আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ সপ্তদশ সংখ্যা ● ১-১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ● ১৬-৩১ ভাদ্র, ১৪৩৩

প্রবন্ধ

নারী স্বাধীনতা ও সমানাধিকার বিরোধী কারা?

নিখিলরঞ্জন গুহ


বহু শ্রূত এবং বহু চর্চিত হলেও দেশের বর্তমান রাজনীতির হালহকিকতের প্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিক ভাবেই হিটলারের নাৎসি জার্মানির মন্ত্রণালয়ের প্রধান প্রচারসচিব পল জোসেফ গোয়েবলসের (Paul Joseph Goebbels) প্রচার নীতিকে স্মরণ করতে হয়, যার মূল কথাই ছিল একটা মিথ্যেকে ধারাবাহিকভাবে বারংবার প্রচার করলে তা মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। বিপরীতে অকথিত সত্যও অনেক সময় তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। বলা যায় ভারতের বর্তমান বিজেপি সরকার এই প্রশ্নে সাফল্যের শীর্ষে অবস্থান করছে। এই দায়িত্ব পালনে মূলধারার সংবাদ মাধ্যমগুলি অনেক এগিয়ে। ঘরে ঘরে দূরদর্শন ও প্রিন্ট মিডিয়ার সৌজন্যে সাধারণ মানুষ এই কৌশলে বিভ্রান্ত। কারণ এই মাধ্যমগুলির প্রচারগুণে সরকারের নীতির সমালোচক মুক্তমনা চিন্তকেরা আজ 'রাষ্ট্র-বিরোধী' বা 'টুকরে টুকরে গ্যাং' হিসেবে প্রতিভাত। নাগরিক সমাজের কাছে সরকার ও রাষ্ট্রকে সমার্থক হিসেবে তুলে ধরতে এই মাধ্যমগুলির তৎপরতা যেমন লক্ষ্য করার মতো তেমনই রাষ্ট্রের সাথে প্রধানমন্ত্রীকে একই আসনে বসানোর নিরবিছিন্ন চেষ্টাতে তাদের কোনও ত্রুটি নেই এবং যার মধ্যে ফ্যাসিবাদের লক্ষণ স্পষ্ট। বিশ্বাস ও প্রচার যখন যুক্তি এবং সত্যকে ছাপিয়ে যায় তখন তা সমাজের হিতের বিপরীতে অনিষ্টের কারণ হয়ে দেখা দিয়ে থাকে। ইতিহাস তখন আর বস্তুনিষ্ঠ থাকে না। বিশ্বাস তার অনুষঙ্গ হয়ে তাকে বিকৃতির আকার দেয়, সত্য চাপা পড়ে।

পশ্চিমবঙ্গের জন্মদিবস পালন তারই একটা উৎকট উদাহরণ যেখানে বর্তমান শাসকদলের আদি দল 'জনসংঘ'-এর প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে প্রধান চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। ইতিহাস কিন্তু সে কথা বলে না। বরং ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় সেখানে একাধিক পার্শ্ব চরিত্রের সাথে তাঁর ভূমিকা থাকলেও মুসলিম লিগের সাথে তাঁর সরকার গঠন, স্বাধীনতা আন্দোলনে (১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনের) বিরোধিতা সহ বিভিন্ন কলঙ্কজনক ঘটনা আজও তাঁকে তাড়া করছে যা গোয়েবলসীয় কায়দায় প্রচার মাধ্যমগুলি ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে ফেলতে সক্রিয়। এমনকী এই উদ্দেশে ভারতের স্বাধীতার ইতিহাস যাকে বাদ দিয়ে অসম্পূর্ণ সেই ঐতিহাসিক চরিত্র বাঙালি তথা সারা দেশের গৌরব দেশনায়ক নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর দেশপ্রেমের ইতিহাসকেও কালীমালিপ্ত করতে দ্বিধা করছে না। বিবেক বিক্রীত সংবাদমাধ্যমগুলি এই প্রশ্নে সদর্থক ভূমিকা নেওয়া থেকে শুধু যে বিরত তাই নয় ব্যবসায়িক স্বার্থে শাসকদলের সাথে রফা করতে ব্যস্ত।

হিন্দুত্বমৌলবাদের প্রবক্তা বিনায়ক দামোদর সাভারকারের ভাবশিষ্য এবং হিন্দুমহাসভার রাজনীতিতে দীক্ষাপ্রাপ্ত যে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ঔপনিবেশিক শাসককে তুষ্টিকরণ নীতি বিপ্লবীদের ও জাতীয় আন্দোলনের সাথে যুক্ত দেশপ্রেমীদের বিরুদ্ধে দমনপীড়নে ব্রিটিশ সরকারকে শুধু সাহায্য করেছিল এমন নয় স্বাধীনোত্তর ভারতেও তার রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি হিন্দু সমাজে পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে কায়েম রাখার প্রশ্নে নারী অধিকারের প্রশ্নেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

