আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ অষ্টদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ● ১-১৫ আশ্বিন, ১৪৩৩

প্রবন্ধ

দার্জিলিং পাহাড়ের মানুষের প্রয়োজন স্বশাসন

অশোক ভট্টাচার্য


দার্জিলিং পাহাড়ের মানুষের গোর্খা জাতিসত্তার বিকাশের আবেগ দীর্ঘকালের। স্বাধীনতার আগে দার্জিলিং-এর পাহাড়ের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী, সংস্থা, সমিতি দার্জিলিং নিয়ে বিভিন্ন ধরনের দাবি বা প্রস্তাব উত্থাপন করেছিল। স্বাধীনতার আগে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি দার্জিলিং পাহাড় এলাকার জন্য গোর্খাজাতি সত্তার বিকাশের প্রশ্নে আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি তুলেছিল। স্বাধীনতার পর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এই দাবির ভিত্তির একটি রূপ দেয়, দুটি প্রস্তাবের মধ্যদিয়ে। এক, নেপালি ভাষাকে অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্তি; দুই, দার্জিলিং পার্বত্য এলাকার জন্য রাজ্যের মধ্যে আঞ্চলিক স্বশাসন ও সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলে অন্তর্ভুক্তি। এই দুটি প্রস্তাবই কমিউনিস্ট পার্টি রাজ্য পুনর্গঠন কমিশনের কাছে উপস্থাপন করেছিল, যখন রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন ১৯৫৫ সালে দার্জিলিং সফরে এসেছিল। এই দাবির সাথে সহমত পোষণ করেছিল সর্বভারতীয় গোর্খা লীগ দলও। যদিও রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন দুটি প্রস্তাবই প্রত্যাখ্যান করে।

যদিও ১৯৯৩ সালে নেপালি বা গোর্খা ভাষা সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায় এবং অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত হয়। এর জন্য পাহাড় ও সমতলের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংস্থা, বুদ্ধিজীবীরা যৌথবদ্ধভাবে বড় আন্দোলন সংগ্রাম করেছিল। কমিউনিস্ট পার্টি তথা বামপন্থীদের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। পশ্চিমবঙ্গ বামফ্রন্ট সরকার দুটি দাবির সমর্থনেই রাজ্য বিধানসভায় সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল। নেপালী ভাষার দাবি আদায় করা সম্ভব হলেও, ষষ্ঠ তফসিল তথা আঞ্চলিক স্বশাসনের দাবি অধরা থেকে যায়। ১৯৮৫ ও ১৯৮৬ সালে দার্জিলিং-এর তদানীন্তন লোকসভা সদস্য তথা কমিউনিস্ট নেতা আনন্দ পাঠক সংসদে এই দাবিতে দুবার বেসরকারি বিল উত্থাপন করেন। দুবারই সংসদে তা গৃহীত হয়নি।

১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত দার্জিলিং পার্বত্য এলাকায় পৃথক রাজ্য গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে এক হিংসাশ্রয়ী আন্দোলন পরিচালিত হয়। সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন জি এন এল এফ নেতা সুভাষ ঘিসিং। ১৯৮৮ সালের আগস্ট মাসে, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের হস্তক্ষেপে বেশ কয়েকটি ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের পর এক সমঝোতাপত্র বা Memorandum of Settlement স্বাক্ষরিত হয়। এরপর গঠিত হয় রাজ্যের মধ্যে, রাজ্যের আইনে দার্জিলিং গোর্খা পার্বত্য পরিষদ (D.G.H.C.)। যা ছিল এক ঐতিহাসিক ঘটনা।

এই পার্বত্য পরিষদ কার্যকরী ছিল প্রায় ২০ বছর। ২০০৫ সালে সুবাস ঘিসিং আরও উন্নত ক্ষমতাযুক্ত, সংবিধান স্বীকৃত ষষ্ঠ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত, স্বশাসনের দাবি তোলে এবং রাজ্য সরকারের কাছে দাবিপত্র পেশ করে। রাজ্যের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সেই প্রস্তাবের সাথে সহমত পোষণ করেন এবং প্রস্তাবটি কেন্দ্রের তদানীন্তন ইউ.পি.এ সরকারের কাছে পাঠান। কেন্দ্রীয় সরকারও প্রস্তাবটির সাথে সহমত পোষণ করে। এরপর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভায় সর্বসম্মতিক্রমে এই প্রস্তাবের পক্ষে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয় এবং তা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠানো হয়। ২০০৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার এবং তদানীন্তন পার্বত্য পরিষদের প্রশাসক সুবাস ঘিসিং-এর মধ্যে নতুন করে এক ত্রিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ২০০৭ সালে সংসদে ষষ্ঠ ও ১০৭ তম সংবিধান সংশোধনী বিল উত্থাপন করা হয়। এই সময় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন শিবরাজ পাতিল। এই বিলে রাজ্যের মধ্যে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনমূলক গোর্খা পার্বত্য পরিষদ, দার্জিলিং নামে একটি স্বশাসিত পরিষদ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিলটি প্রস্তুত করা হয় ষষ্ঠ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত বোড়োল্যান্ড টেরিটোরিয়াল কাউন্সিলের আদলে। বিলটি পাঠানো হয় সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটিতে যার অধ্যক্ষ ছিলেন বি.জে.পি নেত্রী সাংসদ সুষমা স্বরাজ। স্ট্যান্ডিং কমিটিতে সর্বমোট ৩১ জন সদস্য ছিলেন।

