আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ পঞ্চদশ সংখ্যা ● ১-১৫ আগস্ট, ২০২৬ ● ১৬-৩২ শ্রাবণ, ১৪৩৩
প্রবন্ধ
"শুধু শরীর শরীর..." এবং "ক্ষোভের যোগ্য" ধর্ষণের ইতিবৃত্ত
সোহম ভট্টাচার্য
"দেহপট সনে...": ধর্ষণের দেহ এবং প্রতিবাদের রাজনীতি
২০২৪ সালের আগস্ট মাসে আরজি কর মেডিকেল কলেজে ৩১ বছর বয়সী একজন জুনিয়ার ডাক্তারের ধর্ষণ ও হত্যা এবং ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বারুইপুরে ১২ বছর বয়সী একটি মেয়ের প্রতি সংঘটিত নৃশংস অত্যাচারের পর এই রাজ্যে এক অংশের মানবিক জনরোষ এবং আন্দোলন দেখা গিয়েছে। এই রোষ, কিংবা এই প্রতিবাদকে শুধুমাত্র সামগ্রিক বাঙালীর নৈতিক আতঙ্কের "স্বাভাবিক" ও "স্বতঃস্ফূর্ত" প্রকাশ রূপে দেখলে সামান্য ভুল হবে। সেই 'সামান্য ভুলের' দিকে তাকিয়েই এই লেখার অবতারণা।
এই ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়াগুলি নির্বাচিত। মূলত একটি "ন্যায্য জগৎ" (ইংরেজিতে মেল্ভিন লারনার যাকে বলছেন 'জাস্ট ওয়ার্ল্ড') এর ধারণাটি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। এই লেখা জুড়ে আমি চেষ্টা করব একটি প্রস্তাবনা তুলে ধরতে: বাঙালি মধ্যবিত্ত পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তখনই তীব্রভাবে ক্ষুব্ধ হয় এবং আন্দোলিত হয় যখন লঙ্ঘিত দেহটিকে পিতৃতান্ত্রিক-পুঁজিবাদী ব্যবস্থার জৈবিক ও সামাজিক শ্রম পুনরুৎপাদনের চক্রের ধারণায় রাখা সম্ভব হয়। আরেকটু খারাপ শোনাবে হয়ত, ধর্ষণ তখনই চূড়ান্ত রাগের উৎপাদন ঘটাবে যখন কোনও না কোনওভাবে নারী-দেহটিকে "কার্যকরী" বা "সম্ভাব্য কার্যকরী" হিসেবে দেখা যায়। ভেবে দেখুন, "মা-বোনেদের" দেহের কার্যকারিতা আর "ঠাকুমা-দিদিমা"দের দেহ-কে। কেন বারংবার মা-বোনেদের কিংবা গৃহস্থালির নারীদেহের ধারণাটি বাঙালি মননে দাগ কেটে যায়? সামগ্রিক কারণ অনেকগুলি, কিন্তু এই নিবন্ধে আমি শুধুমাত্র নারীদেহের কার্যকারিতার প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করব।
নারীদেহের এই কার্যকরী কিংবা কার্যকরী সম্ভাব্যতার আভাস দিয়েছেন, জুডিথ বাটলার। বিভিন্ন সামজিক ক্ষেত্রে মৃতদেহের সাথে যুক্ত সামাজিক বিশ্লেষণের দেখার চেষ্টা করছেন, তাঁর মূল প্রশ্ন, "কোন দেহগুলি "শোকের যোগ্য" (grievable) হবে এবং সমাজের কাছে "গুরুত্বপূর্ণ বিষয়" (matter) বলে গণ্য হবে? জুডিথ লিখছেন, এটি কোনও অবশ্যম্ভাবীভাবে স্বাভাবিক বা স্বতঃপ্রণোদিত ঘটনা নয়। এমনকি এই কেঁদে উঠে ক্ষোভ উগড়ে দেওয়া সমাজের কোনও অন্তর্নিহিত মানবিক গুণ নয়। বরং এই শোকের আয়ু এবং প্রকাশটি রাজনৈতিক। এই রাজনীতির সাথে সেই সমাজের এবং সমাজের উচ্চকোটির পুরুষের চোখে নারীদেহের জৈবিক পুনরুৎপাদন কিংবা শ্রম পুনরুৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
