আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ অষ্টদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ● ১-১৫ আশ্বিন, ১৪৩৩

প্রবন্ধ

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ও লেনিন

নিখিলরঞ্জন গুহ


ভারতের অপরিণত গণতন্ত্রের বিপজ্জনক দিক বলতে পুঁজি নিয়ন্ত্রিত মূলধারা সংবাদ মাধ্যমগুলির অসত্য, কুরুচিকর এবং ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে মানুষের চিন্তন ও মননের উপর দখলদারীর অপচেষ্টাকে বোঝায়। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী দার্শনিক কার্ল মার্কস এবং তাঁর দর্শনের প্রায়োগিক সাফল্যের প্রথম কারিগর, শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির পথপ্রদর্শক, সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা, চিন্তাবিদ মহামতি লেনিনও এই অপপ্রচারের আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। এটাকে নিম্নমেধা বা অজ্ঞানতাজাত ভাবলে ভুল হবে। কারণ পুঁজিবাদের এজেন্ট শাসকদলের ভীতির মধ্যে তার শিকড় নিহিত। বিশ্বে যাদের সৃজনশীলতার পাঠ ও গবেষণা আজও সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে চর্চিত বিষয় তাদের নিয়ে একশ্রেণির চিন্তকদের ঘৃণ্য চক্রান্তের শিকার এই দেশের সাধারণ মানুষ। ইতিহাসের ছাত্র মাত্রই জানেন, ভারতের উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তাদের দর্শন যুবসমাজকে কীভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল। উগ্রহিন্দুত্ববাদীরা এই সত্যকে শুধু যে এড়িয়ে যেতে চান তাই নয় ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বিপ্লবী এবং দেশপ্রেমিকদের লড়াইকে খাটো করার উদ্দেশ্যেই তারা তা ক'রে থাকেন। বলা যায় স্বাধীন ভারতের সাথে সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্রের যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল তার ভিত প্রস্তুত হয়েছিল প্রাকস্বাধীন ভারতে বিপ্লবীদের সাথে লেনিনের সম্পর্ক স্থাপনের মধ্য দিয়ে যেখানে লেনিনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিশ্লেষণ এদেশের শ্রমজীবী মানুষকে জাতীয় আন্দোলনে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনে সাফল্য এনে দিয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় চরিত্রের পরিবর্তন ঘটলেও সেই ধারা আজও বিদ্যমান। ভূরাজনীতিতে এই ভিত এতটাই দৃঢ় যে স্বাধীনতা–উত্তর ভারত যখনই সাম্রাজ্যবাদীদের হুমকির মুখে পড়েছে তখনই ভারত এই দেশটিকে পাশে পেয়েছে। সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর পরেই জাতিসংঘে কোণঠাসা ভারতের পক্ষে কমিউনিস্ট সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাকে যারা অস্বীকার করে তাঁদের আর যাই হোক দেশপ্রেমিক বলা যায় না।

