আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ সপ্তদশ সংখ্যা ● ১-১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ● ১৬-৩১ ভাদ্র, ১৪৩৩

সম্পাদকীয়

সংঘাত নয়, সংহতির সুরে থাকুক বহুত্বের স্বর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে


আবারও সংবাদ শিরোনামে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। এবার রাতের অন্ধকারে আক্রান্ত হল ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অরবিন্দ ভবন। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, পতাকা পোড়ানো থেকে শুরু করে হুমকি গালিগালাজের বন্যা বয়ে যায় মধ্যরাতের ক্যাম্পাসে। কেবল মাঝরাতের অন্ধকারে নয়, এমনকি পরদিন মাঝ-দুপুরের প্রকাশ্যে দিবালোকে গেরুয়া বাহিনীর তাণ্ডবে নষ্ট হয়ে যায় শিল্পী নন্দলাল বসুর সৃষ্টি করা পদ্ম-পাপড়ি শোভিত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক চিহ্ন। রাজনৈতিক প্রতিশোধের স্পৃহায় শাসক আশ্রিত বাহিনীর হিংস্র উন্মত্ত আচরণে আক্রান্ত হলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ। বলাই বাহুল্য রাজ্যের এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের ওপর এমন আক্রমণের ঘটনায় যখন রাজ্যজুড়ে নিন্দার ঢেউ উঠেছে তখনও রাজ্যের শাসকদলের কিছু কিছু নেতা মন্ত্রীরা যাদবপুরের এই দুষ্কৃতী অভিযানকে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

কার্যত শাসকদলের স্থানীয় বিধায়ক ক্যামেরার সামনে প্রকাশ্যে হুমকির সুরে জানিয়েছিলেন যে তাদের প্রতিপক্ষ থানায় আত্মসমর্থন না করলে রাতভর তাণ্ডব হবে! আর তার সেই হুমকি যে কেবল কথার কথা ছিল না, সেটা প্রমাণিত হলো রাত-ভোর জুড়ে চলা ক্যাম্পাসে দুষ্কৃতি দৌরাত্ম্যে। ফলে এটা স্পষ্ট যে রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতেই রাতের আঁধারে সংঘটিত হয়েছিল সেই আক্রমণ। ঘটনার পর রাজ্যের সরকার প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মধ্যে 'রাষ্ট্রবাদ' প্রতিষ্ঠার হুংকার দিয়ে বলেছেন হয় 'ওরা থাকবে নয়তো আমরা'। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পড়ুয়াদের সংঘর্ষকে ঘিরে অশান্তির ঘটনায় নিরপেক্ষভাবে রাজধর্ম পালনের আগেই প্রশাসনের প্রধান 'আমরা-ওরার 'বিভাজন উসকে দিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয় দুর্ভাবনা।

শ্রীঅরবিন্দ কিংবা রবীন্দ্রনাথের মতো মনীষীদের উদ্যোগে তৈরি এই বিশ্ববিদ্যালয় ছিল দেশের স্বদেশী আন্দোলনের জাতীয়তাবাদী ভাবধারার ফসল। ফলে পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ শাসকদের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল জাতীয় স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্য নিয়ে। ফলে দেশ গড়ার ক্ষেত্রে, বিশেষত দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রের উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-গবেষকেরা। স্বাধীনতার আগে জাতীয় স্বার্থে যে গৌরবজ্জল ভূমিকা পালন করেছিল যাদবপুরের পড়ুয়ারা স্বাধীনতা উত্তরকালে দেশের মহাকাশ কিংবা প্রতিরক্ষা গবেষণা, ব্যাংক-বীমা-রেল-কয়লা-ইস্পাত-খনি-বিদ্যুৎ-পরিবহনের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প পরিষেবার উন্নয়নে নেতৃত্ব দিয়ে গেছে যাদবপুরের প্রাক্তনীরা। পাশাপাশি সমাজবিজ্ঞান ও ভাষা শিক্ষা দর্শনের ক্ষেত্রে জাতীয় মানদণ্ডে অগ্রণী প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাদবপুর দেশে-বিদেশে সমাদৃত। কার্যত গত এক দশক জুড়ে, কেন্দ্রে বিজেপি সরকারের আমলেই সরকার পোষিত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাদবপুর রয়েছে সাফল্যের শীর্ষে। যাদবপুরের এই সাফল্যের অন্যতম কারণ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আভ্যন্তরীণ প্রাণবন্ত শিক্ষার পরিবেশ। সরকারি আর্থিক অনুদানের বহু অভাব নিয়েই আজ শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা ধরে রেখেছে যাদবপুর, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে। ফলে যে বিশ্ববিদ্যালয় আজ দেশের কিংবা রাজ্যের মুখ উজ্জ্বল করে চলেছে সেই প্রতিষ্ঠানের মুখ পোড়ানোর অভিযান যারা চালাচ্ছে তাদের ভূমিকা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। অতীতে ঘাসফুল জমানার রাজ্যের নেতা মন্ত্রীদের মতো বর্তমান পদ্মফুলের নেতা মন্ত্রীদের চক্ষুশূল হয়ে আছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। এর বহু কারণের অন্যতম একটি কারণ হলো শাসকের নিয়ন্ত্রণের রাজনীতির চেনা ছকে এই ক্যাম্পাসকে বাগে আনতে না পারা। কার্যত স্বাধীনতা উত্তরকালে বিভিন্ন ধারার রাজনীতির সরকার কেন্দ্রে কিংবা রাজ্যে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হলেও প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার রাজনীতি সর্বদাই ছিল প্রবল সক্রিয় এই ক্যাম্পাসের মাটিতে।

