আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ ষোড়শ সংখ্যা ● ১৬-৩১ আগস্ট, ২০২৬ ● ১-১৫ ভাদ্র, ১৪৩৩
প্রবন্ধ
শতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য
উৎপল সরকার
তবু আঠারোর শুনেছি জয়ধ্বনি,
এ বয়স বাঁচে দুর্যোগে আর ঝড়ে,
বিপদের মুখে এ বয়স অগ্রণী
এ বয়স তবু নতুন কিছু তো করে।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু কবি আছেন, যাঁদের জীবনকাল ছিল সংক্ষিপ্ত, অথচ তাঁদের সৃষ্টির অভিঘাত সময়ের সীমা অতিক্রম করেছে। সুকান্ত ভট্টাচার্য তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর কবিতা কেবল নন্দনতত্ত্বের বিষয় নয়; তা এক সংকটাপন্ন যুগের সামাজিক দলিল, শ্রেণিসংগ্রামের কাব্যিক ভাষ্য এবং ভবিষ্যতের সমাজ নির্মাণের স্বপ্ন। মাত্র একুশ বছরের জীবনে তিনি যে কাব্যভাষা নির্মাণ করেছিলেন, তা নিপীড়িত মানুষের জীবনকে সাহিত্যের কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা করে।
১৫ আগস্ট তাঁর জন্মদিন স্মরণ করার অর্থ কেবল একজন কবির জন্মবার্ষিকী পালন নয়; বরং এমন এক সাহিত্যিক চেতনার প্রতি সম্মান জানানো, যা মানুষের মুক্তিকে শিল্পের সর্বোচ্চ আদর্শ হিসেবে দেখেছিল। তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত বেদনা বৃহত্তর সমাজবাস্তবতার সঙ্গে মিলেমিশে যায়। ফলে তাঁর কাব্যকে বোঝার জন্য শুধু সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি যথেষ্ট নয়; সমাজ, ইতিহাস ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের আলোয় তাকে বিচার করাও জরুরি।
সুকান্তের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে এমন এক সময়ে, যখন ঔপনিবেশিক শাসন, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ এবং পুঁজিবাদী মুনাফার রাজনীতি বাংলার সাধারণ মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। ১৯৪৩ সালের মন্বন্তর ছিল কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; খাদ্যের অন্যায্য বণ্টন, মজুতদারি এবং ঔপনিবেশিক অর্থনীতির নির্মম পরিণতি। এই বাস্তবতা সুকান্তের কবিতায় গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি বুঝেছিলেন, ক্ষুধা কেবল ব্যক্তিগত অভাব নয়; এটি একটি শ্রেণিভিত্তিক সামাজিক সম্পর্কের ফল।
তাঁর বহুল উদ্ধৃত পঙ্ক্তি -
"ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়,
পূর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।"
এই চিত্রকল্পে কেবল দুর্ভিক্ষের বর্ণনা নেই; আছে সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক নীরব অভিযোগ। মানুষের মৌলিক চাহিদা যখন পূরণ হয় না, তখন প্রকৃতির সৌন্দর্যও তার কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে। ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে চাঁদ আর রোমান্টিক প্রতীক নয়; তা হয়ে ওঠে অন্নের প্রতিচ্ছবি। মার্কসীয় দৃষ্টিতে এটি বস্তুজগতের বাস্তব অবস্থারই শিল্পরূপ।
সুকান্ত বিশ্বাস করতেন, সাহিত্য সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো অলঙ্কার নয়। শিল্পেরও একটি শ্রেণিগত অবস্থান থাকে। যে কবিতা মানুষের দুঃখ, শোষণ ও বঞ্চনাকে অস্বীকার করে, তা ইতিহাসের পরিবর্তনের সঙ্গী হতে পারে না। তাই তাঁর কবিতায় শ্রমিক, কৃষক, মজুর, পথশিশু ও সংগ্রামী মানুষের উপস্থিতি এত স্বাভাবিক। তিনি উৎপাদনকারী মানুষের শ্রমকে সভ্যতার ভিত্তি হিসেবে দেখেছেন।
তাঁর বিখ্যাত কবিতা 'ছাড়পত্র'-এ তিনি লিখেছেন -
"এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান;
জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে।
চলে যেতে হবে আমাদের।"
এই 'নতুন শিশু' কেবল একটি নবজাতক নয়; এটি একটি নতুন সমাজব্যবস্থার প্রতীক। পুরোনো শোষণ, সাম্রাজ্যবাদ, বৈষম্য ও অবিচারের পরিবর্তে এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন এখানে উচ্চারিত হয়েছে, যেখানে উৎপাদনের ফল মানুষের সম্মিলিত কল্যাণে ব্যবহৃত হবে। এই কবিতার অন্তর্নিহিত শক্তি নিহিত রয়েছে ইতিহাসের পরিবর্তনের প্রতি অটল বিশ্বাসে।
সুকান্তের কাব্যে সংগ্রাম কখনও বিমূর্ত নয়। তিনি জানতেন, ইতিহাস এগিয়ে যায় মানুষের শ্রম ও প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে। তাই তাঁর কবিতায় হতাশা থাকলেও আত্মসমর্পণ নেই। মানুষের সম্মিলিত শক্তির উপর তাঁর আস্থা ছিল অটুট। এই বিশ্বাসই তাঁকে বাংলা কবিতায় বিপ্লবী মানবতাবাদের অন্যতম কণ্ঠস্বর করে তুলেছে।
