আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ সপ্তদশ সংখ্যা ● ১-১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ● ১৬-৩১ ভাদ্র, ১৪৩৩
প্রবন্ধ
সমাজ, প্রথাগত ধ্যানধারণা, বিজ্ঞান ও নারী
সুরত্না দাস
প্রথাগত ধ্যানধারণা আমরা সকলেই কিছু না কিছু বহন করে থাকি, হয়তো বা নিজের অজান্তেই। ইংরেজিতে এইসব ধ্যানধারণাকে বলে stereotypes বা unconcious biases। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এইসকল ধ্যানধারণা আমাদের সমাজই সৃষ্টি করে, আর সেই সমাজে বড় হয়ে উঠতে উঠতে প্রথাগত এই ধ্যানধারণাগুলি আমাদের মননের সাথে একাত্ম হয়ে যায়, যুক্তিতর্ক ছাড়াই তখন আমরা সেই ধ্যানধারণাগুলিকে অমোঘ বলে ধরে নিই। প্রথাগত এই ধ্যানধারণাগুলি মানুষ সৃষ্টি করে জটিল সমাজকে একটি সরলীকৃত রূপ দেওয়ার তাগিদে। সমাজের প্রতিটি মানুষকে জনে জনে বিশ্লেষণ করার চেয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ-ভাষা-পেশা ভেদে সমাজকে ভেঙে ফেলে আর সাথে সাথে প্রতিটি বিভাগের গায়ে তার বৈশিষ্ট্যের কিছু লেবেল সাঁটিয়ে দিতে পারলে এই জটিল সমাজকে বোঝা অনেক সহজ হয়ে যায়। আর এই লেবেলগুলি থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় সমাজ সম্বন্ধে প্রথাগত কিছু ধারণা। কিন্তু এই সরলীকরণ এবং তা থেকে জন্ম নেওয়া এইসব প্রথাগত ধ্যানধারণা যে আদতে সমাজের পক্ষে হানিকারক তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা ও লেখালিখি হয়েছে এবং হচ্ছে, একবিংশ শতকের মানুষ তা সম্বন্ধে ওয়াকিবহালও। তা সত্ত্বেও কোনো মানুষই এইসব ধ্যানধারণা থেকে মুক্ত নয়। তার প্রধান কারণ আমরা সকলেই বেড়ে উঠি সমাজের এই প্রথাগত ধ্যানধারণার মধ্যে, আমাদের বেড়ে ওঠার মধ্যে আমাদের অজান্তেই সমাজের ধ্যানধারণা প্রবেশ করে আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, বাসা বাঁধে আমাদের অবচেতন মনে। তাই এই সমাজকেও আমার দেখি পক্ষপাতদুষ্ট চোখ দিয়ে, প্রথাগত ধ্যানধারণার আতস কাচের মধ্যে দিয়ে। এইসকল ধ্যানধারণা কেবল যে সমাজের অগ্রগতির পরিপন্থী তা নয়, ব্যক্তিবিশেষের পথ চলাকেও তা করে তোলে দুরূহ।
বৈজ্ঞানিক অর্থাৎ বিজ্ঞান সাধনাকে যাঁরা পেশা হিসেবে বেছে নেন, তাঁরাও আমাদের সমাজেরই একটি অংশ। বৈজ্ঞানিকদেরও তাই একটি গোত্রে ফেলে সেই গোত্রের গায়েও কিছু লেবেল সেঁটে দিয়েছে এই সমাজ। বৈজ্ঞানিক বললেই তাই বিশেষ এক 'প্রজাতি'র মানুষের ছবি আমাদের মনের মধ্যে ভেসে ওঠে। বৈজ্ঞানিকের এই ছবিটি "বৈজ্ঞানিক প্রজাতি" সম্বন্ধে আমাদের মনে যেসব ধ্যানধারণা আছে তারই প্রতীক মাত্র। ছবিটা আমাদের প্রায় সকলেরই খুব চেনা। তাও এখন যেহেতু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ, তাই এই লেখাটি লিখতে বসেই আমার ইচ্ছে হলো AI-কে জিজ্ঞেস করে দেখি বৈজ্ঞানিক সম্বন্ধে সমাজে প্রচলিত প্রথাগত ধারণাগুলি কেমন। Google Gemini-তে লিখলাম "stereotypes in science", আর সাথে সাথে উত্তর পেলাম, "Stereotypes in science largely centre on the image of the "mad" or "nerdy" scientist - typically portrayed as an intelligent but socially isolated, middle-aged or elderly white man wearing a lab coat and glasses in a cluttered laboratory." বৈজ্ঞানিকের এই ছবি আমাদের একেবারেই অপরিচিত নয় - একটু পাগলাটে গোছের উস্কখুস্ক চুলের একজনের ছবিই যে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে তা আমরা অস্বীকার করতে পারি না, বেশ খানিকটা যেন 'আইনস্টাইন-আইনস্টাইন' ভাব। কিন্তু একটু তলিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবেন, এই ছবিটি অবশ্যই একটি পুরুষের। বৈজ্ঞানিকের চরিত্রে নারীকে কল্পনা করা আজকের দিনেও বেশ দুষ্কর। এটিই বৈজ্ঞানিক সম্বন্ধে আমাদের প্রথাগত ধারণাগুলির মধ্যে একটি মূল ধারণা - বৈজ্ঞানিক মাত্রই সে পুরুষ। আরও একটু তলিয়ে দেখলে আমরা দেখব কল্পনার এই পুরুষটি শ্বেতাঙ্গ - কৃষ্ণাঙ্গ কোনো পুরুষ কজনেরই বা মানসচক্ষে ভেসে ওঠে বৈজ্ঞানিকের নামে?