বর্তমান ভারতে হিন্দু নারীরা যে অধিকার ভোগ করছেন তা মূলত তৎকালীন ভারতের উদারমনা প্রগতিশীল মানুষের ভাবনাচিন্তার ফল যার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে দেখা যায় পণ্ডিত জহরলাল নেহেরুর নেতৃত্বের দৃঢ়তায় এবং যার ভিত্তি ছিল ড. বি. আর. আম্বেদকর রচিত হিন্দু ব্যক্তিগত আইনের বিল বা খসড়া প্রস্তাব। এই বিলের বিরুদ্ধে তৎকালীন সময়ে যে সকল ব্যক্তিত্বদের ভূমিকা নিতে দেখা গিয়েছিল তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। তবে এটাও ঠিক জাতীয় কংগ্রেসের একটা ক্ষুদ্র রক্ষণশীল অংশও তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন যাঁদের মধ্যে ছিলেন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ ও স্বামী করপাত্রী মহারাজের মতো ব্যক্তিত্বরাও।

উল্লেখ্য বৃটিশ ভারতেও হিন্দু ব্যক্তিগত আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে দেখা যায় যা ১৭৭৩ সালে রচিত হলেও ১৭৭৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংসের উদ্যোগে অ্যাংলো-হিন্দু আইন বা জেন্টু কোড (A Code of Gentoo Laws) চালু হয়। এই আইনে ভারতীয় হিন্দুদের উত্তরাধিকার ও বিবাহ সহ বিভিন্ন বিষয় স্থান পায়। তিনিই প্রথম যিনি ভারতে বিচারব্যবস্থায় হিন্দু ও মুসলিমদের জন্য নিজ নিজ ধর্মীয় বিধিনিষেধকে ব্যবহারের নীতি গ্রহণ করেন। এই উদ্দেশ্যে তাঁকে হিন্দু আইনের জন্য বিভিন্ন শাস্ত্র, প্রথা, রীতিনীতি ও সংস্কার প্রভৃতির এবং মুসলিমদের জন্য সরাসরি কোরআন ও শরীয়তের সাহায্য নিতে হয়েছিল।

মুসলিমদের ক্ষেত্রে দীর্ঘ মুঘল শাসনকালের বিচারব্যবস্থায় প্রচলিত কোরআন এবং শরীয়তের সুসংহত লিখিত গ্রন্থরূপ বর্তমান থাকায় এবং বিচারব্যবস্থার সাথে কাজি ও মৌলবীরা যুক্ত থাকায় তাঁকে তেমন সমস্যায় পড়তে হয়নি। হিন্দুদের ক্ষেত্রে তেমন কোনও কাঠামো না থাকায় তাঁকে শাস্ত্রজ্ঞ হিন্দু পণ্ডিতদের সাহায্য নিতে হয়েছিল। প্রকৃতপ্রস্তাবে দেওয়ানি মামলার নিষ্পত্তির জন্য তাঁর হাত ধরেই ভারতে প্রথম 'অ্যাংলো-হিন্দু আইন'-এর সূচনা ঘটে। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে তার সংস্কারও ঘটেছে।

উল্লেখযোগ্য সংস্কারগুলির মধ্যে উনিশ শতকে দুটি বড় ঘটনা হিন্দুসমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল রাজা রামমোহন রায়ের প্রচেষ্টায় বিশ্বে বীভৎসতম প্রথাগুলির মধ্যে নিকৃষ্টতম প্রথা সতীদাহ নিষিদ্ধকরণের আইন যা ১৮২৯ সালের ৪ ডিসেম্বর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দ্বারা সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা ক'রে নির্দেশ জারি করা হয়। দ্বিতীয়টি হল পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের প্রচেষ্টায় ১৮৫৬ সালের হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন প্রণয়ন সহ বাল্য বিবাহের বিরোধিতা এবং শিক্ষা বিস্তারে তাঁর উদ্যোগ গ্রহণ।

১৯২৮ সালে হিন্দু উত্তরাধিকার সংশোধনী আইন প্রণয়ন হলেও সেখানে মহিলাদের কোনও স্থান ছিল না। তবে তার এক বছর পর ১৯২৯ সালে সেই আইনের সংশোধনে সীমিত আকারে বিশেষ ক্ষেত্রে এই অধিকার দেওয়া হয়। এমন বিবিধ আইন ঔপনিবেশিক শাসনাধীন ভারতে প্রণীত হলেও তাতে নানা অসংগতি বর্তমান থাকায় স্বাধীনতার পরবর্তীতেও বিভিন্ন সময়ে তাতে নানা সংযোজন ও বিয়োজন ঘটে।

