিয়েছে - তার বার্ধক্য যেন সমাজের কাছে বোঝা না হয়। প্রবীণ মানুষকে করুণা নয়, অধিকার দিতে হবে; নিঃসঙ্গতা নয়, সামাজিক সঙ্গ দিতে হবে; অবহেলা নয়, মর্যাদা দিতে হবে।

কারণ আজকের প্রবীণরা শুধু অতীত নন। তাঁদের মধ্যেই আমাদের বর্তমানের শ্রমের ইতিহাস এবং আগামী দিনের সমাজের একটি সম্ভাব্য প্রতিচ্ছবি লুকিয়ে আছে। যে সমাজ তার প্রবীণদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেই সমাজ আসলে নিজের ভবিষ্যৎকেই অনিরাপদ করে তোলে।