আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ পঞ্চদশ সংখ্যা ● ১-১৫ আগস্ট, ২০২৬ ● ১৬-৩২ শ্রাবণ, ১৪৩৩

প্রবন্ধ

জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে বর্ণ-পরিচয়

শ্রীদীপ ভট্টাচার্য


আমি ক্ষমতাশালী, তাও আমিই দুর্বল

বহু শতাব্দীর আধিপত্য সত্বেও, আজ অতি আশ্চর্যজনকভাবে নাকি সংকটের মুখে 'ব্রাহ্মণ্যবাদ'। ব্রাহ্মণ্যবাদী সত্তা ও শক্তিকে গৌরবান্বিত করার প্রয়োজন হচ্ছে - ব্রাহ্মণ্যবাদী সংহতির আহ্বানে। সম্প্রতি সেই আশঙ্কারই প্রকাশ ঘটেছে - উচ্চবর্ণ-পরিচয়ের অহরহ ঘোষণার মাধ্যমে। সেই ঘোষণা চোখে পড়ছে চলমান গাড়ির পেছনে; 'ব্রাহ্মণ-জিন' লেখা স্টিকারের মাধ্যমে; জাতিভিত্তিক সংরক্ষণের বিরোধিতার মধ্য দিয়ে; এবং স্ববর্ণ 'জাতি' ও 'মেধার' মধ্যে সম্পর্ক টেনে। ব্রাহ্মণ্যবাদ 'মেধা'-র মালিকানা দাবি করতে চায়, বা করে এসেছে, এই বলে বা এই ভাবে যে 'মেধা' একচেটিয়া তাদেরই - যদিও সামাজিক ন্যায়বিচারের নৈতিক দায়ভার অস্বীকার করাটাও তাদের মজ্জাগত।

সামাজিক ও ঐতিহাসিক শর্তগুলি - যা নির্মম ও নিশ্চিত ভাবেই উচ্চবর্ণের পক্ষে - তা 'মেধা'-কে পুনরুৎপাদন ও পুনর্নির্মাণ করে। যদিও যারা ব্রাহ্মণদের নিপীড়িত আকারে তুলে ধরতে আগ্রহী, তাদের কাছ থেকে সেই নিপীড়নের কাঠামো সম্পর্কে সমালোচনামূলক অবস্থান প্রত্যাশা করাই অনুচিত। ক্ষমতা, সম্পদ ও সুবিধার সিংহভাগ, সহস্র বছর ধরে কুক্ষিগত করে রাখার পরও, ব্রাহ্মণ্যবাদ নাকি আজ ভীষণ নিরাপত্তাহীনতার শিকার। উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন চাকরির অতীব সামান্য অংশ অন্যদের সঙ্গে ভাগ করার জন্য নাকি, তাদের কর্মসংস্থান নিরাপদ নয়। ঔপনিবেশিক-পূর্ব যুগে, জ্ঞানচর্চার ওপর প্রায় সম্পূর্ণ একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পরও, ব্রাহ্মণ্যবাদ আজ 'ঘুরে দাঁড়ানোর' ডাক দিচ্ছে। 
শতাব্দীর পর শতাব্দী অন্যের দান, শ্রম ও সেবার ওপর নির্ভর করে বিশেষ সুবিধাভোগী জীবনযাপন করার পরও, এই সুবিধাভোগী ব্রাহ্মণ্যবাদ, আজ এক অদৃশ্য বঞ্চনার আশঙ্কায় ভুগছে - কারণ জাতগণনা হয়তো ক্ষমতার ও বিশেষাধিকারের প্রকৃত ও অসম-বণ্টন-চিত্র উন্মোচিত করতে পারে। বিশেষাধিকারভোগী ব্রাহ্মণ্যবাদ, এমন যেকোনো উদ্যোগকে ঘৃণা করে, যা অন্যদের বঞ্চনার বিনিময়ে সঞ্চিত বিশেষাধিকারকে সংখ্যার ভাষায় দৃশ্যমান করে তুলতে পারে। জাতগণনা সেই বৈষম্য, অসম বণ্টন ও ক্ষমতার অসামঞ্জস্যপূর্ণ কাঠামোকে পরিসংখ্যানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। তখন, সংরক্ষণের পরিধি সম্প্রসারণ ও তা আরও বিস্তৃত করার দাবিও নতুন বৈধতা পাবে। এই কারণেই ব্রাহ্মণ্যবাদ জাতগণনার বিরোধিতা করে।