তবে স্বাধীন ভারতে পুরুষতান্ত্রিক হিন্দুসমাজে নারীর অধিকারকে সুরক্ষাদানের প্রয়োজনে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা নিতে দেখা যায়, যার ভিত্তি ছিল ভারতের সংবিধান রচয়িতা ড. বি. আর. আম্বেদকর কৃত হিন্দু-ব্যক্তিগত আইনের খসড়া প্রস্তাব। ভারতের বৃহত্তম জনগোষ্ঠী হিন্দুসমাজের প্রায় ৫০% মহিলাদের স্বার্থ এই বিলের সাথে জড়িত থাকলেও তাদের নিরাপত্তা ও অধিকারদানের লক্ষ্যে ড. বি. আর. আম্বেদকর রচিত সেই বিলকে শুধু যে রক্ষণশীলদের আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছিল তাই নয়, জন্মগত কারণকে সামনে রেখে ড. বি. আর. আম্বেদকর মহাশয়কেও ব্যক্তিগতভাবে তীব্র আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছিল।

এই বিলকে আইনি মর্যাদাদানের বিরুদ্ধে যে যে কারণগুলিকে তুলে ধরা হয়েছিল তার সাথে উনবিংশ শতাব্দীতে সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদের বিরুদ্ধে সনাতনী ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ও শাস্ত্রজ্ঞদের উপস্থাপিত কারণগুলির সাথে মৌলিক কোনও পার্থক্য ছিল না। বলা যায় তার উত্তরাধিকার হিসেবেই এই বিলের বিরোধীতায় রক্ষণশীল সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী প্রভাবশালী ব্যক্তিরা প্রায় একই কারণ দেখিয়েছিলেন যার ভিত গ্রথিত ছিল মূলত 'মনুস্মৃতি' নির্ভর ব্রাহ্মণ্যবাদের মধ্যে। যে কারণে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে বিভিন্ন অংশে ভাগ ক'রে সংসদে বিলটিকে উপস্থাপন করতে হয়েছিল। বলা যায় তাঁর দৃঢ় অবস্থানের ফলেই হিন্দু ব্যক্তিগত আইন দুইটি পর্যায়ে ১৯৫৫ এবং ১৯৫৬ সালে আইনে পরিণত হয়।

এই আইনের মূল অঙ্গগুলি হল: হিন্দু বিবাহ আইন ১৯৫৫, যেখানে হিন্দু সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একজন পুরুষের বহুবিবাহ প্রথা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। প্রচলিত প্রথায় একজন পুরুষের একাধিক বিবাহে কোনও বাধা ছিল না এবং সেখানে সংখ্যার প্রশ্নে কোনও বিধিনিষেধ না থাকায় তা ছিল সম্পূর্ণভাবে পুরুষের ইচ্ছাধীন। কুলীন ব্রাহ্মণদের জন্য সেই সংখ্যা কোনও কোনও ক্ষেত্রে একশতকও ছাড়িয়ে যেতে দেখা যেত। সমসাময়িক পত্রপত্রিকায় এমন অনেক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় যেখানে এইসকল নারীদের করুণ অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। নতুন আইনে পুরুষদের একপত্নীক ব্যবস্থাকে বাধ্যতামূলক করা হয়। ১৯৫৬ সালের আইনে নির্যাতিতা হলে বা স্বামী দুশ্চরিত্র হলে অথবা প্রবঞ্চক হলে বিবাহিত স্ত্রী বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার পায় এবং সেই সাথে বিবাহবিছিন্না নারীর ভরণপোষণ পাওয়ার অধিকার আইনি স্বীকৃতি পায়। এই আইনের উল্লেখযোগ্য দিক হল কন্যা সন্তানদের সম্পত্তির উপর পূর্ণ ও আইনগত অধিকার দান।

উল্লেখ্য লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের সতীদাহ প্রথা বিরোধী নির্দেশকে (১৮২৯) বাতিল করার জন্য তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব রাজা রাধাকান্ত দেব ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত 'ধর্মসভা' লন্ডনে প্রিভি কাউন্সিলের সামনে যে কারণগুলিকে দেখিয়ে আবেদন করেছিলেন তার মধ্যে প্রধান দুইটির একটি হল হিন্দুদের ধর্মীয় বিষয়ে কোম্পানির সরকারের অহেতুক ও বেআইনি হস্তক্ষেপ এবং দ্বিতীয়টি ছিল শাস্ত্রীয় প্রথার ঐতিহ্যকে অস্বীকার করা। সেখানে আরও বলা হয়েছিল সতীদাহ প্রথাটি হিন্দু সমাজের দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি পবিত্র ধর্মীয় প্রথা ও বিধবাদের ঐচ্ছিক আত্মত্যাগের অধিকার। কারণগুলিকে অযৌক্তিক বিবেচনা ক'রে প্রিভি কাউন্সিল রাজা রাধাকান্ত দেবের আবেদনকে খারিজ ক'রে দিলে আনুষ্ঠানিক ভাবে ১৮৩২ সালে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ হিসেবে আইনি স্বীকৃতি পায় এবং ভারতীয় হিন্দু নারীরা এক অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তি পান। প্রায় একশো পঁচিশ বছর পর হিন্দু কোড বিল (বা হিন্দু ব্যক্তিগত আইন)-এর বিরোধিতায় হিন্দুমহাসভা, আরএসএস এবং তার প্রধান মুখ ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির নেতৃত্বে রক্ষণশীল সমাজের বিরোধিতার কারণগুলিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে উনিশ শতকের রক্ষণশীল ভাবনাচিন্তা থেকে তারা বেরিয়ে আসতে পারেননি।