শিশুসাহিত্যেও তিনি কেবল বিনোদনের পথ অনুসরণ করেননি। শিশুদের সামনে এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন রেখেছেন, যেখানে মানুষ পরিশ্রমকে সম্মান করবে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে এবং বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তুলবে। তাঁর সহজ ভাষার আড়ালে লুকিয়ে থাকে গভীর সামাজিক দর্শন।
দেশপ্রেম সম্পর্কেও সুকান্তের ধারণা ছিল স্বতন্ত্র। তাঁর কাছে দেশ মানে কোনো বিমূর্ত ভূখণ্ড নয়; দেশ মানে শ্রমজীবী মানুষের জীবন। কৃষকের জমি, শ্রমিকের ঘাম, মায়ের অনাহার, শিশুর ভবিষ্যৎ - এসবই তাঁর স্বদেশচিন্তার কেন্দ্রবিন্দু। ফলে তাঁর দেশপ্রেম সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদে সীমাবদ্ধ নয়; তা আন্তর্জাতিক মানবমুক্তির স্বপ্নের সঙ্গে যুক্ত।
রবীন্দ্রনাথ মানুষের আত্মিক মুক্তির কথা বলেছেন, নজরুল অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ভাষা সৃষ্টি করেছেন, আর সুকান্ত সেই বিদ্রোহকে শ্রেণিবৈষম্যের বাস্তব মাটিতে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর কবিতায় বিপ্লব মানে মানুষের জীবনের মৌলিক পরিবর্তন - অন্ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মর্যাদা ও শ্রমের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার সংগ্রাম।
আমি একটা ছোট্ট দেশলাইয়ের কাঠি;
এতে নগণ্য হয়তো চোখেও পড়ি না:
তবু যেন
মুখে আমার উসখুস করছে বারুদ -
বুকে আমার জ্বলে উঠবার দুরন্ত উচ্ছ্বাস;
আমি একটা দেশলাইয়ের কাঠি।
এই কবিতায় দেশলাইয়ের কাঠি আসলে সংগঠিত মানুষের প্রতীক। একা একটি কাঠি ক্ষুদ্র, কিন্তু সঠিক মুহূর্তে তা আগুন জ্বালাতে পারে। মার্কসীয় রাজনীতিতে যেমন ব্যক্তি নয়, সংগঠিত জনতার শক্তিই ইতিহাস বদলায়, তেমনি সুকান্তও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত শক্তির উপর আস্থা রেখেছেন।
আজকের বিশ্বে যখন পুঁজির কেন্দ্রীভবন বাড়ছে, শ্রমের অনিশ্চয়তা গভীর হচ্ছে, বেকারত্ব ও বৈষম্য নতুন রূপে ফিরে আসছে, তখন সুকান্তের কবিতা আবারও নতুন অর্থে পাঠযোগ্য হয়ে ওঠে। তাঁর রচনা মনে করিয়ে দেয় - অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড কেবল উৎপাদনের পরিমাণ নয়; বরং উৎপাদনের ফল মানুষের মধ্যে কতটা ন্যায়সঙ্গতভাবে বণ্টিত হচ্ছে।
তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক'রে যাব আমি -
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
অবশেষে সব কাজ সেরে
আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে
করে যাব আশীর্বাদ,
তারপর হব ইতিহাস॥
এই অঙ্গীকার কেবল ব্যক্তিগত প্রতিজ্ঞা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি এক বিপ্লবী দায়বদ্ধতা। এখানে কবি নিজের জীবনকে বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ইতিহাসে মানুষের স্থান নির্ধারিত হয় তার সামাজিক ভূমিকার মাধ্যমে - এই ধারণাই যেন তাঁর কাব্যে রূপ পেয়েছে।
১৯৪৭ সালের ১৩ মে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে তাঁর জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়; বরং বাংলা সাহিত্যে এক স্থায়ী রাজনৈতিক ও মানবিক উত্তরাধিকারের সূচনা। তাঁর কবিতা আজও মিছিলে, সভায়, পাঠচক্রে এবং তরুণদের কণ্ঠে নতুন শক্তি সঞ্চার করে।
সুকান্ত ভট্টাচার্য আমাদের শিখিয়েছেন, কবিতা মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। শোষিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলা এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজের স্বপ্নকে জীবন্ত রাখা - এই দায়িত্বও কবিতার। তাঁর সাহিত্য আজও মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস পরিবর্তনের চালিকাশক্তি মানুষের শ্রম, সংগ্রাম এবং সম্মিলিত চেতনা।
১৫ আগস্ট তাই কেবল তাঁর জন্মদিন নয়; এটি বাংলা সাহিত্যকে নতুন সামাজিক দায়বদ্ধতার আলোয় ফিরে দেখার দিন। শতবর্ষে দাঁড়িয়ে সুকান্ত আমাদের আবারও আহ্বান জানান - মানুষের মুক্তিই হোক সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সমাজচিন্তার সর্বোচ্চ লক্ষ্য। যতদিন শোষণ থাকবে, ততদিন তাঁর কবিতা সংগ্রামের মশাল হয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পথ দেখিয়ে যাবে।