বৈজ্ঞানিকদের এই সামাজিক চিত্র শ্বেতাঙ্গ পুরুষ ব্যতিরেকে কেউ বিজ্ঞান সাধনায় উদ্যত হলে তাঁর পথ চলাকে যে কতখানি কঠিন করে তোলে, প্রথমে তারই কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক। কৃষ্ণাঙ্গদের প্রসঙ্গ এই প্রবন্ধে বাদ দিলাম, ভবিষ্যতে কোনোদিন এই নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করার ইচ্ছা রইল। এখানে দেওয়া উদাহরণগুলি সবই নারী-কেন্দ্রিক। উপরন্তু, যেহেতু আমি নিজে পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করি, তাই আমার উদাহরণগুলিও প্রধানত পদার্থবিজ্ঞান-কেন্দ্রিক। এই পক্ষপাতদুষ্টতার জন্য আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার চিত্র হয়তো কিছু আলাদা হবে, তবে এ কথা হলফ করে বলতে পারি সে ফারাক বেশ নগণ্য।
ইতিহাসে নারীর বিজ্ঞানচর্চার নিদর্শন মেলে ২০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকেই। প্রাচীনকালের সেই সব নারীদের মধ্যে চতুর্থ শতকে জ্যোতির্বিজ্ঞান তথা দর্শনশাস্ত্রে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া শহরের হাইপেশিয়ার নাম অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। হাইপেশিয়ার জীবনী অবলম্বনে একটি চলচ্চিত্রও বানানো হয় ২০০৯ সালে, সিনেমাটির নাম আগোরা (Agora)। কিন্তু ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দের আগে বিজ্ঞান ও দর্শনের মধ্যে বিশেষ বিভেদ ছিল না। বলা যেতে পারে ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে বিজ্ঞান দর্শনের থেকে তার নাড়ির টান কাটিয়ে উঠে উনিশ শতকে এসে একটি স্বতন্ত্র বিষয়ের মর্যাদা লাভ করে। 'বৈজ্ঞানিক' শব্দটিও সমাজে এই উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই প্রচলিত হতে শুরু করে। তাই বৈজ্ঞানিকদের নিয়ে সামাজিক ধ্যানধারণাও তৈরি হয় সেই সময় থেকেই। সেই কারণেই, আমি উদাহরণ বেছে নিতে গিয়ে বাদ দিলাম উনিশ শতকের আগের অনেক নারী চরিত্রকেই।
বিজ্ঞানে নারী চরিত্রদের মধ্যে যাঁর নাম প্রথম উঠে আসে তিনি যে নিঃসন্দেহে মাদাম মেরী স্কোদোভস্কা কুরী আশা করি তা নিয়ে কেউই দ্বিমত পোষণ করেন না। শুধু যে বৈজ্ঞানিক হিসেবেই তিনি অনন্য তা নয়, বিভিন্ন পরিসংখ্যানের নিরিখেও তিনি টেক্কা দেন অনেক তাবড় তাবড় পুরুষ বৈজ্ঞানিককে। অবশ্যই তিনি প্রথম মহিলা বৈজ্ঞানিক যিনি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। কিন্তু তিনিই প্রথম বৈজ্ঞানিক, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে, যিনি দুবার নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। আজ পর্যন্ত দুবার নোবেল জয়ের শিরোপা পেয়েছেন মাত্র পাঁচজন - বাকি চারজনই পুরুষ। আর মাদাম কুরীই একমাত্র যিনি বিজ্ঞানের দুটি ভিন্ন শাখায় নোবেল পেয়েছেন, যথাক্রমে পদার্থবিজ্ঞান (১৯০৩) ও রসায়নশাস্ত্রে (১৯১১)। মাদাম কুরী যতোদিন বেঁচে ছিলেন ততোদিন দুবার নোবেল জয়ের গৌরব আর কেউ অর্জন করতে পারেননি।
দ্বিতীয়বার নোবেল পাওয়ার কিছুদিন আগে ১৯১১ সালেই মাদাম 'ফ্রেঞ্চ আকাদেমি অফ্ সায়েন্স'-এর সদস্যপদের জন্য আবেদন জানান। ফ্রেঞ্চ আকাদেমি বৈজ্ঞানিকদের এক মিলনস্থল, যেখানে বিখ্যাত ফরাসি বৈজ্ঞানিকরা মিলিত হয়ে বিজ্ঞানের বিভিন্ন তত্ত্বকথা নিয়ে আলাপআলোচনা তর্কবিতর্ক করে থাকেন। ১৮৫৯ সালে এই ফ্রেঞ্চ আকাদেমির একটি সম্মেলনেই লুই পাস্তুর তাঁর বিখ্যাত জীবাণু নির্বীজকরণের পদ্ধতির কথা জানান। বলাবাহুল্য, ১৯১১ সালে ফরাসি দেশে খ্যাতিতে মাদামের সমতুল্য কেউই ছিলেন না। ফ্রেঞ্চ আকাদেমিতে সদস্যপদ খালি হলে সেই পদের জন্য মাদামের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেন প্রফেসর ব্রানলি, যিনি ছিলেন একজন গোঁড়া ক্যাথলিক। মাদাম হারলেন একটিমাত্র ভোটে, এবং তাঁর সদস্যপদের আবেদন খারিজ হল। কিন্তু পুরুষ-সর্বস্ব ফ্রেঞ্চ আকাদেমি এখানেই থেমে থাকলেন না। মাদামের হার