শোকের নিয়ন্ত্রক সেই আদর্শ এবং সামাজিক কাঠামোর সাথে যুক্ত, যে কাঠামো কিছু দেহকে সামাজিক ভাবে উপযোগী (তাই ব্যবহারযোগ্য) এবং সেই দেহগুলিকে বোধগম্য মনে করে। সেই দেহকেই জীবন্ত ও মূল্যবান করে তোলে, আর অন্য দেহগুলোকে অদৃশ্য ক্লীবের মত বা "অবাস্তব" করে ফেলে। এই প্রক্রিয়ায় দেহের "কার্যকারিতা" (functionality) হয়ে ওঠে তার মূল মাপকাঠি। মেয়েদের জন্য আজও তাই একটি দেহ তখনই পুঁজিবাদী পিতৃতান্ত্রিক সমাজের চোখে 'মানবিক' প্রশ্ন রূপে গণ্য হয়, যখন সে সন্তান ধারণ করতে পারে (ভবিষ্যৎ শ্রমশক্তি নিশ্চিত করে), কিংবা পারিবারিক কাজ বা বিনামূল্যে সেবার শ্রম সম্পাদন করতে পারে (শ্রমশক্তির সামাজিক পুনরুৎপাদন)। কিংবা ধরুন এই দুটি কাজ না পারলেও (কিংবা এই দুটি সমেত) দেহটি যেন পিতৃতান্ত্রিক পরিবার-কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে পারে। সে যেন কার্যকরী দেহের 'মানবিক' আদর্শের কাঠামোকে প্রশ্ন না করে।
আরজিকর হাসপাতালের ঘৃণ্যতার শিকার ডাক্তার মেয়েটি এই "শোক- যোগ্যতার" মাপকাঠিতে তাই পুরোপুরি যোগ্য। তিনি ছিলেন কর্মক্ষম বয়সের এবং রাজ্যের রাজধানী কলকাতায় রাতের ডিউটিতে নিয়োজিত একজন পেশাদার। তাঁর দেহ একদিকে জৈবিক সম্ভাবনা বহন করছিল, উৎপাদনের কাজে যুক্ত ছিল, এবং অন্যদিকে শ্রমের সামাজিক পুনরুৎপাদনের কাজেও তার সম্ভাবনা ছিল। তাঁর কর্মক্ষেত্রে এই লঙ্ঘন তাই সমাজের একটি বড় অংশের কাছে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। তোর্সা সাহা এবং আমার (সাহা এবং ভট্টাচার্য, ২০২৫) একটি পূর্বতন লেখায়, আমরা গত দেড় দশকের তৃনমূল আমলের পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে কর্মক্ষম নারীদের ওপর একটি নিষ্ঠুর কিন্তু প্রায়শই দেহ-ভিত্তিক অদৃশ্য আস্ফালনের ইঙ্গিত লক্ষ্য করেছিলাম।
সেইক্ষেত্রে রাষ্ট্র প্রথমে মৃত্যুটাকে আত্মহত্যা বলে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। পরে যখন "রাত দখল" আন্দোলন শুরু হয়, তখন সেই চাপা দেওয়া আর সম্ভব হয়নি। একই যুক্তি বারুইপুরের ১২ বছর বয়সী মেয়েটির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, তবে সামান্য ভিন্ন রূপে। তার দেহকে "ভবিষ্যতের সম্ভাবনা" হিসেবে দেখা হয়েছে। শুধুমাত্র "আহারে ওইটুকু মেয়ে" কথাটি এখানে সহমর্মের না। