আরেক রকম ● চতুর্দশ বর্ষ পঞ্চদশ সংখ্যা ● ১-১৫ আগস্ট, ২০২৬ ● ১৬-৩২ শ্রাবণ, ১৪৩৩
প্রবন্ধ
ভারতের জেন জি আন্দোলন সফল হল কী করে?
গৌতম হোড়
দিল্লি বিমানবন্দর। ৬ জুন। সকাল দশটা নাগাদ অ্যামেরিকা থেকে ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামল অভিজিৎ দীপকের বিমান। বিমানবন্দরের সামনে পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। অ্যামেরিকা থেকে অভিজিৎ দীপকে বলেছিলেন, ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)র সমর্থকরা যেন দলে দলে বিমানবন্দরে চলে আসেন। তিনি এখান থেকে পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় যাবেন। যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ দেখানোর অনুমতি নেবেন। অনুমতি নিয়ে সোজা যন্তর মন্তর। আশা ছিল, সেই জায়গাটা ভরিয়ে দেবেন জেন জি-রা, যারা সিজেপি-র সমর্থক। সামাজিক মাধ্যমে সিজেপি-র জন্মের পরেই যাদের ফলোয়ারের সংখ্যা দুই কোটি ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু সেদিন বিমানবন্দরের চেহারাটা ছিল অন্যরকম। সেখানে তখন রাশি রাশি পুলিশ, দাঙ্গারোধী বাহিনী, কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনীর জওয়ান। আর শয়ে শয়ে সাংবাদিক ও ইউটিউবার। তুলনায় ককরোচ জনতা পার্টির সদস্য হাতে গোনা। বেশ খানিকক্ষণ পর অভিজিৎ দীপকে বাইরে এলেন। হাতে সংবিধান। তাকে ঘিরে পুলিশ ও সিজেপি্-র কয়েকজন নেতা। ছবি ও ভিডিও তোলার প্রবল হুড়োহুড়ির মধ্যে পুলিশ তাকে গাড়িতে তুলে দিল। দীপকে চললেন যন্তর মন্তর, পুলিশ ততক্ষণে অনুমতি দিয়ে দিয়েছে বিক্ষোভের।
যন্তর মন্তরেও সিজেপি-র সমর্থকের সংখ্যা ছিল কয়েক হাজার মাত্র। একটা পাঁচিলের সামনে বসে, দাঁড়িয়ে ছিলেন সিজেপি নেতারা। তাদের সামনে কিছু মানুষ বসে। আর তার পিছনে ব্যাপক ধাক্কাধাক্কি চিত্রসাংবাদিক ও ইউটিউবারদের। অনভিজ্ঞতার জন্য সিজেপি নেতারা জানতেন না, একটা মঞ্চ করতে হয়, চিত্রসাংবাদিকদের জন্য আলাদা প্ল্যাটফর্ম রাখতে হয়। বড় জায়গা দড়ি দিয়ে ঘিরে রাখতে হয়। কারণ, অভিজিৎ যখন দিল্লি এলেন, তার আগে ককরোচ জনতা পার্টি অল্প সময়ে হইচই ফেলে দিয়েছে। তাদের ঘিরে প্রত্যাশা তুঙ্গে উঠেছে সামাজিক মাধ্যমে। জেন জিরা সেখানে দলে দলে নাম লেখাচ্ছে। অথচ সেদিন যন্তর মন্তরে বেশি সংখ্যায় ছিল বামপন্থী ছাত্ররা। এসএফআই, এআইএসএফ, আইসার মতো ছাত্র সংগঠনগুলি। জেন জি ছিল, তবে বিপুল সংখ্যায় নয়। হয়ত মাঠে নামার আগে তারা দেখে নিতে চাইছিলেন, বিক্ষোভটা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। সেদিনও প্রধান দাবি ছিল, ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ইস্তফা দিতে হবে, প্রশ্নফাঁস বন্ধ করতে হবে। ছি্লেন মধ্যবয়স্ক ও বয়স্করাও। আর ছিল প্রচুর পুলিশ ও গোয়েন্দা।