হতেই আরেকটি ভোটের মাধ্যমে তাঁরা পরোয়ানা জারি করলেন যে শুধু মাদাম কেন, কোনো মহিলারই অধিকার নেই ফ্রেঞ্চ আকাদেমির মতো সম্মাননীয় অধিষ্ঠানের সদস্য হওয়ার। দীর্ঘ অর্ধশতক এই নিয়ম চালু ছিল ফরাসি দেশে। মাদামের পরেও ফরাসি দেশের অনেক মহিলা বিজ্ঞানে অগ্রণী ভূমিকা নিলেও, ফ্রেঞ্চ আকাদেমির দরজা তাঁদের জন্য বন্ধই ছিল। এঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য মাদামেরই নোবেলজয়ী কন্যা ইরিন কুরী। ১৯৬২ সালে বৈজ্ঞানিক মারগারিট পেরে ফ্রেঞ্চ আকাদেমির প্রথম মহিলা সদস্য হয়ে যোগ দেন। মজার কথা হলো এই যে মারগারিট ছিলেন মাদামেরই শিষ্যা।
১৯০১ সালে প্রথম নোবেল পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়। তার তিন বছরের মাথাতেই মাদাম কুরী বিজ্ঞানের এই সর্বোচ্চ পুরস্কারে ভূষিত হন। নারীরা যে বিজ্ঞান সাধনায় পুরুষদের থেকে কোনও অংশেই কম নয়, মাদাম কুরীর এই নোবেল জয় তারই প্রতীক। তা সত্ত্বেও নোবেল জয়ের পথ নারীদের জন্য কখনই সুগম হয়ে ওঠেনি। বিজ্ঞানের বাকি শাখার তুলনায় পদার্থবিজ্ঞানে বরাবরই পুরুষের প্রাধান্য বেশি, তাই নোবেল জয়ের ক্ষেত্রে যে পুরুষরাই এগিয়ে থাকবেন তা হয়তো বলাবাহুল্য। কিন্তু কতোখানি? পরিসংখ্যান বলে ১৯০১ সাল থেকে শুরু করে ২০২৫ পর্যন্ত পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছেন মোট ২৩০ জন, তার মধ্যে নারীর সংখ্যা মাত্র ৫। অর্থাৎ মাত্র দুই শতাংশ নোবেল-বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী নারী। এই পরিসংখ্যানের কারণ কি নারীদের শ্রেষ্ঠত্বের শিখরে ওঠার অক্ষমতা? একটি উদাহরণ দিই।
জ্যোতির্বিজ্ঞানে প্রথম নোবেল পুরস্কার পান কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যান্টোনি হিউইশ ও মার্টিন রায়ল। নোবেলটি তাঁরা পেয়েছিলেন একধরণের অদ্ভুত নক্ষত্র আবিষ্কার করার জন্য। সাধারণ কোনও নক্ষত্রের মধ্যে প্রতিনিয়ত ঘটে চলে পারমাণবিক সব ক্রিয়াবিক্রিয়া যার মাধ্যমে সৃষ্টি হয় তাপের, আর সেই তাপ আলো হয়ে নিরন্তর ছড়িয়ে পড়ে চতুর্দিকে - নক্ষত্রের এই ছবির সাথে আমরা প্রায় সকলেই বেশ পরিচিত। আমাদের সূর্যও একটি নক্ষত্র আর তা থেকে আলো বেরিয়ে আসে নিরবচ্ছিন্নভাবে সবদিকে সমানভাবে। তাই দূরবীন দিয়ে কোনো সাধারণ নক্ষত্র দেখলে তাকে সবসময়ই উজ্জ্বল দেখায়। কিন্তু যে নক্ষত্র আবিষ্কারের জন্য হিউইশ ও রায়ল নোবেল পেলেন তা বেশ বিচিত্র ধরণের। সেইসব নক্ষত্রদের থেকে সবদিকে সমানভাবে সবসময় আলো বিচ্ছুরিত হয় না। আলো বের হয় নক্ষত্রের অক্ষরেখা বরাবর দুই বিপরীতপ্রান্তের দুটি আলোকস্তম্ভ থেকে। তাই এই নক্ষত্রদের যখন পর্যবেক্ষণ করা হয় পৃথিবী থেকে তখন ঝলকে ঝলকে আলো এসে পৌঁছোয় পৃথিবীতে। ঠিক যেমন রাতের বেলায় সমুদ্র থেকে লাইটহাউসের মাথায় বসানো আলো লাগে দেখতে - লাইটহাউসের আলোকস্তম্ভ সমুদ্রের দিকে ঘুরলে দেখা যাবে আলো, আর তারপর আলো ঘুরে গেলেই নেমে আসবে অন্ধকার, আবার আলো দেখা যাবে আলোকস্তম্ভ এক পাক ঘুরে সমুদ্রের দিকে ফিরলে, ফলত আলো দেখা যাবে একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর। সেইভাবেই এই নক্ষত্রগুলিকে পর্যবেক্ষণ করার সময় অক্ষরেখার আলোকস্তম্ভ পৃথিবীর দিকে ঘুরলে তবেই মিলবে দূরবীনে সিগনাল আর সিগনাল আসবে কিছু সময় অন্তর অন্তর একটি নির্দিষ্ট স্পন্দনের আকারে।
এই বিচিত্র নক্ষত্রগুলির হদিশ প্রথম পান জসেলিন বেল যিনি ১৯৬৫ সালে গবেষণায় যোগ দেন হিউইশের তত্ত্বাবধানে। গবেষণায় যোগ দিয়েই জসেলিনকে বানাতে হয়েছিল কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন একটি বিশাল প্রান্তরে ছড়িয়ে থাকা উল্টোনো ছাতার মতো দেখতে সারি সারি রেডিও দূরবীন। বাইশ বছরের জসেলিনের ক্ষেত্রে সে কাজ কতটা কঠিন ছিল তার গল্প নাহয় অন্য একদিনের জন্য তুলে রাখলাম। টানা দু'বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে উঠেছিল সেই দূরবীন যার প্রধান কারিগর ছিলেন জসেলিন। দূরবীন যখন চলতে শুরু করল তখন সেই দূরবীন থেকে তথ্য বেরিয়ে আসতে লাগল একটি চার্ট কাগজের ওপর আঁকা হয়ে। প্রতিদিন প্রায় তিরিশ মিটার দীর্ঘ চার্ট কাগজে আঁকা সিগনাল - একবছরের মধ্যেই চার্ট কাগজে ভরে উঠলো একটি পুরো ঘর। সেই ঘরভর্তি চার্ট কাগজ জসেলিনকে বিশ্লেষণ করতে হয়েছিল নিজের হাতে, কম্পিউটারের যুগ তখনো আসেনি।