২০০৭ সালে স্ট্যান্ডিং কমিটি সহস্রাধিক ব্যক্তি বা সংস্থার সাথে সাক্ষাৎ করে। তদানীন্তন রাজ্য মন্ত্রিসভার পক্ষ থেকে সাক্ষাৎ করে পৌর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদল। সাক্ষাৎ করে তৎকালীন রাজ্যসভার সাংসদ সমন পাঠক, প্রাক্তন সাংসদ আনন্দ পাঠক, সাংসদ দাওয়া নরবুলা, ডি.জি.এইচ.সি-র প্রশাসক সুবাস ঘিসিং, রাজ্যের তদানীন্তন মুখ্যসচিব সহ আরও অনেকে। স্ট্যান্ডিং কমিটি আগ্রহ প্রকাশ করেছিল দার্জিলিং, শিলিগুড়ি ও কলকাতায় গিয়ে বহু ব্যক্তি ও সংস্থার সাথে সাক্ষাৎ করতে। কিন্তু সেই সময় বিমল গুরুং, রোশন গিরির নেতৃত্বে শুরু হয় এক হিংসাশ্রয়ী আন্দোলন। তারা প্রকাশ্যে হুমকি দেয় সুষমা স্বরাজের নেতৃত্বে স্ট্যান্ডিং কমিটি দার্জিলিং পাহাড়ে এলে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হবে। এই অবস্থায় স্ট্যান্ডিং কমিটি তাদের সফর স্থগিত রাখে। এরপর স্ট্যান্ডিং কমিটির সমস্ত কার্যাবলি স্থগিত হয়ে যায়।

২০০৯ সাল থেকে বি.জে.পি প্রতিটি লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে পাহাড়ের ভোটারদের কাছে পৃথক রাজ্য গোর্খাল্যান্ডের পক্ষে নানাভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত বি.জে.পি প্রতিটি লোকসভা নির্বাচনে দার্জিলিং আসনে জয়লাভ করে আসছিল। কিন্তু দার্জিলিং-এর রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান অধরাই থেকে যায়। পাহাড়ের মানুষ বুঝতে পারে বি.জে.পি তাদের প্রতারণা করছে।

২০২৪ সাল থেকে বি.জে.পি দেয় এক নতুন শ্লোগান, পি পি এস। পাহাড়ের রাজনৈতিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান নাকি তারাই করবে ! ২০২৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকার নিযুক্ত করে পঙ্কজ সিং নামক একজন অবসরপ্রাপ্ত আই.পি.এস আধিকারিককে Interlocuter বা মধ্যস্থকারী হিসেবে। তাঁর কাজ কী হবে, তাও কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়। যদিও কয়েকদিন আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ শিলিগুড়িতে সাংবাদিক সম্মেলনে এক রাজনৈতিক কমিটি গঠনের কথা শোনা যায়। পাহাড়ের মানুষ মনে করে এটিও বি.জে.পি-র আর একটি রাজনৈতিক কৌশল।

ইতিপূর্বে বি.জে.পি রাজবংশী ভাষাকে সংবিধানের ৮ম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার আশ্বাস দিয়ে এবং গ্রেটার কোচবিহারের নামে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল বা ইউ.টি.-র আশ্বাস দিয়ে উত্তরবঙ্গের সমস্ত নির্বাচনগুলিতে তারা জয়লাভ করেছে। মানুষ এখন বুঝতে পারছে যে তারা বি.জে.পি-র দ্বারা প্রতারিত হচ্ছে।

বামপন্থীরা মনে করে দার্জিলিং বা উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী বা জনজাতির মধ্যে জাতিসত্তা বা ভাষাগত বিষয়ে কিছু আবেগ আছে, আছে আকাঙ্ক্ষাও। এই সমস্ত আকাঙ্ক্ষার স্থায়ী ও মর্য্যাদাপূর্ণ সমাধান চায় মানুষ। কিন্তু বি.জে.পি উত্তরবঙ্গের মানুষের এই ন্যায়সঙ্গত আকাঙ্ক্ষা ও আবেগের অপব্যবহার করে করছে এক সংকীর্ণ নির্বাচনী রাজনীতি।

দার্জিলিং পাহাড়ের পরিচিতি সত্তার বা রাজনৈতিক সমস্যার নিরসনের একমাত্র পথ রাজ্যের মধ্যে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলে অন্তর্ভুক্ত স্বশাসন। তার ভিত্তি হতে পারে ১০৭ নং সংবিধান সংশোধনী বিলটির কিছু সংশোধন ও পরিমার্জন। দার্জিলিং জেলার পার্বত্য এলাকায় বি.জে.পি এমন কিছু রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিয়ে চলতে চায় যারা দার্জিলিং-এ হিংসা ও অশান্তি সৃষ্টির জন্য দায়ী। যারা সুভাষ ঘিসিং-এর মত নেতার মরদেহ পাহাড়ে নিয়ে যেতে বাধা দিয়েছে। যারা স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারপারসন সুষমা স্বরাজকে দার্জিলিং পার্বত্য এলাকায় ভ্রমণসূচি হুমকি দিয়ে স্থগিত রাখতে বাধ্য করেছে।

বামপন্থীরা চায় প্রতারণা নয়, দার্জিলিং পাহাড়ের জন্য সর্বোচ্চ স্বশাসন। তা হতে পারে সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিল এবং ৩৭১ নং ধারা ও উপধারার সুবিধা সমূহ। এর জন্য উচিত পাহাড়ের বিভিন্ন স্তরের মানুষের ও সংস্থার মতামত গ্রহণ করা।