আমিই যোগ্য; বাকিরা অযোগ্য

ব্রাহ্মণ্যবাদ 'কোটার' মানুষদের নিয়ে এতটা আচ্ছন্ন কেন? কেন তাদের বিশ্বাস, এই তথাকথিত 'অযোগ্য' কোটার-মানুষেরাই - গত সাত দশক ধরে - সমস্ত চাকরি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, তাদের আসন কেড়ে নিচ্ছে? শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সম্পদ, সুযোগ ও বিশেষাধিকার কুক্ষিগত করে রাখার ইতিহাসের সঙ্গে কি মাত্র সত্তর বছরের ইতিবাচক-বৈষম্য (affirmative action)-এর তুলনা - আদৌ করা যায়? উচ্চবর্ণের এই ভ্রান্ত আতঙ্ক - যে তথাকথিত অযোগ্য 'কোটার-প্রার্থী'রা নাকি বিনা পরিশ্রমে সবকিছু পেয়ে যাচ্ছে, আর সাধারণ বিভাগের প্রার্থীরা কঠোর পরিশ্রম করেও শুধুমাত্র 'কোটা'-র কারণে পিছিয়ে পড়ছে - সেটা খণ্ডন করার জন্য একটি সাধারণ তথ্য-যাচাইই যথেষ্ট। এই উচ্চবর্ণীয় মানসিকতা যেন ইচ্ছে করেই ভুলে যায় যে সংরক্ষণের আওতায় থাকা সরকারি চাকরি ও সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা, দেশের মোট কর্মসংস্থানের তুলনায় খুবই সামান্য। কর্মসংস্থানের বিপুল অংশই বেসরকারি ক্ষেত্র এবং বিশাল অসংগঠিত শ্রমবাজার নিয়ে। দেশের সেই পঁচানব্বই শতাংশেরও বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ, প্রায় পুরোটাই সংরক্ষণের আওতার বাইরে। কিন্তু ব্রাহ্মণ্যবাদী দৃষ্টিকোণ, এই মৌলিক বাস্তবতার প্রতিই উদাসীন থাকতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কারণ পেয়ে পেয়ে বা কেড়ে কেড়ে - তারা আরো আরো পেতে এবং কাড়তে অভ্যস্ত।

আধুনিক সাম্যবাদী আদর্শের এত প্রবল বিরোধিতা আর কোনো সামাজিক প্রতিষ্ঠান করেনি, যতটা করেছে ব্রাহ্মণ্যবাদী জাতিপ্রথা। জন্মনির্ধারিত সামাজিক ভূমিকা, অন্তর্বিবাহ এবং দৈনন্দিন পারস্পরিক ঘৃণা ও দূরত্বকে স্বাভাবিক ও বৈধ বলে প্রতিষ্ঠা করে - এই বিভেদী সমাজব্যবস্থা, সামাজিক বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। বহুকাল ব্যাপী। সেখান থেকে বেড়িয়ে আসা সম্ভব হলেও; সহজ নয়। এটি এমন এক নিপীড়নমূলক সামাজিক কাঠামো, যা বরাবরই শ্রেণিবিন্যাসের উচ্চ ও মধ্যস্তরে অবস্থানকারীদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব জাহির করে - বিশেষত তাদের প্রতি, যারা ঐতিহাসিকভাবে জমি ও অন্যান্য সম্পদের মালিক। তারাই আবার নিজেদের জাত-পুঁজিকে, আধুনিক দক্ষতা ও তথাকথিত পরিচ্ছন্ন জীবিকায় রূপান্তরিত করতে সফল হয়েছে। আর সেই রূপান্তরের পর, নিজেদের ক্ষমতা-সুবিধে-সম্পদ গুছিয়ে নিয়ে, উচ্চবর্ণ আজ অনায়াসে দাবী করেছে যে আধুনিক ভারতে 'জাতি' বিলুপ্ত এবং যারা জাতির ভিত্তিতে অধিকার, আসন ও সম্পদের অধিক অংশ চাইছে, তাদের দাবি ন্যায্য নয় কারণ তারা অযোগ্য; অথবা তারা জাতি-ভিত্তিক বিভাজনের রাজনীতি করছে। প্রতিরোধকে দৃষ্টির অগোচরে নিয়ে যাওয়ার সব থেকে সহজ উপায় হল, তাকে নাকচ করে তার প্রতি নিস্পৃহ থাকা। বলা বাহুল্য, সেই সুবিধে কেবল সুবিধাপ্রাপ্ত উচ্চজাতির মানুষেরই দখলে।