অত রাশি রাশি সিগনালের মধ্যে জসেলিনের নজর কেড়েছিল একটি অদ্ভুত সিগনাল - যা দেখতে অনেকটা হার্টের ইসিজি রিপোর্টের মতো - একটি সুষম স্পন্দন - প্রতি ১.৩৩ সেকেন্ড ছাড়া ছাড়া একবার - যেন কেউ ১.৩৩ সেকেন্ড ছাড়া ছাড়া একবার করে টর্চ জ্বালছে আর বন্ধ করছে। হিউইশকে জসেলিন গিয়ে জানালেন এই সিগনালের কথা। হিউহিশের কপালে ভাঁজ পড়লো - নক্ষত্র থেকে আলো আসার কথা নিরবচ্ছিন্ন ভাবে, তাতে স্পন্দন থাকবে কেন? কিছুদিনের আলোচনার পর হিউইশ ও রায়ল বদ্ধপরিকর - এই সিগনাল আসলে কোনও ভিনগ্রহী প্রাণীর পাঠানো, আমাদের পৃথিবীকে উদ্দেশ্য করে! ভিনগ্রহে প্রাণের সন্ধান ! হিউইশ ও রায়ল কবে কীভাবে এমন চাঞ্চল্যকর খবর সাংবাদিকদের দেবেন তাই ভাবতে লাগলেন, গালভরা একটা নামও ঠিক করে ফেললেন - লিটল্ গ্রীন ম্যান।
কিন্তু এই লিটল গ্রীন ম্যান তত্ত্বে জসেলিনের মন সায় দিল না। তিনি আবার ফিরে গেলেন সেই ঘর ভর্তি কাগজের মাঝখানে, ভালো করে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন সব সিগনাল। সেই কিলোমিটার-বিস্তৃত চার্ট কাগজ দেখতে দেখতে তাঁর হঠাৎ চোখে পড়ল একইরকম অন্য একটি সিগনাল, কিন্তু সেটি এসেছে আকাশের একদম অন্য একটি প্রান্ত থেকে, এইবার স্পন্দনের হার ১.২ সেকেন্ড। সিগনালটি পেলেন বটে, কিন্তু সেটি বেশ অস্পষ্ট। জসেলিন মাঝরাতেই ছুটে গেলেন তাঁর মানমন্দিরে। তাক করলেন তাঁর দূরবীন আকাশের সেইদিকে যেদিক থেকে সিগনাল আসার কথা - আর সাথে সাথেই চার্ট কাগজে ফুটে উঠলো সিগনাল - বিপ্ বিপ্ বিপ্। কিছুদিনের মধ্যেই এরকম মোট চারটি সিগনাল খুঁজে পেলেন জসেলিন আকাশের বিভিন্ন কোণ থেকে। জসেলিন খারিজ করলেন হিউইশ ও রায়লের লিটল্ গ্রীন ম্যান তত্ত্ব, কারণ আকাশের চারটি ভিন্ন দিক থেকে একই তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সিগনাল একইভাবে পাঠাচ্ছে চারটি আলাদা গ্রহে বসবাসকারী প্রাণীরা, তাও আবার আমাদের পৃথিবীকে তাক করে - এটা কষ্টকল্পনা ছাড়া আর কিছুই না। আবিষ্কার হলো পাল্সার নামের এই নতুন নক্ষত্র। এতখানি পড়ার পর আশা করি পাঠক আমার সাথে একমত হবেন যে জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রথম নোবেল পুরস্কারে অগ্রাধিকার ছিলো জসেলিনেরই। কিন্তু নোবেল কমিটির বিধান ছিল ভিন্ন। তবে ইতিহাস জসেলিনকেই মনে রেখেছে পাল্সারের আবিষ্কর্তা হিসেবে। আজও আন্তর্জালে পাল্সারের আবিষ্কর্তার নাম খুঁজলে জসেলিনের নামই উঠে আসে - হিউইশ ও রায়ল পাল্সার আবিষ্কারের জন্য নোবেল পেলেও সেই গৌরবের ভাগীদার হয়ে উঠতে পারেননি কোনোদিনই।
বিজ্ঞানে নারীর স্বীকৃতির বঞ্চনার কাহিনি অনেক। স্বয়ং মাদাম কুরীকেই নোবেল কমিটি ধর্তব্যের মধ্যেই আনেননি যখন তেজস্ক্রিয়তার জন্য ১৯০৩ সালে বেকেরেল ও পিয়ের কুরীর নাম ঘোষণা করেন তাঁরা। বেকেরেল তেজস্ক্রিয়তার ফলে ঘটা কিছু ঘটনা (যেমন ইউরেনিয়াম লবণের ফটোগ্রাফিক প্লেটে ছাপ ফেলা বা ইউরেনিয়াম লবণের আশেপাশের বাতাস আয়নিত হয়ে যাওয়ার ঘটনা) প্রত্যক্ষ করেছিলেন মাত্র, সেইসব ঘটনার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তিনি দিতে পারেননি। তেজস্ক্রিয়তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেন মাদাম, এবং তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করার জন্য তিনি ব্যবহার করেছিলেন পিয়ের কুরীর বানানো ইলেক্ট্রোমিটার। মাদামের তেজস্ক্রিয়তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ছিলো যুগান্তকারী। তার আগের প্রায় এক শতক