আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ পঞ্চদশ সংখ্যা ● ১-১৫ আগস্ট, ২০২৬ ● ১৬-৩২ শ্রাবণ, ১৪৩৩
প্রবন্ধ
অসহযোগের শতবর্ষ পেরিয়ে: আজও কেন প্রাসঙ্গিক মহাত্মা গান্ধীর পথ?
উৎপল সরকার
১৯২০ সালের ১লা অগাস্ট ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন - এক এমন রাজনৈতিক কর্মসূচি, যা অস্ত্রের শক্তির বদলে মানুষের নৈতিক শক্তিকে সংগ্রামের প্রধান ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিল। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবি ছিল না; এটি ছিল আত্মমর্যাদা, ন্যায়বোধ, সত্য এবং অহিংসার উপর প্রতিষ্ঠিত এক সামাজিক ও নৈতিক পুনর্জাগরণের আহ্বান।
গান্ধী উপলব্ধি করেছিলেন, অন্যায় শাসন কেবল শাসকের শক্তিতে টিকে থাকে না; শোষিত মানুষের সহযোগিতাও তাকে টিকিয়ে রাখে। তাই তিনি বলেছিলেন, অন্যায়ের সঙ্গে সহযোগিতা করা অন্যায়কে আরও শক্তিশালী করে। তাঁর আহ্বান ছিল - সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিদেশি পণ্য, উপাধি, আদালত ও শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি অসহযোগ জানিয়ে জনগণ যেন নিজেদের নৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করে। এই ভাবনা ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামকে এক অভূতপূর্ব গণআন্দোলনের রূপ দেয়।
অসহযোগ আন্দোলনের তাৎপর্য আজ কেবল ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। স্বাধীনতার আট দশক পরেও ভারতের গণতন্ত্র, সমাজ এবং রাজনীতির সামনে যে সব প্রশ্ন উপস্থিত, সেগুলির উত্তর খুঁজতে গেলে গান্ধীর দর্শন নতুন করে আলোচনার দাবি রাখে। কারণ সময় বদলেছে, শাসক বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে; কিন্তু সত্য, ন্যায়, মানবিকতা এবং সহিষ্ণুতার প্রয়োজন এখনও শেষ হয়নি।
বর্তমান ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ধর্ম, ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক কিংবা মতাদর্শের ভিত্তিতে বিভাজনের রাজনীতি জনজীবনের নানা স্তরে প্রভাব ফেলছে। রাজনৈতিক মতভেদের পরিবর্তে ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, যুক্তির পরিবর্তে উত্তেজনা এবং সংলাপের পরিবর্তে সংঘাত অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক সম্পর্ককে দুর্বল করে দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণার ভাষা, ভিন্নমতকে দেশবিরোধী বলে চিহ্নিত করার প্রবণতা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের পরিবেশ গণতন্ত্রের সুস্থ বিকাশের পক্ষে শুভ লক্ষণ নয়।
মার্কসীয় বিশ্লেষণে সমাজের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বকে কেবল মতাদর্শগত বিরোধ হিসেবে দেখা হয় না; বরং তার অন্তর্নিহিত শ্রেণি-স্বার্থ, রাষ্ট্রক্ষমতার চরিত্র এবং অর্থনৈতিক ভিত্তির সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করা হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এই কথা অনস্বীকার্য যে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS)-এর প্রচারিত হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ধারণা কেবল একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্ন নয়; এটি এমন এক আদর্শগত কাঠামো, যা সমাজের বহুমাত্রিক শ্রেণিগত বৈষম্য, কর্মসংস্থানের সংকট, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের বাস্তব সমস্যাগুলিকে আড়াল করে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। এই ব্যাখ্যা অনুসারে, পরিচয়ের রাজনীতি যখন সামাজিক চেতনাকে প্রভাবিত করে, তখন শ্রেণি-সংহতির পরিবর্তে ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক বিভাজন গভীর হয় এবং অর্থনৈতিক শোষণের প্রশ্ন অনেক সময় জনপরিসরের আলোচনায় প্রান্তিক হয়ে পড়ে।
মার্কস ও এঙ্গেলস রাষ্ট্রকে শাসক শ্রেণির আধিপত্য রক্ষার একটি ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্লেষণ করেছিলেন। পরবর্তী মার্কসবাদী চিন্তক আন্তোনিও গ্রামশি দেখিয়েছিলেন, কেবল প্রশাসনিক বা দমনমূলক ক্ষমতার মাধ্যমেই নয়, সংস্কৃতি, শিক্ষা, ধর্ম, গণমাধ্যম এবং সামাজিক মূল্যবোধের মাধ্যমেও একটি মতাদর্শ সমাজে প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করে। এই তাত্ত্বিক কাঠামো থেকে সমালোচকদের একাংশের বক্তব্য হল, সংখ্যাগুরু সাংস্কৃতিক পরিচয়কে জাতীয় পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা সামাজিক সম্মতির একটি বিশেষ রূপ নির্মাণ করে, যার ফলে বহুত্ববাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বৈচিত্র্যের ধারণা তুলনামূলকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তাঁদের মতে, এই প্রক্রিয়ায় নাগরিকের পরিচয় ধীরে ধীরে তার শ্রেণিগত অবস্থানের পরিবর্তে ধর্মীয় পরিচয়ের দ্বারা অধিক নির্ধারিত হতে শুরু করে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে ফিরে আসে মহাত্মা গান্ধীর দর্শন। গান্ধীর কাছে ভারত ছিল বহু ধর্ম, বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতির এক যৌথ সভ্যতার নাম। তাঁর কাছে হিন্দু, মুসলমান, শিখ, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, জৈন কিংবা পারসি - কেউই "অন্য" ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার বৈচিত্র্যকে ধারণ করার ক্ষমতার মধ্যেই নিহিত। তাই সাম্প্রদায়িক ঘৃণা যখন সমাজকে বিভক্ত করে, তখন গান্ধীর শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় - দেশপ্রেম কখনও ঘৃণার উপর দাঁড়াতে পারে না।
