আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ ষোড়শ সংখ্যা ● ১৬-৩১ আগস্ট, ২০২৬ ● ১-১৫ ভাদ্র, ১৪৩৩
প্রবন্ধ
নারী তুমি অর্ধেক আকাশ
গৌতম সরকার
কোভিড মহামারীর ধাক্কা সামলে ভারতীয় অর্থনীতি একটি শক্তিশালী ভি-আকৃতির (V-shaped) পুনরুজ্জীবন ও স্থিতিস্থাপক উন্নয়ন মানচিত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে ডিজিটাল বিপ্লব, সরকারি উৎসাহমূলক প্যাকেজ এবং প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনিশিয়েটিভ (PLI)-এর মতো প্রকল্পগুলো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত আই.এম.এফ-এর ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ রিপোর্টে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে ভারতের জিডিপি প্রবৃদ্ধির আনুমানিক হার ধরা হয়েছে ৬.৫ শতাংশ। গত চারবছরে ভারতের গড় চক্রবৃদ্ধি বার্ষিক বৃদ্ধির হার (Compound Annual Growth Rate) ছিল ৮.৫৬ শতাংশ। আর্থিক জিডিপি'র নিরিখে ভারত এই মুহূর্তে বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতি, আগাম লক্ষ্য কয়েকবছরের মধ্যে ব্রিটেন, জাপান ও জার্মানিকে ছাড়িয়ে তৃতীয় হওয়ার, অর্থাৎ সামনে থাকবে শুধুই চীন আর আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। এককথায় প্যান্ডেমিক পরবর্তী সময়ে ভারত যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে অর্থনীতির উন্নয়নের ধারাকে একটা দীর্ঘস্থায়ী ও সুস্থির রূপ দিয়েছে সেটা গোটা বিশ্বের কাছে একটা উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
এইসব উন্নয়নের পাঁচালীর মধ্যে দুধের মধ্যে চোনার মত একটা বিষয় রয়ে গেছে, সেটা হল এই অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রসাদ কি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মধ্যে বিতরিত হচ্ছে? বিশেষ করে মহিলা কর্মসংস্থান, যেখানে চাকরির বাজারে অংশগ্রহণের নিমিত্তে মহিলাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে!
কবি বলেছেন, "নারী তুমি অর্ধেক আকাশ..."। কিন্তু বাস্তব জানান দিচ্ছে, কবির কল্পনা কবিতার বিলাস-বাসনাতেই রয়ে গেছে, বিশেষ করে যখন প্রামাণ্য তথ্যভাণ্ডার বিচারের মাপকাঠি হয়ে ওঠে। শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণের হার (Labour Force Participation Rate) ২০২২ সালে ছিল মাত্র ২৫.৪ শতাংশ, সেখান থেকে কিছুটা বেড়ে ২০২৫ সালে হয়েছে ৩০.৭ শতাংশ। অন্যদিকে শ্রমিক-জনসংখ্যা অনুপাত (Worker- Population Rate) অনুযায়ী একই সময়কালে মহিলাদের অংশগ্রহণ বেড়েছে ২৪.৬ শতাংশ থেকে ২৯.৮ শতাংশ। অঙ্কের হিসেবে বলা যায় শ্রমজগতে চাকুরিরত এবং চাকুরির সন্ধানরত মেয়েদের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু এখানে একটা গল্প আছে। শ্রমবাজারে মেয়েদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির বেশিরভাগটাই ঘটছে গ্রামাঞ্চলে। এই মুহূর্তে দেশের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের মাপকাঠিতে গ্রামীণ মহিলারা (৩৪.৬ শতাংশ) শহরের মেয়েদের (২২.২ শতাংশ) তুলনায় অনেকটা এগিয়ে। শহুরে ১৫-২৯ বছর বয়স্ক মহিলাদের ক্ষেত্রে সমস্যাটা আরও গভীর, এদের বেকারত্বের হার (১৮.৪ শতাংশ) শহরের একই বয়সের পুরুষদের (১১.৮ শতাংশ) তুলনায় অনেকটাই বেশি। গ্রামীণ ক্ষেত্রে দেখা গেছে যাদের উপার্জনক্ষম বলা হচ্ছে তার মধ্যে ৭০ শতাংশের বেশি স্বনির্ভর প্রকল্পে নিযুক্ত, ১০ শতাংশের কম মহিলা কোনও নির্দিষ্ট বেতনের চাকরি করেন, সেগুলো আবার কৃষি, পারিবারিক ব্যবসা কিংবা গৃহস্থালি সম্পর্কিত কোনও কাজ। স্বনির্ভরশীল ক্ষেত্রগুলি একাধিক সমস্যায় জর্জরিত। এই ক্ষেত্রের উন্নয়ন সীমিত হওয়ার কারণ মূলধন, প্রযুক্তি ও আধুনিক উদ্যোগ কৌশলের অভাব স্বনির্ভর উদ্যোগকে সাফল্যের সরণিতে পৌঁছে দিতে পারে না। ফলে তথ্যের বিচারে কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার চিত্রনাট্য তৈরি হলেও, বাস্তব বলছে নারী যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেছে।