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে সে সন্তান নেবে, কিংবা পরিবার গড়বে কিংবা সমাজের প্রজননমূলক ও সামাজিক পুনরুৎপাদনমূলক শ্রমের চাহিদা পূরণ করবে। এই প্রত্যাশার অপমৃত্যুটুকু ঘিরে এত ক্ষোভ। তাই তার ওপর অত্যাচার দেখে ক্ষোভ তীব্র হয়েছে, কিন্তু সেই ক্ষোভের মূল আখ্যানঃ প্রায়শই "সুরক্ষা" ও " মেয়েটির পবিত্রতা"র আখ্যানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। প্রসঙ্গত মনে আসে, শোভেন্দ্র শেখর হাঁসদার (আদিবাসী উইল নট ডান্স) গল্প সংকলনের একটি গল্প। সেখানে এক আদিবাসী মহিলাকে এক সেনা জওয়ান, স্টেশনের পাশে যৌন প্রস্তাব দেয়। বিনিময়ে দুটি 'ব্রেড পকোড়া এবং একটি পঞ্চাশ টাকার নোট'। তাবৎ উচ্চকোটির বাঙালির (এবং উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে) দিনের পর দিন বালি খাদানে, চা-বাগানে, কিংবা ক্ষেতের কাজ সেরে ফেরা শ্রমিক-নারীর দেহটির লঙ্ঘনকে যথেষ্ট 'শোকযোগ্য' মনে হয় না কেন? কেন দিনের পর দিন শপিং মলে ১০ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা ঠিকা কাজে লিপস্টিক বিক্রি করা মেয়েটির বাথরুম যাওয়ার অনুমতি না থাকা এবং সেই সূত্রে তাঁর দেহের দৈনিক ক্ষয় 'রেগে ওঠার' প্রতিবাদে পরিণত হয় না? কারণ মেয়েদের কোমর কিংবা পা কিংবা শারীরিক সমস্ত অংশ আসলে 'পবিত্রতার' কিংবা 'সুরক্ষার' দাবি রাখে না। তার 'স্তন' কিংবা 'যোনি' যেহেতু যৌন এবং জৈবিক উৎপাদনের সম্ভাব্যতা নিয়ে আসে, সেই অঙ্গের লঙ্ঘনে রেগে ওঠা একটি মৌলিক কর্তব্য। ৮ জুলাই ২০২৬-এ অভিযুক্তকে এনকাউন্টারে হত্যা করার পর বিজেপি নেতারা একে "আত্মরক্ষা" বলে সমর্থন করেছেন, আর বিরোধী কণ্ঠস্বর একে "জঙ্গলের আইন" বলে সমালোচনা করেছেন।
কিন্তু মূল প্রশ্নটি এখানেই "ন্যায্য জগৎ" বিশ্বাসের মৌলিক ফাঁকিটা তুলে ধরে। এই বিশ্বাস সমাজকে বিশ্বাস করায় যে, "যোগ্য" দেহগুলোর জন্য ন্যায় হয়, আর বাকিদের ক্ষেত্রে নীরবতা বা নির্বাচিত প্রতিক্রিয়াই যথেষ্ট। "আপাতত শান্তিকল্যাণ"।
এনকাউন্টার-ব্যবস্থা ও "কার্যকরী দেহ" নির্বাচনের রাজনীতি
বিজেপি আমলের (উত্তর প্রদেশ খ্যাত) এই এনকাউন্টার-ব্যবস্থাটি আসলে উপরোক্ত "দেহ কার্যকারিতা" যুক্তিরই একটি সম্প্রসারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ। আমাদের দেশে বহির্বিচারিক হত্যার পাঠ এবং বিশ্লেষণ দেখায় যে, এ ধরনের ঘটনা পুলিশকে বিচারক, জুরি ও জহ্লাদ - সবকিছুর জায়গা করে দেয়। সিনেমাটিক বীরত্বের আখ্যান ও জনসমর্থন এই প্রক্রিয়াকে টিকিয়ে রাখে। স্বাভাবিকভাবেই তাই এই এনকাউন্টার ব্যবস্থা আইনের শাসনকে ক্ষয় করে (ভার্গব ও কুমার, ২০২১)।
