আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ অষ্টদশ সংখ্যা ● ১৬-৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ● ১-১৫ আশ্বিন, ১৪৩৩

সম্পাদকীয়

পাখন্ডী


বিজেপি যে আসলে বাংলার মানুষের সংস্কৃতির বিরোধী তা আরও একবার প্রমাণিত হল। বিগত ৪ঠা মের পর থেকে হঠাৎ করেই যেন বাঙালি ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক বোধ এক লহমায় অপাংক্তেয় হয়ে গিয়েছে। মনে হচ্ছে বাঙালি আবার নতুন করে বশ্যতা স্বীকার করেছে। এবার অবশ্য তার দণ্ডমুন্ডের কর্তা কোনও বিদেশী নয়, বরং তারই সহনাগরিক, কিন্তু বাঙালির মনন, কৃষ্টি থেকে বহু যোজন দূরে তার অবস্থান। না, এ কোনও বাঙালির হৃত-গৌরবের রোমন্থন নয়, নিতান্ত কঠিন বর্তমান বাস্তব। কেবল নতুন মধুচন্দ্রিমার আবেগে বাঙালির চোখের ঘোর এখনো কাটেনি। তবে ছ্যাঁকা সে বিলক্ষণ খেয়েছে। তবে সমস্বরে মুখ ফুটে বলতে হৃদয়ে বড় বাজছে।

কিন্তু আর কতদিন? বাগেশ্বরের মহারাজ এসে বাঙালিকে মাছ খাওয়ার অপরাধে 'পাখণ্ডী' বলে গেলেন। যেন মাছের ঝোলে এতদিন ধরে কোনও আমদানি-নির্ভর ধর্মতত্ত্বের অনুমতিপত্র লাগত! বাঙালি অবশ্য মাছ খেতেই থাকে - কারণ তার সংস্কৃতি কোনও সদ্য আবির্ভূত ধর্মীয় দরবারের দাক্ষিণ্যে জন্ম নেয়নি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, যিনি বাঙালির খাদ্যাভ্যাসকে পাপের তকমা দিয়ে গেলেন, তাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়তে আমাদেরই নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ আপত্তি হল না। বরং আবেগে আপ্লুত হয়ে এমন কৃতার্থ হলেন, যেন বঙ্গদেশের ইতিহাসে এতদিন যে অভাবটি ছিল, তা এইমাত্র পূর্ণ হল। অতঃপর ঘোষণা হল ধাম। হ্যাঁ, ধাম! বাঙালির মাটিতে, বাঙালির টাকায়, বাঙালির প্রশাসনের ছত্রছায়ায় - অন্যত্র প্রতিষ্ঠিত এক ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের নামে নতুন তীর্থের মহৎ আয়োজন। সংবিধান, ধর্মনিরপেক্ষতা, রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা - এসব তখন সম্ভবত সভার শেষ সারিতে বসে হাঁ করে দেখছিল। এ দৃশ্যের মধ্যে কৌতুক আছে। আবার কৌতুকের আড়ালে এক গভীর অপমানও আছে। কারণ প্রশ্নটি বাগেশ্বর কে, তা নয়। প্রশ্নটি হল - কেন তাঁকে বাঙালির উপর সাংস্কৃতিক অভিভাবকত্বের আসনে বসাতে হবে?

বাঙালি কাকে প্রণাম করবে, কী খাবে, কী গান গাইবে, কীভাবে উৎসব করবে - এসবের অভিধান কি এখন অন্য কোথাও ছাপা হবে? আজ মাছ পাপ। কাল হয়তো পান্তাভাত সন্দেহজনক। পরশু রবীন্দ্রনাথের কোনও গান অতিরিক্ত 'উদার'। তার পরদিন নজরুলকে নতুন করে দেশপ্রেমের পরীক্ষায় বসানো হবে। আর আমরা দাঁড়িয়ে থাকব - হাত জোড় করে, মাথা নত করে, প্রশাসনিক বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষায়। কী চমৎকার স্বাধীনতা! বাঙালির দুর্ভাগ্য এই যে তাকে পরাজিত করার জন্য কেউ তলোয়ার নিয়ে আসেনি। বরং এসেছে মঞ্চ, মাইক, মালা, ক্যামেরা এবং ক্ষমতার হাসিমুখ। বিজয়ীর বেশে কেউ ঘোষণা করেনি - 'তোমার সংস্কৃতি ভুল।' তার বদলে বলা হয়েছে - 'এটিও তো ভারতীয় সংস্কৃতিরই অংশ।' তারপর অতি ধীরে, অতি ভদ্রভাবে, 'এটিও'-টি হয়ে উঠেছে 'একমাত্র'। এইখানেই বিপদ।