সাম্প্রতিক দশকে শিক্ষাপ্রসারে ভারতবর্ষের অগ্রগতি উল্লেখের দাবি রাখে। এক্ষেত্রে হিসেব বলছে, ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে। উচ্চমাধ্যমিকে মেয়েদের ভর্তির অনুপাত ২০২০-২১ সালের ৫৪.৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ সালে হয়েছিল ৬০.৯ শতাংশ, যে অঙ্কটি ছেলেদের ভর্তির হারকে (৫৬.২ শতাংশ) ছাড়িয়ে গেছে। উচ্চশিক্ষাতেও মেয়েদের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য। এই হিসাব ২০২০-২১ সালের ২৭.৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২২-২৩ সালে হয়েছে ৩০.২ শতাংশ। এই তথ্যগুলো জানাচ্ছে আগের তুলনায় এখন মেয়েদের সার্বিক শিক্ষার হারের উন্নতি হচ্ছে, কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় শিক্ষার প্রাঙ্গণে মহিলাদের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ বাড়লেও সেটি চাকরির বাজারে প্রতিফলিত হচ্ছে না। শহরের ক্ষেত্রে মহিলাদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের হার এখনও যথেষ্ট কম, তাদের মধ্যে যুব বেকারত্বের হার দিন দিন বেড়ে চলেছে; অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মহিলাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যেকার পার্থক্য বেড়ে চলেছে।
তবে এই বৈষম্য কেবলমাত্র চাকরির বাজারে প্রতীয়মান হচ্ছে ভাবলে ভুল হবে। শ্রমবাজারে মহিলাদের অংশগ্রহণ সংকুচিত হওয়ার আরও অনেক কারণ আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল পারিবারিক দায়িত্ব পালন, কর্মক্ষেত্রে চাকরির শর্তের নমনীয়তার অভাব, নিরাপত্তা ও যাতায়াত ব্যবস্থার অভাব ইত্যাদি। ‘ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশন’-এর এক সার্ভে রিপোর্টে দেখানো হয়েছে সারা বিশ্বে শুধুমাত্র সাংসারিক দায়দায়িত্ব পালনের নিমিত্তে প্রায় ৭০৮ মিলিয়ন মহিলা শ্রমশক্তির বাইরে থেকে জীবন অতিবাহিত করছেন। এই সমস্যা শহরাঞ্চলের আরও বেশি প্রকট। ২০২৪ সালে 'দ্য টাইম ইউস সার্ভে'-এর হিসেবমতো একজন মহিলা সারা দিনে গড়ে ২৮৯ মিনিট অবৈতনিক গৃহস্থালির কাজ আর ১৩৭ মিনিট পারিবারিক পরিচর্যার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখে। বর্তমানে এই সমস্যা আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে যৌথ পরিবার ভেঙে আধুনিক সময়ে মানুষ 'নিউক্লিয়ার পরিবার' জীবনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠায়, যেখানে স্বভাবতই পরিবারের মহিলার উপরই যাবতীয় সাংসারিক দায়িত্ব এসে পড়েছে। অর্থনীতির হিসেবে যেকোনও অবৈতনিক কাজ দেশের মোট উৎপাদন অর্থাৎ জিডিপি বৃদ্ধির বিঘ্ন ঘটায়। আর যতদিন আমাদের সমাজে সাংসারিক দায়দায়িত্বের বোঝা প্রায় পুরোপুরিভাবে মহিলাদের উপর ন্যস্ত থাকবে ততদিন আমরা আমাদের অর্ধেক আকাশ অর্থাৎ অর্ধেক মানব সম্পদকে কাজে লাগাতে পারব না। সেক্ষেত্রে উন্নয়ন বিঘ্নিত হবে, লিঙ্গ বৈষম্যের অভিশাপ সার্বিক কল্যাণের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।