ঠিক এই ক্ষেত্রে আমাদের একটু অনুপুঙ্খ আয়াসের প্রয়োজন। যখনই কোনো "প্রতীকীভাবে মূল্যবান" ভিক্টিম কিংবা ধর্ষিতার (যেমন কর্মক্ষম ডাক্তার বা নাবালিকা মেয়ে) ওপর অত্যাচার হয়, তখন এনকাউন্টারের মাধ্যমে "তাৎক্ষণিক ন্যায়বিচার" দেখানো গেল। এতে জনমনে এক ধরনের মানসিক স্বস্তি আসে। কিসের স্বস্তি? অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, আমাদের ক্ষোভের "গুরুত্ব" স্বীকৃত হয়েছে, আর মধ্যবিত্ত সমাজ তাঁদের "ন্যায্য জগৎ" বিশ্বাসটিকে বজায় রাখতে পেরেছে।
কিন্তু এর ফলে সাংবিধানিক এবং মৌলিক কাঠামোগত সমস্যাগুলি, যেমন অনিরাপদ কর্মক্ষেত্র, রাষ্ট্রের এবং পুলিশের ব্যর্থতা, আর সর্বপরি ধনতান্ত্রিক-পিতৃতান্ত্রিক দেহ নিয়ন্ত্রণ এই বিষয়গুলি আলোচনার বাইরে চলে যায়।
যে কারণে ধর্ষণ করে ফেলা গেল, সেই কারণগুলি তুলে ধরলে সব ধর্ষণকেই সমান স্বীকৃতি দিতে হবে। বিবাহিত জীবনে বহু মহিলাকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও যৌন ভোগের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। দেহোপজীবী মহিলাকে তাঁর ইচ্ছের বিরুদ্ধে তুলে নিয়ে যাওয়া যায়। এমনকি পুলিশ হেফাজতে কিংবা সংশোধনাগারে পুরুষের শরীরের মলদ্বারে যে ধর্ষণের স্মৃতি, সেই স্মৃতির আর কি প্রয়োজন? সেই স্মৃতি তুলে ধরলে দেহের রাজনীতির সাথে কিংবা লিঙ্গের রাজনীতির সাথে ক্ষমতাকে জুড়ে নিতে হয়। ক্ষমতা থাকলে জোর খাটানো সম্ভব। মরিস হালবাওকাসকে এইখানে একটু ফিরিয়ে আনি, তাঁর প্রতিপাদ্যটি এই - একটি বৈষম্যমূলক সমাজে, মানুষের সমষ্টিগত স্মৃতি প্রায়শই সামাজিক কাঠামোর মাধ্যমে পুনর্গঠিত হয়। এই পুনর্গঠনের মধ্যে স্মরণের নির্বাচন এবং কৌশলগত বিস্মৃতি দুই-ই থাকে। তাই মিডিয়াকে এক্ষেত্রে ভুলে গেলে চলবে না। কোন ধর্ষণের খবর প্রথম পাতা থেকে সরতে সরতে জেলার খবরে চলে যাবে, তা ঠিক হয় উচ্চকোটির মূল্যবোধের নিরিখে। ভারতীয় প্রেক্ষাপটে এই কাঠামো ঐতিহাসিকভাবে লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতার প্রতি জনপ্রতিক্রিয়াকে সীমাবদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত রাখতে সাহায্য করেছে। এনকাউন্টার যখন "ন্যায়" দেখায়, তখন "অত্যাচারের স্মৃতি" দ্রুত সংরক্ষণাগারে চলে যায়। তাই "আবার এইরকম ধর্ষণ হবে কি?" জিজ্ঞেস করলে শুনতে হয় "সকালে জমা, বিকেলে খরচ" কিংবা "সেই পরিকাঠামো নিয়ে কেন আবার?"। আইনের জবাবদিহির দাবি দুর্বল হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের মৌলিক ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রয়োজনীয়তা কমে যায়। বরং এই প্রশ্নগুলি যেন শোকযোগ্য মৃতদেহকে অপমানের সমান। অথচ, ৬০ বছর বয়সী একজন দলিত মহিলা, নিয়মিত ধান কেটে ফেরার সময় ধর্ষিত হবেন বর্ধমানে কিংবা হুগলীতে। "সে দেহ, এ দেহ না"।