আর বিশ্ববিদ্যালয়? যাদবপুরের দিকে তাকালেই প্রশ্নটি আরও নগ্ন হয়ে ওঠে। যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশ্ন করতে শেখায়, তাকে যদি বারবার সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হয়, তবে আসলে বিশ্ববিদ্যালয়টিকেই ভয় পাওয়া হচ্ছে না - ভয় পাওয়া হচ্ছে প্রশ্ন করার সংস্কৃতিকে। কারণ প্রশ্ন করা বাঙালির বহু পুরনো বদভ্যাস। সে গুরুজনকেও প্রশ্ন করে, দেবতাকেও প্রশ্ন করে, শাসককেও প্রশ্ন করে। এই অপরাধের জন্য তাকে শাসনের বুট দেখানো নতুন কিছু নয়। নতুন শুধু বুটের রং। আর উৎসব? ঈদ বাঙালির নয় - এ কথা বলার মতো নির্বুদ্ধিতা এই বাংলায় কেউ করলে তাকে ইতিহাসের কাছে উত্তর দিতে হবে। দুর্গাপুজোও কেবল কোনও একটি ধর্মীয় আচার নয়; বাঙালির সামাজিক জীবনের এমন এক মহোৎসব, যার সঙ্গে শিল্প, সাহিত্য, অর্থনীতি, পাড়া, পরিবার, স্মৃতি - সবকিছু জড়িয়ে আছে। এই দুই উৎসবকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে যে রাজনীতি আনন্দ পায়, সে বাঙালিকে বোঝে না। কিংবা বুঝেও তাকে অন্য কিছু বানাতে চায়।

এখানে 'গোবলয়' শব্দটি কোনও ভৌগোলিক অঞ্চলের মানুষের বিরুদ্ধে অবজ্ঞা নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক ক্ষমতার প্রকল্পের নাম। সেই প্রকল্পের সমস্যা হিন্দু ধর্ম নয়, উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতিও নয়। সমস্যা তখনই, যখন একটি অঞ্চলের সংস্কৃতিকে সর্বভারতীয়তার একমাত্র বৈধ মাপকাঠি বানিয়ে অন্য সংস্কৃতিগুলিকে ক্রমাগত আত্মপক্ষসমর্থনের আসনে বসানো হয়। বাঙালি ভারতীয় - এ নিয়ে তার কোনও সংশয় নেই। কিন্তু ভারতীয় হওয়ার জন্য তাকে অন্য কারও সাংস্কৃতিক অনুবাদে নিজের পরিচয় লিখতে হবে কেন? বাংলা কি ভারতের সাংস্কৃতিক ছাত্রাবাস, যেখানে কর্তৃপক্ষ ঠিক করবে কোন খাবার শুদ্ধ, কোন উৎসব অনুমোদিত, কোন গান যথেষ্ট দেশপ্রেমিক এবং কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কতটা প্রশ্ন করা চলবে? বাঙালিকে কি তবে নিজের ঘরেই দাঁড়িয়ে প্রমাণ দিতে হবে যে সে যথেষ্ট ভারতীয়? আর যদি তাই হয়, তবে প্রশ্নটি কেবল রাজনৈতিক থাকে না; প্রশ্নটি গিয়ে পড়ে আত্মপরিচয়ের একেবারে মূলে।

এখানেই আসে শেষ প্রশ্নটি - বাঙালির মুক্তি কিসে? সে কি কেবল বাঙালি পরিচয়কে আঁকড়ে ধরতে গিয়ে উগ্র প্রাদেশিকতার কানাগলিতে ঢুকে যাবে, নাকি নিজের পরিচয়কে মর্যাদা দিয়ে একটি সীমানা সে টানবে? নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক স্বাতন্ত্র্যকে মর্যাদা দেওয়া আর অন্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা এক কথা নয়। বরং নিজের পরিচয়কে যথার্থ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেই অন্যের পরিচয়ের প্রতি সম্মান দেখানো সম্ভব। এখানেই লুকিয়ে আছে একটি জাতিসত্তা হিসেবে নিজের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব খুঁজে পাওয়ার রাস্তা। বাঙালির প্রয়োজন এমন এক আত্মপরিচয়, যা কারও বিরুদ্ধে নয়, কিন্তু কারও সামনে আত্মসমর্পণও করে না; এমন এক রাজনৈতিক চেতনা, যা ক্ষমতার প্রসাদের বিনিময়ে নিজের সংস্কৃতিকে বন্ধক রাখে না। কারণ যে মুহূর্তে রাজনৈতিক আনুগত্যের বিনিময়ে নিজের ভাষা, খাদ্য, উৎসব, শিল্প, সাহিত্য ও সামাজিক বোধের সঙ্গে আপস শুরু হয়, সেই মুহূর্ত থেকেই আত্মপরিচয়ের ক্ষয় শুরু হয়। তখন মানুষ আর নিজের মাটির প্রতিনিধি থাকে না; হয়ে ওঠে অন্যের নির্মিত কোনও বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রকল্পের পদাতিক। বাঙালির সামনে তাই আজ সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন ক্ষমতায় কে আছে তা নয় - সে নিজে কে, এবং নিজের পরিচয় নিয়ে সে কতটা দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে প্রস্তুত। সেই উত্তরটিই শেষ পর্যন্ত ঠিক করবে, বাঙালি নিজের মাটিতে নিজের মত করে বাঁচবে, নাকি অন্যের সংজ্ঞায় নিজেকে চিনতে শিখবে।