প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখের দাবি রাখে ১৫ আগস্ট ১৯৪৭ ভারত স্বাধীন হলেও আক্ষরিক অর্থে ভারতের দ্বীপসহ জল ও স্থল ভাগ নিয়ে পূর্ণরাষ্ট্রের আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯৬১ সালে। কারণ তখনও গোয়া,দমন, দিউ প্রায় ৪৫০ বছর ধরে পর্তুগিজদের শাসনাধীনে। এই দ্বীপ অঞ্চলেও ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের আন্দোলন সংগঠিত হতে দেখা যায়। জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রভাবে তা তীব্রতা পেতে থাকে। ১৯৪৬ সালের ১৮ জুন ড.রাম মনোহর লোহিয়ার নেতৃত্বে গোয়ায় ঐতিহাসিক নাগরিক অধিকার ও স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু হলে দ্বীপগুলিকে পর্তুগিজদের দখল মুক্ত করার দাবি ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন এই প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুললে পণ্ডিত জহরলাল নেহেরুর নেতৃত্বে ভারতসরকার সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নেয়। ইতিহাস বলছে, ইউরোপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রভাবিত ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য পুর্তগীজ সরকারের পক্ষে তদানীন্তন জন.এফ.কেনেডি কূটনৈতিক পথে সমস্যা সমাধানের পরামর্শ দিলে ভারত সরকার দ্বারা তা প্রত্যাখ্যাত হয়। ফলে ব্রিটেনের নেতৃত্বে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলির চাপে ভারতের বিরুদ্ধে আমেরিকার আনা জাতিসংঘে আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গের অভিযোগ সংখ্যা গরিষ্ঠতার জোরে অনুমোদিত হয় এবং ভারতের বিরুদ্ধে ন্যাটোর যুদ্ধবাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেই কঠিন সময় যে দেশটিকে ভারত পাশে পেয়েছিল সেই দেশটি হল বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ইউ.এস.এস.আর। ভেটো প্রয়োগ সহ সোভিয়েত রাশিয়ার হুমকির মুখে ন্যাটোর পক্ষে সেই অভিযান চালানো সম্ভব হয়নি।

অগত্যা ১৯৬১ সালের ১৯ ডিসেম্বর ভারতীয় সামরিক বাহিনী 'অপারেশন বিজয়'এর কাছে পর্তুগিজ আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হলে আনুষ্ঠানিক ভাবে ভারত সমুদ্র দ্বীপসহ অখন্ড ভারতরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। ভূরাজনীতিতে নেহেরুর জোট নিরপেক্ষ নীতিতেও ভারতের পাশে সর্বদা ইউ.এস.এস.আরকে দেখা গিয়েছে। ১৯৭১ সালের নির্বাচনে পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আওয়ামি লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে মান্যতা দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর না করলে পূর্ব পাকিস্তান নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে এবং মুক্তিসংগ্রামের পথ নিলে ভারত তাদের পাশে দাঁড়া্য়। গণতন্ত্রের মুখোশধারী আমেরিকা অনৈতিকভাবে মুক্তিসংগ্রাম তথা ভারতের বিরুদ্ধে তাঁদের যুদ্ধযান সপ্তম নৌবহর পাঠালে সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্র সেদিনও ভারতের পক্ষ নিয়েছিল। ফলে আমেরিকা তার সপ্তম নৌবহরকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল। প্রকৃতপ্রস্তাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিলেও নেপথ্যে কারিগর ছিল সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মুক্তিকামী মানুষের ভরসা সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্র। এমনকী বর্তমান বিশ্ব-ত্রাস প্রেসিডেন্ট ডোলান্ড ট্রাম্পের হুমকির কাছে আত্মসমর্পিত মোদী সরকারেরও আশ্রয় রাশিয়া।