প্রশ্নফাঁস বন্ধ করা পড়ুয়াদের কাছে জ্বলন্ত একটা সমস্যা। তাদের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। অথচ, ভারতে কেন্দ্রীয় ও রাজ্যস্তরে বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের ঘটনা জলভাত হয়ে পড়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে মধ্যপ্রদেশে ব্যাপম, পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষকনিয়োগের কেলেঙ্কারি নিয়ে হইচই কম হয়নি। অন্য অনেক রাজ্যেও শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগ সমানে উঠতে থাকে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্ট বলছে, ২০০২ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত ৪৫টি বড় ধরনের প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। অল্প কিছু ক্ষেত্রে উচ্চপদস্থ অফিসারদের শাস্তি হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কারও কোনও শাস্তি হয়নি। নিউজলন্ড্রির রিপোর্ট বলছে, ১০ বছরে ৮৯টি প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছে।
দীপকে-সহ সিজেপি নেতারা সিদ্ধান্ত নেন, তারা যন্তর মন্তরে লাগাতার বিক্ষোভ চালিয়ে যাবেন। কিন্তু সেখানেও যে খুব বেশি মানুষ আসছিলেন এমন নয়। ২৮ জুন থেকে সোনম ওয়াংচুক অনশন শুরু করলেন। বিক্ষোভকারীর সংখ্যা সামান্য বাড়লেও খুব বেশি হেরফের হল না। দিনের পর দিন অনশন চলল। সোনম দুর্বল হয়ে পড়লেন। ১৮ জুলাই সোনমকে হাইকোর্টের নির্দেশের পর পুলিশ টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গেল সফদরজঙ্গ হাসপাতালে। সেই ভিডিও দেখার পর পরিস্থি্তি ঘুরে গেল। সারা দেশ থেকে যুব ও তরুণ-তরণীরা আসতে শুরু করলেন যন্তর মন্তরে। বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা লাফিয়ে বাড়তে শুরু করল। ২০ জুলাই সংসদ অভিযানের ডাক দিল সিজেপি। সেখানেই বিক্ষোভকারীদের উপর পুলিশের লাঠি নির্মমভাবে নেমে এল। ভারতে এটা খুবই চেনা ছবি। রাজ্যে বা দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের থামাতে পুলিশ লাঠি ও কাঁদানে গ্যাসের সেল ফাটায়। কিন্তু রাজনৈতিক বিক্ষোভকারীদের এইভাবে থামান যায়। কিন্তু জেন জি-দের এভাবে থামানো যায় কি? তারা তো সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত। সামান্য সময়ের মধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেল লাঠিবর্ষণের সেই ছবি। সিজেপি-র বিক্ষোভের প্রতি জনসমর্থন লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকল।
খুব সাধারণ মানুষ, যারা সাধারণ সময়ে প্রতিবাদের ধারেকাছে থাকে না, তারাও গেলেন যন্তর মন্তরে, জেন জি-কে সমর্থন জানাতে। তাদের একটাই কথা, আহা, বাচ্চারা প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদ করছিল, তাদের এইভাবে মারল? তখন সারা রাত ধরে বিক্ষোভ হচ্ছে। আর অটোওয়ালা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সেখানে খাবার, জল নিয়ে যাচ্ছেন। আর জেন জি-র সদস্যরা পুলিশের কাছে গিয়ে বলছে, পুলিশ আঙ্কল, মেরা হাত সেঁক দো না, মানে আমার হাতেও মার।