তাই যারা এখনও ক্ষমতা, সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধার ন্যায্য অংশ দাবি করার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের অগ্রগতি ব্রাহ্মণ্যবাদীকে বিচলিত করে। তাই প্রয়োজন হয় - জোর গলায় - অপরকে অযোগ্য বলে ঘোষিত করা। ব্রাহ্মণ্যবাদীকে, নিজের পরিচয় জাহির করতে আজ যদি স্টিকারের প্রয়োজন পড়ে - সেটা কি সেই একই আচরণেরই পুনরাবৃত্তি নয়, যা ব্রাহ্মণ্যবাদীরা যুগের পর যুগ ধরে করে এসেছে: শরীরে নানারকম চিহ্ন ধারণ করে নিজেদের অন্যদের থেকে পৃথক ও উচ্চতর হিসেবে চিহ্নিত করা?

আমারই অধিকার; বাকিরা অবৈধ

'প্লেয়িং-ফিল্ড' কোনোদিনই সমতল ছিল না; আর তা আজও সমান নয় বা সমান নেই। 'মেধা', অন্য যেকোনো অর্জিত সম্পদের মতোই, কখনোই সবার মধ্যে সমানভাবে বণ্টনের জন্য নির্মিত নয়। বরং 'মেধা'কে এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যাতে 'অপর'-কে অযোগ্য ও অবৈধ প্রমাণ করা যায়। উদাহরণ হিসেবে Gilli Pucchi চলচ্চিত্রের, ভারতী চরিত্রটির কথা বলা যায়। সেখানে দেখা যায়, একজন দলিত শ্রমিকের পক্ষে সমস্ত প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও, তার চাকরিতে উত্তরণ প্রায় অসম্ভব। বিপরীতে, উচ্চবর্ণের এক নারী, যার যোগ্যতার কোনো প্রমাণই নেই, তাকেই সেই কাজের জন্য অধিক উপযুক্ত মনে করে মালিক। অর্থাৎ, পরিচ্ছন্ন ও মর্যাদাপূর্ণ কাজের ওপর একজন দলিতের দাবি, সামাজিকভাবে অবৈধ বলে প্রতিপন্ন করা হয়।

'অপর'-কে খারিজ করে দেওয়া ব্রাহ্মণ্যবাদের এক মৌলিক বৈশিষ্ট্য। এই ব্রাহ্মণ্যবাদী- প্রবণতা, কেবল ব্রাহ্মণদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি জাতপ্রথার কাঠামোর মধ্যে প্রোথিত - শ্রেষ্ঠত্ববোধের এক সামাজিক ব্যাধি। নিজেদের সমকক্ষদের তুলনায় শ্রেষ্ঠ এবং নিজেদের ঊর্ধ্বতনদের সমতুল্য প্রমাণ করার জন্য, সামাজিক কৌশলের মাধ্যমে এ প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। জাতপ্রথার কাঠামো, সম্পদের ন্যায্য অংশীদারিত্বকে অনুমোদন করে না। সমকালীন তামিল জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রান্তিক মানুষের সহিংস প্রতিরোধ, বারবার এমন সব সম্পদকে ঘিরেই গড়ে ওঠে - যেগুলির ওপর তাদের ঐতিহাসিক অধিকার দীর্ঘদিন ধরে অস্বীকার করা হয়েছে। জমি, জল কিংবা শিক্ষার অধিকার - এই ধরনের দাবি উত্থাপিত হলেই, সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে।

কেন শিক্ষা, কেন সংরক্ষণ?