মহিলা শ্রমশক্তিকে কীভাবে দেশের সার্বিক উন্নয়নে অন্তর্ভুক্ত করা যায় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল সুইডেন, ডেনমার্ক ও জাপান। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে এই দেশগুলি 'Care economy' বা ‘সেবা পরিচর্যা’ ক্ষেত্রে বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটায়, যার মধ্যে শিশু ও বয়স্কদের যত্নের বিষয়টি অধিকতর গুরুত্ব পেয়েছে। ভারতের আর্থিক ও জনসংখ্যাগত প্রেক্ষিত অনেকটাই আলাদা হলেও সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য পরিচর্যা সেবা আমাদের দেশে মহিলাদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণকে নিঃসন্দেহে উৎসাহিত করবে। তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে, চ্যালেঞ্জটা কেবলমাত্র কাজের বাজার তৈরি করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, সেই শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণের অধিকারকে সুনিশ্চিত করতে হবে। তাই শুধু শিক্ষার হার বাড়িয়ে সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে ভাবলে ভুল হবে, যতক্ষণ না মহিলাদের সেই শিক্ষাকে উৎপাদন কাজে ব্যবহার করা যাচ্ছে ততক্ষণই দেশের সার্বিক উন্নয়ন থমকে থাকবে। সেবা পরিষেবা অর্থনীতিতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত ভারতবর্ষকে সেই অভিষ্ট লক্ষ্যে অনেকটা এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
২০১২ সালের তুলনায় বর্তমানে দেশে বেকারত্বের হার দ্বিগুণ, জিডিপি বৃদ্ধির হার কাগজে কলমে যতটা দেখানো হচ্ছে তার তুলনায় কম, এমত পরিস্থিতিতে মহিলাদের শ্রমবাজারে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের সুযোগ না দিলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এবং ২০৪৭ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্বপ্নের প্রকল্প 'Viksit Bharat' অর্থাৎ 'বিকশিত ভারত' অধরা থেকে যাবে। অর্থনীতিবিদদের গবেষণা থেকে উঠে এসেছে, শ্রমবাজারে মহিলাদের অংশগ্রহণের হার ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেলে দেশের স্থূল জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি পায় ২ শতাংশ। মহিলারা চাকরি পেলে একটি পরিবারের আয়, ব্যয় ও সঞ্চয় বৃদ্ধি পাবে; শিশুদের শিক্ষা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটবে। এককথায় দেশে মানবিক মূলধনের সৃষ্টি হবে। নোবেল পুরস্কার বিজয়িনী ক্লডিয়া গোল্ডিন শ্রমবাজারে মহিলাদের অংশগ্রহনকে একটি U-আকৃতির রেখা দিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে যখন দেশে ধীরে ধীরে শিল্পায়ন ঘটতে থেকে এবং পারিবারিক আয়ের স্বল্পমাত্রায় বৃদ্ধি ঘটে, শ্রমশক্তিতে মহিলাদের যোগদান কম থাকে, এরপর শিক্ষা ও সেবাক্ষেত্রের দ্রুত উন্নয়ন ঘটতে থাকায় শ্রমবাজারে মহিলাদের অংশগ্রহণের হার বাড়তে থাকে। গোল্ডিনের মতে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের সমান অংশগ্রহণ কেবলমাত্র একটি কল্যাণমূলক প্রকল্প নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি দক্ষ, প্রগতিশীল, উন্নয়নমুখী এবং প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
২০১৮ সালে ভারতের (১৫-২৯) বছর বয়স্ক প্রায় ১০০ মিলিয়ন মহিলার উপস্থিতি শিক্ষা কিংবা কর্মক্ষেত্র কোনোটাতেই ছিল না। আমাদের দেশে শ্রমবাজারে মহিলাদের কম অংশগ্রহণের একাধিক কারণ আছে -
এক, ২০০৪-০৫ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ভারতীয় কৃষিতে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটেছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকের চাহিদা কমেছে। গ্রামে বহু মহিলা কৃষির বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত ছিলেন, এই পরিবর্তন গ্রামীণ মহিলাদের বড় মাত্রায় কর্মহীন করে তুলেছে।
দুই, কোভিডের সময় বহু মহিলা শহরের চাকরি হারিয়ে গ্রামে ফিরে বাধ্য হয়ে অবৈতনিক সাংসারিক কাজে নিযুক্ত হয়েছেন।