স্বাধীন ভারতে যে যুক্তিগুলিকে সামনে রেখে তারা বিরোধিতা ক'রেছিলেন সেগুলি হল; (১) সনাতন ধর্মীয় প্রথাভঙ্গের অভিযোগ (২) যৌথ পরিবার ও বিবাহ ব্যবস্থার ওপর আঘাতের আশঙ্কা (৩) আইনটিকে কেবল একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার বৈষম্যমূলক নীতি।

উল্লেখ্য ভারতের তৎকালীন জনসমষ্টির ৯.৮% সংখ্যালঘু মুসলিমকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার ক'রে ৮৪.১% হিন্দুদের প্রায় ৫০% নারী, যাদের মধ্যযুগীয় পশ্চাদপদ ভাবনার শৃঙ্খলে বন্দী রাখতে চেয়েছিলেন তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের যে মাথারা, সেখানে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা ছিল উল্লেখ করার মতো। বর্তমান ভারতের মোট হিন্দুর সংখ্যা আনুমানিক ১১৫ থেকে ১১৬ কোটির (United Nations Population Fund রিপোর্ট, ২০২৫) মধ্যে প্রায় ৫৮ কোটি নারীর অধিকার আজ অনেকটাই সুরক্ষিত। তবে সামগ্রিকভাবে তারা পুরুতান্ত্রিক ব্যবস্থা থেকে মুক্ত সেই দাবি করা যায় না। বর্তমান রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্ষমতাপ্রাপ্ত রাজনৈতিক দলের আদর্শিক ভিত্তি যেহেতু রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ এবং হিন্দুমহাসভার দর্শন সেইহেতু তার সংকোচনের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিলে ভুল হবে। সাথে এটাও মনে রাখা আবশ্যক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে উত্তর আধুনিক বিশ্বের পরিবর্তনের নিরিখে নারীর অধিকারের প্রশ্নও বিশেষভাবে আলোচিত হওয়ার দাবি রাখে। অধিকারের প্রশ্নে মুসলিম নারীরা পিছিয়ে থাকলে তা দূর করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের এবং সেখানে ধর্মীয় কারণকে সামনে রেখে তার বিরোধিতা করা অর্থ দাঁড়ায় মৌলবাদের কাছে আত্মসমর্পণ। কারণ একজন মুসলিম নারীকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার মধ্যে নারী সমাজের বৈষম্যকেই শুধু তা প্রকট ক'রে তোলে না লালন করে মানুষ হিসেবে নারী সত্তার প্রতি অমানবিক আচরণকেও। এখানে রক্ষণশীল মানসিকতাকে অতিক্রম করাই হল মানবিক দায়িত্ব পালনের প্রাক শর্ত। আধুনিক সভ্যতার আলোকে সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের বিবর্তনের ইতিহাসকে অস্বীকার করার অর্থ যুগের দাবিকে অস্বীকার করা এবং পিছিয়ে পড়া। এই প্রশ্নে ভারতের ব্রহ্মণ্যবাদী রক্ষণশীলদের বিরুদ্ধে ড. বি. আর. আম্বেদকরের ভূমিকা যেমন আমাদের কাছে স্মরণযোগ্য তেমনই চেতনাসমৃদ্ধ ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার প্রাপ্ত ভারতের প্রগতিশীল চিন্তকদের ক্ষেত্রেও তা প্রত্যাশিত। কর্পোরেট পুঁজি নিয়ন্ত্রিত সরকারের পোষ্য সংবাদমাধ্যমগুলি এমন অনেক সত্যকে চাপা দিতে যখন সক্রিয় তখন ইতিহাসই আমাদের আলোর পথ দেখাতে পারে যেখানে তার ভাঁজে ভাঁজে যেমন পিছুটানের অন্ধকার আছে তেমনই আছে সামনে এগিয়ে চলার সাফল্যের ইতিহাস যা নবীন প্রজন্মকে পথ দেখাতে পারে।