আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ সপ্তদশ সংখ্যা ● ১-১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ● ১৬-৩১ ভাদ্র, ১৪৩৩
প্রবন্ধ
ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
গৌতম সরকার
এই মুহূর্তে বিশ্ব অর্থনীতি এক দ্বিমুখী গতিশীলতার মধ্যে দিয়ে চলেছে। একদিকে যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার সংকট আর অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত প্রযুক্তির অগ্রগতি, এই দুই বিপরীত শক্তির মধ্যে পড়ে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বেশ কিছু রদবদলের সম্মুখীন হচ্ছে।
সম্প্রতি আই.এম.এফ. প্রকাশিত 'ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক ২০২৬' প্রতিবেদনে চলতি বছরের বৈশ্বিক বার্ষিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে ৩ শতাংশ, ২০২৭ সালে সেটা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে হবে ৩.৪ শতাংশ। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য এই দুই বছরের প্রবৃদ্ধির হার ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের প্রকৃত হারের (৩.৫ শতাংশ) তুলনায় কম। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতে দুনিয়া জুড়ে এই ধীরগতির প্রবৃদ্ধির মূল কারণ হল দুটি: এক, মধ্যপ্রাচ্যে চলতে থাকা যুদ্ধ; আর দুই, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির অগ্রগতি।
যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার মূলে কুঠারাঘাত হেনেছে। যুদ্ধের কারণে একদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথগুলি বন্ধ হয়ে গিয়ে পণ্য পরিবহনের সময় ও খরচ বাড়িয়ে তুলেছে; অন্যদিকে অপরিশোধিত তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং খাদ্যশস্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার কারণে বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতির সংকট দেখা দিচ্ছে। যুদ্ধ সবসময়ই সর্বাত্মক অনিশ্চয়তার জন্ম দেয়, যে কারণে অর্থনীতির আগাম গতিপথ অনুধাবন করতে না পেরে বড় বড় কোম্পানিগুলি নতুন বিনিয়োগে উৎসাহ হারাচ্ছে, ফলস্বরূপ বিশ্বজুড়ে উৎপাদন চক্র ধীরে ধীরে শক্তি হারিয়ে আর্থিক উন্নয়ন মন্থর গতিপ্রাপ্ত হচ্ছে। এর উপর যুদ্ধের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত দেশগুলিতে সম্পদের বেশিরভাগটাই সামরিক অস্ত্রশস্ত্র ও সৈনিকদের রসদ ক্রয় ও অন্যান্য যুদ্ধ সংক্রান্ত কাজে খরচ হয়ে যাওয়ায়, দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন খাতে (বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিকাঠামো উন্নয়ন) সম্পদের অকুলান ঘটছে। এটিও বিশ্ব অর্থনীতির ধীরগতির অন্যতম প্রধান কারণ।
তবে আশার কথা যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি যতটা ধাক্কা খাবে আশঙ্কা করা হয়েছিল বাস্তবে সেই ধাক্কা অনেকটা কাটিয়ে উঠেছে, তার জন্য বিশেষজ্ঞরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি, বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত প্রযুক্তির ব্যবহারকেই কারণ বলে মনে করছেন। পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, প্রত্যাশিত মুদ্রাস্ফীতি এবং সমষ্টিগত অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলির ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সীমিত প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে, এই প্রক্রিয়াটি প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে - বাণিজ্যিক ও কৌশলগত মজুত হ্রাস (destocking) সাময়িকভাবে হয়তো জ্বালানি প্রবাহ হ্রাসের চাপ থেকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে, কিন্তু সরবরাহ শৃঙ্খলের নিম্নগতির চাপ এবং ম্যানুফ্যাকচারিং পারচেজিং ম্যানেজার্স ইনডেক্স (PMI)-এর মতো দূরদর্শী সূচকগুলো আগামীদিনে উন্নয়নের ধীরগতির ইঙ্গিত দিচ্ছে, ফলে কিছু দেশ তুলনামূলকভাবে অন্যদের তুলনায় সংকটে থাকবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