দেহের শুদ্ধতা এবং কানুনের এই ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রক্রিয়াটি ডঃ আম্বেদকার যখন পাঠ করেছিলেন, তখন তিনি "মনুবাদী ন্যায়বিচার"কে চিহ্নিত করেছেন এই আপাত ক্ষোভের স্বার্থে লুকিয়ে থাকা আসল সমস্যা রূপে। যেখানে শাস্তি দ্রুত, শ্রেণি ভিত্তিক এবং পিতৃতান্ত্রিক-জাতিগত শ্রেণিবিন্যাস অনুসারে প্রয়োগ হয়, সেখানে মনুবাদ একটি স্বতন্ত্র পাঠ। আজকের এনকাউন্টার-ব্যবস্থাও সেই পুরনো যুক্তিরই সমসাময়িক রূপ - নিরাপত্তাকরণ ও হিন্দুত্বের সংখ্যাগুরুবাদের ভেতর দিয়ে। আজকের এই প্রক্রিয়া সেই পাঠের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই বিচারে দেহ তাহলে, দুরকম "কার্যকরী ও শৃঙ্খলিত দেহ"।
ফলে এনকাউন্টার শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেয় না, বরং সমাজের শ্রেণিভিত্তিক বৈষম্যকেও রক্ষা করে। যে দেহগুলো "কাজে লাগে", তাদের লঙ্ঘন সাময়িকভাবে গুরুত্ব পায়। তারপর এনকাউন্টার "সমস্যার সমাধান" করে দিলে সমাজ আবার পূর্বের "স্বাভাবিক" অবস্থায় ফিরে যায়, সেই স্বাভাবিক যেখানে প্রতিদিনের যৌন সহিংসতা, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা এবং দেহের ওপর পুঁজিবাদী নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকে।
"শোকের যোগ্য দেহ" থেকে "সকল দেহের অধিকার": আজকের প্রতিবাদ
এই নির্বাচিত শোকস্তব্ধতা একটি ক্লীবত্বের অনুকরণ, যা জনস্মৃতি ও বিবেকের বিবর্ণতাকে ব্যবহার করে একটি ভ্রান্ত এবং মধ্যবিত্তের সুবিধাজনক 'ন্যায্য জগতের' দিকে নিয়ে যায়। "ন্যায্য জগতের বিশ্বাস" বলে যে, "কার্যকরী" দেহগুলোকে শাস্তিমূলক এবং আপাত-নাটকীয়তার মাধ্যমে রক্ষা করা যাক। কিন্তু যাদের শ্রম বা প্রজনন ক্ষমতাকে উদ্বৃত্ত, বিচ্যুত বা বর্তমান শ্রেণিবিন্যাসে নিম্নতর বলে বিবেচনা করা হয়, তাদের বিরুদ্ধে চলমান সহিংসতা অস্পৃষ্য থেকে যায়। এমনকি এই নিম্নতর দেহের জন্য, ভিক্টিম শেমিং কিংবা "লাভ জিহাদের" রাস্তা খোলাই থাকে।