আর সেই সঙ্গে গুজব ছড়াচ্ছে, সিজেপি-র ফান্ডিং আসছে বাইরের দেশ থেকে। এই বিষয়ে বিদে্শ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, তাঁদের কাছে এই বিষয়ে কোনও তথ্য নেই। তারপর শুরু হলো পোস্টের বন্যা, বিদেশ মন্ত্রক বলেছে, সিজেপি-র কাছে বাইরের দেশের অর্থ আসছে না। পরে বিদেশ মন্ত্রকের ফ্যাক্ট চেক জানিয়ে দেয়, এই ধরনের প্রচার বিভ্রান্তিকর।
এই বিতর্কের মধ্যেই রাজ্যে রাজ্যে শুরু হলো বিক্ষোভ। বড় শহরগুলিতে। সেখানেও জমায়েতে প্রচুর মানুষ যোগ দিলেন। বিহারে এই বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করতে গুলিও চালায় পুলিশ। সেই পুলিশকর্মীকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। কিন্তু সরকার ততক্ষণে বুঝে যায়, ককরোচদের দাবি না মানলে বিপদ বাড়বে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বারবার ভিডিও বার্তা দিতে থাকেন। শেষপর্যন্ত ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন, ককরোচ জনতা পার্টির অন্য দাবিও সরকার মেনে নেয়। ২৭ জুলাই সংসদে প্রশ্নফাঁস সংক্রান্ত আইন কঠোর করতে সংশোধনী আনে সরকার।
এই ইতিহাসটুকু বলার পর একবার ঢোকা যাক ককরোচদের আন্দোলনের ভিতর। আগেই বলেছি, প্রথমে এই বিক্ষোভে ভিড় হচ্ছিল না। তারপর সোনমকে জোর করে নিয়ে যাওয়া ও বিক্ষোভকারীদের উপর লাঠির পর পুরো ছবিটা বদলে যায়। হাজারে হাজারে মানুষ ভিড় করতে থাকেন। আর এই বিক্ষোভ নিছক আর পাঁচটা বিক্ষোভের মতো ছিল না। বরং তা কার্নিভালের চেহারা নেয। কোথাও গান হচ্ছে, কোথাও ছবি আঁকা হচ্ছে, কোথাও গোল হয়ে ঘিরে নিজেদের কথা বলছেন তারা। সমানে সবাই ভিডিও করছেন এবং তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন সামাজিক মাধ্যমে। শুরু হয়েছে লঙ্গর। জলখাবার দেওয়া হচ্ছে। রাশি রাশি জলের বোতল আসছে। একে প্রবল গরম, তার উপর প্রচুর মানুষ ঠাসাঠাসি করে আছেন। ফলে গরম আরো বেশি লাগছে। প্রচুর যুবক সেখানে হাতপাখার হাওয়া করছেন, কেউ কেউ ব্যাটারির ফ্যান হাতে নিয়ে অন্যদের হাওয়া দেওয়ার চেষ্টা করছেন। একাধিক জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। সেখা্নে ওষুধ আছে। চিকিৎসকও। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আর ঘন ঘন স্লোগান উঠছে। সেই স্লোগানের মাধ্যমে রাজনীতিক থেকে মিডিয়ার একাংশের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানানো হচ্ছে। আর লড়াই চলছে সামাজিক মাধ্যমে। বিক্ষোভ নিয়ে পোস্টের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে সামাজিক মাধ্যম। এই বিক্ষোভ শুধু সিজেপির ছিল না, এখানে যোগ দিয়েছিল নানান সংগঠন এবং সংগঠনের বাইরে থাকা তরুণ প্রজন্ম, যাদের কাছে প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারি ছিল খুব বড় বিষয়।