Asuran (২০১৯) চলচ্চিত্রের সূচনাই ঘটে জলকে কেন্দ্র করে এক সংঘাতের মাধ্যমে। সেচের জন্য বৈদ্যুতিক-পাম্প বসানো প্রভাবশালী জাতির মানুষজন, সম্পূর্ণ উদাসীন থাকে এই সত্যটির প্রতি যে ভূগর্ভস্থ জল একটি যৌথ সম্পদ; তাদের এই পাম্প বসানোর ফলে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর নেমে যাবে এবং অন্যদের প্রাপ্য জলও কমে আসবে। তাদের ক্ষমতার অহং এবং অধিকারের স্বভাব কোনো জায়গা ছাড়ে না অপরের প্রতি ন্যূনতম সংবেদনশীলতা বা সহমর্মিতা পোষণ করতে। জল নিয়ে এই বিরোধের সাময়িক নিষ্পত্তি হয় তথাকথিত 'নীচু' জাতের মানুষদের, উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে। তাদের একজনকে, তার জুতো খুলিয়ে, একে একে সমস্ত উচ্চবর্ণের পরিবারের সামনে গিয়ে মাথা নত করে, ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়। চলচ্চিত্রের শেষদিকে নিপীড়িত নায়ক তাঁর ছেলেকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ উপদেশ দেন: শিক্ষা অর্জন করো। ওরা জমি কেড়ে নিতে পারে, টাকা ছিনিয়ে নিতে পারে, কিন্তু অর্জিত শিক্ষা, তোমারই থাকবে। এই কারণেই, ব্রাহ্মণ্যবাদের অন্তর্নিহিত প্রবণতা, শিক্ষা অর্জনের পথকে, যতটা সম্ভব দুর্গম ও অপ্রবেশযোগ্য করে তোলা।

Pariyerum Perumal (২০১৮) চলচ্চিত্রের শুরুতেই আমরা দেখি এক দীর্ঘ ও নির্মম শাস্তির দৃশ্য। দলিত পরিবারের একটি কুকুরকে, রেললাইনের ওপর বেঁধে রাখা হয়, যাতে ট্রেনের নিচে পিষ্ট হয়ে সে মারা যায়। এই নিষ্ঠুর প্রদর্শনের উদ্দেশ্য একটাই: দলিতদের তাদের আওকাদ বুঝিয়ে দেওয়া - কারণ তারা সেই জমিতে প্রবেশ করেছে, যা একসময় তাদেরই ছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে উচ্চবর্ণের মানুষ তা দখল করে নিয়েছে। এই চলচ্চিত্রেও শিক্ষাকেই মুক্তির পথ হিসেবে দেখানো হয়েছে। অধীনতা, বঞ্চনা ও অপমানের চক্র থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র বৈধ উপায় - শিক্ষা। কিন্তু সেই শিক্ষাব্যবস্থাও এমনভাবে গঠিত, যা ক্ষমতাশালী ও সুবিধাভোগী জাতিগুলির পক্ষেই কাজ করে; ফলে প্রথম-প্রজন্মের একজন দলিত শিক্ষার্থীর পক্ষে, উচ্চশিক্ষা সম্পূর্ণ করাই - এক কঠিন সংগ্রাম।

শিক্ষা যদি সামাজিক ঊর্ধ্বগামিতার অন্যতম মূল বৈধ মাধ্যম হয়, তবে সেটি যে প্রবলভাবে বিরোধপূর্ণ এক ক্ষেত্র হয়ে উঠবে - তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই। তাই বিদ্যমান ক্ষমতার ভারসাম্য অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং সামাজিক গতিশীলতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে, ভর্তির অধিকার যাতে কেবল 'মেধা'-র উত্তরাধিকারীদের জন্যই সংরক্ষিত থাকে - এমনই এক ব্রাহ্মণ্যবাদী যুক্তি কাজ করে। অন্যদের পথ রুদ্ধ করতে, রীতিগত বিভাজন ও বঞ্চনাকে - প্রতিটি স্তরে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হয়। চলচ্চিত্রের শেষে, নিপীড়িত নায়ক গভীর আক্ষেপের সঙ্গে বলে, 'আপনি যদ্দিন আপনার মতোই থাকবেন, আর আমাকে থাকতে হবে আপনার বাধ্য কুকুর হয়ে, তদ্দিন কিছুই বদলাবে না।' অন্যকে চিরকাল অধীনস্থ, অনুগত ও বশ্যতাস্বীকারকারী হিসেবে দেখতে চাওয়ার এই মানসিকতাই - ব্রাহ্মণ্যবাদী মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