স্বাধীনতার পরবর্তীতে বিশ্বরাজনীতিতে নানা পরিবর্তন ঘটেছে। ভূরাজনীতিতে ভারতের অবস্থানেরও পরিবর্তন ঘটেছে কিন্তু কমিউনিস্ট সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্র এবং অধুনা রাশিয়ার সাথে ভারতের সম্পর্কের এই পরাম্পরা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তার পেছনের ঐতিহাসিক কারণকে উপেক্ষা করলে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশকেই বাদ দেওয়া হয়। এই প্রশ্নে প্রাসঙ্গিকভাবে বিপ্লবী এম.এন.রায়ের(ছদ্দনাম) নাম চলে আসে যিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর একজন প্রখ্যাত ভারতীয় বিপ্লবী, আন্তর্জাতিক খ্যাত তাত্ত্বিক এবং ভারতের কমিউনিস্ট ও র‍্যাডিক্যাল হিউম্যানিস্ট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। প্রথম জীবনে তিনি বাংলার বিপ্লবী দল যুগান্তরের সাথে যুক্ত হয়ে বাঘাযতীনের সহযোগী হিসেবে বিপ্লবী কাজে অংশ নেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য অস্ত্র সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তিনি জার্মানির সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেন যা 'ইন্দো-জার্মান প্লট' নামে পরিচিত। তখন ছদ্মবেশে তিনি (১৯০৫-১৯১৫) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন। এই সময় মাঃযুক্ত্রাষ্ট্রে থাকাকালীন তিনি সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং মেস্কিকোতে মেক্সিকান কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠায় (১৯১৭) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। যে সকল গেরুয়াপন্থীরা বর্তমানে ভারতপ্রেমের ইজারাপ্রাপ্ত হিসেবে নিজেদের দাবী করেন তারা এই ইতিহাসকে ভয় পান। কারণ সেখানে এম.এন.রায়ের মতো অনেক বিপ্লবী এবং কমিউনিস্টদের নাম পাওয়া যাবে যারা দেশের জন্য তাঁদের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা (১৯২০, তাসখন্দ) এবং কমিন্টার্নে অংশগ্রহণ তার জীবনে উল্লেখযোগ্য ঘটনা। শেষ দিকে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে তাঁর বিছিন্নতা ঘটলেও বলা যায় মুজফফর আহ্মেদ (কাকাবাবু) এবং এম এন রায় ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রধান দুই স্তম্ভ ও পথিকৃৎ।

দেশের মাটিতে মুজফফর আহমদ ছিলেন সেই আন্দোলনের বীজ বপনকারী ও তাকে মহীরুহে পরিণত করার প্রধান কারিগর। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ২০ বছরেরও বেশি সময় কেটেছিল কারগারে। ৮ বছর কেটেছিল আত্মগোপনে। ব্রিটিশ সরকারের বিরোধিতায় কানপুর বলশেভিক ষড়যন্ত্র মামলা (১৯২৪), মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা (১৯২৯-১৯৩৬) অন্তরীন আদেশ অমান্য মামলা (১৯৪০) প্রভৃতিতে তাঁর বন্দিজীবনের বেশি সময় কাটলেও স্বাধীন ভারতেও তাঁকে ১৯৪৮-১৯৫১ এবং ১৯৬২-১৯৬৫ কারারুদ্ধ হতে হয়। কিন্তু কোনও ক্ষেত্রেই আত্মসমর্পণ বা মুচলেখার প্রশ্ন অঠেনি। প্রকৃতপ্রস্তাবে কানপুরে সম্মেলনের (১৯২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর) গঠিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকর্তাদের ইতিহাসও তার ব্যতিক্রম ছিল না। স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত থাকার ফলে তাদেরও যেমন ব্রিটিশদের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছিল তেমনই কারাজীবনও ছিল তাদের জীবনে স্বাভাবিক ঘটনা। একই ভাবে বলা যায় বিপ্লবী ও দার্শনিক এম. এন. রায়েরও জীবনের একটা দীর্ঘ সময় কাটে কারাবাসে। তরুণ বয়সে হাওড়া ষড়যন্ত্র মামলাসহ বিভিন্ন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত থাকায় একাধিকবার গ্রেফতার হলেও উল্লেখযোগ্য হল ১৯৩১ সালে কানপুর বলশেভিক ষড়যন্ত্র মামলার (১৯২৪) প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনা। ব্রিটিশ সরকারের কাছে বিপজ্জনক বিবেচিত হওয়ায় তাঁকে বিভিন্ন কারাগারে স্থান্তরিত হতে হয়। বন্দি জীবনে সরকারের নির্মমতা ফুটে ওঠে তার নয় খন্ডে লেখা 'প্রিজন ম্যানুস্ক্রিপ্টস' বা পাণ্ডুলিপিতে।