এখনও বাজারে পণ্যদ্রব্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী, তবে যুদ্ধবিরতি এবং ইরান-আমেরিকা সমঝোতা চুক্তি (MOU)-এর কারণে দাম ২০২৬ সালের এপ্রিলের পণ্যমূল্যের সর্বোচ্চ স্তরের প্রেক্ষিতে কিছুটা কমেছে। এর একটি কারণ হল, বাজারে যেসব ঘাটতিকে সাময়িক বলে মনে করা হচ্ছে, সেগুলো মোকাবিলার জন্য মজুত পণ্যের (inventories) ব্যবহার ঘটছে। জ্বালানির দাম যুদ্ধের আগের স্তরের তুলনায় এখনও প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। তেলের বাজারে ভবিষ্যতের দামের তুলনায় বর্তমান দাম বা 'spot price' বেশি। এটি সরবরাহে বিঘ্ন এবং ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি বেশি থাকার কারণে ঘটছে। এই মুহূর্তে তেলের গড় দামসূচক ব্যারেল প্রতি ৭৮ ডলার, যেটি গত এপ্রিলে 'ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক'-এর প্রত্যাশিত ৮২ ডলারের তুলনায় কম, এবং একই সময় প্রতিকূল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে করা ১০০ ডলার পূর্বাভাসের তুলনায় অনেকটাই কম। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে তেল সরবরাহ হ্রাসের ক্ষতিটি আংশিকভাবে মজুত তেল (inventories) ব্যবহারের সাহায্যে পূরণ করা হয়েছে; মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে তেলের ব্যবহার ও উৎপাদন হ্রাসকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম তুলনামূলক ভাবে খুব বেশি বাড়েনি।
আই.এম.এফ. তাদের প্রতিবেদনে জানাচ্ছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রভাব একেক দেশে একেকরকম ভাবে পড়েছে। কোনো দেশ মূল যুদ্ধের সাথে কতটা সম্পৃক্ত এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তির মূল্যশৃঙ্খলে তার অবস্থান কোথায় আছে তার উপর যুদ্ধের প্রভাব কোন দেশে কতটা পড়বে তা নির্ভর করে। যেমন যেসমস্ত দেশে যুদ্ধের আঁচ প্রায় পড়েনি এবং যারা বিশ্ব বাজারে তেল রফতানিকারক তারা অনুকূল বাণিজ্য শর্তের সুবিধা পেয়ে লাভবান হচ্ছে; অন্যদিকে যে সমস্ত দেশে এআই-এর প্রয়োগে প্রযুক্তির বিবর্তন খুব দ্রুতগতিতে ঘটছে, সেই সমস্ত দেশগুলি জ্বালানি আমদানি করা সত্ত্বেও নিজ নিজ আর্থিক পরিকাঠামো ও উন্নয়ন সুনিশ্চিত করতে সমর্থ হয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হল, বিশ্বের যে সমস্ত দেশ জ্বালানি আমদানি করে, একইসাথে বৈশ্বিক প্রযুক্তির মূল্যশৃঙ্খলে অংশগ্রহণ সীমিত, সেই সমস্ত নিম্নআয়ের দেশগুলোতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল হয়ে পড়েছে।
যদিও তেলের বাজারগুলো বিশ্বব্যাপী একে অপরের সাথে যুক্ত এবং সাধারণত ব্রেন্ট (Brent), দুবাই (Dubai) এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (West Texas Intermediate)-এর মতো মূল্যের মাপকাঠিগুলো অনুসরণ করে, তবুও বিভিন্ন দেশ তাদের আমদানির জন্য নিয়মিত ভিন্ন ভিন্ন মূল্য পরিশোধ করে। এই তফাতটি তেলের ধরন, উৎস থেকে ভৌগোলিক দূরত্ব, সরকারি পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করার সক্ষমতা এবং নিষেধাজ্ঞা (sanctions)-এর ওপর নির্ভর করে। এছাড়া কর, ভর্তুকি এবং বাজারের নিয়মনীতির কারণে খুচরা পেট্রোলের দামের ওপর এর প্রভাবের মাত্রাও ভিন্ন হয়।