মার্কসবাদী-নারীবাদী চিন্তকেরা (যেমন সিলভিয়া ফেদেরিচি ও অন্যান্যরা) দেখিয়েছেন যে, পুঁজিবাদ ঐতিহাসিকভাবে নারীর প্রজনন ও সামাজিক পুনরুৎপাদনমূলক ক্ষমতার ওপর সহিংস নিয়ন্ত্রণ চেয়েছে, যাতে শ্রমশক্তি নিশ্চিত করা যায়। বরং যখনই এই ব্যবস্থায় সংকট দেখা দেয়, তখন এটি একটি দৃশ্যমান ও নাটকীয় শাস্তি দেখিয়ে সেই সংকটকে সাময়িকভাবে "ম্যানেজ" করে। এই ম্যানেজমেন্টের বিস্ময় কাটতে না কাটতেই, ফিরে আসে নতুন সংঘাত।
এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রগতিশীল নারীবাদী, মার্কসবাদী ও গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে একসঙ্গে দাঁড়াতে হবে। কেবলমাত্র এক-আধটা ঘটনায় রাগ প্রকাশ করে বা এনকাউন্টার দেখে স্বস্তি নিয়ে ক্ষান্ত হলে চলবে না। দরকার হল জনস্মৃতিকে যথেষ্ট দীর্ঘ সময় ধরে জীবিত রাখা, যাতে মৌলিক দাবি তোলা যায় - নিরাপদ কর্মক্ষেত্র, সামাজিকীকৃত যত্নব্যবস্থা, দেহের ওপর পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের বিলোপ, এবং সব দেহের জন্য শোক ও মর্যাদার সম্প্রসারণ।
লেখার এই অবধি এসে এই প্রতিবাদের সাথে যুক্ত অনেকেই, রেগেমেগে বলে উঠবেন, দেহ নিয়ে ভাবিনি, নিজের পরিবার নিয়ে ভেবেছি। কিংবা আজ রেখে যাই, আজকের প্রতিবাদ। সে রাগ যোগ্য কিন্তু সাময়িক। যতদিন অবধি দেহের রাজনীতি আমাদের শ্রেণির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করা যাবে না, ততদিন, এই ক্ষোভ এবং বহিঃপ্রকাশ সাময়িক।
চিন্তার শেষ অংশ এটুকুইঃ "কোন দেহ শোকের যোগ্য?"
এই প্রশ্নটি থেকে যেদিন থেকে শুধু পিতৃতন্ত্রের নির্বাচিত ক্ষোভ এবং বিচার বহির্ভূত নাটকের মধ্যে রাগগুলি সীমাবদ্ধ থাকবে না, সেদিন ফিরে আসতে হবে মৌলিক প্রশ্নে। দেহ এবং দেহের ক্ষমতার সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক হয়ে উঠবে একটি মৌলিক শ্রেণি এবং লিঙ্গের রাজনৈতিক দাবি। প্রতিটি দেহের নিরাপত্তা, মর্যাদা, এবং সামগ্রিক যাপনে বেঁচে থাকার অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি। সেই দিন অবধি যেন বামপন্থী মননের ক্ষোভ জেগে থাকে, 'দেহে এবং মনে'।
তথ্যসূত্র:
● আম্বেদকার, ডঃ বি. আর. (২০১৪ [১৯৩৬]) জাতিভেদ প্রথার উচ্ছেদ। নবায়ন।
● ভার্গব, নৈনা ও গৌরী এস. কুমার (২০২১) 'ভারতে বহির্বিচারিক হত্যা...', South Asia @ LSE, ২৪ মে।
● বাটলার, জুডিথ (১৯৯৩) Bodies That Matter। রাউটলেজ।
● বাটলার, জুডিথ (২০০৪) Precarious Life। ভার্সো।
● লার্নার, মেলভিন জে. (১৯৮০) The Belief in a Just World। প্লেনাম প্রেস।
● সাহা, তোর্সা ও সোহম ভট্টাচার্য (২০২৫) 'Making of a Rape–Murder Atrocity and the Failed State of West Bengal', Economic and Political Weekly, ১২ জুলাই।