Maamannan (২০২৩) চলচ্চিত্রে দলিত শিশুদের, পাথর দিয়ে মাথা থেঁতলে হত্যা করা হয়, কারণ তারা এমন একটি কুয়োয় স্নান করেছিল - যা উচ্চবর্ণের জন্য সংরক্ষিত। পরবর্তীকালে, বেঁচে যাওয়া শিশুদের একজন, নতুন এক সংঘাতের মুখোমুখি হয়, যখন প্রভাবশালী জাতির নেতা, তার বাবাকে চেয়ারে বসার অধিকার অস্বীকার করে। অন্যদিকে, Karnan (২০২১) চলচ্চিত্রে এই সংঘাত আরও গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য লাভ করে। সেখানে নায়ক, তাদের দলিত গ্রামের জন্য বাসস্টপের দাবি, উচ্চবর্ণের মানুষকে যতটা না ক্ষুব্ধ করেছে, তার চেয়েও বেশি আঘাত করেছে এই সত্য যে তারা মাথা উঁচু করে প্রতিরোধ করতে শিখেছে। উচ্চবর্ণের অহংকারে আঘাত হানে এই আত্মমর্যাদাবোধ ও প্রতিরোধের মনোভাব।

জাতিগত দূরত্বের সবচেয়ে সূক্ষ্ম ও মর্মস্পর্শী প্রকাশটি, এক ধরনের পরিহাসের মধ্য দিয়েই, দেখা যায় Bheed (২০২৩) চলচ্চিত্রে। সেখানে এক দলিত পুরুষ পুলিশ-অফিসার এবং তার ঊর্ধ্বতন উচ্চবর্ণীয় কন্যার মধ্যে প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অন্তরঙ্গ মুহূর্তে, পুলিশ অফিসারটি বলে: "তোমাকে ছুঁতে গিয়ে আমার হাত কাঁপে। ন্যায়বিচার সবসময় শক্তিশালীদের হাতেই ছিল তো; সেই ন্যায়বিচার যদি দুর্বলদের হাতে চলে আসে, তবে তা অন্য রকমের ন্যায়বিচার হবে।" প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জাতপ্রথা - দূরত্ব, বর্জন, বিভাজন, বঞ্চনা, আধিপত্য এবং অমানবিকীকরণকে - মানুষের চেতনার কত গভীরে প্রোথিত করেছে, তারই বহিঃপ্রকাশ এই কাঁপা স্পর্শ। সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদা অর্জনের পরও সেই স্পর্শ কেঁপে ওঠে - কারণ সেটি শেষ পর্যন্ত এক 'নিম্নজাতের' স্পর্শ। সেই হাত আজ স্পর্শ করার অনুমতি পেলেও, ন্যায়বিচার যেন এখনও সেই হাতের মাধ্যমে কার্যকর হয়ে ওঠেনি।

এই প্রসঙ্গে, Article 15 (২০১৯) চলচ্চিত্রটি আমাদের সামনে যে প্রশ্নটি উত্থাপন করে, তা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক: নিচু জাতির মানুষ কি আদৌ জাতি-সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত? নাকি তাদের অধিষ্ঠান, সেই সংজ্ঞার বাইরে। যে রাষ্ট্র, দলিত নর্দমা-পরিষ্কারক শ্রমিকদের, ন্যূনতম নিরাপত্তা-সরঞ্জাম পর্যন্ত দিতে ব্যর্থ, সেই রাষ্ট্রই আবার Court (২০১৪) চলচ্চিত্রে এক সমাজকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে যে, তাঁর লেখা নাকি সাফাই কর্মীদের আত্মহত্যায় প্ররোচিত করেছে! নিজের ব্যর্থতা আড়াল করে, দায় চাপিয়ে দেওয়ার এই প্রবণতা এবং প্রান্তিক মানুষের 'তুচ্ছ' মৃত্যুকে গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দেওয়াই - ব্রাহ্মণ্যবাদী বৈশিষ্ট্য।