পরবর্তীতে নেতৃত্বের মধ্যে সংগ্রাম পরিচালনার পথ ও আন্তর্জাতিক প্রশ্নে মত পার্থক্য ঘটলে কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হলেও তারা মার্কস এবং লেনিনীয় আদর্শচ্যুত হয়েছেন বলা যাবে না এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের তাদের অবদানকেও অস্বীকার করা যায় না। লেনিন ভারত সম্পর্কে কতটা ওয়াকিবহাল ছিলেন তা তাঁর বিভিন্ন লেখা থেকেই স্পষ্ট যা শুধু ভারতীয় বিপ্লবীদেরই উদ্বুদ্ধ করেনি ব্রিটিশদের শোষণের বিরুদ্ধে বিশ্বজনমত গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের লেখা কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ, চিঠি ও নোট এখানে উল্লেখ করা হল যেখানে দেখা যাবে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তাঁর তাত্ত্বিক লড়াইয়ের সাথে তিনি ভারতের শোষিত মানুষ ও শ্রমিকদের আন্দোলনকে কীভাবে সাহায্য ও প্রশংসা করছেন। এই প্রসঙ্গে রুশবিপ্লব সম্পর্কে একজন আপাদমস্তক অহিংস আন্দোলনের প্রবক্তা মহত্মা গান্ধীর মূল্যায়নও বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। তাঁর ভাষায় "যে বিপ্লবের পেছনে আছে অসংখ্য নরনারীর আত্মত্যাগ,যে বিপ্লবের সামনে আছে লেনিনের মত মহান মানুষের আদর্শ সেই বলশেভিক বিপ্লবের শিক্ষা কখনও ব্যর্থ হতে পারে না" (ইয়ং ইন্ডিয়া, ১৫ নভেম্বর, ১৯২৮; পৃষ্ঠা - ৩৮১)

১. লেনিন তাঁর প্রতিষ্ঠিত আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা 'ইস্ক্রা'র বিভিন্ন কলামে ও প্রবন্ধে ১৯০০ সালের শুরুর দিকে ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন সৃষ্ট ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানান।

২. ১৯০৮ সালে 'Inflammable Material in World Politics' শিরনামে তার লেখাকে ভারত প্রসঙ্গে সবচেয়ে বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লেখা হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। ১৯০৮ সালের ২৩ জুলাই 'প্রলেতারি' (Proletary) পত্রিকায় এটা প্রকাশিত হয়। যার বিষয়বস্তু ছিল ব্রিটিশ শাসকরা ভারতের জাতীয়তাবাদী নেতা বাল গঙ্গাধর তিলক-কে ৬ বছরের কারাদণ্ড দিলে, বোম্বাইয়ের (বর্তমান মুম্বই) টেক্সটাইল শ্রমিকদের ঐতিহাসিক ধর্মঘটের ঘটনা। সেখানে লেনিন লেখেন "ভারতে প্রলেতারিয়েতরা (শ্রমিক শ্রেণী) ইতিমধ্যে সচেতন রাজনৈতিক গণসংগ্রামের স্তরে উন্নীত হয়েছে - আর যদি তা-ই হয়, তবে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের দিন ঘনিয়ে এসেছে!"।

৩. Notebooks on Imperialism - 1912-1916। এটি হল লেনিনের বিখ্যাত বই 'ইম্পেরিয়ালিজম, দ্য হায়েস্ট স্টেজ অব ক্যাপিটালিজম' (১৯১৬) রচনার প্রস্তুতিমূলক নোটের সংকলন। মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় লেনিন এই নোটগুলো তৈরি করেন। এখানে লেনিন ভারতের প্রায় ৩০ কোটি মানুষের ওপর ব্রিটিশ আমলাতন্ত্রের লুণ্ঠন, ঔপনিবেশিক অত্যাচার এবং ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের গুরুত্ব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন যা বিশ্ব দরবারের ভারতে ব্রিটিশ শাসনের প্রকৃতি উন্মোচন করতে সাহায্য করে।