গান্ধীর অহিংসা ছিল না দুর্বলতার প্রতীক। বরং এটি ছিল নৈতিক সাহসের সর্বোচ্চ প্রকাশ। তিনি জানতেন, অস্ত্র দিয়ে মানুষকে ভয় দেখানো যায়, কিন্তু হৃদয় জয় করা যায় না। আজ যখন মতভেদকে অনেক সময় শত্রুতার সমার্থক হিসেবে তুলে ধরা হয়, তখন গান্ধীর দর্শন শেখায় - প্রতিপক্ষকে ধ্বংস নয়, তাকে বোঝার চেষ্টা করাই সভ্যতার লক্ষণ। বিরোধী মতকে সম্মান করা, সংলাপের মাধ্যমে সমাধান খোঁজা এবং সহমর্মিতাকে রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ করে তোলাই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।
বর্তমান সময়ে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো সত্যের সংকট। গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার সমাজকে বিভ্রান্ত করে। গান্ধীর "সত্যাগ্রহ" কেবল রাজনৈতিক আন্দোলনের কৌশল ছিল না; এটি ছিল সত্যকে নিরন্তর অনুসন্ধানের এক নৈতিক অঙ্গীকার। তিনি বিশ্বাস করতেন, সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে হলে আত্মসমালোচনা, সততা এবং নৈতিক সাহস অপরিহার্য। এই শিক্ষা আজকের তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সমাজেও সমান প্রাসঙ্গিক।
গান্ধী অর্থনৈতিক বৈষম্য সম্পর্কেও গভীরভাবে চিন্তা করেছিলেন। তিনি এমন উন্নয়নের কথা বলেছিলেন, যার কেন্দ্রে থাকবে সাধারণ মানুষ। আজকের ভারতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি বেকারত্ব, কৃষকের অনিশ্চয়তা, পরিবেশ সংকট এবং সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার সুফল সমাজের প্রান্তিক মানুষ পর্যন্ত পৌঁছায়। এই দৃষ্টিভঙ্গিও গান্ধীর ভাবনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
গান্ধীর জীবনের শেষ অধ্যায়ও আমাদের কাছে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত তাঁকে নাথুরাম গডসে নামক এক উগ্র হিন্দুত্ববাদী আততায়ীর গুলির সামনে দাঁড় করিয়েছিল। কিন্তু তাঁর মৃত্যু তাঁর আদর্শকে হত্যা করতে পারেনি। বরং সেই ঘটনাই ইতিহাসের কাছে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে ঘৃণা সাময়িকভাবে একজন মানুষকে হত্যা করতে পারে, কিন্তু মানবতার আদর্শকে মুছে দিতে পারে না।
আজ ভারতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলির একটি হলো সংবিধানের মৌলিক চেতনা - ন্যায়, স্বাধীনতা, সাম্য এবং ভ্রাতৃত্ব - বাস্তবে কতটা রক্ষা করা যাচ্ছে। সংবিধানের এই মূল্যবোধগুলির সঙ্গে গান্ধীর চিন্তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। যদিও সংবিধান রচনার ক্ষেত্রে বহু মনীষীর অবদান ছিল, তবু ভারতকে একটি বহুত্ববাদী, মানবিক এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার নৈতিক ভিত্তি নির্মাণে গান্ধীর প্রভাব অনস্বীকার্য।
অসহযোগ আন্দোলনের মূল শিক্ষা ছিল - অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা, কিন্তু মানুষের বিরুদ্ধে ঘৃণা নয়; শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই, কিন্তু প্রতিহিংসাপরায়ণতা নয়; ক্ষমতার সমালোচনা, কিন্তু মানবিকতার ভিত্তি হারিয়ে নয়। এই দর্শন আজও ভারতের জন্য প্রাসঙ্গিক। কারণ যে সমাজ নিজের ভিন্নতাকে সম্মান করতে শেখে, সেই সমাজই দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও উন্নয়নের ভিত্তি নির্মাণ করতে পারে।
ইতিহাস আমাদের কেবল অতীতের স্মৃতি দেয় না; ভবিষ্যতের পথও দেখায়। ১৯২০ সালের অসহযোগ আন্দোলন সেই পথেরই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আজ যখন অসহিষ্ণুতা, মেরুকরণ এবং অবিশ্বাসের নানা প্রশ্ন ভারতের জনজীবনকে স্পর্শ করছে, তখন মহাত্মা গান্ধীর সত্য, অহিংসা, সহিষ্ণুতা এবং সর্বধর্ম সমন্বয়ের দর্শন নতুন করে অনুধাবন করা জরুরি। কোনও রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে যদি ভারত তার সাংবিধানিক আদর্শকে শক্তিশালী করতে চায়, তবে গান্ধীর শিক্ষা কেবল স্মরণ করার বিষয় নয়; তা দৈনন্দিন নাগরিক চর্চার অংশ হওয়াই সময়ের দাবি। অসহযোগ আন্দোলনের শতবর্ষ-অতিক্রান্ত এই উত্তরাধিকারের প্রকৃত সম্মান সেখানেই - যেখানে মতভেদ থাকবে, কিন্তু ঘৃণা নয়; প্রতিবাদ থাকবে, কিন্তু সহিংসতা নয়; আর ভারতবর্ষ থাকবে তার বহুত্ববাদী আত্মাকে ধারণ করে।