রাজনীতির ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যমে বিজেপি-র সঙ্গে এঁটে উঠতে পারে না অন্য দলগুলি। সেখানে তারা অন্যদের থেকে অনেকটাই এগিয়ে। কিন্তু জেন জি-র সঙ্গে এই লড়াইয়ে সেই জোরদার সামাজি্ক মাধ্যমের প্রচারযন্ত্রও ফেল করল।
ওই বিক্ষোভ দেখে কয়েক বছর আগের কৃষক বিক্ষোভের কথা মনে পড়ছিল। সেই বিক্ষোভেও কার্নিভালের ছবি দেখেছিলাম। সেটাও ছিল অন্য ধারার আন্দোলন। সেই আন্দোলনের জেরে তিনটি কৃষি আইন বাতিল করতে হয়েছিল সরকারকে। কিন্তু তার জন্য দীর্ঘদিন আন্দোলন করতে হয়েছিল কৃষকদের।
কৃষকদের আন্দোলন হয়েছিল দিল্লির সীমান্তে, কিন্তু জেন জি-দের আন্দোলন হলো দিল্লির বুকে যন্তর মন্তরে। দুই মাস হওয়ার আগেই সেই আন্দোলনের প্রাবল্যে ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ইস্তফা দিতে হল। এই প্রথম আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নরেন্দ্র মোদী মন্ত্রীসভায় একজন মন্ত্রীকে ইস্তফা দিতে হল। কেন জেন জি-দের দাবি মানল সরকার? সোনম-কাণ্ড ও লাঠির ধাক্কার ফলে সাধারণ মানুষের সহানুভূতি যখন সমানে কেন্দ্রিভূত হচ্ছিল আন্দোলনকারীদের দিকে, তখনই বিজেপি-র শীর্ষ নেতৃত্ব বুঝে যান, এবার দাবি মেনে বিক্ষোভ শেষ করার সময় এসেছে। না হলে ক্ষতিটা অনেক বড় হয়ে যাবে।
দিল্লিতে বিজেপি-র মুখোমুখি যে বিরোধীরা আছে, তারা ছকে বাঁধা আন্দোলন করে। এভাবে বিক্ষোভ দেখানোর ক্ষমতা, ইচ্ছা ও দৃঢ়তা তাদের নেই। তাদের রাজনীতি বিবৃতি-নির্ভর। সংসদ চললে তারা লোকসভা ও রাজ্যসভা অচল করে মিডিয়ার নজরে থাকতে চান। তাদের মোকাবিলা করা বিজেপি-র শীর্ষনেতাদের কাছে সহজ কাজ। কিন্তু জেন জি-রা যখন অদম্য জেদ নিয়ে আন্দোলনে নামে, তখন বিরোধীদের মতো একই অস্ত্র দিয়ে তাদের মোকাবিলা করা যায় না। রাজনীতি হলো পারসেপশনের খেলা। সেখানে মানুষের পারসেপশন ঘুরে গেলে কী হয়, তা বহুবার বহু রাজ্যে ও কেন্দ্রে দেখা গেছে। সেজন্যই বেশি ঝুঁকি নেওয়া বিজেপি-র শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষে সম্ভব ছিল না। আর তাই নরেন্দ্র মোদী দ্রুত কৌশল বদল করে ককরোচদের দাবি মেনে নিলেন।
প্রথম রাউন্ডে জিতল সিজেপি। অতঃপর? তিনটি কৃষি্ আইন বাতিলের সাফল্য থাকার পর কৃষকরা আবার আন্দোলনে নামার চেষ্টা করেছিলেন। সফল হয়নি। আন্না হাজারের জন-লোকপাল আন্দোলন প্রবল সমর্থন পেয়ে সাফল্যের মুখ দেখেছিল। কিন্তু তারপর আন্না হাজারেকে আর সেরকম আন্দোলন করতে দেখা যায়নি। ককরোচ জনতা পার্টি কি পারবে? এর জবাব ভবিষ্যতই দিতে পারবে। ভারতের প্রতিবেশী দেশে জেন জি আন্দোলনের সাফল্যের পর বারবার প্রশ্ন উঠেছে, দিল্লিতে কি এই আন্দোলন সফল হবে? এই প্রশ্নের জবাব পাওয়া গেছে। এবার সম্ভবত কেন্দ্র বা রাজ্য কোনও সরকারই জেন জি-র শক্তিকে খাটো করে দেখবে না।