৪. To the Indian Revolutionary Association – ১৯২০ এ কাবুলে অবস্থানরত ভারতীয় বিপ্লবীদের পাঠানো একটি বার্তার জবাবে লেনিন এই শুভেচ্ছা বার্তাটি পাঠান। ১৯২০ সালের ১৩ মে লেনিন রেডিওর মাধ্যমে সম্প্রচারের জন্য এটা প্রস্তুত করেন এবং ১৯২০ সালের ২০মে সোভিয়েত পত্রিকা 'প্রাভদা' (Pravda)-য় এটি প্রকাশিত হয়। সেখানে লেনিন ভারতীয় বিপ্লবীদের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান এবং সোভিয়েত রাশিয়ার পক্ষ থেকে পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেন।

৫. Theses on the National and Colonial Questions – 1920। ১৯২০ সালের জুন-জুলাই মাসে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল এর দ্বিতীয় কংগ্রেস উপলক্ষে লেনিন এটি রচনা করেন। ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা এম.এন.রায়ের সাথে তাত্বিক আলোচনায় ভারতের জাতীয় আন্দোলনের চরিত্র এবং ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ভূমিকা নিয়ে তাত্ত্বিক ও কৌশলগত বিরোধ দেখা দেয়। সেখানে এম.এন.রায় যখন জাতীয় আন্দোলনে নেতৃত্ব দানে মহাত্মা গান্ধীর তীব্র সমালোচনা করছেন তখন লেনিন মনে করতেন, ভারতের মতো পরাধীন উপনিবেশগুলিতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সেখানকার জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণী (যেমন: ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং মহাত্মা গান্ধী) একটি প্রগতিশীল ভূমিকা পালন করছে। তাই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সাধারণ লড়াইয়ের স্বার্থে কমিউনিস্টদের উচিত এই "বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক" (Bourgeois-democratic) আন্দোলনগুলিকে সাময়িকভাবে সমর্থন করা। মহান বিপ্লবী হিসেবে লেনিন এই প্রশ্নে এম.এন.রায়ের স্বাধীন চিন্তাকে গুরুত্ব সহকারে নেন। নিজের খসড়ায় "বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক" শব্দের পরিবর্তে "জাতীয়-বিপ্লবী" শব্দটি ব্যবহার করতে সম্মত হন। শেষ পর্যন্ত কমিন্টার্নে লেনিনের মূল তত্ত্বের পাশাপাশি এম.এন.রায়ের 'সম্পূরক থিসিস' (Supplementary Theses)-টিকেও সংশোধনী সাপেক্ষে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় যা এম.এন.রায়কে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট মহলে একজন প্রথম সারির তাত্ত্বিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়। লেনিন সশরীরে ভারতে উপস্থিত না হলেও দেশের বিপ্লবী এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উপর তার প্রভাব ছিল উল্লেখ করার মতো এবং ব্রিটিশদের ঔপনিবেসিক শোষণের বিরুদ্ধে বিশ্বজনমত গঠনেও তার অবদানকে অস্বীকার করা যায় না।জালিওনাবাগের হত্যা(১৯১৯) কাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসনের নিষ্ঠুরতাকে তিনি শুধু কঠর ভাষায় নিন্দাই করেছিলেন এমন নয় বিশ্ববাসীর কাছে তার চেহারাকে তুলে ধরেছিলেন। তাই তথাকথিত মুখোশধারী দেশপ্রেমিকরা যখন মুক্তিসংগ্রামীদের এবং লেনিনকে নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তখন নাগরিক সমাজকে তা ভাবিত করে। প্রকৃতপ্রস্তাবে সশস্ত্র বিপ্লব অথবা জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে স্বাধীনতার আন্দোলনে যারা উৎসর্গকৃত ছিলেন তাঁদের অনেককেই রাজনৈতিক স্বাধীনতার পর শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক স্বাধীনতার লড়াইয়ে উজ্জ্বল ভূমিকা নিতে দেখা গিয়েছে যার উত্তরাধিকার বর্তমান প্রজন্মের মধ্যেও প্রতিভাত হতে দেখা যায়। ইতিহাসের শিক্ষা থেকে এটা স্পষ্ট দেশপ্রেমের প্রশ্নে বামপন্থীদের হীনমন্যতার যেমন কোনও হেতু নেই তেমনই দেশীয় পুঁজিপতিদের এজেন্টদের দেশপ্রেমের নামে দেশ বিরোধিতাকে উন্মোচন করাও জরুরি। কারণ দেশ বলতে শুধু এক খন্ড ভূমিকে বোঝায় না, বোঝায় সার্বভৌম ক্ষমতার আধার জনগণকে এবং যেখানে সংগ্রামের দ্বিতীয় ধাপ দাবি করে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা।