ধরে বৈজ্ঞানিকদের ধারণা ছিল যে পদার্থের পরমাণু অবিভাজ্য ও অবিনশ্বর। মাদাম-প্রদত্ত তেজস্ক্রিয়তার তত্ত্ব সেই শতাব্দী-প্রাচীন ধারণাকেই মুছে দিয়েছিল। অথচ মাদামের নামই যখন নোবেলের ঘোষণায় বাদ পড়ল, তখন বাদ সেধেছিলেন পিয়ের কুরী নিজে। পিয়ের জানিয়েছিলেন মাদাম ব্যতীত তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কারের স্বীকৃতি অসম্পূর্ণ। পিয়ের কুরীর মতো স্বনামধন্য বৈজ্ঞানিক বেঁকে বসায় একপ্রকার বাধ্য হয়েই নোবেল কমিটি মাদামের নাম জুড়ে দিয়েছিলেন ১৯০৩ সালের পদার্থবিজ্ঞানের নোবেলে। পিয়ের কুরী সেদিন রুখে না দাঁড়ালে নারীর বিজ্ঞানে স্বীকৃতির পথ আরও দুর্গম হয়ে উঠত।
কৃতিত্বের স্বীকৃতি না পাওয়াটাকেই বিজ্ঞানে নারীর প্রতিকূলতার প্রধান উদাহরণ হিসেবে বেশিরভাগ সময়ই তুলে ধরা হয়। এর প্রধান কারণ হয়তোবা এই যে এক্ষেত্রে পরিসংখ্যান দেওয়া সহজ। কিন্তু বিজ্ঞানীদের কেবল পুরুষ হিসেবে দেখা সমাজে একজন নারীর বিজ্ঞান সাধনার অন্তরায় শুধুই স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হওয়া নয়, এবং সেটা প্রধানও নয়। মূল অন্তরায় কাজ করার ক্ষেত্রেই নারীর উপস্থিতিকে অনধিকার প্রবেশ হিশেবে দেখা - বিজ্ঞানের জগত তো পুরুষদের জন্য, সেখানে নারীর অনুপ্রবেশ যে কতখানি অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে বিজ্ঞানের ইতিহাসে তার উদাহরণও অগুনতি। জসেলিন নিজেই বহু সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে হিউইশ ও রায়ল এমন অনেক মিটিং করতেন যেখানে তাঁরা জসেলিনের কাজ নিয়ে আলোচনা করতেন, অথচ জসেলিনকে ডাকার বা তাঁর মতামত জানতে চাওয়ার প্রয়োজন বোধ করতেন না।
বিজ্ঞানের গবেষণাগারে নারীর উপস্থিতি যে কতখানি অনভিপ্রেত হতে পারে তার সবচেয়ে করুণ উদাহরণ বোধহয় রোসালিন্ড ফ্রাঙ্কলিনের লন্ডনের কিংস কলেজের অভিজ্ঞতা। রোসালিন্ড ফ্রাঙ্কলিনের নাম সর্বসমক্ষে তুলে ধরেন নোবেলজয়ী জেমস ওয়াটসন তাঁর লেখা বিখ্যাত বই 'দ্য ডাবল হেলিক্স'-এ যেখানে তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে খানিক অসৎ উপায়ে পাওয়া রোসালিন্ড ফ্রাঙ্কলিনের এক্স-রে ফটোগ্রাফিক প্লেট (যেটি এখন Photo 51 নামে খ্যাত) ব্যতীত DNA-র দুটো পেঁচানো সিঁড়ির মতো গঠন তাঁরা কোনোদিন অনুধাবন করতে পারতেন না। এরপরে রোসালিন্ড ফ্রাঙ্কলিনের জীবনী নিয়ে বেশ কিছু বইও লেখা হয়, যার মধ্যে সবথেকে উল্লেখযোগ্য বোধহয় ব্রেন্ডা ম্যাডক্সের লেখা 'Rosalind Franklin: The Dark Lady of DNA' বইটি। হঠাৎ রোসালিন্ডকে 'ডার্ক লেডি' বলে সম্বোধন কেন? কারণ হলেন রোসালিন্ডের কিংস কলেজের সহকর্মী মরিস উইল্কিন্স। রোসালিন্ড ও উইল্কিন্স একই সাথে DNA নিয়ে গবেষণায় রত ছিলেন কিংস কলেজে। কিন্তু তাঁরা যে উভয়েই একই বিষয়ে আলদা আলাদাভাবে কাজ করছেন নিজেদের অজান্তেই তার জন্য অবশ্য দায়ী ছিলেন বিভাগীয় প্রধান জন র্যান্ডাল, এবং এই খবর জানাজানি হওয়াতেই রোসালিন্ড ও উইল্কিন্সের সম্বন্ধের অবনতির সূত্রপাত। এ ছাড়াও আরও বেশ কিছু কারণ ছিল। ম্যাডক্সের লেখাতে পাওয়া যায় রোসালিন্ড ছিলেন স্পষ্টবক্তা, বিজ্ঞান ও রাজনীতি নিয়ে অকপট আলোচনা করতে তিনি ভালোবাসতেন, আর অভ্যাসবশতই তিনি কথা বলতেন সামনের মানুষটির চোখে চোখ রেখে। স্পষ্টতই এমন আচরণ 'নারীসুলভ' নয়। অন্যদিকে উইল্কিন্স মুখচোরা, কথা বলেন অনেকটা স্বগতোক্তির ভঙ্গিতে কারোর চোখের দিকে না তাকিয়ে। তাই শুধু পেশাগত রেষারেষিই নয়, চারিত্রিক দিক থেকেও রোসালিন্ড ছিলেন উইল্কিন্সের বিপরীত যা তাঁদের মধ্যের দূরত্ব বৃদ্ধিতে অনুঘটকের কাজ করেছিল। দুজনের মধ্যে বিবাদ ও উইল্কিন্সের নারীবিদ্বেষ এমনই পর্যায়ে পৌঁছোয় যে তিন বছরের মাথাতেই রোসালিন্ড বাধ্য হন কিংস কলেজ ছেড়ে চলে যেতে। আর সেই খবর পেয়েই উইল্কিন্স চিঠি লেখেন কেমব্রিজে তাঁর বন্ধু ফ্রান্সিস ক্রিককে (ওয়াটসন ও ক্রিক তখন DNA-এর তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য দিনরাত এক করছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে) যার দুটি বক্তব্য আমি উদ্ধৃত করলাম: "the dark lady is leaving", এবং "I hope the smell of witchcraft will soon be getting out of our eyes"। "Dark lady" এবং "witchcraft"-এর মতো শব্দবন্ধই কপালে জুটেছিল রোসালিন্ডের কিংস থেকে বিদায় বেলায়। তাই ম্যাডক্সের বইয়ের শিরোনামে "Dark lady" কোনও ভালোবাসার ডাকনাম নয়, ঈর্ষা ও নারীবিদ্বেষেরই প্রতীক। এখানে ছোটো করে বলে রাখি যে উইল্কিন্সই রোসালিন্ডের অগোচরে তাঁর গবেষণাগার থেকে Photo 51 নিয়ে গিয়ে তুলে দিয়েছিলেন ওয়াটসন ও ক্রিকের হাতে - পেশাগত রেষারেষি, ঈর্ষা ও নারীবিদ্বেষের এই কাহিনি বহুচর্চিত।
এতখানি পড়ে পাঠকের হয়তো মনে হতে পারে যে এইসব উদাহরণই বিগত শতকের। নিঃসন্দেহে আজকের চিত্র তার থেকে আলাদা। একবিংশ শতকে নারী অনেক বেশি মুক্ত, তাঁদের উপস্থিতি সর্বক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আর বিজ্ঞানও তার ব্যতিক্রম নয়। তাই একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে বিগত শতকের পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটার প্রয়োজন কী?
একথা অনস্বীকার্য যে নারীর উপস্থিতি বিজ্ঞানের প্রাঙ্গণে আগের থেকে বেশ খানিকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু তাতে করে কি উল্লিখিত অন্তরায়গুলি দূর হয়েছে? বিজ্ঞান সাধনায় নারীর পথ কি আগের থেকে সুগম হয়েছে? সমাজ কি নারীর বৈজ্ঞানিক সত্তাকে সহজে গ্রহণ করতে পেরেছে? প্রথমে নারীর স্বীকৃতির দিকটিই তুলে ধরা যাক। আবার আমি নোবেল পুরস্কারকেই আমার আলোচনার মাপকাঠি ধরে নিচ্ছি। পদার্থবিজ্ঞানে নারীর পাঁচটি নোবেল পুরস্কারের মধ্যে শেষ তিনটি দেওয়া হয়েছে বিগত দশ বছরে (যথাক্রমে ২০১৮, ২০২০ ও ২০২৩ সালে)। সেই নিরিখে বিজ্ঞানে নারীকে মান্যতা দেওয়ার হার অনেকখানিকই যে বৃদ্ধি পেয়েছে এই শতকের শুরুর দিকেই তার ইঙ্গিত আমরা পেতে শুরু করেছি অবশ্যই। কিন্তু আন্তর্জালের দুনিয়ায় অন্য আরেকটি মান্যতা সমাজে বেশ প্রচলিত, তা হল উইকিপিডিয়ায় বিখ্যাত ব্যক্তিদের উল্লেখ করে তাঁদের মান্যতা দেওয়া।
২০১৮ সালে পঞ্চান্ন বছরের খরা কাটিয়ে ডোনা স্ট্রিকল্যান্ড পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পাওয়ার সাথে সাথেই হইচই পড়ে যায় স্বাভাবিক কারণেই। তড়িঘড়ি সবাই জানতে চান ডোনার ব্যাপারে - সহজ উপায় উইকিপিডিয়ায় গিয়ে ডোনার বিষয়ে পড়ে নেওয়া - এটাই এখনকার দস্তুর । কিন্তু নোবেল কমিটির ঘোষণার প্রায় দেড় ঘণ্টা পরও উইকিপিডিয়ায় ডোনা স্ট্রিকল্যান্ডের নামে কোনও পাতাই কেউ খুঁজে পাননি। পরের দিন 'The Guardian' পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবরের মাধ্যমে জানা যায় যে সেই বছরের মার্চ মাসেই একজন উদ্যোগ নেন ডোনা স্ট্রিকল্যান্ডের নামে একটি উইকিপিডিয়া পাতা বানানোর, কিন্তু উইকিপিডিয়া সেটি প্রকাশে অসম্মত হন এই জানিয়ে যে "This submission's references do not show that the subject qualifies for a Wikipedia article" [১]। এখানে "subject" অর্থে ডোনা স্ট্রিকল্যান্ড। সেই সময় উইকিপিডিয়া মনে করেননি ডোনা স্ট্রিকল্যান্ড উইকিপিডিয়ায় উল্লেখ করার মতো কোনও ব্যক্তিত্ব - এমন একজন যিনি ছ'মাস পরেই নোবেলে ভূষিত হবেন! অথচ ডোনার (পুরুষ) সহকর্মী যিনি ডোনার সাথেই নোবেল পুরস্কার ভাগ করে নেন, সেই শেরার মুরুর নাম উইকিপিডিয়াতে উল্লেখ রয়েছে ২০০৫ সাল থেকেই। নোবেল পুরস্কার ঘোষণার দেড় ঘণ্টার মধ্যেই উইকিপিডিয়া তাঁদের ভুল শুধরে নিয়ে তড়িঘড়ি বানিয়ে ফেলেন ডোনা স্ট্রিকল্যান্ডের নামের একটি পাতা।
