আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ পঞ্চদশ সংখ্যা ● ১-১৫ আগস্ট, ২০২৬ ● ১৬-৩২ শ্রাবণ, ১৪৩৩
প্রবন্ধ
"কমলাকান্ত" বঙ্কিমচন্দ্রের ব্যঙ্গদর্শন
কুন্তল মুখোপাধ্যায়
আদালতে ও "কার গরু" প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে কমলাকান্ত বলিল, "আমার না'ত কার? আমি দুধ খেয়েছি, ওর দই খেয়েছি, ওর ঘোল খেয়েছি, ওর ছানা খেয়েছি, ওর মাখন খেয়েছি, ওর ননী খেয়েছি - ও গরু আমার হলো না..." কিশোর এবং যৌবন প্রারম্ভে এই বাক্যবন্ধের সঙ্গে পরিচিত নয়, এমন বাঙালি শিক্ষার্থী মানুষের দেখা পাওয়া বিরল।
১৮৭৫ সালে বঙ্কিমচন্দ্র স্বসম্পাদিত "বঙ্গদর্শন" পত্রিকায় কমলাকান্তে'র শিরোনামে এই নিবন্ধগুলি লেখেন। পরবর্তী কালে ক) কমলাকান্তের দপ্তর, খ) কমলাকান্তে'র পত্র, ও গ) কমলাকান্তে'র জবানবন্দি নামে তিনটি বইয়ে এই লেখাগুলি প্রকাশিত হয়। বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন একজন সংবেদনশীল ও বিচারশীল বুদ্ধিজীবী। নবজাগরণ উত্তর পর্বে সম্ভাব্য জ্ঞানালোকের বাহক যে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র, ঔপনিবেশিক শিক্ষা এবং বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণি বা "বাবু" সম্প্রদায়, তার নিজ জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বঙ্কিম তার দ্বন্দ্ব, দ্বিচারিতাকে দেখেছিলেন, ফলে তার রচনায় তাঁর নিজের শ্রেণি, বাবুদের প্রতি তীব্র সমালোচনা উপস্থাপিত করেন।
কমলাকান্তকে বঙ্কিমচন্দ্রের গোপন আত্মচরিত বলা যায়। যেখানে কিছুটা স্বপ্ন কিছুটা কল্পনার মাধ্যমে তথাকথিত বাবু জীবনকে তিনি ব্যঙ্গ করেছেন। বলা হয়, ইংরেজ লেখক থমাস ডি কুইন্সির (Thomas De Quincey) বিখ্যাত গ্রন্থ "কনফেশন অফ অ্যান ইংলিশ ওপিয়াম ইটার" -এর অনুসরণে বঙ্কিমের কমলাকান্ত লেখাগুলি রচিত - আফিমের নেশায় লেখকের আত্মগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা। গোটা পৃথিবীতেই এইধরনের রচনাগুলি "ড্রাগ লিটারেচার" নামে পরিচিত। তবে, বঙ্কিমচন্দ্র শুধুমাত্র ডি কুইন্সির বই থেকেই অনুপ্রাণিত হননি। বরং তাঁকে দেশীয় ঐতিহ্যের সাথে মিশিয়ে সাহিত্য রচনায় এক অনন্য নজির তৈরি করেছেন "বিড়াল" রচনায়, মার্জার কমলাকান্ত'র দুধ খাওয়ার পর কমলাকান্ত আফিমের মৌতাতে বুঝিলেন, "দুধ আমার বাপেরও নয়। দুধ মঙ্গলার, দুহিয়াছে প্রসন্ন। অতএব সে দুগ্ধে আমারও যে অধিকার, বিড়ালেরও তাই"। কমলাকান্ত বুঝিলেন, বিড়াল বলিতেছে, "মারপিট কেন? স্থির হইয়া হুকা হাতে করিয়া, একটু বিচার করিয়া দেখো দেখি! এ সংসারে ক্ষীর, সর, দুগ্ধ, দধি, মৎস, মাংস, সকলই তোমরা খাইবে, আমরা কিছু পাইবো না কেন? তোমরা মনুষ্য, আমরা বিড়াল, প্রভেদ কি? তোমাদের ক্ষুৎ পিপাসা আছে - আমাদের কি নাই... দেখ শয্যাশায়ী মনুষ্য! ধর্ম্ম কি? পরোপকারই ধর্ম্ম"।
বঙ্কিমচন্দ্র বুঝেছিলেন, হাসি হল নিপীড়িত ও অবদমিত মানুষের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। হাসি ও তামাশার যেমন কোনও যথার্থ সংজ্ঞা দেওয়া যায় না, তেমনই এঁদের প্রকৃত অর্থকেও সুনির্দিষ্ট করা যায় না। খেলার ছলে হাসি-তামাশাকে নানা অর্থে - নিছক আমোদ মজা থেকে শুরু করে তীব্র সামাজিক সমালোচনা - ব্যবহার করা যায়। পলিটিক্স এর ব্যাখ্যায় কমলাকান্ত দুই রকমের পলিটিক্স দেখেছেন - "এক কুক্কুর জাতীয়, আর এক বৃষ জাতীয়"। জার্মানীর একীকরণের নায়ক বিসমার্ককে তিনি বৃষের দরের পলিটিশিয়ান বলেছেন - যারা