তিন, সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন মূলত অর্থ ও তথ্যপ্রযুক্তির মতো মূলধন নিবিড় ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে। এই সব উৎপাদন ক্ষেত্রগুলিতে শ্রমিকের চাহিদা খুব কম। অন্যদিকে ২০১৩-১৯ সালের মধ্যে টেক্সটাইল ও বস্ত্রের মত শ্রমনিবিড় শিল্পগুলিতে নিয়োগ দিনদিন কমে গেছে।
চার, ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রি বা উৎপাদন শিল্পে ২০১৯ সালে মহিলা শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ২০০৪ সালের তুলনায় কম। 'মেক ইন ইন্ডিয়া' বা 'পারফর্ম্যান্স লিঙ্কড ইনিশিয়েটিভ (PLI)'-এর মত প্রকল্পগুলি তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করতে পারেনি। এই শিল্পে মহিলাদের কর্মসংস্থান ২০০৪ সালের সংখ্যায় পৌঁছতে ২০২২ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।
তবে সুইডেন-ডেনমার্ক-জাপান মডেল পর্যন্ত যেতে হবে না, তামিলনাড়ু মডেল অনুসরণ করলে অবশিষ্ট ভারত সার্বিক উন্নয়নে মহিলাদের অন্তর্ভুক্তিকরণের চাবিকাঠি পেয়ে যাবে। এই বিষয়ে সারা দেশে তামিলনাড়ু একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এই রাজ্যে ভারতের মোট মহিলা কারখানা শ্রমিকের ৪০ শতাংশের কর্মসংস্থান ঘটেছে, অথচ রাজ্যটিতে দেশের মাত্র ৫-৬ শতাংশ মানুষ বাস করে। এর মূল কারণ হল মহিলাদের উন্নয়নে রাজ্য সরকারের সুচিন্তিত এবং সুযোগ্য পরিকল্পনা রূপায়ণ। এই রাজ্যে মহিলাদের শিক্ষার হার দেশের গড় হারের তুলনায় অনেকটাই বেশি। এছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং হস্টেল ব্যবস্থা মেয়েদের বাড়ি থেকে দূরে দৈনিক যাতায়াতের মাধ্যমে বা কাজের জায়গার কাছাকাছি থেকে চাকরি করতে উৎসাহিত করেছে। এর ফলে রাজ্যের ও বাইরের রাজ্যের বহু মহিলা তিরুপ্পুর এবং কোয়েম্বাটোরের বয়ন শিল্প এবং পোশাক নির্মাণ কারখানায়, শ্রীপেরামবুদুরের জুতো ও ইলেকট্রনিক্স শিল্প এবং গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানায় চাকরিতে নিযুক্ত হয়েছেন।
তামিলনাড়ুর এই উত্থান উত্তর-দক্ষিণ পার্থক্যকে (North-South Divide) আরও স্পষ্ট করে। তামিলনাড়ুর মহিলা কর্মসংস্থানের মাত্রায় পৌঁছতে হলে অন্যান্য রাজ্যের সর্বাগ্রে মেয়েদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রাথমিক সুযোগ সুবিধা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও হোস্টেলের মত প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা আবশ্যক। মহিলাদের শিক্ষা ও দক্ষতাকে জাতীয় স্তরে উন্নীত করতে হবে যাতে তাঁরা স্বীয় প্রতিভার জোরে কাজের বাজারে নিজেদের পছন্দের কাজ খুঁজে নিতে পারে।
শ্রমশক্তিতে মহিলাদের অংশগ্রহণের হার না বাড়ালে দেশের সার্বিক উন্নয়নের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। বিহারের মত পিছিয়ে পড়া রাজ্যে মহিলা শ্রমশক্তির হার মাত্র ১৫ শতাংশ, দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন। মহিলাদের অংশগ্রহণের এই ঘাটতি মূলত সেই সমস্ত শ্রমনিবিড় উৎপাদন শিল্পে পরিলক্ষিত হচ্ছে যেসব ক্ষেত্র একটা সময় বিপুল সংখ্যক নারী শ্রমিকের রুজি রোজগারের জায়গা ছিল। এখন সেই সমস্ত শিল্পের কাঠামোগত পরিবর্তন বিশেষ করে অদক্ষ শ্রমিকের চাহিদা কমিয়ে দিয়ে মহিলাদের কর্মসংস্থানের সুযোগকে সংকুচিত করে তুলেছে। বিকশিত ভারত ২০৪৭-কে সফল করে তুলতে হলে তামিলনাড়ুর মত সঠিক খাতে সঠিক বিনিয়োগ, শিক্ষা এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নের মাধ্যমে উত্তর-দক্ষিণ বৈষম্যকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কমিয়ে উন্নয়নের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে। আর সেখানে পাশে আমাদের অর্ধেক আকাশ নারীশক্তিকে অবশ্যই থাকতে হবে।