এ তো গেলো মান্যতা বা স্বীকৃতির কথা। এখনও সমাজ যে নারীর বৈজ্ঞানিক সত্তাকে স্বীকার করতে কুণ্ঠা বোধ করে আমার আগের দেওয়া উদাহরণটি তারই প্রতীক। কিন্তু বিজ্ঞানে নারীর উপস্থিতি বৃদ্ধিতে কি কাজের জায়গায় নারীকে সহজভাবে গ্রহণ করতে পেরেছে বৈজ্ঞানিক সমাজ? আমি দুটি উদাহরণ তুলে ধরব। নোবেল পুরস্কৃত বৈজ্ঞানিক টিম হান্ট ২০১৫ সালে কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত একটি বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে জনসমক্ষে বলেন [২] মেয়েরা ল্যাবরেটরিতে শুধুই কাজের বিঘ্ন ঘটায়। কারণ হিসেবে তিনি বলেন যে ল্যাবরেটরিতে মেয়েরা থাকলে "তুমি তাদের প্রেমে পড়বে, সে তোমার প্রেমে পড়বে, আর একটু বকাঝকা করলেই তারা কাঁদতে বসবে"। তাই মেয়েরা কাজের বিঘ্ন ঘটানো ছাড়া আর কিছুই করে না। ২০১৮ সালে সুইৎজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আরেকটি বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে পদার্থবিদ আলেসান্দ্রো স্ত্রুমিয়া জনসমক্ষে বলেন যে "পদার্থবিজ্ঞান পুরুষরাই আবিষ্কার করেছেন, আর তাঁরাই তা গড়েও তুলেছেন" [৩]। সাথে আরও বলেন যে লিঙ্গবৈষম্যের অছিলায় এখন পুরুষদের তাঁদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এগুলি কেবল কয়েকটি বিছিন্ন ঘটনা নয়, এটি বৈজ্ঞানিক মহলে নারীদের নিয়ে মনোভাবের প্রতিফলন মাত্র। তাই নতুন শতাব্দীতে পা দিয়েও মেয়েদের বিজ্ঞান সাধনার পথ যে খুব সুগম হয়েছে তা বলার দিন এখনও যে আসেনি তা বলাবাহুল্য।
এখন পর্যন্ত আমি যে উদাহরণগুলি তুলে ধরলাম তা সবই পশ্চিমী দুনিয়ার। আমাদের ভারতবর্ষের ছবিটা কেমন? সত্যি কথা বলতে এই বিষয় নিয়ে একটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রবন্ধের অবতারণা করা যায়। কিন্তু এখন খালি সিনেমার ট্রেলার দেখানোর মতো করে আমি দুটি উদাহরণ তুলে ধরব, আর আশা করব পাঠক আমাদের দেশের বিজ্ঞান মহলের পরিস্থিতিটা তাতে কিছুটা আঁচ করতে পারবেন। ভারতবর্ষে পদার্থবিজ্ঞানে সবচেয়ে নামকরা প্রতিষ্ঠান মুম্বাই শহরের টাটা ইন্সটিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ, সংক্ষেপে TIFR। এই সংস্থারও সবচেয়ে কুলীন বিভাগটি হলো তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ। TIFR ১৯৪৫ সালে স্থাপন করেন ভারতের স্বনামধন্য বৈজ্ঞানিক হোমি জাহাঙ্গীর ভাবা। সেই ১৯৪৫ সাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত, অর্থাৎ দীর্ঘ আশি বছরের ইতিহাসে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে মাত্র একজন মহিলা পদার্থবিদ অধ্যাপকের আসনে আসীন হতে পেরেছেন, তিনি হলেন অধ্যাপিকা নন্দিনী ত্রিবেদী, যিনি মাত্র এক দশক TIFR-এ কাজ করে ২০১০ সালে মার্কিন দেশে পাড়ি দেন। দ্বিতীয় উদাহরণটি দিই নারীদের বিজ্ঞানে স্বীকৃতি প্রসঙ্গে। ভারতবর্ষে বিজ্ঞানের সর্বোচ্চ পুরস্কারটির নাম 'শান্তি স্বরূপ ভাটনাগর পুরস্কার' যা ১৯৫৮ সাল থেকে প্রতি বছর দেওয়া হয়ে থাকে। হালে এই পুরস্কারটির নামান্তর ঘটিয়ে 'বিজ্ঞান যুবা পুরস্কার' হিসেবে দেওয়া শুরু হয়েছে। আজ পর্যন্ত পদার্থবিজ্ঞানে এই সম্মান পেয়েছেন মাত্র একজন মহিলা বৈজ্ঞানিক, এলাহাবাদের, থুড়ি প্রয়াগরাজের হরিশ্চন্দ্র রিসার্চ ইন্সটিটিউটের অধ্যাপিকা অদিতি দে। তিনি পুরস্কারটি পান ২০১৮ সালে।
প্রশ্ন করা যেতে পারে বিজ্ঞানে নারীর প্রয়োজনীয়তা কী? পুরুষদের হাতে রাশ ছেড়ে দিলে ক্ষতি কী? সমাজ যখন পুরুষকেই বিজ্ঞানের কাণ্ডারী হিসেবে মেনে নিয়েছে তার পিছনে নিশ্চয়ই কোনও কারণ আছে। কিন্তু বৈজ্ঞানিকদের এই সামাজিক চিত্র যে কতখানি ভঙ্গুর তা বারবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন নারীরাই। বিজ্ঞান সাধনায় নারীরা যে কোনওদিনই পুরুষদের থেকে পিছিয়ে ছিলেন না তার উদাহরণ দিতে বসলে এ লেখা শেষ হবে না। বরং বিজ্ঞানে প্রচলিত অন্যান্য সামাজিক ধ্যানধারণা নারীরা কীভাবে নিজেদের কাজের মাধ্যমেই ভেঙেছেন তার দুটি উদাহরণ দিই।