যুদ্ধ বিধ্বস্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে যখন বিনিয়োগ, উৎপাদন ও বণ্টনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, তখনই এক নতুন সম্ভাবনার আলো উন্নত প্রযুক্তির হাত ধরে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার সংকল্প নিয়ে এগিয়ে এসেছে। অর্থনীতিবিদগণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নিবিড় প্রযুক্তির বিবর্তনকে 'চতুর্থ শিল্প বিপ্লব' আখ্যা দিয়েছেন। এ.আই., অটোমেশন এবং ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের প্রয়োগে উৎপাদন খরচ কমে কাজের গতি অনেকাংশে বেড়ে গেছে। স্মার্ট প্রযুক্তির প্রয়োগে কোম্পানিগুলি কাঁচামাল ও শক্তির খরচ কমিয়ে কম খরচে বেশি উৎপাদনে সক্ষম হচ্ছে। তবে সনাতনী কিছু চাকরি চলে গেছে, পরিবর্তে প্রযুক্তি, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং সাইবার সিকিউরিটি ক্ষেত্রে লক্ষ লক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। আরেকটি বিষয়, প্রযুক্তির ক্রম উন্নয়নের সাহায্য নিয়ে দূরত্বকে জয় করে রিমোট ওয়ার্ক এবং গ্লোবাল ফ্রিল্যান্সিংয়ের বাজার সারা পৃথিবী জুড়ে অর্থের প্রবাহ সচল রাখছে।
একদিকে যুদ্ধ আর অন্যদিকে প্রযুক্তির উদ্যাপন, এর মাঝে পড়ে এই বিশ্ব দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে কিছু দেশ খুব শীঘ্র প্রযুক্তিকে আপন করে নিতে পেরেছে, যেমন - যুক্তরাষ্ট্র ও উন্নত কিছু এশীয় দেশ, তারা অর্থনৈতিক মন্দার অভিশাপ কাটিয়ে প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে গেছে। অন্যদিকে অনুন্নত যুদ্ধকবলিত কিছু দেশ অত্যধিক ঋণ, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং প্রযুক্তি উন্নয়নের সাথে তাল মেলাতে না পারায় তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের শিকার হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রাভান্ডার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, মধ্যপ্রাচ্যে পুনরায় যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে জ্বালানিসহ অন্যান্য পণ্যের দামে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হতে পারে। এতে করে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যাহত হবে, দ্রব্যমূল্য বাড়বে এবং সরকার বাধ্য হয়ে কঠোর আর্থিক নীতির সাহায্য নিতে পারে। তবে আই.এম.এফ. আশ্বাস দিয়েছে, জ্বালানি বাজার স্বাভাবিক স্থিতি ফিরে পাওয়ার কিছুটা সম্ভাবনা তৈরি হলে, প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়লে, কাঠামোগত সংস্কারের সাথে দেশে দেশে মুক্ত বাণিজ্যের আবহ তৈরি হলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার প্রত্যাশার তুলনায় ভালো হবে। তবে ভারতের জন্য খবর খুব একটা উৎসাহব্যঞ্জক নয়। আই.এম.এফ. জানাচ্ছে ২০২৬ সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২.১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২.৩ শতাংশ হলেও, চীন ও ভারতের প্রবৃদ্ধি কিছুটা হলেও কমবে। চীনের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪.৬ শতাংশ, ভারতের ক্ষেত্রে ৬.৪ শতাংশ।
বর্তমান আলোচনা শুরু হয়েছিল এক ধন্দ দিয়ে, যুদ্ধকালীন অস্থিরতা ও প্রযুক্তির বাড়বাড়ন্ত আমাদের কোন উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, সমগ্র আলোচনা ধন্দের দ্বন্দ্ব থেকে বেরিয়ে একটা নির্দিষ্ট উপসংহারে উপনীত হবে সেইরকম কোনও তথ্যপ্রমাণাদি আমাদের হাতে নেই। শুধু এটুকু বলা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত অর্থনীতি একটি শক্তিশালী ইঞ্জিনের মতো বিশ্ব অর্থনীতিকে সামনের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের অভিশাপ ও ভূ-রাজনৈতিক বৈরিতা সেই ইঞ্জিনের গতিশীলতায় ব্রেক কষার চেষ্টা চালাচ্ছে। এই দুইয়ের শক্তির ফারাকই ঠিক করবে আগামীদিনে বিশ্ব অর্থনীতির পথ চলার দিগদর্শন।