এই প্রসঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের কনিষ্ঠ ভ্রাতা ড.ভুপেন্দ্রনাথ দত্তের নাম উল্লেখের দাবি রাখে। বলা যায় ১৯০২ সালে প্রমথনাথ মিত্র দ্বারা গঠিত বাংলার প্রথম বিপ্লবী সংগঠন 'নিখিল বঙ্গ বৈপ্লবিক সমিতি' (অনুশীলন সমিতি)-তে যোগদান থেকেই তার বিপ্লবী জীবন শুরু। সেখানে তিনি অরবিন্দ ঘোষ, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, ভগিনী নিবেদিতা এবং যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো বিপ্লবীদের সান্নিধ্যে আসেন। ১৮৮০-১৯৬১ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক অগ্রগণী বিপ্লবী হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ ও বহুমুখী। তার সম্পাদনায় বিপ্লবী 'যুগান্তর' পত্রিকায় ব্রিটিশবিরোধী বার্তা ছড়িয়ে পড়তে থাকলে ১৯০৭ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে এবং কারাদণ্ড দেয়। কারামুক্তির পর তিনি বিদেশে চলে যান। ১৯০৮ সালে ভারতের বাইরে বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। ক্যালিফোর্নিয়াতে গদর পার্টি-তে যোগ দেন এবং সমাজতন্ত্র সম্পর্কে পড়াশোনা শুরু করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি জার্মানিতে যান এবং জার্মানির সহায়তায় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের লক্ষ্যে, ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স কমিটি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। ১৯১৬-১৯১৮ তিনি সেই কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯২১ সালে মস্কোয় কমিন্টার্ন সম্মেলনের সময় ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত লেনিনের কাছে সমসাময়িক ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলন নিয়ে একটি গবেষণাপত্র পেশ করেছিলেন। এই সময় লেনিন তাকে ভারতের সাধারণ কৃষক সমাজ ও কৃষক সঙ্ঘগুলোর (Peasant Leagues) বাস্তব পরিস্থিতি এবং পরিসংখ্যান সংগ্রহ করার নির্দেশ দেন এবং সরাসরি কৃষক আন্দোলন ও জনসাধারণের মুক্তির লড়াইয়ে যুক্ত হওয়ার উপর জোর দিতে বলেন। তাঁর লেখা উল্লেখযোগ্য বইগুলি হলো 'ভারতের দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম' এবং 'Swami Vivekananda: Patriot-Prophet'। তাঁর রচিত বাংলা এবং ইংরেজি ভাষাতে ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, রাজনীতি ও নৃতত্ত্ব বিষয়ক বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ সমসাময়িক বৌদ্ধিকজগতে বিশেষভাবে সারা ফেলেছিল।

এটা স্পষ্ট ১৯১৭ সালের নভেম্বর বিপ্লবের আগে ও পরে ভারতীয় যুব সমাজ ও ভারতীয় চিন্তবিদদের উপর কার্লমার্কস ও লেনিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ব্রিটিশ সরকারকে ভাবিয়ে তুলেছিল। তাই বলা যেতে পারে সশস্ত্র বিপ্লব ও জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে তাঁদের ভূমিকাকে অস্বীকার করার অর্থ হল ইতিহাসের বিরুদ্ধচারণ করা।