ফলে দেশের সরকারের মানদণ্ডে উচ্চাসনে থাকা এক প্রতিষ্ঠান একাধারে তথাকথিত দেশদ্রোহীদের আখড়া আবার একই সাথে উৎকর্ষের কেন্দ্র কীভাবে হয়ে ওঠে সেই রহস্যের কিনারা করা জরুরি! একটা প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের পেছনে আর্থিক অনুদানের মতই জরুরী সেই প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র। যাদবপুরের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের বহুত্বের স্বর আসলে যাদবপুরের মূল চালিকাশক্তি। ফলে বিগত আশি বছরে কেন্দ্র কিংবা রাজ্যে বহু দলের, বহু মতের সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও ক্যাম্পাসের অন্দরে কেবল সরকারের সুরে সুর মেলানোর রেওয়াজ কখনোই তৈরি হয়নি। সেই ক্যাম্পাসে সত্তরের দশকের জরুরি অবস্থা বিরোধী আন্দোলন, বাম আমলে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম বিরোধী আন্দোলন, তৃণমূল আমলে 'হোক-কলরব'-এর মতো আন্দোলনের সুর ছিল রাজ্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধী সুর।

কিন্তু শাসক সর্বদাই আশা করে প্রশ্নাতীত আনুগত্য। কিন্তু আজকের তরুণ প্রজন্ম সেই প্রশ্নহীন আনুগত্যের পথ ছেড়ে বেরিয়ে শাসককে প্রশ্ন করার সাহস ধরে। যার সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত রাজধানী দিল্লিতে নিটের দুর্নীতির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ছাত্র আন্দোলন। ফলে প্রশ্ন করার স্বাধীনতা কিংবা মুক্ত মত প্রকাশের স্বাধীনতা, যেকোনো উৎকৃষ্ট ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের পরিচয়। অথচ সেই অপ্রিয় প্রশ্নের পথ পরিহার করে শাসকের আনুগত্যের পথে না হাঁটলেই তাদের দাগিয়ে দেওয়া হয় কখনও 'মাওবাদী' বলে কখনও 'দেশদ্রোহী' বলে! আসলে বোঝা দরকার যে একটা ক্যাম্পাসের প্রতিবাদী চরিত্র থাকা বৃহত্তর সামাজিক চাহিদার পরিপূরক, যেটা আখেরে শাসকের শাসনের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার সূচক। সেই নিরিখে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ক্যাম্পাস জুড়ে রয়েছে এমন প্রতিবাদী চরিত্র। ফলে শাসকের প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্যের চেয়েও ঢের জরুরি সামাজিক চাহিদা পূরণে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিপূরক ভূমিকা। সেখানেই সরকারের জনমুখী কর্মসূচির পরিপূরক হয়ে উঠতে পারে এমন প্রতিষ্ঠানগুলি। তাই ক্ষুদ্র রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পথ পরিহার করে শাসকের উচিত সরকার পোষিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে রাজ্য তথা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের কর্মযজ্ঞে শামিল করানোর উদ্যোগ। মনে রাখতে হবে যে দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম খরচে মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত মেধাবী পড়ুয়াদের উচ্চশিক্ষার লেখাপড়ার সুযোগ আজও মেলে ঐ যাদবপুরের ক্যম্পাসে। এমন প্রেক্ষিতে রাজনৈতিক কারণে ক্যাম্পাস দখলের অভিযান উত্তরোত্তর বাড়তে থাকলে যে রাজ্যের উচ্চশিক্ষায় সমূহ সর্বনাশ, সেটা আজ বুঝতে পারছে মানুষ, যাদবপুরের এই সিঁদুরে মেঘ দেখে!

ফলে এখানেই তৈরি হচ্ছে দুই আদর্শের সংঘাত। একদল চাইছেন অতীত ঐতিহ্যের পরম্পরা মেনে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধিকার রক্ষার উদ্যোগ। আর শাসকদল চাইছে নিয়ন্ত্রণের রাজনীতির শেকল পরিয়ে তাদের রাজনৈতিক যুদ্ধজয়ের ছক। এমন দুর্যোগকালে একটাই ভরসা যে রাতের অন্ধকারে এই ভয়াবহ ক্যাম্পাস আক্রমণ সমাজের সিংহভাগ মানুষ মন থেকে মেনে নেয়নি। মনে রাখতে হবে বহুত্বের পথ ধরেই বিশ্ববিদ্যালয় থাকুক। সেখানে থাকুক বিভিন্ন স্বর, বিভিন্ন সুর। কিন্তু সেই সুর বা স্বরের অতিশয্যে যেন প্রতিষ্ঠান, তার মূল লক্ষ্য পঠন-পাঠন এবং গবেষণার কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত না হয়। সেটা বজায় রাখার দায় যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেকার বিভিন্ন অংশীদারদের তেমনি সেই দায় কোনও অংশে কম নয় রাজ্যের সরকারেরও।