বৃহৎ শৃঙ্গ হেলাইয়া বিপক্ষকে ভয় দেখাইয়া আপন স্বার্থ সিদ্ধি করে। আর "কুক্কুর জাতীয় পলিটিশিয়ান হইলেন ইংরেজ রাষ্ট্র নায়ক কার্ডিনাল টমাস উলসি (১৪৭৩-১৫৩৯ আনুমানিক) যিনি রাজা অষ্টম হেনরীর প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে ১৫১৫ সাল থেকে ১৫২৯ সাল অবধি ইংল্যান্ডের সরকার ও চার্চের প্রায় সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। "কুক্কুর" পলিটিসশিয়ান হইলেন অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী, কর্মী এবং কৌশলী কূটনীতিবিদ্। বাঙালীর মনুষ্যত্ব বিষয়ে কমলাকান্ত ব্যঙ্গ করিয়া বলিলেন - "আমি কি একাই ঘ্যান্ ঘ্যানে? তোমার এ বঙ্গভূমে জন্মগ্রহণ করিয়া ঘ্যান ঘ্যান করিব না তো কি করিব? বাঙালী হইয়া কে ঘ্যান ঘ্যানানি ছাড়ে? কোন বাঙালীর ঘ্যানঘ্যানানি ছাড়া অন্য ব্যবসা আছে? এ যেন সেই বহু প্রচলিত "ন্যাগিং বাঙালী"-রই প্রতিচ্ছবি। কমলাকান্ত সার বুঝিয়াছেন, "যদি সভ্য এবং উন্নত হইতে চাও, তবে কাড়িয়া খাইবে"। বর্তমান সময়ের শাসক ও শাসনের বৈধতা প্রসঙ্গে কতকাল আগেই কমলাকান্ত'র করা মন্তব্য - প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। কমলাকান্ত'র থেকে নিজেকে বিযুক্ত করতে চাইলেও এখানেই বঙ্কিমচন্দ্রের সার্থকতা।
ধরা যাক, 'বসন্তের কোকিল'। 'তুমি বসন্তের কোকিল, বেশ লোক, যখন ফুল ফুটে, দক্ষিণ বাতাস বহে, এ সংসার সুখের স্পর্শে শিহরিয়া উঠে, তখন তুমি আসিয়া রসিকতা আরম্ভ কর। আর যখন দারুণ শীতে জীবলোকে থরহরি কম্প লাগে, তখন কোথায় থাকো বাপু? যখন শ্রাবণের ধারায় আমার চালা ঘরে নদী বহে, যখন বৃষ্টির চোটে কাক চিল ভিজিয়া গোময় হয়, তখন তোমার মাজা কালো কালো দুলালি ধরনের শরীরখানি কোথায় থাকে? তুমি বসন্তের কোকিল, শীত বর্ষার কেহ নও" এই লেখা পড়ে কি মনে হয় ১৮৮৯ (দ্বিতীয় সংস্করণ)-র লেখা না বর্তমান মুহূর্তের। সমসাময়িক সময়ের জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদদের এমন রূপের সঙ্গেই তো আমাদের পরিচয়। বঙ্কিমের উপর রুশোর "ভিসকোর্স অন দি অরিজিন অফ ইনইকোয়ালিটি এন্ড সোস্যাল কন্ট্রাক্ট" র প্রভাব ছিল। তাই তিনি মানুষের মৌলিক সমতায় বিশ্বাস করতেন, সমাধান সংকল্প এর কথা ভাবতেন মানুষের মৌলিক চাহিদার। কমলাকান্ত বলতে চেয়েছেন, সমাজ যদি ক্ষুধার্তের অন্ন সংস্থান করতে না পারে, তবে সেই সমাজের নীতি নৈতিকতা বা আইনি কাঠামো অন্তঃসার শূন্য।
"দরিদ্রের আহার সংগ্রহের দন্ড আছে, ধনীর কার্পণ্যের নাই কেন? তুমি কমলাকান্ত, দুরদর্শী কেন না আফিংখোর, তুমিও কি দেখতে পাও না যে, ধনীর দোষেই দরিদ্র চোর হয়? পাঁচশত দরিদ্রকে বঞ্চিত করিয়া একজন পাঁচশত লোকের আহার্য্য সংগ্রহ করিবে কেন? যদি করিল, তবে সে তাহার খাইয়া যাহা বাঁচিয়া পরে থাকে তাহা দরিদ্রকে দিবে না কেন? যদি না দেয়, তবে দরিদ্র অবশ্যই তাহার নিকট হইতে চুরি করিবে; কেন না অনাহারে মরিয়া যাইবার জন্য এ পৃথিবীতে কেহ আইসে নাই"। এই চৌর্যবৃত্তির অধিকার দাবী কি প্রতিরোধ/প্রতিবাদের অধিকারের সমার্থক? দ্য ফিলোসফি অফ নিড অনুযায়ী যদি কোনও ব্যক্তির বেঁচে থাকার জন্য অত্যাবশ্যকীয় কোন সম্পদ (খাদ্য/ওষুধ) অন্যের কাছে মজুত থাকে এবং সেই ব্যক্তি তা পেতে অক্ষম হয় তবে নৈতিকভাবে সেই সম্পদ নেওয়ার একটি অধিকার তৈরী হয়; মানবিকতার দৃষ্টিতে এটি বেঁচে থাকার অধিকার এর প্রয়োগ। কমলাকান্ত বলিল, "রাইট অফ কনকোয়েস্ট যদি রাইট হয়, তবে রাইট অফ্ থেফট কি একটা রাইট নয়?"