বৈজ্ঞানিক মহলে একটি ধারণা খুব সুপ্রতিষ্ঠিত - মনে করা হয় যে বৈজ্ঞানিকরা ৩৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সের মধ্যেই তাঁদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কাজটি করে থাকেন, এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে তাঁদের নতুন কিছু আবিষ্কারের ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পায়। ব্যতিক্রম লিসা মাইটনার এবং অটো হান। ১৯৩৮ সালে বৈজ্ঞানিক অটো হান একটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দেখতে পান যে ইউরেনিয়াম পরমাণুতে নিউট্রন দিয়ে আঘাত করলে বেরিয়ামের পরমাণু পাওয়া যায়। অটো হান তাঁর পরীক্ষার ফলাফল জানান তাঁর সহকর্মী লিসা মাইটনারকে। লিসা এই পরীক্ষার ফলাফলের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেন - এবং এই প্রক্রিয়ার নাম দেন 'nuclear fission' বা পারমাণবিক বিদারণ। এই পারমাণবিক প্রক্রিয়ার ওপর ভর করেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বানানো হয় পরমাণু বোমা। ১৯৩৮ সালে অটো হান ও লিসা মাইটনার দুজনেই তখন সত্তরের দোরগোড়ায়। এই আবিষ্কারের জন্য অটো হান নোবেল পান ১৯৪৪ সালে। নতুন করে আর বলে দিতে হয় না যে লিসা মাইটনারের নামটি সেবারও বাদ পড়েছিল নোবেল কমিটির ঘোষণায়। শোনা যায় লিসা মাইটনারের নাম রসায়নে নোবেলের জন্য ১৯ বার এবং পদার্থবিজ্ঞানে নোবেলের জন্য ৩০ বার নোবেল কমিটির কাছে আবেদন করা হয়েছিল। যাই হোক, নোবেল না পেলেও আইনস্টাইন লিসাকে 'জার্মান মেরী কুরী' আখ্যা দিয়েছিলেন - সেটিই বা কম প্রাপ্তি কী!
নারীদের সম্বন্ধে আরও একটি কথা সমাজে খুব সুপ্রচলিত - ইংরেজিতে একটি কথা আছে "beauty and brains", বাংলায় তারই ধারেকাছের প্রবাদ বাক্যটি হলো "রূপে লক্ষ্মী গুণে সরস্বতী"। এইসব প্রবাদ বাক্য শুনলে মনে হয় বাহ্যিক সৌন্দর্যের সাথে কোথাও যেন বুদ্ধিমত্তার একটা বিবাদ আছে। সুন্দরীও আবার বুদ্ধিমতীও - এ যেন সোনার পাথরবাটি। চন্দ্রবিন্দুর একটি গান 'অঙ্ক কী কঠিন'-এ তো তাঁরা সরাসরি বলেই ফেলেছেন - "মেয়েটি লম্বা, জগদম্বা/ অঙ্কে নাম্বার, কিন্তু এবড়ো খেবড়ো স্কিন/ দাদা অঙ্ক কী কঠিন", অর্থাৎ যে মেয়ে অঙ্কে নাম্বার আনে তার ত্বক এবড়ো খেবড়ো হতে বাধ্য। তাঁরা হয়তো হলিউডের ডাকসাইটে সুন্দরী অভিনেত্রী হেডি লামারের কথা জানেন না যিনি একাধিক উল্লেখযোগ্য সিনেমায় অভিনয়ের সাথে সাথে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এমন একটি রেডিও গাইডেন্স সিস্টেম বানিয়েছিলেন যাতে করে জার্মানদের রেডিও সিগনাল আটকে দেওয়ার যন্ত্রকে ফাঁকি দিয়ে রেডিও সিগনাল পৌঁছে দেওয়া যেত টর্পেডো নিক্ষপ করার সময়।
আরও বহু উদাহরণ আজ এই লেখায় হয়তো জায়গা পেলো না, কারণ একটি সময় ইতি টানতেই হয়। কিন্তু তাও যদি কারোর মনে এখনও প্রশ্ন থেকেই যায় বিজ্ঞানে নারীর প্রয়োজনীয়তা কী, তাহলে তাঁকে আমি স্মরণ করিয়ে দিতে চাই আমার প্রিয় বৈজ্ঞানিক জসেলিন বেল - যাঁর সাথে দু'বার সাক্ষাতের ও দীর্ঘ সময় আলাপআলোচনা করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে - তাঁর একটি উক্তি: "We need more women in scince: not for the betterment of women, but for the betterment of scince"। নারীর অনুপস্থিতিতে ক্ষতি বিজ্ঞানেরই। তাই প্রথাগত ধ্যানধারণার ঊর্ধ্বে উঠে নারীর বিজ্ঞান সাধনাকে সমাজে সহজে গ্রহণ করার সময় বোধহয় এসেছে, নারীও যাতে বৈজ্ঞানিকের জীবন স্বচ্ছন্দে বেছে নিতে পারেন আমাদের সমাজকে ততখানি পরিণত করার দিনও এসেছে। অপেক্ষা শুধু আমাদের সমাজের চক্ষু উন্মোচনের।
তথ্যসূত্র:
[১] https://www.theguardian.com/science/2018/oct/03/donna-strickland-nobel-physics-prize-wikipedia-denied
[২] https://www.cbc.ca/news/world/tim-hunt-nobel-prize-winner-apologizes-for-comments-about-women-in-labs-1.3107375
[৩] https://www.bbc.com/news/world-europe-45703700